ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

ফেসবুকে ফুড রিভিউ এবং ডিজিটাল চাঁদাবাজির গল্প!

ঢাকা থেকে অনেক দূরের এক মফস্বল শহরের ঘটনা। এক ভদ্রলোক অনেকদিন দেশের বাইরে কাটিয়ে এসেছেন, এতদিন ধরে টাকাপয়সা যা জমিয়েছেন, সেটা দিয়ে একটা রেস্টুরেন্ট খোলার ইচ্ছে তার। জায়গা পছন্দ করা হয়ে গেল, শহরের প্রাণকেন্দ্রেই একটা ছিমছাম সুন্দরমত বিল্ডিঙের নিচতলায় ডেকোরেশনের কাজকর্মও শুরু হলো। বিপত্তিটা বাঁধলো রেস্টুরেন্ট উদ্বোধনের কয়েকদিন আগে। স্থানীয় রাজনৈতিক ক্যাডারেরা আবদার জানালো, রেস্টুরেন্ট যেহেতু হচ্ছে, মানুষজন আসবে, খাবে, ব্যবসাও হবে, সুতরাং তাদেরকেও চা-নাস্তা খাওয়ার জন্যে কিছু টাকা পয়সা দেয়া হোক। নইলে রেস্টুরেন্ট আর আলোর মুখ দেখবে না। চা-নাস্তা খাওয়ার জন্যে তাদের দাবীকৃত টাকার অঙ্কটা আমি শুনেছিলাম, তখন বয়স খুব কম, আমার মনে প্রশ্ন জেগেছিল- চায়ের দাম এত টাকা! এরা কয় হাজার কাপ চা খাবে?

ঢাকা শহরে একটা সময়ে ব্যবসায়ী আর মোটামুটি মানের বড়লোকদের কাছে আতঙ্কের নাম ছিল অজানা নাম্বারের ফোন। ল্যান্ডফোনের সেই দিনগুলোতে হুটহাট বেজে উঠতো ঘন্টি, ফোনের মালিকের সব তথ্য ওপাশের মানুষটার নখদর্পণে। ভয়ভীতি আর হুমকি দেখানো হতো চাঁদার জন্যে। ভয়ে কেউ সেই অন্যায় দাবী মেনে নিতেন, কেউবা পুলিশের দ্বারস্থ হতেন। কালা জাহাঙ্গীর, পিচ্চি হান্নান- এরকম কত নামে যে চাঁদা চাওয়া হতো, এরাই তখন ঢাকা শহরের ত্রাস ছিল সম্ভবত।

কালা জাহাঙ্গীরদের দিন নেই এখন। ওদের মধ্যে কেউ মরে গেছে, কেউবা হারিয়ে গেছে চিরতরে। কিন্ত মিষ্টি গলায় ভয়ভীতি দেখিয়ে চাঁদাবাজী হয় এখনও, অচেনা নাম্বার থেকে আসে উড়োফোনও। এই চাঁদাবাজদের দৌরাত্ন্য এখন অনলাইনের জগতে। আরেকটু পরিস্কার করে বললে, ফেসবুকের নীল-সাদা দেয়ালে।

ঢাকা শহরের মানুষের বিনোদনের অভাবটা প্রকট। জনসংখ্যার ঘণত্ব মাত্রাতিরিক্ত পরিমানের বেশী, নেই সুস্থ বিনোদনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থাও। এজন্যেই হয়তো রেস্টুরেন্টে যাওয়া, কিংবা খাওয়াদাওয়া করাটাও এখন ঢাকাবাসীর বিনোদনের একটা অংশ হয়ে উঠেছে। শহরজুড়ে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছে রেস্টুরেন্ট, ফুডকোর্ট। এরমধ্যে কিছু এলাকা তো পুরোপুরি রেস্টুরেন্টপাড়ায় রূপ নিয়েছে। বাসাবো-খিলগাঁও, মিরপুর বা উত্তরার কিছু অংশ এরকমই। লোকজন খাচ্ছে দেদারসে, সেলফি তুলছে, ফেসবুকে এসে খাবারের রিভিউও লিখছে কেউ কেউ।

রেস্টুরেন্টে খাওয়াটা ঢাকার মানুষজনের হাজার বছরের কোন ঐতিহ্য নয়। সারাটা সপ্তাহ ব্যাস্ত সময় কাটানোর পরে সবারই মন চায়, বন্ধু বা প্রিয় মানুষদের সঙ্গে খানিকটা সময় কাটাতে। রেস্টুরেন্টের চেয়ে ভালো জায়গা সেক্ষেত্রে আর কি হতে পারে?

