একাত্তরের সেই বিভীষিকাময় নয় মাসের শেষে যেখানে নির্যাতিত ও নিষ্পেষিত লাখো মা-বোনকে স্বাধীন বাংলাদেশে শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় বরণ করে নেবার কথা ছিল, তাদের অবর্ণনীয় দুঃখগাঁথা প্রজন্মের পর প্রজন্ম স্মরণ করবার কথা ছিল পরম আবেগ আর যত্নে, শোকের শক্তিতে বলীয়ান হবার ছিল আমাদের, সেখানে একাত্তরের পর এই সব হারানো মা-বোন, নির্যাতিতা নারীদের যেতে হয়েছে ভয়ংকর অপমান আর লাঞ্ছনার ভেতর দিয়ে। চরিত্রহীনা, কুলটা, বেশ্যা ইত্যাদি অজস্র জঘন্যতম নোংরা ভাষায় আমরা দুরছাই করে তাড়িয়ে দিয়েছি তাদের, অপবাদ আর অপমানে জর্জরিত করেছি। বঙ্গবন্ধু একাত্তরের প্রত্যেক বীরাঙ্গনাকে মেয়ের মর্যাদা দিয়েছিলেন, কিন্তু তাকে মেরে ফেলার পর এই ভাগ্যাহত মুক্তিযোদ্ধাদের দিকে আর কেউ ফিরেও তাকায়নি।

তারপরেও যে গুটিকয়েক বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধা নারী হতাশায় হারিয়ে না গিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছিলেন, পাকিস্তানীদের নির্যাতনের যন্ত্রণাকে শক্তি আর সাহসে রূপান্তরিত করে এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজের মুখে দুটো চড় লাগিয়ে নতুন উদ্যমে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন, অসামান্য শিল্পগুণে নিজের ভাস্কর প্রতিভায় উদ্ভাসিত করেছেন চারপাশ, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মাতরে একাত্তরের সেই বীভৎস ধর্ষণ আর নির্যাতনের ইতিহাস পৌঁছে দিয়ে উল্টো আমাদের তথাকথিত সভ্য সমাজকে লজ্জায় ফেলে দিয়েছেন, সেই সিংহীনি ভাস্কর বীর মুক্তিযোদ্ধা ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন আজ!

৭০ বছর বয়েসী এই মুক্তিযোদ্ধা আজ মঙ্গলবার দুপুর ১টায় রাজধানীর বেসরকারি ল্যাব এইড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন। হৃদরোগের পাশাপাশি ডায়াবেটিস ও কিডনি জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি, এর মধ্যেই গত নভেম্বরে নিজের বাসায় বাথরুমে পড়ে গোড়ালিতে চোট পান এ মুক্তিযোদ্ধা-ভাস্কর। পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়-বিএসএমএমইউতে ভর্তি করা হয়। সেখানে গত ১১ ডিসেম্বর এক অস্ত্রোপচারের পর তার একটি হার্ট অ্যাটাক হয়, পরে দেখা দেয় ইউরিন ইনফেকশন। ভাস্কর প্রিয়ভাষিণীকে বিএসএমএমইউর সিসিইউ থেকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র-আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। পরে ২০শে ডিসেম্বর চিকিৎসা শেষে অনেকটা সুস্থ হয়ে তিনি বাসায় ফিরেছিলেন তিনি। কিন্তু এর ৮৩ দিনের মাথায় আজ হঠাৎ করেই অসুস্থ হয়ে আমাদের ফেলে চলে গেলেন তিনি।

১৯৪৭ এর ১৯ শে জানুয়ারিতে জন্মগ্রহণ করা প্রিয়ভাষিণীর ছোটবেলা থেকেই বড় হয়েছেন নানাবাড়ীর শিল্প-সাহিত্যের পরিমণ্ডলে। বড় মামা নাজিম নাহমুদ নাটক,গান লিখতেন আবার গান আবৃতিও করতেন। আবার খালারাও গান আবৃতিতে পটু ছিলেন।পেয়েছেন খালাদের প্রচুর শাসনও।তার নানা এডভোকেট আবদুল হালিম কংগ্রেস করতেন. ১৯৫৪ এর যুক্তফ্রন্ট সরকার আমলে স্পিকার হয়েছিলেন। ১৯৫২ সালে নানা হাইকোর্টে কাজ করার উদ্দেশ্যে ঢাকা চলে আসেন। সাথে আসে প্রিয়ভাষিণীও। এসেই ভর্তি হন টিকাটুলির নারী শিক্ষা মন্দিরে। পরে নানার স্পিকার হওয়ার সুবাদে মিন্টুরোড চলে আসলে ভর্তি হন সিদ্ধেশ্বরী গার্লস স্কুলে। যার প্রধান শিক্ষিকা ছিলেন শহীদ জননী জাহানারা ইমাম। প্রতিবছর সে স্কুলে প্রিয়ভাষিণী উপস্থিতির জন্য পুরস্কার পেয়েছেন। কারণটা ছিল আম্মা জাহানারা ইমাম ছিলেন তার অসম্ভব আপনজন। কিভাবে যেন ভবিষ্যৎ একটা যোগসুত্র রেখে গিয়েছিল এখানে!

