আপনি-ই সাংবাদিকইনসাইড বাংলাদেশ

সত্যিই কি এদেশে ‘ফকির-মিসকিন’ নেই?

গ্রামের রাস্তা দিয়ে প্রাণপণ ছুটে চলেছে এক ব্যক্তি। তার নাম হামিদ। আর তাকে হৈ হৈ করে তাড়া করছে গ্রামের একদল নারী-পুরুষ। প্রথম দর্শনে যে কারও মনে হতে পারে, কোন চোর বুঝি চুরি করতে গিয়ে নজরে পড়ে গেছে, এখন গ্রামের সবাই মিলে তাকে ধরার জন্য ধাওয়া করছে। কিন্তু আসলে বিষয়টি সেরকম কিছুই না। মূল কারণ খোলাসা হয় খানিক বাদে, যখন ওই গ্রামেরই এক প্রবীণ ব্যক্তি দুই পক্ষের পথরোধ করে এই তাড়া করার কথা জানতে চান।

উত্তরে এক নারী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন যে, গ্রামের আরেক ব্যক্তি জহির তার প্রয়াত বাবা মায়ের স্মরণে ফকির মিসকিন খাওয়াতে চান। এজন্য তিনি হামিদকে পাঠিয়েছেন তাদেরকে দাওয়াত করতে। এতে তারা অপমানিত হয়েছেন। “আমরা কি ফকির মিসকিন নাকি?” পাল্টা প্রশ্নও ছুড়ে দেন ওই নারী।

পরে ভিড় থেকে আরেক ব্যক্তি জানান, তারা আগে ফকির মিসকিন থাকলেও এখন আর নেই। এখন তারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আশ্রয়ণ প্রকল্পের মানুষ। সরকার তাদের ঘর, বিদ্যুৎ সংযোগ, জায়গা জমি, পুকুর দেয়ার পাশাপাশি সন্তানদের লেখাপড়া সেইসঙ্গে উপার্জনের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন বলে জানান তারা। এর এক পর্যায়ে প্রথম নারীটির মুখ থেকে একটি সংলাপ বের হয়, “আমরা গরিব হইতে পারি, কিন্তু ফকির মিসকিন না।” সবশেষ তারা জানান, “এই দেশে ফকির মিসকিন খুঁজতে আহে। বাংলাদেশ আর সেই দেশ নাই।”

এতক্ষণ যে কাহিনী বর্ণনা করলাম, সেটি বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি)-তে প্রচারিত একটি সরকারি প্রচারণামূলক বিজ্ঞাপনের। তথ্য মন্ত্রণালয়ের সৌজন্যে বিটিভি গত কয়েকদিন ধরে বিজ্ঞাপনটি প্রচার করে আসছে। এবং ইতিমধ্যেই ১.৩৫ মিনিটের বিজ্ঞাপনটি অনলাইনেও ভাইরাল হয়ে গেছে, যার সুবাদে হাজার হাজার মানুষ বিজ্ঞাপনটিতে লাইক-কমেন্ট-শেয়ার করছে। সবমিলিয়ে বিজ্ঞাপনটি দারুণ আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

যদিও আগের লাইনে ‘আলোচনা-সমালোচনা’ শব্দদ্বয় ব্যবহার করলাম, কারও নিশ্চয়ই বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে বিজ্ঞাপনটিকে নিয়ে আলোচনার চেয়ে সমালোচনাই হচ্ছে বেশি। এখন অনেকেই বলতে পারেন, “সমালোচনা করাই মানুষের কাজ। যেকোনো বিষয়ের খুঁত ধরতে না পারলে তাদের পেটের ভাত হজমই হয় না!” হ্যাঁ, এ বক্তব্যের সাথে আমিও আংশিকভাবে একমত। কিন্তু সে-কথা কি সবসময়ই সমানভাবে প্রযোজ্য? যে বিজ্ঞাপনটি নিয়ে এখানে আমরা আলোচনা করছি, সেটির কি সমালোচনাই প্রাপ্য নয়?

