ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

শুক্রবারের নামাজ ও আমাদের লোকদেখানো আচার!

১.

আমার এক পরিচিত আর্কিটেক্ট সদ্য পাওয়া চাকরিটি ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছে স্রেফ সে ধর্মকর্ম করেনা বলে। ব্যক্তিগত ভাবে সে সংশয়বাদী, ধর্ম নিয়ে তার মাথাব্যথা নেই। কিন্তু তার নাস্তিকতা তার নিজের কাছেই। এ নিয়ে সে কখনো লেখালেখি বা খোচাখুচি করেনা। কিন্তু তার সহকর্মীরা এ নিয়ে তাকে খোচাতে ছাড়েনি। ইচ্ছা করে তার সামনে এসেই এরা নামায পড়তো এবং সে কেন মুসলমানের সন্তান হয়েও নামায পড়ছে না, সে নামায পড়তে পারেনা – এই নিয়ে হাসিঠাট্টা করতো। বেচারা এদের অত্যাচারে চাকরিই ছেড়ে দিয়েছে। আমার ধারণা ছিল আর্কিটেক্ট বা শিল্পী বা যারা ক্রিয়েটিভ কাজের সাথে জড়িত তারা যথেষ্ট লিবারেল হয়। কিন্তু দেখা যাচ্ছে আমার ধারণা সর্বাংশে সত্য নয়।

২.

অনেক অফিসে নামায পড়া বাধ্যতামূলক। নামায না পড়লে বেতন থেকে টাকা কাটা যায়! অফিসের বস বাধ্যতামূলক ভাবে অফিসের সকলকে নামায পড়তে বাধ্য করে৷

৩.

শুক্রবার দিন এলেই আমি যে আত্মীয়ের বাসাতেই থাকি না কেন নামাযে পাঠানোর জন্য তোড়জোড় করা হয়৷ বাঙালি মুসলমানদের কাছে কোন এক বিচিত্র কারণে ইসলাম ধর্মমতে মহাগুরুত্বপূর্ণ ফরজ নামাযের থেকে জুমার নামায, ঈদের নামায- এগুলো বেশি গুরুত্বপূর্ন। যাই হোক, আমার কথা হচ্ছে, আমি ধর্মে বিশ্বাসী না অবিশ্বাসী সেটা পরের কথা। আমি যদি ধর্ম বিশ্বাসী হয়েও থাকি তাহলে আমি নিজের তাগিদেই নামায পড়বো৷ যদি সেই তাগিদ আমার ভিতর থেকে না আসে, আমি যদি অন্য কারো কথায় নামাযে দাঁড়াই সেটাতো আরো বড় ভণ্ডামি হয়ে গেল! স্রষ্টার জন্য না, বরং আমি সেই লোকটিকে দেখানোর জন্য নামাযে দাঁড়াচ্ছি!

আর আমি যদি অবিশ্বাসী হই তাহলে আমাকে নামায পড়তে বলা একরকম মানসিক অত্যাচারের পর্যায়ে পড়বে৷ কোন হিন্দু ধর্মাবলম্বীকে যদি বলা হয় ‘তোমাকে এখন আমাদের সাথে নামাযে দাঁড়াতে হবে’ – সেটা যেমন তাকে আঘাত করবে, তেমন একজন অবিশ্বাসীকে ইবাদতের জন্য আহবান করাটাও হাস্যকর ব্যাপার হবে।

৪.

প্রার্থনা বা ইবাদতের মূল উদ্দেশ্য স্পিরিচুয়াল। মানুষ যখন মনের শান্তির জন্য প্রার্থনা করে, তখন সেটার আধ্যাত্মিক মূল্য আছে। সেই প্রার্থনা একেক জনের ক্ষেত্রে একেক রকম হতে পারে। কেউ নামায পড়ে শান্তি পেতে পারে, কেউ পূজা করে, কেউ জিকির করে, কেউ ধ্যান করে আবার কেউবা গান করে৷ তাই আমরা দেখি মাওলানা রুমি প্রথাগত নামাযের বাইরে নৃত্যগীত সম্বলিত এক ধরণের প্রার্থনা পদ্ধতি চালু করেছিলেন। সেই ঘূর্ণি নৃত্যে প্রার্থনা করে মাওলানা রুমি যে শান্তি পেয়েছিলেন, অসংখ্য মানুষ হয়তো সারা জীবন নামায পড়েও সেই শান্তি পাবেনা৷ অর্থাৎ ধর্ম বা প্রার্থনা যতক্ষণ স্পিরিচুয়াল ততক্ষণ সেটা ব্যক্তিগত। আর যতক্ষণ সেটা ব্যক্তিগত ততক্ষণ তা সুন্দর। প্রত্যেকের পথ আলাদা৷ কেউ নির্বাণ লাভ করতে চায়, কেউ চায় মারেফত অর্জন করতে। আবার কেউ বিজ্ঞান আর লজিকের রাস্তা ধরে জগতকে বুঝতে চায়। তো আমার যখন মনের শান্তির দরকার হবে, আমার পথ আমিই ঠিক করে নেব।

