প্রশ্নপত্র ফাঁসের মহামারী থেকে কোনভাবেই মুক্তি মিলছে না। সবগুলো পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নই ফাঁস হচ্ছে দেদারসে, ঠেকানোর উপায় যেন জানা নেই কারো। শিক্ষামন্ত্রীর কণ্ঠে অসহায়ত্ব, প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যেও আশা খুঁজে পাওয়া যায়নি একদমই। উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহনের কথা বলা হচ্ছে বারবারই, কিন্ত থামছে না প্রশ্নফাঁস, কাটছে না রাহুর দশা। তবে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ কোনরকমের সৌজন্যের ধার না ধরে যুদ্ধ ঘোষণা করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রশ্নফাঁসের বিরুদ্ধে, বলেছেন, যারা প্রশ্ন ফাঁসের সঙ্গে জড়িত, তাদের ফায়ারিং স্কোয়াডে দাঁড় করানো দরকার!

রাষ্ট্রপতির অনেকগুলো গুনের মধ্যে মজার একটা গুণ হচ্ছে, লিখিত বক্তব্যের বাইরে গিয়ে তিনি একদম সাধারণ মানুষের কাতারে নেমে এসে জনগণের মনের কথাটা অকপটে বলে দেন। গতকাল রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা সপ্তাহের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের বক্তব্য দিতে গিয়েও লিখিত বক্তৃতার বাইরে প্রশ্নফাস নিয়ে অনেক কথা বলেছেন তিনি, আরও একবার মাইউক্রোফোনের সামনে দেখা মিলেছে অতি সাধারপণ একজন আবদুল হামিদের, প্রশ্নপত্র ফাঁসের মহামারীতে যিনি বিরক্ত, বিব্রত; আর দশজন সাধারণ নাগরিকের মতোই যিনি প্রশ্ন ফাঁসের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের কঠোর শাস্তি চান। এগিয়ে চলো’র পাঠকদের জন্যে মহামান্য রাষ্ট্রপতির সেই বক্তব্যের চুম্বক অংশ তুলে ধরা হলো।

“সবাই তো চায়, তার ছেলেমেয়েরা ভালা ফল করুক, ফার্স্ট হোক, সেকেন্ড হোক, গোল্ডেন এ প্লাস এগুলা পাক, সবাই চায়। কিন্ত যখন শোনা যায়, বাপ বা মা গিয়া তাদের ছেলেরে নকল সাপ্লাই দেয়, এটা কি করে হয়? এরচেয়ে লজ্জার, জঘন্য ঘটনা আর কি হইতে পারে? তাহলে এই বাপ আর মা তার ছেলে বা মেয়েকে কি শিখাইতেসে? তারে কি বানাইতেসে? সে ভবিষ্যতে কি হবে? তারে দিয়ে দেশের কি উন্নতিটা হবে?”

“পাশাপাশি যে শিক্ষকেরা শিখাইবো ছেলেমেয়েদেরকে, তারা নিজেরাই তো প্রাইভেট আর কোচিঙের ছেলেমেয়েদেরকে প্রশ্ন বলে দেয়, তার প্রাইভেট পড়ানোর মার্কেট ভালো করাবার জন্যে। বেশী বেশী ছাত্রছাত্রী তাদের কাছে প্রাইভেট পড়তে আইবো, এসব চিন্তা থেকেই তো তারা এইগুলি করতেসে।”

প্রশ্নফাঁস, রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ, ফায়ারিং স্কোয়াড

“তারা দেশটাকে কী দিচ্ছে? এখন কথা কইলেতো খারাপ কথা। দেশ ও জাতির স্বার্থে দে শুড গো টু ফায়ারিং স্কোয়াড। ফায়ারিং স্কোয়াডে দেওয়া উচিত।”

“আমাদের তো বাপ-মা খবরই নিছে না। মাসখানেক পরে গিয়া খবর হইছে যে, স্কুলে গেছে নি? আর অহনতো পাছার মইধ্যে লাইগা থাকে। লাইগা থাকেন ভালা কথা, কোন অসুবিধা নাই। কিন্ত এই আকামটা করেন কেন? তারে ভালা জিনিস শিখান। এইটা তো খুব দুঃখজনক। এরা তো এখনও প্রাইমারী লেভেল, একেবারে বাচ্চা। যেইভাবে আপনি বানাইতে চান ঠিক সেইভাবে বানাইতে পারেন। এই অবস্থায় তো সঠিকভাবে পরিচর্যা করবেন।”

“আর ফার্স্ট-সেকেন্ড হইলে কী হয়? আমিতো খুব খারাপ ছাত্র আছিলাম। আমার মত খারাপ ছাত্র যদি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হইতে পারে, তাহইলে অত ভালা ছাত্র হওয়ার দরকারটা কী?”

