আমাদের কম বেশী সবার ফেমিনিজম শব্দটির সঙ্গে পরিচয় রয়েছে। কিন্তু অনেকেই ঠিকঠাক ভাবে জানেন না ফেমিনিজম আসলে কী? এই শব্দটি নিয়ে অনেক ভুল অথবা কাল্পনিক ধারনা রয়েছে। আবার অনেক নারীই রয়েছে যারা এটিকে ঘৃণা করে। “নারীবাদ’’ (feminism) এবং “নারীবাদী” (feminist) শব্দ দুটি ফ্রান্সনেদারল্যান্ডসে প্রথম প্রকাশিত হয় ১৮৭২-এ, যুক্তরাজ্যে ১৮৯০-এ, এবং যুক্তরাষ্ট্রে ১৯১০-এ। নারীবাদী নিয়ে একটি আর্টিকেলে পড়েছি, ফেমিনিজমের বিরুদ্ধে নারী এবং পানির বিরুদ্ধে মাছ সমান কথা। তবু এ কথা সত্য, বেশীরভাগ নারী নারীবাদী হিসেবে চিহ্নিত হন না। যুক্তরাষ্ট্রের একটি জরিপে দেখানো হয়েছে ১৮% নারীদের মধ্যে একজন নিজেকে নারীবাদী বলেন। অন্যদিকে যুক্তরাজ্যে এর সংখ্যা আরও কম।

নারীবাদী হচ্ছে উভয় লিঙ্গের সমতা করার বা আনার এক বিপ্লব। নারীবাদী = সমতা। এর মূল লক্ষ্য হচ্ছে জেন্ডার ডিস্ক্রিমিনেশন উচ্ছেদ করা অর্থাৎ নারী পুরুষের মধ্যে সাম্যাবস্থা নিয়ে আসা। লিঙ্গ বৈষম্য যুগযুগ ধরে আমাদের সমাজে হয়ে আসছে। অথচ যে দেশের প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে বিরোধীদলীয় নেত্রী পর্যন্ত নারী। সে দেশে আবার নারী অধিকার নিয়ে কথা বললে লেবেল করে দেয়া হয় ‘নারীবাদী’ বলে। একবার ভেবে দেখুন আমরা যারা নারীবাদীদের বিপক্ষে তাদের মতো মানসিকতার মানুষকে আপনার মা কীভাবে সহ্য করে গড়ে তুলেছে। যিনি কিনা একজন নারী।

মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে, ফেমিনিজম যদি নারী পুরুষের মধ্যে সাম্যতা নিয়ে আসার জন্যই হয় তাহলে কেনো এটার নাম ফেমিনিজম, কেনো এটার নাম হিউমিনিজম বা ইক্যুলিজম নয়? কারন একটাই যুগ যুগ ধরে নারী সবচেয়ে বেশি অবহেলিত এবং সুবিধা বঞ্চিত। এখনো ঘরে ঘরে বহু নারী তাদের পুরুষ দ্বারা প্রহার হচ্ছে। তাদেরই অফিসের বস আবার নারী। বউয়ের কাছে খুব বুক ফুলিয়ে বলে আমি পুরুষ আমার শক্তি আছে আমি তোমাকে পেটাতে পারি। স্বামী হিসেবে এটি আমার অধিকার। বউও মাথা পেতে মার খেয়ে নেয়। কারন ঐযে নিজের স্থান, নিজের সম্মান, মর্যাদা, অধিকার সম্পর্কে অজ্ঞাত। এই অজ্ঞাততা দূর করতেই কিছু মানুষ কাজ করে যাচ্ছে। অনেক পুরুষের অভিযোগ, ফেমিনিজম পুরুষ বিরোধী একটা ব্যবস্থা। কিন্তু এটা একদমই ভুল ধারনা। উভয় লিঙ্গের সমতা ঘটানো এর মূল লক্ষ্য। ফেমিনিজমের লক্ষ্য হচ্ছে ভাষার লিঙ্গ নিরপেক্ষতা, পক্ষপাতহীন বেতন-কাঠামো, প্রজনন-সংক্রান্ত অধিকার, গর্ভনিরোধকগর্ভপাতের অধিকার, বিভিন্ন ক্ষেত্রে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার অধিকার ও সম্পত্তির মালিকানার অধিকার নিশ্চিত করা।

