দুই দলের মুখোমুখি দেখার ফলাফলে এগিয়ে ছিল বেলজিয়াম। সাম্প্রতিক ফলাফলেও বেলজিয়ামের দিকেই বাজীর পাল্লা বেশি থাকার কথা ছিল, আকাশে উড়তে থাকা ব্রাজিলকে হারিয়ে যে শেষ চারে নাম লিখিয়েছিল দলটা! তবে বিশ্বকাপে দুইবারের দেখায় দুবারই বিজয়ী দলের নাম ফ্রান্স। বিগ ম্যাচের প্রেশারটা এবারও সামলাতে পারলো না রবার্তো মার্টিনেজের বেলজিয়াম, দারুণ শুরু করেও ফ্রান্সের কাছে ১-০ গোলে হেরেছেন হ্যাজার্ড-লুকাকু’রা। আর তাই সেন্ট পিটসবার্গ থেকে মস্কোর বিমানে চড়া হচ্ছে না তাদের, বিজয়ী হিসেবে ফ্রান্সই যাচ্ছে রাশিয়ার রাজধানীতে!

দলের সেরা ডিফেন্ডারদের একজন তিনি, তর্কযোগ্যভাবে হয়তো বর্তমান বিশ্বেরই অন্যতম সেরাদের একজন, প্রতিপক্ষের একটার পর একটা আক্রমণ নস্যাৎ করে দিচ্ছেন ঠান্ডা মাথায়। কখনও স্লাইড ট্যাকেলে খুন করছেন পরিকল্পিত আক্রমণ, কখনও বা লাফিয়ে উঠে চান্স ক্রিয়েটের সুযোগটাই তৈরি হতে দিচ্ছেন না। সেই মানুষটা কর্ণারের সময় প্রতিপক্ষের ডিফেন্সে ঢুকলেন, দলকে ফাইনালে তোলা একমাত্র গোলটা করলেন দুর্দান্ত এক হেড থেকে, তাও আবার বিপক্ষ দলের সবচেয়ে লম্বা খেলোয়াড়কে বিট করে! একটা ম্যাচে আর কি করা যায়, আর কতটা ভালো খেলা যায়, সেটা ফুটবলবোদ্ধারাও ভেবে বের করতে পারবেন না হয়তো। স্যামুয়েল উমতিতি আজ এই অবিশ্বাস্য ফুটবলটাই খেলেছেন, গোল ঠেকিয়েছেন, গোল করেছেন, শেষ মূহুর্তে মাটিতে গড়াগড়ি খেয়ে নিজ দলের জন্যে খানিকটা সময়ের অপচয়ও করেছেন! এক ম্যাচে তিনি আর কি করতে পারতেন?

ম্যাচের বয়স তখন ৫১ মিনিট। কর্ণার থেকে ভেসে আসা বলে মাথা ছোঁয়ানোর জন্যে উমতিতি লাফিয়ে উঠলেন অনেকখানি। মারুয়াইন ফেলাইনি ছিলেন তার সামনে, তিনিও তখন শূন্যে ভেসেছেন। কিন্ত লাফ দিয়ে ফেলাইনিকে হার মানাতে চাইলেন উমতিতি, মাথার আলতো সংঘর্ষে খানিকটা দিক বদলে বলটা জড়ালো জালে। থিবো কোর্তোয়া চেষ্টা করেছিলেন সেটা ধরার, কিন্ত অসম্ভব তো আর প্রতিদিন সম্ভব হয় না। কোর্তোয়া তাই দর্শক হয়েই দেখলেন বলটাকে পোস্টে ঢুকতে।

সেমিফাইনালের এই ম্যাচটাকে বলা হচ্ছিল ফাইনালের আগের ফাইনাল। বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে দুর্দান্ত ফর্মে থাকা দুটো দলের লড়াই, একদল বিদায় করেছে ল্যাটিন জায়ান্ট আর্জেন্টিনাকে, অন্য দলের কাছে হেরে বিদায় নিয়েছে ব্রাজিল। বিশ্বকাপের উন্মাদনা খানিকটা কমিয়ে দেয়ার জন্যে কি ফ্রান্স আর বেলজিয়ামকে কাঠগড়ায় তোলা যায়? এমন প্রাণবন্ত আর প্রতিদ্বন্দ্বীতায় মুখর একটা ম্যাচের পর বিশ্বকাপে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার না থাকার অভাবটা চোখে লাগে না একটুও। বরং মনে হয়, অল ইউরোপিয়ান সেমিফাইনালটাই বুঝি প্রত্যাশিত ছিল!