“আমার মনে হয় এখন যে টিক মার্ক দিয়া(এমসিকিউ) দেয়। ইট শুড বি স্টপড। এমন সিস্টম করা দরকার প্রশ্ন আগেই জানা যাইবো। এই প্রশ্ন আইব, এখন তুমি লেখ। নকলবাজেরা কি প্রশ্ন আউট করব, আপনারা মিনিস্ট্রি থেকে বইলা দেন- এই এই প্রশ্ন আইব। সব কোর্স-সিলেবাস মিলাইয়া ২০-২৫সেট প্রশ্ন করেন। সব প্রশ্ন ওয়েবসাইটে দিয়া দেন, এর ভেতর থেইকা প্রশ্ন আইব। ২৫টা প্রশ্ন থাকলে পুরো সিলেবাস কাভার করবে। কিন্তু কুনডা আইবো হেইডা কইতে পারত না। বিশ-পঁচিশটা প্রশ্ন যদি একটা ছেলে বা মেয়ে শিখতে পারে, তার তো আর ফাঁস করা প্রশ্নের দরকার নাই। করো নকল, কিন্ত এই পঁচিশটা প্রশ্নের সবটাই তোমাকে পড়তে হবে।

প্রশ্নফাঁস, রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ, ফায়ারিং স্কোয়াড

“প্রশ্ন হলে যাওয়ার ঠিক পাঁচ মিনিট আগে বলা হবে, অমুক সেট দিয়া দাও। যেই সেট দেয়ার কথা ওইটা সারা বাংলাদেশেই এইভাবে দিয়া দিলো। এই সিস্টেম যদি হয়, তাহলে প্রশ্ন ফাঁসের বিষয়ে দুশ্চিন্তা করতে হবে না।” পচিশটা সেট প্রশ্ন আগেই দিয়া দিলাম, যাও এবার নকল করতে থাকো, কোন অসুবিধা নাই।”

“শুধু তো এইটা নয়, আমার কথা হলো বাপ মা, শিক্ষক, তারা কিভাবে সন্তানকে নকল সাপ্লাই দেয়ার কথা চিন্তা করতে পারে? এইটা তো আমার মাথার মধ্যেই আসে না। এগুলি নিয়া আমাদের চিন্তাভাবনা করতে হবে। যদি কোন ছেলে বা মেয়ে দুই নম্বরী কিছু করার চিন্তা করে, তার বাপ মা কে তো বলতে হবে, এইটা অন্যায় কাজ, এটা কইরো না। তুমি বাবা ফেইল করো তাও ভালো, তবু এই আকামটা কইরো না। আমাদের বাপ-মায়েরা তো কোনদিন আমাদের পড়ালেখার খোঁজ নেয় নাই। কিন্ত তারা জীবনে চিন্তাও করতে পারে নাই যে তার ছেলে নকল করবে। পরীক্ষায় ফেইল করি যাই করি, নকল করতে গেলেই মাথায় আসতো যে ধরা পড়ে গেলে তো আত্মহত্যা করতে হবে। মানুষের সামনে মুখ দেখাবো কেমনে? এই ধরণের আত্মসম্মানবোধ নিয়ে আমরা চলাফেরা করছি। তাহলে আজকাল এগুলা কি করে হয়?”

“প্রত্যেক বাবা মা’ই সন্তানের সেরা সাফল্য কামনা করেন। কিন্ত সেই সাফল্য অর্জনের জন্যে যদি নীতি নৈতিকতার রাস্তা বিসর্জন দিয়ে অনৈতিক পথে হাঁটতে হয়, তাহলে সেটা কোনভাবেই কাম্য হতে পারে না। আজকাল সন্তানদের নিয়ে মায়েরা প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। এর ফলে অনেক সময় শিশুরা নির্যাতনের শিকার হয়। শিশুরা অন্তর্মুখী হয়ে উঠে। এটা তো হওয়ার কথা না।”

এজন্যেই রাষ্ট্রপতি হয়েও আবদুল হামিদ আমাদের খুব কাছের একজন। দেশের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হয়েও তিনি একজন মাটির মানুষ, আর দশজন সাধারণের সাথে যার কোন পার্থক্য নেই। রাষ্ট্রপতির এই বক্তব্যের পরে শিক্ষা মন্ত্রণালয় কতটুকু উদ্যোগী হয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

ছবি কৃতজ্ঞতা- বিডিনিউজ২৪ ডটকম।

Comments
Spread the love