পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্যই হলো নারীর যৌন জীবনকে নানা উপায়ে নানা কৌশলে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করা। বিবাহপূর্ব এবং বিবাহউত্তর জীবনের উভয় ধাপেই সমাজের এই নিয়ন্ত্রণ প্রচেষ্টা বিদ্যমান থাকে। এই বিদ্যমান প্রচেষ্টা থেকেই উদ্ভব ঘটে সমাজের পুরুষতান্ত্রিক সহিংস নানা রীতিনীতি ও প্রথা ব্যবস্থার। যার কোনো কোনোটি মানবাধিকার লঙ্ঘন করে নারীর উপর নির্যাতনকে ভয়াবহ রূপে আবির্ভূত করে পুরুষতন্ত্রের স্বরূপ টিকিয়ে রাখে। আর ঠিক সেরকম একটি প্রথাই হচ্ছে Female Genital Mutilations (FGM) বা নারীর যৌন অঙ্গহানী। একে কোন কোন ক্ষেত্রে Female Genital Cutting এবং Genital circumcision-ও বলা হয়। কেননা ১৯৮০ সালের পূর্বে সারাবিশ্বে নারীর যৌন অঙ্গহানীর এই প্রক্রিয়াটি নারীদের খৎনা হিসেবেই পরিচিত ছিল।

নারীর যৌনতাকে নিয়ন্ত্রণ করার ভয়াবহ নিকৃষ্টতম এক নিপীড়নমূলক পদ্ধতিটিই বিশ্বব্যাপী পরিচয় পেয়েছে FGM নামে। এর মূল উদ্দেশ্য থাকে নারীর বাহ্যিক সৌন্দর্য যেন পুরুষকে নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত আকৃষ্ট করতে না পারে এবং নারীর যৌন চাহিদাকে যেন সীমাবদ্ধ করে রাখা যায় তার নিমিত্তে বয়ঃসন্ধির পূর্বেই নারীর বহিঃযৌনাঙ্গের বিভিন্ন অংশ কর্তন করা। সাধারনত একজন বয়স্ক মহিলা কিংবা পুরুষ নাপিত দ্বারা এই কর্তন কাজটি সম্পন্ন করা হয়।

FGM এর ভয়াবহতা সম্পর্কে World Health Organization (WHO) তাদের প্রতিবেদনে কতগুলো key factors উল্লেখ করেছে-

১। এটি উদ্দেশ্যমূলকভাবে নারীর যৌনাঙ্গ কর্তনের মাধ্যমে বিকৃতি সাধন পদ্ধতি। এ কারণে এর প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে মেডিকেল সাইন্সেও কোন ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না।

২। এর কোনোরকম স্বাস্থ্যগত উপকারিতা নেই।

৩। পদ্ধতিতে নারীর যৌনাঙ্গের অধিক রক্তক্ষরণের সম্ভাবনা থাকে এবং ইউরিনেটিং সংক্রান্ত নানা সমস্যা দেখা দেয়। সন্তান জন্মদানের ক্ষেত্রে FGM এর স্বীকার নারীদের নানা জটিলতা দেখা দেয়। এবং অনেক ক্ষেত্রেই নবজাতকের মৃত্যু ঝুঁকি থাকে।

৪। ইউনিসেফের ২০১৬ সালে প্রকাশিত সমীক্ষায় সারা পৃথিবীতে প্রায় ২০০ মিলিয়ন নারী এবং কন্যা শিশু এই FGM এর স্বীকার। পৃথিবীর প্রায় ৩০ টি দেশে এই সংস্কৃতির চর্চা অব্যাহত আছে। মূলত আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য এবং এশিয়া মহাদেশের প্রচলন রয়েছে।

৫। মাত্র ১৪ বছর বয়সের মধ্যেই ঐ দেশগুলোর নারীরা এই বর্বরতার স্বীকার হয়।

৬। এটি সুনিশ্চিতভাবেই মানবাধিকার লঙ্ঘনের মধ্যে পড়ে।

১৯২৯ সাল থেকে কেনিয়ায় দেশটির মিশনারী কাউন্সিল জাতীয়ভাবে FGM এর চর্চা করে আসছে। বর্তমানে আফ্রিকার ২৭ টি রাষ্ট্র, ইন্দোনেশিয়া, ইরাকি কুর্দিস্তান এবং ইয়েমেনের নারীদেরকে এই বর্বর, নিকৃষ্ট চর্চার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। আফ্রিকান এই রাষ্ট্রগুলো ইসলাম, ইহুদি এবং খ্রিষ্টান ধর্মকে FGM এর ভিত্তি হিসেবে বিভিন্ন সময়ে দাবির চেষ্টা করলেও তা পুরোপুরিই অবান্তর। বাইবেল এবং কোরআনে নারীদের যৌনাঙ্গ কর্তনের কোন নির্দেশ নেই। তবে কিছু দুর্বল হাদিসে এইরকম কিছু কার্যক্রম প্রশংসিত হলেও তা যে সুনিশ্চিতভাবে FGM এর প্রতিই ইঙ্গিত প্রদান করে এমনটি বলা যায় না। এ প্রসঙ্গে ২০০৭ সালে “আল আযহার সুপ্রিম কাউন্সিল অব ইসলামিক রিসার্চ” মিশরের কায়রোতে FGM যে ইসলাম ধর্ম সম্মত কোন প্রথা নয় এবং এর যে কোন ইসলামী আইনগত ভিত্তি নেই তা স্পষ্টভাবে ঘোষণা দেয়। ২০১৩ এর ইউনিসেফ রিপোর্টে দেখা যায় যে মুসলিমদের পাশাপাশি ১৭ টি আফ্রিকার দেশে প্রায় ১০ শতাংশ খ্রিষ্টান মেয়ে শিশু ও মহিলা FGM এর স্বীকার। নাইজারে ৫৫ ভাগ খ্রিস্টান নারীকে এই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। অন্যদিকে ইহুদি ধর্মে পুরুষদের খৎনার কথা বলা থাকলেও সেখানে FGM এর কোন উল্লেখ নেই। তারপরেও ইথিওপিয়ার ইহুদি সম্প্রদায়ের মধ্যে এই রীতি দীর্ঘদিন ধরেই জনপ্রিয় হয়ে আসছে। ধর্মীয় কোন ভিত্তি না থাকা সত্ত্বেও আফ্রিকার দেশগুলো এটিকে তাদের বিশ্বাস ও পুরুষতান্ত্রিক প্রথাগত রীতি হিসেবে দীর্ঘসময় ধরেই পালন করে আসছে।