কিন্তু আমাদের এখানে প্রার্থনা বা ইবাদত আচার সর্বস্ব। সেখানে আধ্যাত্মিক শান্তির থেকে দেনাপাওনার সম্পর্কটাই মুখ্য৷ আমি আল্লাহর কাছে ইবাদত করছি, বিনিময়ে আল্লাহ আমাকে এটাসেটা দেবেন। ইহকালে সমৃদ্ধি আর পরকালে বেহেশত- এটুকুতেই সীমাবদ্ধ আমাদের ধর্মচর্চা। সেই সাথে আছে কিছু নরক বা দোজখের ভয়। এই ধর্মচর্চায় কোন আধ্যাত্মিকতার স্থান নেই বলে এই মানুষ গুলো প্রবল ইনসিকিওরিটিতে ভোগে৷ অন্য ধর্মের হলে যাও মেনে নেয় (এখন সেটাও নেয় না), নাস্তিক বা অবিশ্বাসী হলে এরা আতংকিত হয়। তখন অবিশ্বাসীদের নিজেদের দলে ভিড়ানোর জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে তারা, না পারলে করে আক্রমন। নিজেদের বিশ্বাসে জোর নেই বলে অপরের অবিশ্বাস এদের সন্ত্রস্ত করে তোলে।

কিন্তু আমরা তো ধীরে ধীরে সভ্য হচ্ছি। ধর্ম ছাড়াও আরো অনেক সিমেন্টিং এজেন্ট সমাজে জায়গা করে নিচ্ছে। জাতিয়তাবাদ, দেশ বা রাষ্ট্র এবং অর্থ এগুলো নতুন ধরণের এজেন্ট। এবং এরাই এখন রাজত্ব করছে। পিছিয়ে পড়া দেশ গুলো ছাড়া, যারা এখনো শিক্ষাদীক্ষায় খুব একটা উন্নত নয় তারা ব্যতিরেকে অন্যান্য সভ্য দেশ গুলোতে ধর্ম খুব একটা গুরুত্বপূর্ন ফ্যাক্টর না। ধর্ম সেখানে ব্যক্তিগত, যেমনটা হওয়া উচিত। এবার আপনিও সভ্য হন।’

৫.

আমি ইচ্ছা হলে নামায পড়বো, ইচ্ছা হলে ঢাকেশ্বরী গিয়ে দেবীর পায়ের তলায় মাথা ঠুকবো, ইচ্ছা হলে ধ্যান করবো, ইচ্ছা হলে চার্চে গিয়ে মহাপ্রভুর কাছে কান্নকাটি করবো, ইচ্ছা হলে নাংগাবাবার সাথে উলংগ হয়ে নাচানাচি করবো (পৃথিবীতে এমন উপসনা পদ্ধতিও কিন্তু আছে) অথবা ইচ্ছা হলে কিছুই করবো না, বই পড়বো, গান শুনবো। স্রষ্টা বলে যদি কেউ থেকে থাকে তবে সেটা তার সাথে আমার বোঝাপড়া। আপনার নয়৷ নিজে ধর্মপালন করতে চাইলে করুন, যেভাবে শান্তি পান সেভাবে ইবাদত করুন কিন্তু অন্যের উপর নিজের পদ্ধতি চাপিয়ে দেবেন না। আপনি যেভাবে কমোডে বসে শান্তি পান, সবাই সেভাবে বসে শান্তি নাও পেতে পারে! আপনি যদি চিন্তা করেন আপনার স্টাইলই সঠিক এবং এটাই সবাই ফলো করবে তবে মশাই আপনি ভুল করছেন। এই ভুলটি করবেন না।

আরও পড়ুন-

Comments

Tags

Related Articles