ইনসাইড বাংলাদেশ

‘বাংলাদেশের আইনস্টাইন’ ফজলুর রহমান খানকে চেনেন আপনি?

১৯৮৩ সাল। আমেরিকায় এক বাঙালী ছাত্র গিয়েছে চাকুরীর খোঁজে। আমেরিকার অনেক মানুষ বাংলাদেশ কোথায় সেটাই জানেনা। যারা জানে, তাদের অনেকের কাছে বাংলাদেশ শুধু খরা-বন্যা আর দারিদ্র্যের দেশ। সেখানকার লোকজনের কাছে নিজের দেশের পরিচয় দিতেই কেমন যেন অস্বস্তি লাগতো ছেলেটার। চাকুরীর ইন্টারভিউতে তার সিভিতে চোখ বুলাতে বুলাতে একজন তাকে প্রশ্ন করলেন, তুমি দেখছি বাংলাদেশের লোক! ছেলেটার মেজাজ খারাপ হলো একটু, আবার হয়তো খরা-বন্যা নিয়ে লেকচার শুনতে হবে। কিন্ত তাকে অবাক করে দিয়ে ভাইভা বোর্ডে বসা সেই লোকটা উচ্ছ্বাসের সাথেই বললেন- ‘তুমি এফ আর খানের দেশের লোক?’

অবাক হওয়ার ধাক্কাটা সামলে উঠে উত্তর দেওয়ার আগে বুকটা গর্বে ফুলে উঠল ছেলেটার, ঢোক গিলে নিয়ে সে শুধু বলতে পারলো, ‘জি।’ অবিশ্বাস্য হলেও আমেরিকায় তার দ্বিতীয় চাকরির সাক্ষাৎকারের সময়ও প্রথম দশ মিনিটের মধ্যেই সেই একই প্রসঙ্গ উঠে এল। এবার আর কোন দেশের লোকটোক জিজ্ঞেস করা না, সিভির পাতায় চোখ রেখে সরাসরি একজন বললেন, ‘তুমি তো দেখছি এফ আর খানের দেশ থেকে এসেছ। তুমি জানো, আমি তার সঙ্গে পাঁচ–পাঁচটি বছর এক অফিসে কাজ করেছি।’

২০০৯ সাল, কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা দেয়ার সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার কণ্ঠে উঠে এলো বাংলাদেশের নাম। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি বললেন, আমরা শ্রদ্ধা জানাই এক বাঙালী প্রকৌশলীকে। তার কাছে আমরা সবাই কৃতজ্ঞ। আমাদের দেশের সর্বোচ্চ ভবনটি তারই নকশা করা। তার আবিস্কৃত পদ্ধতি অনুসরণ করেই বিশ্বজুড়ে মাথা তুলেছে আকাশচুম্বী ভবনগুলো।

২০১৭ সাল। সকালবেলা গুগলে ঢুকেই চোখে পড়লো অন্যরকমের একটা ডুডল। বিশেষ দিবসগুলোতে গুগল তার গ্রাহকদের জন্যে বিশেষ ডুডল তৈরি করে। কিন্ত তেসরা এপ্রিল কি এমন বিশেষ দিবস? ডুডলে কতগুলো বিল্ডিং দেখা যাচ্ছে, সেগুলোর পাশে দুই হাত ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছেন এক ভদ্রলোক। এফ আর খান নামটার সঙ্গে পরিচয় তখনই। বাংলাদেশী এই কৃতি সন্তানের সঙ্গে তার জন্মদিনেই পরিচয় ঘটলো আমার। গুগলে খোঁজ নিয়ে যে তথ্য পেলাম, তাতে চোখ কপালে ওঠার জোগাড়! তাকে নাকি স্থাপত্যবিদ্যার আইনস্টাইন বলা হয়! নিজের সময়ের সেরা স্থপতিদের একজন ছিলেন তিনি, কারো মতে সময়ের সেরা! বাংলাদেশে জন্ম নেয়া ফজলুর রহমান খান নামের এই মানুষটা নিজের প্রতিভা আর কর্মে জয় করেছেন বিশ্ব, তার গড়া কীর্তিগুলো এখনও বিস্ময় হয়েই সগর্বে দাঁড়িয়ে আছে বিশ্বের নানা প্রান্তে!

