অদ্ভুত,বিস্ময়,অবিশ্বাস্যসিনেমা হলের গলি

দাঙ্গাল গার্লজ: বাস্তবের গীতা-ববিতার গল্প!

ভারতের হরিয়ানা রাজ্য, মহাবীর সিং পোগাটের বাস এখানেই। ভদ্রলোক কুস্তি লড়তেন। হরিয়ানায় এটা সবাই করে। কুস্তি এখানে শুধু খেলা নয়, একটা ভালোবাসার নাম, অন্যরকম একটা আবেগের নাম। তবে মহাবীর সিং কুস্তি ভালোই খেলতেন। রাজ্য পর্যায়ে পুরস্কারও পেয়েছিলেন। কিন্ত জীবনের একটা বড় আক্ষেপ তার, ভারতের হয়ে কখনও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে খেলতে পারেননি, কুস্তির বড়মঞ্চে ভারতকে কোন পুরস্কার এনে দিতে পারেননি। 

তবে নিজে না পারলেও, স্বপ্ন দেখা বন্ধ করেননি তিনি। ভেবেছিলেন, ভগবান যদি একটা ছেলেসন্তান দেয় তাকে, তাহলে সেই ছেলেকেই কুস্তিগীর বানাবেন, ছেলে তার কুস্তিতে আন্তর্জাতিক পুরস্কার নিয়ে আসবে ভারতের জন্যে, ভারতের তিনরঙা পতাকাটা তার ছেলের গৌরবে উড়বে পতপত করে! এসব ভাবতে ভাবতে আনমনেই মনটা খুশীতে ভরে ওঠে তার।

কিন্ত মানুষ ভাবে এক, হয় আরেক। পরপর তিনটে সন্তানের জন্ম হলো মহাবীর সিং-এর। কিন্ত সবাই মেয়ে। প্রতিবার তার স্ত্রী গর্ভবতী হয়, মহাবীর সিং বড় আশা নিয়ে অপেক্ষা করেন, একটা ছেলে হবে বুঝি! পরপর তিনবার কন্যাশিশুর জন্ম হবার পরে মহাবীর খানিকটা হতাশ হয়ে পড়লেন, নিজের স্বপ্নটা কখনও বাস্তবায়িত হবে না ভেবে মুষড়েও পড়লেন খানিকটা।

ক’দিন বাদেই নিজের চিন্তাভাবনাগুলোর মোড় অল্প একটু ঘুরিয়ে দিলেন মহাবীর। স্বপ্নটা একই রইলো, শুধু চরিত্রটা বদল্র গেল। মহাবীর ঠিক করলেন, সন্তানকে কুস্তিগীর বানিয়ে তিনি ছাড়বেনই, কিন্ত স্রষ্টা যখন ছেলে দেয়নি তাকে, মেয়েদেরই কুস্তি শেখাবেন তিনি। যেই ভাবা সেই কাজ, বড় দুই মেয়ে গীতা আর ববিতার উপর আদেশ জারী করা হলো, তারা যেন বাবার সাথে কুস্তি শিখতে যায় নিয়মিত। এটুকুতেই সীমাবদ্ধ থাকলে ক্ষতি ছিল না, কিন্ত কুস্তিগীরের মতো শরীর গড়ার জন্যে ছোট্ট দুটো মেয়েকে ভোররাত চারটার সময় ঘুম থেকে উঠিয়ে দিতেন মহাবীর, পাঠাতেন কয়েক কিলোমিটার দৌড়ে আসতে। ওরা যাতে ফাঁকি দিতে না পারে, সেজন্যে নিজেও বের হতেন ওদের সাথে, কখনও দৌড়ে, আবার কখনওবা মোটর সাইকেলে চড়ে।