বিশ্বের সামনে বাংলাদেশ দারিদ্র্য বিমোচনে একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ১৯৭২ সালে, অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধের পরের বছরই, বাংলাদেশে একটি জরিপের ফলাফলে বেরিয়ে আসে যে এদেশের ৮২% মানুষই দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। কিন্তু ২০১০ সালে বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটিসটিক্স (বিবিএস) এর করা একটি জরিপ থেকে জানা যায় যে, তখন বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ৩১.৫%। প্রত্যন্ত অঞ্চলে দারিদ্র্যের হার ছিল ৩৫.২%, আর শহরাঞ্চলে ২১.৩%। কিন্তু ২০১৬ সালের এপ্রিল থেকে ২০১৭ সালের মার্চ পর্যন্ত করা সর্বশেষ জরিপের ফলাফল বলছে, বর্তমানে বাংলাদেশের সামগ্রিক দারিদ্র্যের হার ৭.২% কমে হয়েছে ২৪.৩%। প্রত্যন্ত অঞ্চলে দারিদ্র্যের হার ২৬.৪%, আর শহরাঞ্চলে ১৮.৯%।

অর্থাৎ সরকারি জরিপ থেকেই একটি বিষয় দিনের আলোর মত পরিষ্কার যে, স্বাধীনতার পর থেকে গত ৪৭ বছরে দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশ আসলেই অনেক উন্নতি করেছে। এত কম সময়ে দারিদ্র্যকে এতটা জয় করা চাট্টিখানি কথা নয়। তাই তো বিশ্বব্যাংকের তরফ থেকেও স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে যে, গত ১৬ বছরে বাংলাদেশে দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করা মানুষের সংখ্যা ৫০% হ্রাস পেয়েছে।

কিন্তু এখানে একটি বিষয় লক্ষ্য করেছেন কি, সরকারি জরিপও কিন্তু দাবি করছে না বাংলাদেশ এখনও শতভাগ দারিদ্র্যমুক্ত হয়েছে। কারণ সেটি হবে একটি আকাশ-কুসুম কল্পনা। বাংলাদেশের পুরোপুরি দারিদ্র্যমুক্ত হতে এখনও কম করে হলেও আরও পঞ্চাশ বছর লাগবে।

এ পর্যায়ে অনেকে বলতে পারেন, বিজ্ঞাপনটিতে তো স্বীকার করাই হয়েছে যে ‘গরিব’ অনেকেই আছে, কিন্তু ‘ফকির-মিসকিন’ আর নেই বাংলাদেশে। দারিদ্র্যের হারের পরিসংখ্যান তুলে ধরে আমি কীভাবে প্রমাণের চেষ্টা করছি যে বাংলাদেশে আসলেই ফকির-মিসকিন আছে? ঠিকই ধরেছেন, সাধারণ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করা মানুষের পরিসংখ্যান দেখিয়ে দেশে ফকির-মিসকিন আছে কি না সে ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।

তবে বাংলাদেশে আসলেই ফকির-মিসকিন আছে কি না সে ব্যাপারে জানার জন্য আমরা সাহায্য নিতে পারি আরেকটি পরিসংখ্যানের, যেটিও কিন্তু পূর্বোল্লিখিত জরিপের ফলাফলের সাথে সাথেই প্রকাশ করেছিল বিবিএস। সেখানে তারা দেখিয়েছিল, বাংলাদেশে ছয় বছর আগে চরম দারিদ্র্যতার হার ছিল ১৭.৬%, যা বর্তমানে কমে দাঁড়িয়েছে ১২.৯%।

জাতিসংঘ ১৯৯৫ সালে চরম দারিদ্র্যকে সংজ্ঞায়িত করতে গিয়ে বলে, “a condition characterized by severe deprivation of basic human needs, including food, safe drinking water, sanitation facilities, health, shelter, education and information. It depends not only on income but also on access to services.”

সুতরাং দেখতেই পাচ্ছেন, জীবনধারণের জন্য অতি প্রয়োজনীয়, মৌলিক অধিকারগুলো থেকেই যারা বঞ্চিত হয় (সেটি হতে পারে অর্থের অভাবে কিংবা দুষ্প্রাপ্যতার কারণে), তাদেরকে বলা হয় চরম দরিদ্র। আর এই চরম দরিদ্র তো মূলত অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ফকির-মিসকিনেরই সমার্থক। তাহলে আমরা ধরে নিতেই পারি, সরকারি হিসাব অনুযায়ীও, বাংলাদেশে এখনও প্রতি ১০০ জন নাগরিকের মধ্যে প্রায় ১৩ জনই ফকির-মিসকিন।

