বিশ্বের সব বড়বড় কোম্পানীগুলো সাধারণত ব্যক্তিকেন্দ্রিক না! কিন্তু অ্যাপলের মত এত বড় প্রতিষ্ঠান-এর ক্ষেত্রে স্টিভ জবস এর নাম এমন অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে গেছে যে, বাইরে থেকে মনেই হবে স্টিভ জবস একাই চালাচ্ছেন অ্যাপল! এবং বাস্তবতা দাঁড়িয়েছে, যারাই অ্যাপল ভক্ত তারাই স্টিভ জবসেরও ভক্ত! তবে হ্যাঁ, এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই, অ্যাপলকে একটি গ্যারেজে শুরু হওয়া কোম্পানী থেকে পৃথিবীর সবচেয়ে দামী ব্র্যান্ডে তৈরি করার পেছনে জবসের অবদান সবচেয়ে বেশি। তার দক্ষতা সাথে তার ব্যক্তিগত কারিশমাও অ্যাপলের বিস্ময়কর প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখেছে।

কিন্তু অ্যাপল-এর বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ড হওয়ার এই যাত্রা স্টিভ জবস একা ছিলেন না। তারও একটা টিম ছিল! কিন্তু মিডিয়া প্রচারের আলো এতটাই জবসের দিকে ছিলো যে পাশ থেকে বাকিরা হারিয়ে গেছেন। তাদের অনেকের নাম সাধারণ মানুষ জানেনই না! এই আর্টিকেলে অ্যাপলের প্রথম দশজনের কথা সংক্ষিপ্তভাবে বলা হয়েছে। মূল আর্টিকেল ছাপা হয় “বিজনেস ইনসাইডার” পত্রিকায় যেখানে এইসব তথ্য নেয়া হয়েছে অ্যাপলের কো-ফাউন্ডার স্টিভ ওজনিয়াক এবং প্রথম সিইও মাইকেল স্কট এর থেকে।

 

১. গ্যারি মার্টিন-দ্যা একাউনটেন্টমার্টিন ছিলেন কোম্পানীর একাউনটেন্ট এর দায়িত্বে। তিনি ভেবেছিলেন অ্যাপল ফ্লপ করবে, কিন্তু তারপরও এতে যোগ দেন। ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত তিনি এখানে কাজ করেন, এরপর যোগ দেন “স্টার্সট্রাক” নামের এক স্পেস ট্রাভেল নিয়ে কাজ করা কোম্পানীতে। পরবর্তী কয়েক দশকে তিনি বেশ কয়েকটি কোম্পানীতে চিফ ফাইনান্স অফিসার হিসেবে কাজ করেন।

২. শেরি লিভিংস্টোন-দ্যা সেক্রেটারি

শেরি ছিলেন স্টিভ জবস এর ডানহাত, তিনি ছিলেন তার প্রথম সেক্রেটারি। তিনি প্রচুর পরিশ্রম করতেন, ছোট বড় সব ধরণের কাজেই তাকে পাওয়া যেত।

৩. ক্রিস এসপিনোসা-পার্টটাইমার হাইস্কুল ছাত্র

ক্রিস ১৪ বছর বয়সে স্কুলছাত্র থাকা অবস্থাতেই এপল এ জয়েন করেন, এবং এখনো তিনি অ্যাপলেই আছেন। তিনি অ্যাপলের সবচেয়ে বেশি দিন ধরে কাজ করা কর্মী।

৪. মাইকেল স্কট-দ্যা অরিজিনাল সিইও

মাইকেল স্কটকে হায়ার করেন মাইক মার্কুলা, যিনি অ্যাপলে আড়াই লাখ ডলার ইনভেস্ট করেছিলেন। স্কট কর্মীদের বিভিন্ন সিরিয়াল দিতেন আর সেই নাম্বার অনুসারে তাদের অরগানাইজ করতেন, তিনি নিজের নাম্বার দিয়ছিলেন ৭, জেমস বণ্ডের ০০৭ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে।

 

৫. র‍্যান্ডি ওইগিংটন-দ্যা প্রোগ্রামার

কোম্পানীতে র‍্যান্ডির কাজ ছিল অ্যাপল-২ এর জন্য প্রোগ্রাম করা, BASIC  প্রোগ্রামিং ভাষা ব্যবহার করে। অ্যাপল ছাড়ার পর তিনি ইবে,গুগল, স্কয়ার প্রভৃতি বড় বড় টেক কোম্পানীতে কাজ করেন।

৬. রোড হল্ট-দ্যা ডিজাইন ইঞ্জিনিয়ার

রোড হল্ট ছিলেন সেই সময়ের একজন নামী ডিজাইনার, তিনি অ্যাপল-২ এর পাওয়ার সাপ্লাই এর ডিজাইন করেন। রোড বলেন যে তিনি অ্যাপলে যোগ দেয়ার ব্যাপারে দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন, স্টিভ জবস প্রায় জোর করে তাকে অ্যাপলে ঢুকিয়েছিলেন। ছয়বছর পর আবার নতুন ম্যানেজমেন্ট এসে তাকে কোম্পানী ছাড়তে বাধ্য করে।