সমাজের একটা প্রচলিত নিয়ম হয়ে গেছে যে মেয়েদের লাজুক হতে হবে, তাঁদের কণ্ঠস্বর নিচে নামিয়ে কথা বলতে হবে, তাঁদের একদম মেয়েলি আচরন করতে হবে, তাঁরা রাত পর্যন্ত বাড়ির বাহিরে থাকতে পারবে না। মেয়ে মানে ঘরের কাজ নিজের করতে হবে, কিন্তু ভাইটি বিন্দাস ঘুরে বেড়াচ্ছে। বিবাহের পর হয়ত তাঁদের চাকুরী করার অধিকারটুকুও থাকে না। বাবা-মাকে বিদায় জানিয়ে ঘটা করে কেঁদে শ্বশুরবাড়িতে মেয়েদেরই যেতে হচ্ছে। আবার বিয়ের পর স্বামীর জন্য নিজের জন্মের পর দেয়া নামটি অনাশয়ে বদলে ফেলছে একজন নারীই। এমন কী জীবন সঙ্গী নির্বাচন করার সুযোগটিও দেয়া হয় না। বাকি অধিকারগুলোর কথা না হয় বাদই দিলাম। নারীদের জন্ম হয়েছে জেনো সব বলিদান দেয়ার জন্যই। সবসময় একজন মেয়েকেই বলা হয় এডজাস্ট করে নাও। এটাই জীবন! তবে হ্যাঁ, আজকের নারীর অবস্থান এক দশক আগের অবস্থান থেকে ভিন্ন। নারীরা এখন পুরুষের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সব ক্ষেত্রে কাজ করে যাচ্ছে। ঘর সামলানো থেকে শুরু করে রাস্তায় রিকশা চালানোতেও পিছিয়ে নেই নারীরা।

ব্যক্তিগত জীবন থেকে যদি বলতে হয় তাহলে একজন মেয়ে হিসেবে আমিও বাদ যায়নি এই সব বিধি নিষেধের। আমার বাবা একটা ছেলে সন্তানের অভাব কতটা অনুভব করে তা ছোটবেলা থেকেই দেখে এসেছি। তার ভাষ্য মতে মেয়েদের দিয়ে কি হবে? মেয়েরা আজ না হয় কাল বিয়ে করবে, শ্বশুর বাড়ি চলে যাবে। পর হয়ে যাবে। বৃদ্ধ বয়সে মেয়েরা কোনদিন দেখবেনা। তাই মেয়েদের পেছনে টাকা খরচ করাও ছিল একটি লস্ট প্রোজেক্ট। কিন্তু আসলেই কি তাই? মেয়েরা কি বিয়ের পর তার বাবা-মাকে দেখেনা? পড়ালেখা করে নিজের পায়ে দাড়িয়ে সংসারের দায় ভার নেয়না? সৃষ্টিকর্তা কি শুধু ছেলেদেরই এই জাদুকরী শক্তি আর সামর্থ্য দিয়ে পাঠিয়েছে? একদমইনয়! আজকাল ছেলেদের চাইতে মেয়েরা তার পরিবারকে বেশী দেখে। ছেলেমেয়ে বলে কিছুই নেই, সবই হচ্ছে মানসিকতা।

সাংবাদিকতা বিভাগের ছাত্রী হওয়াতে আমাদের প্রায়ই লিঙ্গ সমতা নিয়ে পড়তে হয়েছে। কিন্তু লক্ষ্য করলে দেখা যায় আমরা পড়েই খালাস হয়ে যাই। দৈনন্দিন জীবনে আমরা আমাদের এই পড়া আর শেখাটা কতটা কাজে লাগাই? একবার নিজেদের প্রশ্ন করে দেখবেন আপনি শেষ কবে একটি মেয়ের দিকে খারাপ দৃষ্টিতে তাকাননি? শেষ কবে একটি মেয়েকে নিয়ে বাজেভাবে কথা বলেননি? শেষবার কবে একটি মেয়ের অধিকার নিয়ে রুখে দাঁড়িয়েছেন? মনে পড়ে? আমরা শুধু জ্ঞানই অর্জন করছি। শিক্ষিত হচ্ছি কিন্তু মানুষ হচ্ছি না। এতো শিক্ষিত হওয়ার পরও বখাটে ছেলের হাতে ললনাদের রেহাই নাই।

আমি নারীবাদীও নই, আমি পুরুষবাদীও নই। আমি মানুষবাদী! একজন মানুষ হিসেবে আমাদের সকলের উচিৎ যেকোনো প্রকারের অন্যায় রুখে দাঁড়ানো। কথায় আছে, “অন্যায় যে করে এবং অন্যায় যে সহে, তব ঘৃণা তারে যেন তৃণ সমদহে”।

আবারও বলতে হচ্ছে নারীবাদী একটি মতাদর্শের নাম, একটি সামাজিক আন্দোলনের নাম। এটি একটি চেতনা। যা নারী পুরুষ উভয় ধারণ করতে পারে। যদি সামাজিক অধিকার আদায় করা কোন দোষের হয়, তা হলে হলাম না হয় দোষী!

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-