হাজার হাজার রেস্টুরেন্ট আছে ঢাকায়। কোনটার মান কেমন, কোন রেস্টুরেন্টের কোন খাবারটা খেতে ভালো, কারা কি অফার দিচ্ছে- সেসব কারো মুখস্ত থাকার কথা নয়, থাকেও না। এগুলো জানার আর জানানোর জন্যেই মানুষজন ফেসবুকের দ্বারস্থ হয়। সামাজিক যোগাযোগের এই মাধ্যমে বাংলাদেশী ফুড গ্রুপ আছে বেশ কয়েকটা। লক্ষ লক্ষ মেম্বার আছে এই গ্রুপগুলোতে। অনলাইনের বড় একটা কম্যুনিটি এসব গ্রুপের রিভিউ’র ওপর ভরসা রাখে, পজিটিভ রিভিউ পেলে বন্ধু-বান্ধব বা পরিবার নিয়ে খেতে যায় সেখানে। আর সেটারই সুযোগ নিচ্ছে কিছু ধান্ধাবাজ চাঁদাবাজ মানুষ।

বলছি ফেসবুকের ফুড গ্রুপগুলোর অ্যাডমিনদের কথা। কাজের বিনিময়ে খাদ্য নামে সরকারী একটা কর্মসূচি ছিল একসময়, হয়তো এখনও আছে। আর এইসব অ্যাডমিনের যেটা করছে, সেটাকে বলা যায় খাদ্যের গুণগানের বদলে চাঁদা! রেস্টুরেন্টের মালিকদের জিম্মি করে গ্রুপে পজিটিভ রিভিউ দেয়ার কথা বলে এরা হাতিয়ে নিচ্ছে লক্ষ লক্ষ টাকা। কেউ টাকা দিতে না চাইলে তার রেস্টুরেন্টের বিরুদ্ধে মনগড়া নেগেটিভ রিভিউ লেখা হচ্ছে, সেসব আবার পাবলিশ করা হচ্ছে গ্রুপে। ব্যবসায় ধ্বস নামানোর জন্যে তো এটুকুই যথেষ্ট!

ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনের খুব জনপ্রিয় একটা অনুষ্ঠান ‘তালাশ’। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে লুকিয়ে থাকা অপরাধ আর অপরাধীদের নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করা হয় এই অনুষ্ঠানে। তাদের সবশেষ অনুসন্ধান ছিল ফেসবুকের ফুড গ্রুপগুলোর চাঁদাবাজী নিয়ে। এর আগে ফুডব্যাংক নামের একটা গ্রুপের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজীর অভিযোগ উঠেছিল। এবার তালাশের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এলো আরেক ফুড গ্রুপ ‘ফুড ব্লগার্স বাংলাদেশে’র অনলাইন চাঁদাবাজীর চাঞ্চল্যকর কিছু সত্য। দেশ ডিজিটাল হয়েছে, চাঁদাবাজেরা আর অ্যানালগ থাকবে কেন, তারাও ডিজিটাল হবার পথে হেঁটেছে!

