জীবজন্তুদের মানুষের মত বাকশক্তি নেই। তাই তারা নিজেদের মনের ভাবও প্রকাশ করতে পারে না। কিন্তু তাই বলে যে তাদের মধ্যে আবেগ, অনুভূতি, অপত্যস্নেহ প্রভৃতি নেই এমনটা ভাবলে খুবই ভুল হবে। বিশেষ করে সন্তান স্নেহের কথাই যদি বলা হয়, তবে তা অনেক পশুর মধ্যেই মানুষের চেয়েও অনেক বেশি পরিমাণে আছে। সন্তানের কোন ক্ষতির আশংকা হলে বা সন্তান কাছ ছাড়া হলে কিছু কিছু প্রাণী যে কেমন অস্থির হয়ে যায়, তার ভুরি ভুরি দৃষ্টান্ত রয়েছে। হাতি ঠিক এমনই একটি প্রাণী। এবং অতি সম্প্রতি তেমনই একটি ঘটনার দৃষ্টান্ত ইন্টারনেট দুনিয়ায় ঝড় তুলেছে। তবে এ ঘটনায় হাতির অপত্যস্নেহের উদাহরণ যেমন উঠে এসেছে, তেমনি প্রতিফলিত হয়েছে মানুষের মানবিকতার চিত্রও।

কয়েকদিন আগে তামিল নাড়ুতে এক লোক তার ট্রাক্টরে করে বাণভদ্র কালিয়াম্মাম মন্দির থেকে থেকামপাত্তির উদ্দেশে যাচ্ছিল। পথিমধ্যে সে দেখতে পায় একটি মা হাতি রাস্তা আটকে দাঁড়িয়ে আছে, আর তার পেছনে আরও বেশ কয়েকটি হাতি। লোকটি এ অবস্থা দেখতে পেয়ে প্রথমে হর্ণ দেয় যাতে হাতিগুলো রাস্তার মাঝখান দিয়ে সরে যায়। কিন্তু হাতির পাল তা তো করেই না, উলটো তাকেই আক্রমণ করতে যায়। তখন লোকটি দ্রুত ট্রাক্টর নিয়ে পিছু হটে যায় এবং স্থানীয়দের বিষয়টি সম্পর্কে অবগত করে। স্থানীয়রা আর দেরি না করে দ্রুত মেত্তুপালায়াম বনবিভাগকে বিষয়টি জানায়।

বনবিভাগের লোকজন এসে হাতির পালটিকে জঙ্গলের মধ্যে ফেরত পাঠায়। এবং তারপরই তারা খুব কাছে কোথাও থেকে একটি অদ্ভূত আওয়াজ শুনতে পায়। পরমুহূর্তেই তারা আবিষ্কার করে যে একটি বাচ্চা হাতি পার্শ্ববর্তী খালে পড়ে গেছে। তখন লোকজন বুঝতে পারে বাচ্চা হাতিটি তার মায়ের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে। এজন্যই মা হাতি আর তার পালের অন্যান্য হাতিরা রাস্তা আটকে দাঁড়িয়ে ছিল।

ঘন্টাখানেকের মধ্যেই উদ্ধার কার্যক্রম শুরু হয়ে যায়। বনবিভাগের কর্মরতদের আপ্রাণ প্রচেষ্টায় বাচ্চা হাতিটিকে টেনে খাল থেকে উঠানো সম্ভব হয়। কিন্তু দীর্ঘক্ষণ খালের পানিতে কিছু না খেয়ে পড়ে থাকার ফলে বাচ্চা হাতিটির একদমই চলৎশক্তি ছিল না। এক কদমও হাঁটতে পারছিল না সেটি। তখন বনবিভাগেরই এক লোক নিজে বাচ্চা হাতিটিকে তার কাঁধে তুলে নেয়, এবং সেটিকে জঙ্গলের মধ্যে তার পালের মাঝে রেখে দিয়ে আসে।

কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, বাচ্চা হাতিটি ততক্ষণে ওই লোকের খুব ন্যাওটা হয়ে উঠেছিল। কিছুতেই সেটি ওই লোকটিকে কাছ ছাড়া করতে চাইছিল না। লোকটি যতবার সেটিকে হাতির পালের মাঝে ছেড়ে চলে আসার চেষ্টা করছিল, সেটি বারবার লোকটির সাথে ফিরে আসছিল। অগত্যা লোকটি হাতির বাচ্চাটিকে সেই সময়ের জন্য নিজের সাথে নিয়ে আসে, এবং দুইদিন তাকে নিজের কাছে রেখে ল্যাকটোজেন, গ্লুকোজ, নারকেলের পানি ইত্যাদি খাইয়ে সুস্থ করে তোলে।

দুইদিন বাদে মা হাতিটি নিজেই তার বাচ্চাকে ফেরত নিতে চলে আসে। ততদিনে বাচ্চা হাতিটিও বেশ সুস্থ হয়ে উঠেছে। এবার সে তার মাকে চিনতে পারে, এবং বিনা আপত্তিতেই মায়ের সাথে চলে আসে।

এই ঘটনার বেশ কয়েকটি দিন পশুপ্রেমীদের বিশেষ নজর কেড়েছে। প্রথমত একটি বাচ্চা হাতি খালে পড়ে গেলে শুধু তার মা-ই নয় বরং পুরো হাতির পালই একাট্টা হয়ে সেটিকে বাঁচানোর যে চেষ্টা চালায়, তা থেকে হাতিদের মধ্যকার একতার চিত্রই ফুটে ওঠে। আবার বাচ্চা হাতিটি যখন বনবিভাগের লোকটির কাছে বারবার ফিরে আসছিল, এ থেকেও প্রমাণিত হয় যে হাতিরা কতটা কৃতজ্ঞ, আর একটু ভালোবাসা পেলেই তারা যে কাউকে আপন করে নিতে পারে। সর্বশেষ দুইদিন বাদে মা হাতিটি নিজেই বনবিভাগে গিয়ে উপস্থিত হয় তার বাচ্চাকে ফিরিয়ে নিতে, এ থেকেও আমরা দেখতে পাই সন্তানের প্রতি তার কী অপরিসীম টান যার ফলে জঙ্গল ছেড়ে লোকালয়ে চলে আসতেও সে দ্বিধাবোধ করেনি।

তথ্যসূত্র- www.kenfolios.com

Comments
Spread the love