স্কুল থেকে ফিরে দুই মেয়েকে যেতে হতো ক্ষেতের মাঝখানে কুস্তির আখড়ায়, নরম বালি দিয়ে সেখানে দুই মেয়ের জন্যে কুস্তি শেখার ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন মহাবীর। দশ-বারো বছরে বাচ্চা মেয়েগুলোর প্রিয় সব খাবারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলো, আচার-মিষ্টির জায়গা নিলো শসা-গাজর আর পুষ্টিকর বিভিন্ন খাবার। জীবনটা হুট করে বদলে গেল গীতা আর ববিতার, সমবয়েসী অন্য মেয়েরা যখন সিনেমা দেখতে যাচ্ছে, প্রেম করছে, বিয়ের পিড়িতে বসছে, তখন ওরা দুজনে ঘাম ঝরাচ্ছে কুস্তির আখড়ায়।

মহাবীর সিং পোগাট, গীতা পোগাট, ববিতা পোগাট, দাঙ্গাল, আমির খান, হরিয়ানা, কুস্তি, কমনওয়েলথ গেমস

শুরুর দিকে ব্যপারটাকে সবাই মহাবীর সিং-এর পাগলামী বলেই ধরে নিয়েছিল। সবার ধারণা ছিল, অনেক চেষ্টার পরেও ছেলে সন্তান না হওয়ায় মহাবীরের ভীমরতি ধরেছে। কিন্ত লোকজনের ভুল ধারণাটা ভেঙে গেল একদিন হুট করেই, ভাঙলেন মহাবীর নিজেই।

হরিয়ানার প্রতিটা অঞ্চলেই মাসিক বা বাৎসরিক কুস্তি উৎসব বা প্রতিযোগীতার আয়োজন করা হয়। স্থানীয় ভাষায় এগুলোকে ‘দাঙ্গাল’ নামে ডাকা হয়। এমনই এক দাঙ্গালে দর্শকেরা একদিন অবাক হয়ে দেখলো, ছেলেদের মতো করে চুল কাটা একটা মেয়েকে নিয়ে এক ভদ্রলোক এসেছেন খেলোয়াড় হিসেবে সেই মেয়ের নাম লেখাতে! সেই কুস্তির আয়োজক কমিটির তো মাথায় হাত! মেয়েরা কুস্তি লড়বে ছেলেদের সাথে, এমন কথা কোন জনমে কে শুনেছে? মহাবীর সিং নাছোড়বান্দা। তার মেয়ে দাঙ্গাল লড়বেই, সেটা যেকোন কিছুর বিনিময়েই হোক! কুস্তিগীর হিসেবে মহাবীর সিংকে চেনে সবাই, কিন্ত তার এউ দাবীটা বড্ড খাপছাড়া মনে হয় সবার কাছেই।

সেই টুর্নামেন্টে কিশোরী গীতা হেরে গিয়েছিল। তবে পুরুষশাসিত সমাজের মুখের ওপরে কঠিণ একটা বার্তা ছুঁড়ে দিয়ে এসেছিলেন মহাবীর সিং। নারীরা অবলা নয়, নারীরা পুরুষের সমকক্ষ, সমান সম্মান তাদেরও প্রাপ্য- হরিয়ানার এক আধাশিক্ষিত মধ্যবয়স্ক পুরুষ সেই সমাজের আনাচে কানাচে মিশে থাকা ভ্রান্ত ধারণা আর বিশ্বাসগুলোর মূল ধরে টান মেরেছিলেন সেদিন।

মহাবীর সিং-এর স্বপ্ন সার্থক হয়েছিল, যে স্বপ্নটা তাকে ঘুমুতে দিতো না, রাতের পর রাত জাগিয়ে রাখতো, সেটাই পূরণ করেছেন তার মেয়েরা। মাঝের কষ্টসংকুল পথটা হেঁট গিয়েছেন ওরা, কুস্তিগীর হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন জাতীয় পর্যায়ে। তারপর ভারতের ঝাণ্ডা নিয়ে ছুটে গেছেন বিশ্বদরবারে। ২০১০ সালে কমনওয়েলথ গেমসে প্রথম ভারতীয় মহিলা কুস্তিগীর হিসেবে ৫৫ কেজি ফ্রিস্টাইল রেসলিং ইভেন্টে স্বর্ণপদক জয় করেন গীতা। সেবছর অন্য ইভেন্টে ববিতা জিতেছিলেন সিলভার মেডেল।