ফুড ব্লগার্স বিডি। প্রায় এগারো লক্ষ মেম্বার আছে এই গ্রুপে। একেকটা পোস্ট লক্ষাধিক মানুষের নিউজফিডে যায়। আর এই ব্যাপারটাকেই ব্যবসার হাতিয়ার বানালেন গ্রুপের অ্যাডমিন মোহাম্মদ আরমান শাহফিয়ার, ওরফে সৌম্য শাহরিয়ার। পেশায় তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের উপ-পরিচালক। তার বিরুদ্ধেই অভিযোগের তীর, গ্রুপে নেগেটিভ রিভিউ দেয়ার ভয় দেখিয়ে রেস্টুরেন্ট মালিকদের কাছ থেকে হাজার হাজার টাকা চাঁদা নেন তিনি। বেশ কয়েকজন রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ী তার বিরুদ্ধে মুখও খুলেছেন ইতিমধ্যে।

ক্যাফে খিলগাঁও, অঙ্গন কিংবা ক্যাফে রিও- গল্পগুলো প্রায় একই। খিলগাঁয়ে অঙ্গন রেস্টুরেন্টের মালিক মাহতাব আহমেদ। শুরুতে ভোজনরসিকদের আনাগোনা ভালোই ছিল তার রেস্টুরেন্টে। রেস্টুরেন্টের প্রচারের জন্যে ফুড ব্লগার্সের অ্যাডমিন সৌম্য শাহরিয়ার প্রস্তাব দেন তাকে, ঠিক হয়, তার রেস্টুরেন্টের নামে শুধু পজিটিভ রিভিউ যাবে, নেগেটিভ রিভিউগুলো গ্রুপে প্রকাশ করা হবে না। বিনিময়ে শাহরিয়ারকে প্রতি মাসে দশ হাজার টাকা করে দেবেন মাহতাব। বেশ কয়েকমাস এভাবে চললো। কিন্ত এক পর্যাগে ব্যবসায়িক মন্দার কারণে শাহরিয়ারের চাহিদামতো টাকা দিতে পারছিলেন না মাহতাব। ক্ষুব্ধ হয়ে শাহরিয়ার ফুড ব্লগার্স গ্রুপে অন্য একাউন্ট থেকে একটানা বেশ কয়েকটি নেগেটিভ রিভিউ দেন বলে মাহতাবের অভিযোগ। আর সেসব রিভিউ’র ভাষাও ছিল ভীষণ আক্রমণাত্নক; ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার জের ধরেই যে সেসব রিভিউ গ্রুপে পোস্ট করা হয়েছে, সেই বিষয়ে মাহতাবের কোন সন্দেহ নেই।

নিজেদের প্রতিষ্ঠানের খাবার ভোক্তাদের কাছে পৌঁছে দেয়ার তাগিদেই রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ এসব ফেসবুক গ্রুপের অ্যাডমিনদের টাকা দিয়ে থাকেন। কিন্ত এই প্রমোশনের ব্যাপারটাই যে তাদের গলায় ফাঁস হয়ে আটকে যাবে একটা সময়ে, সেটা শুরুর দিনগুলোতে কারো মাথাতেই ছিল না বোধহয়। একটা রেস্টুরেন্ট ভালো ব্যবসা করছে, কারো সাতে-পাঁচে নেই; সেটার পেছনে লাগতেও দ্বিধা করছে না এসব গ্রুপের অ্যাডমিনেরা। ফোন করে হুমকি দেয়া হচ্ছে নেগেটিভ রিভিউ দিয়ে ব্যবসায় ‘লাল বাতি’ জ্বালিয়ে দেয়ার। এসব গ্রুপে বাঁধাধরা দু-চারজন লোক থাকেন, যাদের কাজই হচ্ছে একাধিক আইডি থেকে রিভিউ দেয়া। কেউ টাকা দিলে তার সুনাম করা, কেউ টাকা দিতে না চাইলে তার প্রতিষ্ঠানের নামে মনগড়া নেগেটিভ রিভিউ লেখা! 

তালাশের প্রতিবেদকদের সামনে সৌম্য শাহরিয়ার জানিয়েছেন, একটা চ্যারিটেবল ফাউন্ডেশন হিসেবেই গ্রুপটা চালান তিনি। মানুষের উপকারের জন্যেই নাকি এই গ্রুপের জন্ম! এই ডিজিটাল চাঁদাবাজীতে তার ব্যক্তিগত উপকার ছাড়া আর কার কি লাভ হচ্ছে সেটা তিনিই ভালো জানেন! যদিও প্রতিবেদনে বেরিয়ে এসেছে থলের বেড়াল, গোপন ক্যামেরা আর মাইক্রোফোনে রেকর্ড করা হয়েছে শাহরিয়ারের কথাবার্তা আর টাকা নেয়ার মূহুর্তগুলো। অথচ ঘাঘু অপরাধীর মতো মুখে খই ফুটিয়ে তিনি বলে চলেন- “কেউ যদি প্রমাণ করতে পারেন আমি উদ্দেশ্যেপ্রণোদীতভাবে তার প্রতিষ্ঠানের সুনাম নষ্ট করার জন্যে নেগেটিভ রিভিউ দিচ্ছি, তাহলে আমাকে যে শাস্তি দেয়া হয় আমি মাথা পেতে নেবো…”