এবার আপনাদের সামনে তুলে ধরতে পারি আরও একটি পরিসংখ্যান। এটি অবশ্য কিছুটা পুরনো, ২০১৪ সালের। সে বছরের জুলাই মাসে জাতিসংঘের প্রকাশিত এমডিজি ২০১৪ বার্ষিক প্রতিবেদনে প্রকাশ পায় যে, চরম দরিদ্র জনগোষ্ঠির দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বে চতুর্থ। ওই প্রতিবেদনে জানানো হয়, সারাবিশ্বে যতো চরম দরিদ্র জনগোষ্ঠি আছে, তার ৫ দশমিক ৩ শতাংশের বাস বাংলাদেশে। জাতিসংঘের ওই প্রতিবেদনসহ বেশ কিছু গবেষণা প্রতিবেদনে জানা যায়, সারাবিশ্বে ১শ’ ২০ কোটি মানুষ চরম দরিদ্র।

এ প্রতিবেদন অনুযায়ী চরম দারিদ্র্যের তালিকায় বাংলাদেশের সামনে অবস্থান করছে ভারত, চীন এবং নাইজেরিয়া। ২০১০ সালের হিসাবে বিশ্বের ১২০ কোটি চরম দরিদ্র লোকের ৩৫ দশমিক ৫ শতাংশেরই বাস ভারতে। এরপরেই অবস্থান চীনের। এখানে বিশ্বের ১৩ শতাংশ দরিদ্রের বাস। আর নাইজেরিয়াতে বাস ৯ শতাংশের।

ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রাম, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) সহ বেশ কিছু সংস্থা দারিদ্র্যতা নিরূপণে স্কেল হিসেবে খাদ্যগ্রহণকে ব্যবহার করেছে। সেই হিসাবে যে সকল ব্যক্তি দিনে ২ হাজার ১শ’ ২২ ক্যালরির নিচে খাদ্যগ্রহণ করার সামর্থ্য রাখে, তাদেরকে দরিদ্র এবং যারা দিনে ১ হাজার ৮শ’ ক্যালরির নিচে খাদ্যগ্রহণ করার সামর্থ্য রাখে, তাদেরকে চরম দরিদ্র বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।

ইউনিভার্সিটি অব সাসেক্সের মাইকেল লিপটন ১৯৮৬ সালে চরম দরিদ্রের একটি সংজ্ঞা নিরূপণ করেন। এই সংজ্ঞায় বলা হয়, যেসকল ব্যক্তি তাদের দৈনন্দিন চাহিদার ৮০ শতাংশ বা তার কম খাদ্যগ্রহণ করে এবং এই খাদ্য যোগানে তাদের দৈনিক উপার্জনের ৮০ শতাংশ বা তার বেশি অর্থ খরচ হয়, তাদেরকে চরম দরিদ্র বলা হয়ে থাকে। ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি অনুযায়ী, যারা দিনে মার্কিন মুদ্রায় ৫০ সেন্টের কম অর্থে খাদ্যগ্রহণ সারে, তাদেরকে চরম দরিদ্র বলে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩৫ থেকে ৪৫ টাকার মধ্যে। অপরদিকে জাতিসংঘের আরেকটি সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, যেসকল ব্যক্তি দিনে ১ দশমিক ২৫ ডলার, অর্থাৎ ১শ’ টাকার কম ব্যয়ে জীবনধারণ করে, তারা চরম দরিদ্র।

এই এত এত পরিসংখ্যানের পরও কি আর কারও মনে বিন্দুমাত্র সন্দেহের অবকাশ থাকে যে আসলেই বাংলাদেশে ফকির-মিসকিন রয়েছে কি না? সরকারি-বেসরকারি কোনো হিসাব অনুযায়ীই তো বাংলাদেশ এখনও চরম দারিদ্র্যতা দূর করতে পারেনি। কোনোদিন যে পারবে না তা আমরা বলছি না। আশা করা যাচ্ছে, দেশ থেকে পুরোপুরি দারিদ্র্য দূর করা না গেলেও, ২০৩১ সাল নাগাদ বাংলাদেশে চরম দারিদ্র্যের হার শূন্যের কোঠায় নেমে আসার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।

