ফুটবলকে যারা শুধু খেলা হিসাবে আজকের দিনে দেখেন, বিশেষ করে ইউরোপের লীগগুলাকে, তারা আসলে একটা বড় জিনিস মিস করেন সেটা হলো এর পিছনের বিজনেসটা। ফুটবল এখন খালি খেলাই না, এইটা একটা মাল্টি বিলিয়ন ডলার বিজনেস। এই যে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার হঠাত করে কয়েক বছরের মধ্যে ফুটবলে চলে আসলো, এটার পিছনে কারণ একটাই; ব্যবসা। ফুটবলকে ভালোবাসে বলে এখন বিলিয়নাররা ফুটবল ক্লাব কেনে, এটা মনে করার কিছু নাই, লাভের বিজনেস বলেই কেনে। যার বিলিয়ন ডলার আছে সে আর কিছু না হউক ব্যবসা বোঝে, অন্তত আমার/আপনার চেয়ে ভালো বোঝে।

এটা অনেকগুলা দিক নিয়ে বিশাল আলোচনার বিষয়, খালি একটা উদাহরণ দেই প্লেয়ার ট্রান্সফার দিয়ে।

খেয়াল করে দেখবেন এখন ফুটবল ক্লাবগুলার কে কত বড়লোক সেটার র‍্যাংকিং করা হয়। আপনি যদি গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশক বা এই শতকেরই প্রথমদিকে যান, তাহলে দেখবেন এইসব ছিলো না। তখন ক্লাবগুলা ছিলো ফুটবল ক্লাব, ফুটবল ফ্যানদের ক্লাব। প্লেয়াররা ট্রান্সফার হতেন এক ক্লাব থেকে আরেক ক্লাবে কিন্তু এতো উচ্চবাচ্য ছিলো না, আজকের মতো ট্রান্সফার মার্কেটে কে কতো টাকা দিয়ে প্লেয়ার কিনতে পারে সেটা ছিলো না। ঐ সময় কি ভালো প্লেয়ার আসেনি? আমাদের জেনারেশনের শুরুর দিকে আমরা যাদের খেলা দেখছি এদের অনেকেই সর্বকালের সেরাদের মধ্যে থাকবেন। ২০০০ সালে লুইস ফিগো বার্সেলোনা থেকে মাদ্রিদে যান রেকর্ড পরিমাণ ট্রান্সফার ফি’তে যেটা ছিলো ৩৭ মিলিয়ন, ২০০১ সালে সেই রেকর্ড ভেঙ্গে জিনেদিন জিদান জুভেন্টাস থেকে রিয়াল মাদ্রিদ যান ৪৭ মিলিয়ন ট্রান্সফার ফি’তে। সেই রেকর্ড ৮ বছর ছিলো, ২০০৯ সালে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো সেই রেকর্ড ভেঙ্গে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড থেকে রিয়াল মাদ্রিদে আসেন ৮০ মিলিয়নে, তারপরে ২০১৩ সালে সেই রেকর্ড ভাঙ্গেন গ্যারেথ বেল ৮৬ মিলিয়নে টটেনহাম থেকে রিয়ালে এসে। এইগুলা পাউন্ডের হিসাবে, ইউরোতে কনভার্ট করলে সংখ্যাটা আরেকটু বড় হবে। ইউরোতে হিসাব করলে গ্যারেথ বেল প্রথম ফুটবলার যার দাম ১০০ মিলিয়ন ছিলো।