তিনি রেস্টুরেন্টে যাচ্ছেন, দলবল নিয়ে খাওয়াদাওয়া করছেন, সেখান থেকে ফেসবুকে লাইভে আসছেন, গ্রুপের মেম্বারদের আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন সেখানে খেয়ে আসতে- এই পুরো ব্যাপারটাই টাকার খেলা। সেই টাকার লেনদেনটা হয় অন্ধকারে, সবার অগোচরে। পণ্যের প্রচারণা চালানোটা দোষের কিছু নয়, সেটার বিনিময়ে টাকা নেয়াটাও অপরাধ নয়, যতোক্ষণ সেটা একটা নিয়মের মধ্যে থেকে করা হচ্ছে। সৌম্য শাহরিয়ারেরা ফেসবুক গ্রুপগুলোর মাধ্যমে যেটা করছেন, সেটা সুস্পষ্ট চাঁদাবাজী, মানুষকে জিম্মি করে টাকা আদায় করা। তিনি যদি এতই ধোয়া তুলসী পাতা হয়ে থাকেন, তাহলে যারা তার চাহিদা অনুযায়ী টাকা দিচ্ছেন না, তাদের প্রতিষ্ঠানের নামে অপপ্রচার চালাচ্ছেন কেন? নিজের পরিচিত লোকজনকে দিয়ে গ্রুপে নেগেটিভ রিভিউ’র বন্যা বইয়ে দিচ্ছেন কেন? ফুড ব্লগার্সের সাবেক কয়েকজন অ্যাডমিনও মুখ খুলেছেন শাহরিয়ারের বিরুদ্ধে, তাদের অভিযোগ, টাকা নিয়ে রিভিউ দেয়ার ব্যাপারে প্রতিবাদ করায় গ্রুপ থেকে বের করে দেয়া হয়েছিল তাদের।

আপনি আমি আমাদের সময় আর টাকা খরচ করে খানিকটা সময় কোন রেস্টুরেন্টে কাটানোর পরিকল্পনা করবো, সাধ্যের মধ্যে সেরা জায়গাটা খোঁজার জন্যে ফেসবুক গ্রুপগুলোর দ্বারস্থ হবো আমরা, আর সেই সুযোগটা কাজে লাগিয়েই নিজেদের পকেট ভারী করছেন সৌম্য শাহরিয়ারের মতো মানুষগুলো। আমরা কি খাবো, কোথায় খাবো সেসব কিছু যাচাই বাছাইয়ের জায়গাটায় মিথ্যের পসরা সাজিয়ে আমাদেরকে বোকা বানানো হচ্ছে, মানুষকে ঠকানো হচ্ছে। সবচেয়ে বড় কথা, যারা তাদের অন্যায় আবদার মানতে রাজী নন, তাদের সাথে অবিচার করা হচ্ছে। সৌম্য শাহরিয়ারদের মধ্যে কোথায় যেন সেই উড়ো ফোনকল দেয়া চাঁদাবাজদের ছায়াটা খুঁজে পাওয়া যায়, কালা জাহাঙ্গীর বা পিচ্চি হান্নানের মতো অস্ত্র হাতে নয়, প্রযুক্তি হাতে নিয়ে চাঁদাবাজী করেন এযুগের ডিজিটাল চাঁদাবাজেরা!

তথ্যসূত্র কৃতজ্ঞতা- তালাশ, ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশন।

https://www.youtube.com/watch?v=SXM-fG78DKQ&feature=youtu.be

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close