দেশগুলো ঐতিহ্যচর্চার অংশ হিসেবে এবং নারীর পবিত্রতা, বিশুদ্ধতা ও সৌন্দর্য বৃদ্ধির উপায় হিসেবে FGM পদ্ধতি জাতীয়ভাবে এবং কোন কোন দেশের এথনিক গ্রুপ নিজেদের মধ্যে উৎসব আয়োজন করে বিশেষ দিনক্ষণ ঠিক করে পালন হয়ে থাকে। নারীর যৌনাঙ্গের বিভিন্ন অংশ যেমন : ক্লিটোরাল হূড, ক্লিটোরাল গ্ল্যান্ড, অন্তঃস্থ ও বহিঃস্থ লেবিয়া এবং ভালভার অংশাদি কর্তনের মাধ্যমে প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করা হয়। কর্তনকৃত অংশ এবং এরিয়ার ভিত্তিতে এই কর্তনের ৪ টি প্রকারভেদ রয়েছে। যেগুলোকে তারা Type I, Type ii, Type iii এবং Type iv নামে আখ্যায়িত করে। এই টাইপ অনুসারে কোন কোন দেশে আবার স্তন এবং স্তনবৃন্ত কর্তনের রীতিরও প্রচলন রয়েছে। তবে সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপারটি হচ্ছে এই কর্তনের কাজে ব্যবহার করা উপকরণ। অধিকাংশ FGM এই ধারালো ব্লেডের ব্যবহার সবচেয়ে বেশী জনপ্রিয়। এবং অধিকাংশ সময়েই কোনরকম এনেস্থেশিয়া বা চেতনানাশক ব্যাবহার করা পর্যন্ত হয় না। আফ্রিকার দেশ মালি, নাইজার, মৌরিতানিয়া এবং কেনিয়ায় আবার ব্লেডের পাশাপাশি ছুরি, কাঁচি, শক্ত ধারালো পাথর, ভাঙ্গা কাচের টুকরা এমনকি হাতের আঙ্গুলের নখও ব্যবহার করা হয়। ২০০৭ সালে উগান্ডার এক সেবিকা জানান যে সাধারনত একটি ছুরি বা ব্লেড একই সময়ে প্রায় ৩০ জন নারীর যৌনাঙ্গ কর্তনের কাজে ব্যবহৃত হয়ে থাকে।

যুগ যুগ ধরে চলে আসা এই অসভ্য বর্বর রীতির বিরোধিতা যে কেউ করেননি এমনটি নয়। উৎপত্তিস্থল আফ্রিকা মহাদেশেই প্রথম ১৯৭২ সালে মিশরে এই প্রথার বিরুদ্ধে মুখ খুলেন দেশটির জনস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিচালক নাওয়াল এল সাদাওয়ি। সেসময়তে তিনি তার বই “Women and Sex” এ এই প্রথার বিরোধিতা করেন এবং তীব্র জনরোষের স্বীকার হন। যার ফলে তার বই মিশরে নিষিদ্ধ করে তাকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। পরবর্তীতে বহির্বিশ্ব যখন বুঝতে পারল যে এটি পুরোপুরিভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের পাশাপাশি নারীর উপর এক ধরনের পাশবিক শারীরিক নির্যাতন। তখন থেকেই বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন এর বিরোধিতা করে কাজ করে আসছে। এবং এই চর্চা বন্ধের জন্য এর ভয়াবহতা এবং এর ক্ষতিকর প্রভাব তুলে ধরে নানা সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন পরিচালনা করছে। FGM এর ফলে সাধারনত যৌনাঙ্গের অস্বাভাবিক স্ফীতি, অধিক রক্তক্ষরণ, ইউরিন রিটেনশন, মারাত্মক ইনফেকশন জনিত নানা সমস্যা দেখা দেয়। এর স্বীকার নারীদের পরবর্তীতে সন্তান জন্মদানের সময়েও প্রতিকূল অবস্থার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এক পরিসংখ্যান বলে আফ্রিকায় FGM আক্রান্ত নারীদের প্রতি ১০০০ জনে ২০ জনের মত মৃত বাচ্চা প্রসব করে। আর শিশুকালে এরকম ভয়াবহ জঘন্যতম অভিজ্ঞতার কারনে কত শিশুই যে মানসিক ট্রমায় নিজেদের স্বাভাবিকতা হারায় তা যে কোন পরিসংখ্যান ছাড়াই অনুমান করে নেয়া যায়।

তাই একবিংশ শতাব্দীতে এসেও আফ্রিকার নারীদের জন্য আজও এক বীভৎস বিভীষিকার নাম FGM!

Comments
Spread the love