রাজার জন্ম এক খুবই দরিদ্র পরিবারে। তার বাবা ছিলেন অতি সামান্য একজন টেলিফোন লাইন্সম্যান। ছোটবেলা থেকেই দারিদ্র্যতা আষ্টেপৃষ্ঠে ধরেছিল তাকে। বাবা-মায়ের আদরও খুব একটা পায়নি সে। বাঁধাধরা কোন অনুশাসনের মধ্যেও পড়তে হয়নি তাকে। আর তাই খারাপ সঙ্গে পড়তে খুব বেশি সময়ও লাগেনি তার। একদম অল্প বয়সেই খারাপ বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে স্কুল ছেড়ে মদ-জুয়ায় মনোনিবেশ করে সে। কিন্তু এসবের জন্য তো অনেক টাকার প্রয়োজন। আর সেজন্যই চুরি-ডাকাতির মত অপরাধেও জড়িয়ে পড়ে সে।

অপরাধজগতে বেশ প্রভাব প্রতিপত্তি ছিল তার। রাতারাতি একজন ডনে পরিণত হয় সে। কিন্তু প্রকৃত আর্থিক সচ্ছলতা কখনোই আসেনি তার জীবনে। শুরুতে সে এমনকি নিজের মায়ের মঙ্গলসূত্রাটা পর্যন্ত চুরি করেছিল। এবং তার কারণে একে একে তার গোটা পরিবারটাই সর্বস্বান্ত হয়ে বসে। তার জ্বালাতনে অতিষ্ঠ হয়ে এক পর্যায়ে তার বাবা-মা তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। কয়েকদিন পথের কুকুরের মত রাস্তায় রাস্তায় দিন কেটেছে তার। তারপর যখন একদম মরিয়া হয়ে চেন্নাইয়ে গিয়ে অপরাধ কাজগুলোর পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়, মাত্র ১৬ বছর বয়সে ডাকাতি করতে গিয়ে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে সে। তাকে পাঠানো হয় একটা কিশোর সংশোধানাগারে।

জেলজীবনে এক নতুন উপলব্ধির শিকার হয় রাজা। সে বুঝতে পারে, জাগতিক ভোগ বিলাসিতাই জীবনের সবকিছু নয়। জীবনকে সুন্দর ও অর্থবহ করে তোলার আরও অনেক উপায় আছে। এবং এ উপলব্ধি তাকে ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাসীও করে তোলে। নির্ধারিত সময়ের পর ছাড়া পায় সে। আর তারপর সে জীবিকা নির্বাহের তাগিদে অটোরিকশা ও ট্যাক্সি চালানো শুরু করে।

ছোটবেলা থেকেই দারিদ্র্যতার কদর্য রূপ দেখে দেখে বড় হয়েছে সে। তারপরও একদিনের একটা ঘটনা তার মনে গভীর দাগ কাটে। রাস্তায় সে একটা মৃত্যুপথযাত্রী নগ্ন লোককে অসহায়ভাবে পড়ে থাকতে দেখে। তখন থেকেই তার মনে ইচ্ছা জাগে এরকম মানুষদের জন্য কিছু একটা করার। কিন্তু কিই বা এমন করতে পারে সে, কারণ তার নিজেরই যে দৈনিক আয় মাত্র একশো টাকা!

কিন্তু ধীরে ধীরে রাজার আর্থিক অবস্থার উন্নতি হতে শুরু করে। সৎভাবে উপার্জন করেই সে একটা পর্যায়ে তার মনোবাসনা পূর্ণ করার সক্ষমতা অর্জন করে। ১৯৯৭ সালে সে তার এক রুমের বাসারই ৫ বাই ৬ ফুটের প্যাসেজে ‘নিউ আর্ক মিশন অব ইন্ডিয়া‘ গড়ে তোলে। রাস্তা থেকে অসহায় হতদরিদ্র ও অসুস্থ লোকদের বেছে বেছে নিয়ে আসতে থাকে সেখানে, আর তারপর সুচিকিৎসার মাধ্যমে তাদেরকে সারিয়ে তুলতে থাকে। তাদের ক্ষতস্থান পরিষ্কার করা, গোছল করিয়ে দেয়া, কাপড় পরিয়ে দেয়া, খাইয়ে দেয়া সবই সে একা হাতে করতে থাকে। অবশ্য তার এইসব কর্মকান্ড খুব একটা সুনজরে দেখে না তার বন্ধুবান্ধব ও পরিবারের লোকেরা। তারা ভাবে, সে বুঝি বদ্ধ উন্মাদ হয়ে গেছে।

রাজা এসবে বিন্দুমাত্র কর্ণপাত করে না। সে তার নিজের কাজটা ঠিকমত করে যেতে থাকে। কিন্তু এ কাজ করতে গিয়ে সে পর্যাপ্ত স্থান সংকুলান না হওয়ার সমস্যায় আক্রান্ত হয়। তখন সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় স্থানীয় একটা চার্চ। তারা ৫,০০০ রুপি অনুদান দেয় তাকে। যদিও পরিমাণে সেটা খুবই কম, তারপরও সেই সময়ে এটুকুই ছিল রাজার জন্য বিরাট কিছু। এই অর্থ দিয়ে সে গড়ে তোলে ‘হোম অফ হোপ’।

এবং তারপর থেকে রাজাকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। বিগত ২০ বছরে ‘হোম অফ হোপ’ নতুন জীবন দিয়েছে ১১,০০০ এরও বেশি মানুষকে। এছাড়া তার বদৌলতে মৃত্যুযন্ত্রণা কিছুটা হলেও প্রশমিত হয়েছে ৬,০০০ এর উপর মানুষের। এই মুহূর্তে তার সংস্থা একাধারে ৭০০ অসহায় মানুষের জীবন বাঁচানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, যার মধ্যে ৮০টি এতিম বাচ্চাও রয়েছে।

এভাবেই এককালের জেলখাটা আসামী রাজা এখন হয়ে উঠেছে মানবতার প্রতিমূর্তি, মাদার তেরেসার নবতম সংস্করণ!

তথ্যসূত্র- www.kenfolios.com

Comments
Spread the love