প্রথম পনেরো মিনিট খানিকটা খোলসবন্দী ছিল ফ্রান্স। বাকীটা সময় খেলা হয়েছে সেয়ানে সেয়ানে। উনিশ বনাম কুড়ির লড়াই ছিল না এটা, দুই পক্ষই সমান প্রভাব বিস্তার করেছে মাঠে। প্রতিভা আর তারুণ্যে ঠাসা এনার্জেটিক বাইশজন ফুটবলার মাঠে নামলে কি হয়, রাশিয়ার সেন্ট পিটসবার্গ সেই দৃশ্যটা দেখেছে আজ। একপাশ থেকে একের পর এক আক্রমণ শাণিয়ে যাচ্ছেন হ্যাজার্ড-ডি ব্রুইন-ফেলাইনিরা, সেগুলো ঠেকিয়ে আবার পাল্টা আক্রমণে উঠছেন এমবাপ্পে-গ্রিজম্যানরা। দুই দলের ডিফেন্স যেন চীনের প্রাচীর, সেটার সঙ্গে ক্ষুরধার আক্রমণভাগের লড়াইতে যে মধুর বৃষ্টি ছড়িয়েছে মাঠে, সেরকমটা ফুটবলপ্রেমীদের কাছে পরম আরাধ্য। এমন ম্যাচ দেখে মনের শান্তি, চোখের শান্তি!

গোলটা হজমের পরে আক্রমণে ধার বাড়ানোর চেষ্টা করেছে বেলজিয়াম, আর ডিফেন্স অটুট রেখে ইনস্যুরেন্স গোলের খোঁজে হন্যে হয়ে ছুটেছে ফ্রান্স। এই ব্যাপারটা ভীষণ ভালো লেগেছে, লিড ধরে রেখে ডিফেন্সে বাস পার্ক করার চিন্তায় যাননি দিদিয়ের দেশম। অ্যাটাক ইজ দ্য বেস্ট ডিফেন্স- এই মানসিকতায় খেলেছেন গ্রীজম্যান-পগবা-মাতুইদিরা। বরং গোল দেয়ার পরে আক্রমণ তুলনামূলক বেশিই করেছে ফ্রান্স। প্রতিপক্ষের সীমানায় যতো বেশি সময় বল রাখা যায়, এরকম কিছুই হয়তো স্ট্র‍্যাটেজি ছিল।

ফ্রান্সের রক্ষণ ছিল দুর্দান্ত। দারুণ সব আক্রমণ ঠেকিয়েছেন উমতিতি-ভারানে। রিয়াল আর বার্সায় খেলা এই দুই ডিফেন্ডার মিলেই বারবার হতাশ করেছেন হ্যাজার্ড-লুকাকুদের। অজস্র ক্রস হয়েছে ডি-বক্সের বাইরে থেকে, প্রায় সবগুলোই নস্যাৎ করেছেন ফরাসী ডিফেন্ডারেরা। গোলরক্ষক হুগো লরিস করেছেন দারুণ কিছু সেভ। এরমধ্যে কেভিন ডি-ব্রুইনের একটা শট তো অবিশ্বাস্য দক্ষতায় ঠেকিয়েছেন। মাতুইদি-কান্তেরা শরীর পেতে দিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন ডি-বক্সের বাইরে, যা হয় হোক, গোল হতে দেয়া যাবে না শুধু! এরমধ্যেও সহজ সুযোগ হাতছাড়া করেছেন ফেলাইনি, লুকাকুকে বেশ কয়েকবারই খুঁজে পাওয়া যায়নি জায়গামতো। আর ফ্রান্সের হয়ে জিরুড একাই হাতছাড়া করেছেন গোটাকয়েক সুযোগ!

বড় মঞ্চ, বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল ম্যাচ, বিশাল চাপ। অভিজ্ঞতার অভাবটা বেলজিয়ামের খেলায় আজ ছিল স্পষ্ট। এই জায়গাটাতেই ছক্কা হাঁকিয়েছে ফ্রান্স। থিয়েরি অঁরি আর রবার্তো মার্টিনেজের ট্যাকটিকস ভালো ছিল নিঃসন্দেহে, কিন্ত দেশমের দলের সামনে মুখ থুবড়ে পড়েছে সেটা। অধিনায়ক হিসেবে বিশ্বকাপ জিতেছেন, এবার কোচ হিসেবেও বিশ্বকাপ জেতা থেকে এক ম্যাচ দূরে দাঁড়িয়ে দিদিয়ের দেশম, যে কীর্তি বিশ্বে আর একজনেরই আছে, কিংবদন্তী ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ারের। দেশম কি ছুঁতে পারবেন বেকেনবাওয়ারকে? উত্তর জানা যাবে মস্কোতে।

তবে এমন অসাধারণ একটা ম্যাচের পরে একটা দলকে জয়ীর আসনে দেখতে খারাপ লাগে। একটা দলের বিদায় মেনে নিতে কষ্ট হয়। এমন ধ্রুপদী লড়াইতে কোন বিশেষ দল জেতে না আসলে, এই ম্যাচগুলোতে ফুটবলটাই জিতে যায়…

Comments
Spread the love