এই হিসাবে ২০০০ থেকে ২০১৩ মানে ১৩ বছরে হায়েস্ট ট্রান্সফার ফি বাড়ছে ৪৯ মিলিয়ন (৩৭ মিলিয়ন থেকে ৮৬ মিলিয়ন) মানে প্রতি বছর ৩.৭ মিলিয়ন মতো। এরপরে ২০১৫ পগবা ৮৯ মিলিয়নে জুভেন্টাস থেকে ইউনাইটেড; ২০১৭ তে ১৯৮ মিলিয়নে নেইমার বার্সা থেকে পিএসজি’তে, ৯৭ মিলিয়নে ডেম্বেলে ডর্টমুন্ড থেকে বার্সায়; ২০১৮ তে কৌটিনহো ১০৫ মিলিয়নে লিভারপুল থেকে বার্সায়, কিলিয়ান এম্বাপে ১২৮ মিলিয়নে মোনাকো থেকে পিএসজি’তে আসেন। মানে ২০১৩(২০১৪তে সবচেয়ে দামি ট্রান্সফার ছিলো ডেভিড লুইস, ৪০ মিলিয়নে চেলসি থেকে পিএসজি) ২০১৮ সালে ট্রান্সফার ফি বাড়ছে ১১২ মিলিয়ন (৮৬ মিলিয়ন থেকে ১৯৮ মিলিয়ন) অর্থাৎ প্রতি বছর ২২.৪ মিলিয়ন। এবার চিন্তা করে দেখেন, ১৩ বছরে যেখানে গড়ে ৩.৭ মিলিয়ন করে ট্রান্সফার ফি বাড়ছে সেখানে তারপরের মাত্র ৫ বছরে বাড়ছে গড়ে ২২.৮ মিলিয়ন। মেসি, রোনালদো এর অনেক আগে থেকেই খেলছিল তাহলে হঠাৎ এমন কি হলো যে মাত্র ৫ বছরে ট্রান্সফার মার্কেট এরকম ফুলে-ফেঁপে উঠলো? নেইমার, পগবা, এম্বাপে এরা নিঃসন্দেহে ভালো প্লেয়ার কিন্তু আসলেই কি এতো এতো টাকা দিয়ে কেনার মতো? 

ফুটবল অর্থনীতি, ফুটবল বাণিজ্য, ফুটবল সত্ব, ক্রীড়া বাণিজ্য, এশিয়া ফুটবল

এইখানেই বিজনেসটা, এইখানেই টাকার খেলাটা। এটা দর্শক/ফ্যান হিসাবে আপনি/আপনি বুঝবো না, কিন্তু যারা ফিনানশিয়াল ট্রেডিং ইত্যাদি করেন তারা বুঝবেন। ২০১৪ সালে গ্যারেথ বেল ১০০ মিলিয়ন ইউরোতে মাদ্রিদে আসার পর রিয়ালের ঐ বছর রেভিনিউ ছিলো ক্লাবগুলার মধ্যে হায়েস্ট এবং সেটা কতো ছিলো জানেন? ৫৪৯.৫ মিলিয়ন ইউরো যার মধ্যে ম্যাচডে রেভিনিউ ১১৩.৮ মিলিয়ন, ব্রডকাস্টিং রেভিনিউ ২০৪.২ মিলিয়ন এবং কমার্শিয়াল থেকে রেভিনিউ ছিলো ১৯৩.৬ মিলিয়ন [তথ্যসূত্র: Deloitte]। অনেকেই হয়তো ভাবছেন ২০১৪তে ‘লা ডেসিমা’ এবং ‘কোপা দেল রে’ (যেটাতে বেল লাস্টের দিকে গোল দিয়েছিলো বার্সার এ্যাগেইনেস্টে) জেতার জন্য রিয়ালের এই ইনকাম হয়েছে। এটা ক্লিয়ার করার জন্য বলি ঐ ২০১৪ সালেই ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড আয় করেছে সেকেন্ড হায়েস্ট ৫১৮ মিলিয়ন যেখানে তারা কিছুই জেতেনি, এমনকি লিগে পজিশন ছিলো ৭ নাম্বার। আবার সেই একই বছর লা লিগা জেতা এবং ইউসিএল এ রানার-আপ হওয়া এ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের ইনকাম ছিলো মাত্র ১৬৯.৯ মিলিয়ন। আর সবচেয়ে বড় কথা হলো এই ডিলগুলা সিজনের শুরুতে হয় তাই কে কেমন খেলবে ঐ সিজনে, কি জিতবে না জিতবে বিষয় না; মূল বিষয়টা হলো ব্র্যান্ড ভ্যালু। এই ব্র্যান্ড ভ্যালু ক্রিয়েট করার চেষ্টাতেই থাকে বড় ক্লাবগুলা কারণ এই যে ইনকাম, সেটা পুরাপুরিই ব্র্যান্ডভ্যালুর জন্য।