তাহলে কি আমরা এই সিদ্ধান্তে পৌছাতে পারি যে, একসময় দেশের ঘোর দুর্যোগের সময়ও যে বিটিভি কোথায় বাতাবিলেবুর বাম্পার ফলন হয়েছে বা কে ছাগল পালন করে স্বাবলম্বী হয়েছে, এ ধরণের সংবাদ নিয়ে ব্যস্ত থাকত, তারা এখন সময়ের চেয়ে এতটাই এগিয়ে গিয়েছে যে ২০৩১ সালে তাদের যে বিজ্ঞাপন প্রচারের কথা, সেটি তারা এই ২০১৮ সালে বসেই প্রচার করা শুরু করে দিয়েছে? নাকি এই দায়ভার আমাদের তথ্য মন্ত্রণালয়ের। তারা তথ্যের বদলে ভবিষ্যদ্বাণী প্রচার শুরু করেছে?

তবে এই মুহূর্তে অবস্থা যা দাঁড়িয়েছে তাতে সময় ও কালকে জয় করা এই বিজ্ঞাপনের পেছনে মূল কৃতিত্ব আমরা আসলে কাকে দেব, তা নিয়েই আমাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। কারণ বিটিভি ও তথ্য মন্ত্রণালয় উভয়ই বিনয়ের অবতার। নিজেরা কৃতিত্ব নেয়ার বদলে তারা অন্যের ঘাড়ে সব প্রশংসা গছিয়ে দিতে চাইছে। বিটিভির মহাপরিচালক এস এম হারুনুর রশিদ জানিয়েছেন, তার প্রতিষ্ঠান শুধুমাত্র বিজ্ঞাপনটি প্রচারের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। এর পরিকল্পনার বিষয়ে তাদের কোন সংশ্লিষ্টতা নেই। আর বিজ্ঞাপনটির বিষয়বস্তু বাস্তবতাকে সমর্থন করে কিনা এমন প্রশ্নের উত্তর জানতে তথ্য মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করা হলে এ বিষয়ে তারা বাংলাদেশ টেলিভিশনের সাথে কথা বলার পরামর্শ দেন।

অবশ্য বিটিভি বা তথ্য মন্ত্রণালয় উভয়ই যেহেতু সরকার পরিচালিত প্রতিষ্ঠান, তাই সরকার এমন একটি বিজ্ঞাপনের দায়ভার কিছুতেই এড়িয়ে যেতে পারে না। আমাদের সরকারের বোঝা উচিৎ, বর্তমান শিক্ষিত প্রজন্মকে কেবল একটি মনগড়া বিজ্ঞাপন দেখিয়েই বিভ্রান্ত করা সম্ভব নয়। ডিজিটাল বাংলাদেশে যাবতীয় তথ্য আমাদের হাতের নাগালের মধ্যেই রয়েছে, তাই কোন তথ্যটি সত্য আর কোন তথ্যটি মিথ্যা তা নিরূপণ করতে আমাদের খুব একটা অসুবিধা হয় না। তাই এরকম একটা সময়ে দাঁড়িয়েও যখন কেউ টিভি চ্যানেলের টক-শোতে গিয়ে বলে দেশের কোথাও প্রশ্নফাঁসের কোনো ঘটনাই ঘটেনি, বা বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে দাবি করা হয় যে দেশে কোনো ফকির-মিসকিনই নেই, সেগুলো কেবল হাস্যরসেরই জন্ম দেয়। বিশ্বাস ও গ্রহণযোগ্যতার ধারে-কাছেও যায় না।

দেশের উন্নতিতে বর্তমান সরকারের কোনো অবদান নেই, এ ধরণের মন্তব্য করে আমরা অকৃতজ্ঞ সাজতে চাই না। কারণ এটি একটি প্রতিষ্ঠিত সত্য যে গত এক দশকে বাংলাদেশ সত্যিই প্রভূত উন্নতি লাভ করেছে, অর্থনৈতিকভাবে অনেকটাই এগিয়ে গেছে, যার কৃতিত্ব অবশ্যই বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারের। এগুলোকে অস্বীকার করার তো প্রশ্নই আসে না। এবং বাস্তবে তারা যতটুকু উন্নয়ন করেছে দেশের, সেটুকুর জন্যই কিন্তু তারা প্রশংসার দাবিদার। তাহলে কেন মিছেমিছি এই ধরণের ভুয়া ও কাল্পনিক তথ্য সংবলিত বিজ্ঞাপন নির্মাণ করে লোক হাসানোর অপচেষ্টা?