মাত্র নয় বছর বয়সে বীনাপাণি পাঠশালায় পড়বার সময়ে তার ভাস্কর প্রতিভা পরিস্ফুটিত হয়।কিন্তু সমস্যা ছিল তার বাবা। তার মায়ের উপর নির্যাতন করতো তার বাবা, সহ্য করতে পারতেন না তিনি। ছোটবেলাটা একটা ট্রমার মধ্যে দিয়ে কেটেছে তার। প্রিয়ভাষিণী চাইতেন এই যন্ত্রণা থেকে পালিয়ে যেতে। তা করতে গিয়েই মাত্র ১৬ বছর বয়সে এক বিশাল ভুল ফেলেন তিনি, যার প্রেমে পড়ে পালিয়ে বিয়ে করেছিলেন সে নিজেকে উচ্চশিক্ষিত দাবী করেছিল, আদতে সে ছিল তার বাবার মতই এক বউ পেটানো পার্ভাট। রক্ষনশীল আর মৌলবাদী ছিল তার স্বামী, একইসাথে বেকার ও অলস। তাই সংসারের হাল ধরতে হয়েছিল তাকেই। ১৯৬৩ সালে ৬০ টাকা বেতনে খুলনার আগা খান স্কুলে শিক্ষকতার দায়িত্ব নেন। আর সাথে কিছু টিউশনির সুবাদে আরো ২০/৩০ টাকা। কিন্তু এতে সংসার চলছিল না। অন্যদিকে তার অপদার্থ স্বামীর অত্যাচারও অসহনীয় হয়ে উঠেছিল। ফলে শেষ পর্যন্ত একদিন স্বামীর বিচ্ছেদ হয়ে গেল তার, সালটা ১৯৭১।

১৯৭১ এপ্রিলের শুরুতেই পাকিস্তানীদের হাতে ধরা পড়েন প্রিয়ভাষিণী। তার পরের নয় মাস চলে অবর্ণনীয় অত্যাচার। দেশ স্বাধীন হবার পর যখন ফিরে এলেন, অবাক বিস্ময়ে আবিষ্কার করলেন যে তার যুদ্ধটা এখনো শেষ হয়নি! বঙ্গবন্ধুর সরকার প্রত্যেক বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধাকে রাষ্ট্রীয় সম্মান দিলেও আমাদের দেশের আমাদের মানুষেরা তাদের নিয়ে হাসিতামাশা করে, টিটকারী দেয়, লোকজন ‘বারাঙ্গনা’ ডাকে। উপহাস করে।যে খালা মামাদের সাথে একসাথে খেলে বড় হয়েছেন তারাই তাকে এড়িয়ে চলেন,নষ্টা মেয়েমানুষ বিবেচনায় কেউ তাদের কোন অনুষ্ঠানে দাওয়াত দেয় না।আর দিলেও সেখানে প্রিয়ভাষিণীকে যেতে দেয় না তার পরিবার। একাত্তরে পাকিস্তানীদের হাতে নির্যাতিত হয়ে যতটা না কষ্ট আর যন্ত্রণা পেয়েছিলেন প্রিয়ভাষিণীর মত এমন লাখো নারী, তার চেয়েও বড় অপমান আর লজ্জা স্বাধীন বাংলাদেশে পেতে শুরু করেন তারা। যেন পাকিস্তানীদের হাতে নয় মাসের অকল্পনীয় যন্ত্রণা সহ্য করা তাদের জীবনের সবচেয়ে অপরাধ!

কি ভয়ংকর লজ্জা একবার ভাবুন! যে স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষে দাঁড়ানোর জন্য নয়টা মাস ধরে তিল তিল যন্ত্রণা আর দুঃখ সহ্য করতে হলো এই পবিত্র মা-বোনদের, তাদের আমরা স্বাধীন দেশের দাঁড়িয়ে চরিত্রহীন বলেছি, যাদের আত্মত্যাগ আর অসামান্য সাহস আমাদের গৌরবের উপলক্ষ হবার কথা ছিল, তাদের নিয়ে গর্ব করার কথা ছিল, অনুপ্রেরণা হবার কথা ছিল যাদের, তাদের আমাদের সামাজিকভাবে, পারিবারিকভাবে বিতাড়িত করেছি, লজ্জা দিয়েছি! ছিঃ!