এখন আপনার নিশ্চয়ই মনে হচ্ছে আমি আসলে কি বুঝাতে চাচ্ছি? এই ইনকামের সাথে ট্রান্সফারে সম্পর্ক কি? সম্পর্ক আছে এবং সেটা খুব র‍্যাশনাল। ব্যবসায়িক দিক থেকে লা ডেসিমা বা কোপা দেল রে না, ১০০ মিলিয়নে গ্যারেথ বেলকে কেনাটা হলো ঐ বছর রিয়ালের সবচেয়ে বড় অর্জন। কিভাবে? এই গ্যারেথ বেল যখন টটেনহামে ছিলো তাঁর খেলা কয়জন দেখতো? কিন্তু বেল যখন মাদ্রিদে আসলো তখন এই যে ‘১০০ মিলিয়নে প্লেয়ার কিনেছে’ এই ব্যাপারটাই আপনার/আমার মতো মানুষের মুখে মুখে ঘুরবে। আমাদের মনে হবে ‘আচ্ছা দেখি তো!! এই যে ১০০ মিলিয়ন দিয়ে গ্যারেথ বেলকে কিনলো সে আসলে কেমন খেলে’। বেলের খেলা দেখতে আপনি রিয়াল মাদ্রিদের খেলা দেখবেন আর এখানেই বিজনেস। ব্রডকাস্টিং বিজনেসে দুইটা জিনিসই মূল, দর্শক আর বিজ্ঞাপন। আর যে জিনিস যতো বেশি দর্শক দেখবে সেই জিনিসে বিজ্ঞাপন ততো বেশি। এর সহজ মানে হলো আপনি খেলা দেখলেই আসলে ব্রডকাস্টিং কোম্পানি আর ক্লাব দুটোরই লাভ এবং এই লাভের অংকটা কিন্তু ১০০/২০০ ইউরো না, মিলিয়ন মিলিয়ন ইউরো। তাই দিন শেষে ক্লাবের ১০০ মিলিয়নে কেনা প্লেয়ারের পিছনে যা খরচ হয় সেটা আসলে কয়েকটা ম্যাচেই উঠে আসে আর সাথে স্পন্সরদের কাবযাব তো আছেই। আমি নিজেই ২০১৪ সালে যখন জার্মানি আসি তখন প্লেনের টিকেট কাটার সময় কাতারের টিকেট কাটছিলাম কারণ কাতার এয়ারওয়েজ ঐ সময় বার্সেলোনার স্পন্সর ছিলো। আপনি মাদ্রিদ ফ্যান হলেও এমিরেটসে যেতে চাইতেন কারণ ঐ প্লেনে করেই রোনালদো, রামোসরা চলাফেরা করে। এমন ভাবারও কারণ নেই, আমি/আপনি একাই এমন ভাবছি, লক্ষ লক্ষ ফ্যান- এইভাবে পুরো পৃথিবীতে এবং এটাই বিজনেস।