সরকারের নীতিনির্ধারক ব্যক্তিরা কি এই সহজ বিষয়টুকু বোঝেন না যে একটি হাস্যকর বিজ্ঞাপন নির্মাণের মাধ্যমে সরকারের কোনো লাভই আদতে হলো না? বর্তমান প্রতিক্রিয়াশীল প্রজন্ম এখন সরকারের প্রকৃত অবদানগুলোকেও ভুলে গেল, এবং এখন যেভাবে তারা আলোচ্য বিজ্ঞাপনটিকে নিয়ে অনলাইন-অফলাইনে হাসি-ঠাট্টা করছে, তাতে যে কারও মনে হতে বাধ্য যে গত এক দশকে বর্তমান সরকার দেশের মানুষের জন্য কিছুই করেনি!

দেশে কোনো ফকির-মিসকিন নেই, এ ধরণের একটি আজগুবি তথ্য দিয়ে বিজ্ঞাপন নির্মাণের কথা কেউ ভাবতেই বা পারে কীভাবে? উপরে যেসব পরিসংখ্যান দেখিয়েছি, সেগুলোর কথা না হয় ভুলেই যান। এমনিতেও কি আমরা দেশের সাধারণ জনগণ রাস্তায় টিনের চশমা পরে ঘুরে বেড়াই? আমরা কি দেখি না রাস্তায় পথ চলতে গেলে দৈনিক গড়ে কতজন ভিক্ষুক এসে আমাদের সামনে হাত পাতে? মসজিদে নামাজ পড়ে বের হলে কতজন ভিক্ষুক আমাদের ঘিরে ধরে, তা কি আমরা দেখি না? আমরা কি দেখি না রাস্তার ফুটপাতে কতশত মানুষকে সহায়-সম্বলহীনভাবে পড়ে থাকতে দেখা যায়?

বাস-ট্রেন-রেলস্টেশনগুলোতে কী পরিমাণ উদ্বাস্তু মানুষের বাস, তা কি আমাদের চোখে পড়ে না? এই তো সপ্তাখানেক আগেই কুরবানির ঈদ গেল। তখন মাংস সংগ্রহের জন্য প্রতিটি বাড়ির সামনে কী পরিমাণ মানুষ এসে ভিড় জমিয়েছে তা কি আমরা দেখিনি? আমাদের এই দেশেই যে ত্রাণ সংগ্রহ করতে গিয়ে পদপিষ্ট হয়ে শত শত মানুষের নির্মম মৃত্যু হয়, সে খবর কি আমরা গণমাধ্যমের কল্যাণে পাই না?

বর্তমানে দেশের কী অবস্থা তা জানতে আসলে টিভি, ইন্টারনেট, ফেসবুক, সংবাদপত্র ইত্যাদি কোনো কিছুরই প্রয়োজন পড়ে না। স্রেফ একটু চোখ-কান খোলা রাখলেই সবকিছু আমাদের সামনে স্পষ্ট হয়ে আসে। তাই একটি বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে আমাদেরকে বোকা বানাতে চাওয়া নিতান্তই বালখিল্য প্রয়াস বৈ আর কিছুই নয়। পাশাপাশি সরকার কি এরকম একটি বিজ্ঞাপন নির্মাণ ও প্রচারের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিকেও প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করল না?

সরকারের যে উদ্দেশ্যই থাকুক, গত কয়েকদিনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে মানুষের লেখালেখি থেকে বুঝতে কোনো অসুবিধাই হয় না যে সরকারের সেই চেষ্টা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। তাই সরকারের প্রতি আমাদের বিনীত অনুরোধ থাকবে, দয়া করে নির্বাচনের বছরে এ ধরণের অতিরঞ্জিত কোনো তথ্য প্রচার করবেন না। তারচেয়ে বরং আমাদের সামনে বস্তুনিষ্ট তথ্য তুলে ধরুন, যাতে করে আমরা ভবিষ্যতে যোগ্য নেতৃত্বকেই আবারও ক্ষমতায় নিয়ে আসতে পারি। দয়া করে নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ দিন, আজগুবি বিজ্ঞাপন দেখিয়ে বা বক্তব্য দিয়ে মানুষের মনে বিরূপ ধারণার জন্ম দেবেন না।

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close