গৌতম ঘোষ ভারতীয় নাগরিক, বাড়ি কলকাতা। বাংলাদেশের সাথে তার সম্পর্কটা কাজের। এখানকার একটা কোম্পানীতে বেশ কয়েকবছর চাকুরী করেছেন তিনি। এখন ভারতীয় একটা কোম্পানীর ম্যানেজিং ডিরেক্টর তিনি, বাংলাদেশকে একেবারে ছেড়ে যেতে পারেননি এখনও। ব্যবসায়িক প্রয়োজনে মাঝেমধ্যেই আসতে হয় এখানে, রাজধানী ঢাকায়। ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ ম্যানেজমেন্টের এই গ্র‍্যাজুয়েট কয়েকদিন আগেও বাংলাদেশে এসেছিলেন, তবে আসার আগে বুঝতে পারেননি, ঢাকা শহরটা তখন আগের মতো নেই।

ব্যবসার কাজে গৌতম যখন ঢাকায় পা রেখেছেন, তখন বাংলাদেশের রাজধানী শহর উত্তাল নিরাপদ সড়কের দাবীতে। শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই ছাত্রছাত্রী দিয়া আক্তার মীম এবং আবদুল করিম রাজীব নিহত হয়েছেন বাসে নীচে চাপা পড়ে, দুটো বাসের গতির লড়াইয়ের বলি হয়েছে দুটো নিস্পাপ তাজা প্রাণ। সেই হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবীতে ছাত্রছাত্রীরা পথে নেমেছে, স্লোগানে স্লোগানে উত্তাল করেছে রাজপথ।

‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ ধ্বনিতে মুখরিত হয়েছে ঢাকার রাজপথ। প্রতিদিনই ঢাকার ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করছে ছোট ছোট এই ছেলেমেয়েরা। তারা প্রতিটা গাড়ি, প্রতিটা মোটরসাইকেলের লাইসেন্স চেক করছে, লাইসেন্স ঠিকঠাক থাকলে গাড়ি যেতে দিচ্ছে, আর কোন সমস্যা পেলে আটকে দিচ্ছে সেটা। ওদের কথা একটাই, লাইসেন্স ছাড়া এই শহরে কেউ গাড়ি চালাতে পারবে না, এই শহরটাকে মৃত্যুপূরীতে পরিণত করার অধিকার কাউকে দেয়া হবে না। পুলিশ-বিজিবি এমনকি মন্ত্রীর গাড়িও আটকে দিয়েছে তারা, পানিসম্পদ মন্ত্রীকে বাধ্য করেছে লাইসেন্সবিহীন গাড়ি থেকে নেমে অন্য গাড়িতে করে যেতে।

বাস আটকে ওরা ড্রাইভিং লাইসেন্স চেক করছে, যে কাজটা করার কথা ট্রাফিক পুলিশের। পুলিশ সেটা করে না কখনও, করলেও লেনদেনের বিনিময়ে ছেড়ে দেয়া হয় লাইসেন্স না থাকা চালকদের। এই ছেলেমেয়েরা সেটা করেনি। তারা যে বাসের চালকের কাছে লাইসেন্স খুঁজে পায়নি, সেটাকে আটকে দিয়েছে। এমনকি আর্মড পুলিশ আর পুলিশের গাড়ি আটকেও লাইসেন্স চেক করেছে তারা। মজার ব্যাপার কি জানেন? আর্মড পুলিশের সদস্যদের বহনকারী বাস কিংবা মোটরসাইকেলে চড়ে যাওয়া পুলিশ, কারো কাছেই লাইসেন্স ছিল না! স্প্রে মার্কার দিয়ে আনসার সদস্যদের বহনকারী গাড়িতে ছেলেরা বড় করে লিখে দিয়েছে- ‘লাইসেন্স নাই!’

রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজ, দুর্ঘটনা, হত্যা, ছাত্র আন্দোলন

এতবছর ধরে যে কাজটা ট্রাফিক পুলিশ করতে পারেনি, সেটাই করে দেখিয়েছে ছাত্র-ছাত্রীরা। তারা প্রমাণ করে দিয়েছে, সদিচ্ছা থাকলে সবকিছুই সম্ভব। জরুরী পরিবহণের জন্যে রাস্তায় ইমার্জেন্সি লেন তৈরী করেছে ছাত্র-ছাত্রীরা। সেই লেন দিয়ে পার করা হচ্ছে অ্যাম্বুলেন্স বা ফায়ার সার্ভিসের গাড়ির মতো জরুরী যানবাহনকে। এরমধ্যে পুলিশ কিংবা পরিবহন শ্রমিক, এমনকি সরকারদলীয় ছাত্রসংগঠনের কর্মীরাও কোথাও কোথাও হামলা চালিয়েছে আন্দোলনরত এসব কিশোর-কিশোরীদের ওপর!

স্বাভাবিকভাবেই এতসব করতে গিয়ে কোথাও কোথাও গাড়ির গতি শ্লথ হয়েছে। গত ২রা আগস্ট গৌতম ঘোষের ভারতে ফেরার কথা ছিল। বিমানের টিকেটও কাটা ছিল তার। হোটেল থেকে গাড়ি নিয়ে এয়ারপোর্টের দিকে যাচ্ছিলেন তিনি। রাস্তায় তখন ছাত্ররা প্রতিটা গাড়ির লাইসেন্স চেক করছিল। মতিঝিল থেকে প্রায় ছয়ঘন্টা লেগেছে মহাখালী পৌঁছাতে, বারো কিলোমিটারের এই পথে আটাশবার লাইসেন্স চেক করা হয়েছে তার। তারা নিজেরাই গৌতমকে জিজ্ঞেস করেছে, আপনি হজ্জ্বযাত্রী কিনা, সেরকম হলে ছাড় দেয়া হবে। গৌতম বিনয়ের সাথে জানিয়েছেন, তিনি হজ্জ্বযাত্রী নন।

ছাত্র প্রতিবাদ, নিরাপদ সড়ক চাই, আন্দোলন

শেষমেশ যখন ফ্লাইট ধরতে পারবেন কিনা, এমন সংশয়ে পড়েছেন, তখন মহাখালীর একটা চেকপোস্টে তিনি পাসপোর্ট দেখিয়ে বলেছেন- আমার প্লেন ধরার তাড়া আছে। আমাকে কি একটু কনসিডার করা যায়? সঙ্গে সঙ্গেই ছাত্ররা বলেছে, ‘আপনি আমাদের দেশের অতিথি, আপনার অসম্মান মানে আমাদের দেশের অসম্মান। আপনি যান, আর কোথাও আপনার গাড়ি চেক করা হবে না।’ গাড়ি যাতে কোন ঝামেলায় না পড়ে, সেটা নিশ্চিত করার জন্যে আন্দোলনকারী ছাত্রদের কয়েকজন তার সঙ্গে গাড়িতে করে তাকে কাকলী পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছে। ঢাকা রিজেন্সির সামনে থেকে আরেক ছাত্র তাকে এয়ারপোর্ট পর্যন্ত পৌঁচে দিয়েছে। মহাখালী থেকে যাত্রাপথের বাকীটা নির্বিঘ্নই ছিল।

গৌতম ভারতে পৌঁছে ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাস দিয়েছেন এই ঘটনার উল্লেখ করে। সেখানে যে ছেলেটা তাকে রিজেন্সি থেকে এয়ারপোর্ট পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছিল, তার একটা ছবিও দিয়েছেন। গৌতম লিখেছেন- “এমন কিছু শুধু বাংলাদেশেই সম্ভব। এই ছেলেগুলো প্রচণ্ড দায়িত্বশীল। ওরা ভালো আর মন্দের পার্থক্যটা খুব ভালো বোঝে, ট্র‍্যাফিকটাও দারুণ সামলাতে পারে। ওদের জন্যে ভালোবাসা!”

নিরাপদ সড়কের দাবীতে যে আন্দোলনটা হচ্ছে, এখানে মন খারাপ করে দেয়ার মতো অজস্র ঘটনা ঘটছে গত দুই-তিনদিন ধরে। কিশোর ছেলেগুলোর ওপর হামলা হচ্ছে, ওদের রক্তে লাল হচ্ছে রাজপথ। মন ভালো করে দেয়া অনেক গল্পও আছে, গৌতম ঘোষের এই গল্পটা তেমনই একটা গল্প, যে গল্পটা অসম্ভব মায়া আর মমতায় মোড়ানো।

Comments
Spread the love