ফজলুর রহমান খান, সিয়ার্স টাওয়ার, স্থাপত্যবিদ্যা

১৯২৯ সালে মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন ফজলুর রহমান খান। ঢাকার আরমানিটোলা সরকারী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মেট্রিক পাশ করে কলকাতা পাড়ি জমান উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে। তখনও ভারত ভাগ হয়নি। কলকাতার শিবপুরে বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন, কিন্ত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হওয়ায় মাঝপথেই ফিরে আসতে হয় ঢাকায়। আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ (বর্তমানে বুয়েট) থেকে বাকী পড়ালেখা শেষ করেন তিনি। তারপর সেখানেই শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন।

১৯৫২ সালে স্কলারশীপ নিয়ে আমেরিকায় গিয়েছিলেন পড়তে, সেখান থেকে স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং এবং তত্ত্বীয় ও ফলিত মেকানিক্স-এ ডাবল এম.এস করার পর ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। এই ডাবল এম.এস করতে তার সময় লেগেছিল মাত্র তিন বছর! পিএইচডি চলাকালীন সময়েই শিকাগোতে স্কিডমোর ওয়িংস অ্যান্ড মেরিল নামের একটা প্রকৌশল প্রতিষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন। পিএইচডি শেষ করে আবার ফিরে এসেছিলেন দেশে, যোগ দিয়েছিলেন পুরনো কর্মস্থল আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজেই। করাচীর ডেভেলপমেন্ট কমিটিতে যোগ দিয়েছিলেন তিনি, কিন্ত স্বাধীনভাবে কাজ করার কোন সুযোগ ছিল না সেখানে। ১৯৬০ সালে স্কিডমোর কোম্পানীর বিশেষ আমন্ত্রণে আবার আমেরিকায় পাড়ি জমান তিনি। মৃত্যুর আগে পর্যন্ত সেই কোম্পানীতেই কর্মরত ছিলেন তিনি। ফজলুর রহমান খানের পুরো নামটা আমেরিকানরা উচ্চারণ করতে পারতো না, তাই তার সহকর্মীরা তাকে সংক্ষেপে ‘ফাজ’ বলে ডাকতেন।

১৯৬৯ সাল, বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ খুচরা বিক্রেতা কোম্পানী সিয়ার্স এন্ড কোং এর কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন লক্ষ। এরমধ্যে প্রধান কার্যালয়ে সারাদিন কর্মীদের ভীড়ভাট্টা লেগেই থাকে। প্রায় হাজার পঞ্চাশেক কর্মীর ধারণক্ষমতাসম্পন্ন একটা বিল্ডিং নির্মাণের পরিকল্পনা করলেন তারা। কয়েকটা ইঞ্জিনিয়ারিং এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ করলেন, কিন্ত ১০১ একরের মাঝারি সাইজের জায়গায় এরকম স্থাপনা বানানোটা খুব সহজ কিছু নয়, তার ওপর একটামাত্র বিল্ডিঙেই সবকিছু হবে। যোগাযোগ করা হলো স্কিডমোরের সঙ্গে। সিয়ার্স এন্ড কোং-এর স্বপ্নপূরণ করতে এগিয়ে এলেন একজন বাঙালী প্রকৌশলী, তিনি ফজলুর রহমান খান।

ফজলুর রহমান খান, সিয়ার্স টাওয়ার, স্থাপত্যবিদ্যা

তিন বছরের প্রচেষ্টায় মাটির বুক চিরে আকাশে মাথা তুলে দাঁড়ালো ১১০ তলা উঁচু সিয়ার্স টাওয়ার, এখন যেটার নাম বদলে গিয়ে উইলস টাওয়ার হয়েছে। ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত এটিই ছিল বিশ্বের সর্বোচ্চ ভবন। এই কাজটাই তাকে জগতজোড়া খ্যাতি এনে দিলো, তুমুল প্রশংসার বৃষ্টিতে সিক্ত হলেন ফজলুর রহমান খান। এরমধ্যে বাংলাদেশ নামের নতুন দেশটার জন্ম হয়েছে, প্রবাসী হিসেবে নিজের জায়গা থেকে সর্বোচ্চ সমর্থন যুগিয়েছেন তিনি দেশকে। সশস্ত্র যুদ্ধে অংশ নিতে না পারার আক্ষেপ তিনি ঘুচিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধে অবদান রেখে। সিয়ার্স টাওয়ারের কাজ চলছে সেই সময়টাতে, নিজের ব্যস্ততাকে একপাশে রেখে তিনি ছুটে বেড়িয়েছেন দেশের জন্যে তহবিল সংগ্রহে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সমর্থন আদায়ে সর্বাত্নক প্রচারণা চালিয়েছিলেন ৪২ বছরের ফজলুর রহমান। শিকাগোতে বাংলাদেশ ইমার্জেন্সি ওয়েলফেয়ার আপিল ও বাংলাদেশ ডিফেন্স লিগ নামের দুইটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তিনি।