কিন্তু প্রিয়ভাষিণী থামেননি। একবিন্দু টলেননি। বরং সমাজের এ সকল চরিত্র দেখেই একদিন প্রিয়ভাষিণী তার প্রিয় বড় মামাকে বলেন তিনি সবাইকে তার দীর্ঘ নয় মাসের কাহিনী জানাতে চান।তিনি চান জানুক দেশবাসী কিসের বিনিময়ে এ স্বাধীনতা। মামার অনুপ্রেরণা পেয়েই সবার আগে মুখ খুললেন প্রিয়ভাষিণী। স্বাধীনতার পর প্রথম মানুষ জানতে পারে বীরাঙ্গনাদের কাহিনী। কারোর করুণা, পরিহাস কিংবা সমবেদনা পাওয়ার জন্য না, শক্ত কন্ঠে এই সকল বঞ্চনার প্রতিবাদে ঘুরে দাঁড়িয়েছিলেন প্রিয়ভাষিণী, তাদের নষ্টা বেশ্যা মেয়েমানুষ বলে সম্বোধন করা আমাদের উল্টো লজ্জা ফিরিয়ে দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন যে এই দেশের স্বাধীনতায় সাড়ে ছয় লাখ নির্যাতিত নিপীড়িত বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধার অবদান কত বেশি! স্পষ্ট কন্ঠে উচ্চারণ করেছিলেনঃ “যুদ্ধের শিকার হয়েছে যে নারী তার তো নিজের কোনো লজ্জা নেই।”

১৯৭৭ থেকে একটানা ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত কাজ করে গেছেন প্রিয়ভাষিণী। কখনো টেলিফোন অপারেটর হয়ে আবার UNDP, UNICEF, FAO, কানাডিয়ান দূতাবাসের হয়ে বড় বড় কাজ করেছেন। বাচ্চাদের মানুশ করা আবার কাজ করা র দুইই নিপুন হাতে সামলেছেন। ১৯৫৯ সালে দৌলতপুর গার্লসে পড়ার সময় পরিচয় হয়েছিল এস এম সুলতানেরর সাথে।যিনি তখনো হয়ে উঠেন নি এস এম সুলতান। কিন্তু ২৬ বছর পর যখন এস এম সুলতান খ্যাতির শীর্ষে তখন ১৯৮৫ সালে আবার কাকতালীয় ভাবে দেখা হয় প্রিয়ভাষিণীর। এস এম সুলতানের আগ্রহেই ভাস্কর্যের কাজ শুরু করেন আবার। এস এম সুলতান জাতির কাছে তুলে ধরেন এক ভাস্করকে।নাম ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী। যে বীরাঙ্গনা যাকে লোকে টিটকারী দিয়ে বারাঙ্গনা বলেছিল!

যুদ্ধটা তার শেষ হয়নি কখনো। গাছের মূল, শেকড় অথবা অব্যবহৃত কাঠকে হাতের নিপুণ ছোঁয়ায় অসাধারণ শিল্প রূপ দেওয়া এই ভাস্কর কখনো তার শিল্প কর্মের প্রদর্শনী করতে চাননি। কিন্তু জাগতিক জীবন বড় কঠিন, তার চেয়েও কঠিন এখানে টিকে থাকা। তাই তার মত মুক্তিযোদ্ধাকে আর্থিক স্বচ্ছলতার জন্য প্রদর্শনীর আয়োজন করতে হয়েছিল। মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতিটাই পেয়েছেন বহু পরে, ২০১৬ সালের ১১ই আগস্ট তাকে এই বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি দেয়। ২০১০ সালে স্বাধীনতা পুরষ্কারে ভূষিত হওয়া প্রিয়ভাষিণী ২০১৩ সালের রাজাকারের ফাঁসীর দাবিতে গরে ওঠা গণজাগরণের অন্যতম বড় ব্লাড লাইন ছিলেন। ধর্মান্ধ মৌলবাদের বিরুদ্ধে তার যুগের পর যুগ ধরে চলে আসা যুদ্ধটা আমাদের দিয়েছিল অসামান্য অনুপ্রেরণা!

যেমন মায়া আর দরদ দিয়ে শত্রু মিত্র সবাইকে ভালবাসতেন তেমনি দোর্দান্ড প্রতাপশালী সিংহিনীর ন্যায় লড়ে গেছেন। মুক্তিযুদ্ধবিরোধী পাকিপ্রেমী রাজাকারের দল তার চরিত্র হননের চেষ্টা করেছে, কত অসংখ্য অজস্র মিথ্যাচার আর অপপ্রচার চালিয়েছে, গালাগালি করেছে, কিন্তু তিনি এক মুহুর্তের জন্য দমেননি, থামেননি, এই প্রজন্মকে পাকিস্তানীদের গণহত্যা আর গণধর্ষণের বীভৎস ইতিহাস সম্পর্কে জানিয়ে গেছেন অবিরাম।

একে একে একাত্তরের সকল চলে যাবেন, ফেরদৌসি প্রিয়ভাষিনীও চলে গেলেন। স্বচক্ষে একাত্তরকে দেখা মানুষের কাছ থেকে তা জানার সুযোগ ছোট হয়ে আসছে।

ভালো থাকবেন ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী…

Comments
Spread the love