মহাবীর সিং পোগাট, গীতা পোগাট, ববিতা পোগাট, দাঙ্গাল, আমির খান, হরিয়ানা, কুস্তি, কমনওয়েলথ গেমস

২০১২ সালে প্রথম ভারতীয় নারী হিসেবে ওয়ার্ল্ড রেসলিং চ্যাম্পিয়নশীপে ব্রোঞ্জ মেডেল জেতেন গীতা, অলিম্পিকে অংশ নেয়ার সুযোগ পান এই সাফল্যের কারণে। ২০১৪ সালের কমনওয়েলথ গেমসে ববিতা স্বর্ণপদক জিতেছিলেন ৫৫ কেজি ক্যাটাগরিতে। আর ৪৮ কেজির ওজন সীমায় স্বর্ণ জিতেছিলেন ওদের ছোট বোন, মহাবীর সিং পোগাটের আরেক মেয়ে ভিনেশ পোগাট। ওদের আরেক বোন ঋতু পোগাটও কুস্তিগীর।

হরিয়ানায় মহাবীর সিং-এর গ্রামে গেলে এখন গ্রামের সীমানার একদম শুরুতেই একটা বড়সড় গেট নজরে পড়বে সবার। গেটের ওপরের অংশে লেখা, মহাবীর সিং, গীতা, ববিতা, ভিনেশ আর ঋতু পোগাটের গ্রামে আপনাকে স্বাগতম! যে গ্রামের মানুষেরা একটা সময়ে লজ্জায় মুখ লুকাতো মেয়েরা কুস্তি খেলে বলে, সেই মানুষগুলোই এখন মহাবীর সিং-এর মেয়েদের নিয়ে গর্ব করে! যে মহাবীর সিংকে একটা সময় প্রায় একঘরে করে রাখা হয়েছিল, তিনিই এখন গ্রামের সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি। এখনও বৃদ্ধ মহাবীর সিং গ্রামের মেয়েদের কুস্তি শেখান তার আখড়ায়, দূর দূরান্ত থেকে বাবা মায়েরা তাদের সন্তানদের নিয়ে আসেন মহাবীর সিং-এর কাছে।

মহাবীর সিং-এর গল্পটা প্রায় সবারই জানা। বছরখানেক আগেই বলিউড সুপারস্টার আমির খান ‘দাঙ্গাল’ নামের সিনেমা করেছেন এই গল্পের ওপরে, মহাবীর সিং চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন তিনি। ভারতের বক্স অফিসে সবচেয়ে বেশী আয় করা সিনেমা এখন দাঙ্গাল। যদিও কাহিনীতে রোমাঞ্চ আনার প্রয়োজনে বাস্তবের কিছু ব্যপার বদলে দেয়া হয়েছে গল্পে।

মহাবীর সিং সোজা পথে হাঁটতে চাননি, ব্যতিক্রমী রাস্তাটা বেছে নিয়েছিলেন। প্রচলিত নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এগিয়ে গেছেন সামনের দিকে। নারীত্বের শক্তি কতটুকু হতে পারে, নিজের মেয়েদের নিয়ে সেটা দেখিয়ে দিয়েছেন মহাবীর। ভারতের মতো দেশে যেখানে নারী নির্যাতন আর নারীর প্রতি সহিংসতা নিয়মিত একটা ব্যপার, সেখানে মহাবীর সিং বা গীতা ববিতার মতো মানুষগুলো উজ্জ্বল এক ব্যতিক্রম!

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close