ফজলুর রহমান খানের বান্ডেল টিউব স্ট্রাকচার অনুসরণ করেই বৈপ্লবিক একটা পরিবর্তন এসেছে স্থাপত্যকৌশলে। একশো তলা বিল্ডিং বানানো ডালভাত করে দিয়েছেন এই মানুষটাই। অথচ এই কৌশল আবিস্কারের গল্পটা বেশ মজার। অফিসে এক সহকর্মী ফজলুর রহমানকে নতুন একটা প্যাকেট থেকে সিগারেট অফার করছিলেন, প্রথম সিগারেটটা তোলার সময় ফজলুর রহমান খেয়াল করলেন, সেটার আশেপাশের এরও দু-তিনটে সিগারেট খানিকটা উঁচু হয়ে গিয়েছে। জিনিসটা আগেও তার চোখে পড়েছে, কিন্ত বিশেষ কিছু মনে হয়নি কখনও। কিন্ত সেদিন আইডিয়াটা মাথায় খেলে গেল তার, আর সেখান থেকেই জন্ম হলো বিখ্যাত ‘টিউবুলার কনসেপ্ট’ এর। তার আবিস্কৃত ফর্মূলাকে ভিত্তি ধরেই নির্মিত হয়েছে মালয়েশিয়ার পেট্রোনাস টাওয়ার আর দুবাইয়ের বুর্জ খলিফা।

আমাদের দেশের মানুষের কাছে জেদ্দা এয়ারপোর্টের টার্মিনালটা বেশ পরিচিত। হজ্জ কিংবা কর্মসূত্রে প্রচুর বাংলাদেশী প্রতিবছর সৌদি আরবে যান, কিন্ত তাদের মধ্যে সিংহভাগ মানুষই জানেন না, সেই বিমানবন্দরের ডিজাইন করেছিলেন ফজলুর রহমান খান। জেদ্দার কিং আবদুল আজিজ বিশ্ববিদ্যালয় আর মক্কা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠামোও তার হাতেই তৈরি। সিয়ার্স টাওয়ারের আগে আমেরিকার প্রথম একশো তলা ভবন জন হ্যানকক সেন্টারের নকশাও করেছিলেন তিনিই।

ফজলুর রহমান খান, সিয়ার্স টাওয়ার, স্থাপত্যবিদ্যা

এই গুণী মানুষটা মারা গেছেন ১৯৮২ সালে, মাত্র ৫৩ বছর বয়সে। সৌদি আরবের জেদ্দায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন তিনি। তার মৃতদেহ শিকাগোতে নিয়ে সমাহিত করা হয়। আমেরিকা এই মানুষটাকে সম্মান দিতে কার্পণ্য করেনি একটুও। ইঞ্জিনিয়ারিং নিউজ রেকর্ডের ম্যান অব দ্য ইয়ার খেতাব কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল একাডেমি অফ ইঞ্জিনিয়ারিং এর সদস্য নির্বাচিত হওয়া- এরকম হাজারও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন তিনি। শিকাগোর জ্যাকসন স্ট্রিট থেকে ফ্রাঙ্কলিন রোডের সংযোগ সড়কটির নামকরণ করা হয়েছে তার নামে। অথচ একটা মরণোত্তর স্বাধীনতা পদক আর চার টাকা মূল্যের সাম্মানিক ডাকটিকেট ছাড়া নিজে এই কৃতি সন্তানকে কোন স্বীকৃতিই দিতে পারেনি বাংলাদেশ।

শিকাগোতে আপনি যদি উইলিস টাওয়ারে(সাবেক সিয়ার্স টাওয়ার) যান, মূলফটকে বাংলায় ‘স্বাগতম’ লেখা আর ফজলুর রহমান খানের ছবি দেখতে পাবেন। যদিও তাকে আমেরিকান হিসেবেই পরিচয় দেয় তারা, কোথাও বাংলাদেশের নাম নেই। তার ‘বাংলাদেশী’ পরিচয়টা কি আমরা দাবী করতে পারি? এদেশের কয়জন মানুষ ফজলুর রহমান খানের নাম বা তার অবদান সম্পর্কে জানেন? গুগল তার জন্মদিনে তাকে নিয়ে ডুডল বানায়, অথচ আমরা তাকে স্মরণ করি না। আমাদের স্কুলের পাঠ্যবইতে কত হাজার মানুষের কথা লেখা থাকে, সেখানে একজন কীর্তিমান ফজলুর রহমানের নামে একটা অধ্যায় কি রাখা উচিত ছিল না? দেশ যখন তার কৃতি সন্তানের প্রতি দায়িত্ব পালন করে না, তখন তাকে এদেশের নাগরিক ভেবে, বাংলাদেশী ভেবে গর্ব করার আগে একবার কুণ্ঠাবোধ জাগে মনের ভেতরে।

Comments

Tags

Related Articles