এত কথা বলার কারণ হলো আমরা অনেকসময় দেখি যে খুব টানটান উত্তেজনাকর খেলার লাস্ট মুহূর্তে একটা দল পেনাল্টি পেলো, তখন মনে হয় এটা না দিলেও হতো। হ্যাঁ না দিলেও হইতো কিন্তু এটা দিলে ভালো হয়। ব্যবসায়িকভাবে যদি আমি চিন্তা করি তাহলে রোমা বা জুভেন্টাসের চেয়ে বার্সা আর রিয়াল মাদ্রিদের চ্যাম্পিয়নস লীগে থাকাটা বেশি দরকারি। শুধুমাত্র ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো বা লিওনেল মেসির খেলা দেখতে যে পরিমাণ মানুষ রিয়াল/বার্সার ম্যাচ দেখে, পুরা পৃথিবীতে রোমা/জুভেন্টাসের তত ফ্যান আছে নাকি সন্দেহ আছে। এইজন্যই এই দুইজনের, অন্তত একজনের চ্যাম্পিয়নস লিগে থাকা দরকার চ্যাম্পিয়নস লিগের ব্যবসার জন্যই। আর এমনিতেও এই বছরের ইউসিএল একটু তাড়াতাড়ি শেষ হবে কারণ আর মাত্র মাসদুয়েক পর বিশ্বকাপ। তাই বার্সা যেহেতু আগেরদিন বাদ পড়ছে, কাল যদি রিয়ালও বাদ পড়ে যেতো তাহলে এইবারের ইউসিএল’র যে লস হতো এটা তুলতে আরো ২ বছর লাগতো উয়েফার। একই ঘটনা ছিলো ২০০৮/০৯ সালের ইউসিএলে চেলসি-বার্সার সেমিফাইনালে, রেফারি বেশ কিছু বাজে ডিসিশান দিয়েছিল বার্সার পক্ষে। ঐ বছর আরেক সেমিতে ছিলো ইউনাইটেড-আর্সেনাল এবং ইউনাইটেড-বার্সার ফাইনাল হয় যেখানে বার্সা জেতে। সেবার রিয়াল আগেই বাদ পড়েছিলো, বার্সা বায়ার্নকে হারিয়ে আর চেলসি লিভারপুলকে হারিয়ে সেমিতে আসছিলো। এখন আপনি যদি ফিনানশিয়ালি দেখেন তাহলে আপনি কাকে রাখতেন? অবশ্যই বার্সেলোনাকে কারণ বায়ার্ন/রিয়াল/লিভারপুল না থাকার পর যদি বার্সেলোনাও না থাকতো তাহলে ঐ ইউসিএল’র ফাইনাল ফিনানশিয়ালি বিরাট লস প্রজেক্ট হতো। বার্সেলোনা ফাইনালে থাকাতে কি হয়েছে? রিয়াল ফ্যানরা ফাইনালটা দেখেছে যদি বার্সা হারে ভেবে, চেলসি ফ্যানরাও তাই আর ইউনাইটেড ফ্যানরা দেখছে তাদের টিম ফাইনালে গিয়েছে, এই জন্য। এখন আপনি যদি দর্শকসংখ্যা চিন্তা করেন তাহলেই বুঝবেন যে ফাইনানশিয়ালি চেলসি-ইউনাইটেড ফাইনালের চেয়ে বার্সা-ইউনাইটেড ফাইনাল অনেক বেশি গুরুত্বপুর্ণ আর ঐ সময়টায় বার্সার ব্র্যান্ড ভ্যালু যে কোনো ক্লাবের চেয়েই বেশি ছিলো তাই এই টিমটা কোনো টুর্নামেন্টে থাকলে সেটা আয়োজকদের জন্য আনন্দের বিষয়।

এই ব্যাপারগুলা দেখে প্রতিপক্ষ হিসাবে রাগ/খুশি লাগবে কিন্তু আসলে ব্যাপারটা এমন হতে হতো তাই হয়েছে। এইখানে আমার/আপনার কথায় কিছু আসে যায় না, ফুটবলের যে বৈশ্বিক ব্যবসা, সেই বিলিয়ন ডলার বিজনেসে আপনি/আমি খুব খুব খুব ছোট অংশ শেয়ার করি। আরেকটা জিনিস জানিয়ে রাখি যে ১৯৯২ সাল থেকে একই টাইমে (রাত ৮.৪৫) হওয়া ইউসিএল এই ২০১৮/১৯ সিজন থেকে তাদের ম্যাচগুলার টাইম এগিয়ে আনছে শুধুমাত্র এশিয়ার টাইমের সাথে মিল রাখার জন্য।

কারণটা কি বোঝা যায়?

তথ্য কৃতজ্ঞতা-

  • https://www2.deloitte.com/content/dam/Deloitte/uk/Documents/sports-business-group/deloitte-football-money-league-2015.PDF
  • https://www.amazon.de/dp/0007586523/

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-