৭. বিল ফার্নান্ডেজ-দ্যা মাল্টিটাস্কার

বিল ছিলেন স্টিভ জবসের স্কুল জীবনের পরিচিত এবং অ্যাপলের আরেক ফাউন্ডার স্টিভ ওজনিয়াকের প্রতিবেশী ও বন্ধু। তিনি এই  দুই স্টিভ এর পর কোম্পানীতে ৩য় ব্যক্তি অর্থাৎ প্রথম এমপ্লয়ি। তিনি বিভিন্ন রকম দায়িত্ব পালন করেছেন-প্রথমে হার্ডওয়ার,পরে সফটওয়ার এরপর ফাইনালি ইউজার ইন্টারফেস ডিজাইন। অ্যাপল-১, অ্যাপল-২, ম্যাকিনটোস, ম্যাকওএস,কুইক টাইম ইত্যাদি অনেক  প্রজেক্টেই তিনি কাজ করেছেন। তিনি ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত অ্যাপলে ছিলেন, এরপর ‘ইংগ্রিস’ নামের এক ডাটাবেজ কোম্পানীতে কাজ নেন। তিনি বর্তমানে অমনিবায়োটিক্স নামের এক কোম্পানীর সিইও হিসেবে আছেন।

মাইক মার্কুলা-দ্যা মানি ম্যান

অ্যাপল কোম্পানী গড়ে তুলতে দুই স্টিভ এর বাইরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন মাইক। তিনি কোম্পানীর ৩০% শেয়ারের বিনিময়ে আড়াই লাখ ডলার ইনভেস্ট করেন,কোম্পানীর ম্যানেজমেন্ট ও বিজনেস প্ল্যান তৈরিতে হেল্প করেন, কোম্পানীর প্রথম সিইও স্কটকে হায়ার করেন এবং স্টিভ ওজনিয়াককে রাজি করান অ্যাপলে যোগ দিতে,সেই সময় ওজনিয়াক এইচপি তে চাকরি নেয়ার চিন্তা করছিলেন। মাইক ইন্টেল কোম্পানীর প্রথম দিকের একজন কর্মী ছিলেন। ইন্টেল যখন পাবলিক লিমিটেড কোম্পানী হয় তখন মাত্র ৩০ বছর বয়সে তিনি মিলিওনার হয়ে যান। অ্যাপলে তিনি তার সম্পদের মাত্র ১০% বিনিয়োগ করেন।

৯. স্টিভ জবস-দ্যা ভিশনারী

কোম্পানীতে স্টিভ জবস এর সিরিয়াল ছিল ২! এটি তিনি নিজেই নিয়েছিলেন নিজের জন্য। স্টিভ এর জীবনের উত্থানপতন গল্পের মত। একসময় তাকে নিজের তৈরি করা কোম্পানী থেকে বের করে দেয়া হয়েছিল। এরপর তিনি তৈরি করেন আরো দুটো কোম্পানী- “নেক্সট” নামের কম্পিউটার কোম্পানী এবং “পিক্সার” নামের এনিমেশন কোম্পানী। প্রায় এক দশক পর তিনি আবার অ্যাপলে ফিরে আসেন সগৌরবে এবং অ্যাপলকে পৃথিবীর এক নাম্বার ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ২০১১ এর অক্টোবরে মারা যান।

১০স্টিভ ওজনিয়াক-দ্যা টেকনিক্যাল এক্সপার্ট

স্টিভ ওজনিয়াক অ্যাপল প্রোডাক্টের পিছনের প্রধান টেকনিক্যাল ব্যক্তি। কিন্তু শুরুতে তিনি এখানে যোগ দিতে চাইছিলেন না,কারণ তার হাতে ভাল অফার ছিল বিখ্যাত কোম্পানী এইচপি থেকে। যাইহোক তিনি অ্যাপলে আসেন এবং রাতারাতি স্টার হয়ে যান। স্টিভ জবস এর সাথে সাথে তিনিও সিলিকন ভ্যালির পরিচিত মুখে পরিণত হন।

রোনাল্ড ওয়েন

এই দশজন ছাড়াও আরেকজন আছেন যিনি অ্যাপলের শুরুর দিকে পার্টনার ছিলেন। তার নাম রোনাল্ড ওয়েন। কিন্তু মজার ব্যাপার হল, তিনি শুরুর কিছুদিন পরই তার শেয়ার মাত্র ১৭০০ ডলারের মাইক মার্কুলার কাছে বিক্রি করে চলে যান। কারণ তিনি অ্যাপলের কোন ভবিষ্যত দেখতে পাননি। অনেক পরে অ্যাপল যখন বিলিয়ন ডলার কোম্পানী তখন তার মতামত জানতে চাওয়া হয়েছিল তার সেই সময়কার ডিসিশনের ব্যাপারে। তিনি বলেছিলেন তার সেই কাজে কোন আফসোস নেই কারণ তখন তার কাছে যা সঠিক মনে হয়েছিল তাই করেছেন।

এরকম হয়ে থাকে যে, যখন কেউ একজন বেশি প্রচার পান, অনেক বড় আইকনে পরিণত হন। এবং তখন তার সহযোদ্ধারা আস্তে আস্তে পাদপ্রদীপের আলোয় হারিয়ে যেতে থাকেন। স্টিভ জবসের ব্যাপারেও অভিযোগ ছিল তিনি তার কলিগদের সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতেন না। কিন্তু এটি অন্যায়। সবার কাজের স্বীকৃতি থাকা উচিত। কারণ একা কেউ কিছু করতে পারে না, সব কিছুতেই মানুষের সহযোগিতা লাগে।

সূত্রঃ বিজনেস ইনসাইডার

আপনার কাছে কেমন লেগেছে এই ফিচারটি?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-

এই ক্যাটাগরির অন্যান্য লেখাগুলো