ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

এত সিক মানুষজনের এত কাছাকাছি আমরা বাস করি?

কিছু লোক আছে যাদের সব খারাপ বিষয়েই মতামত হলো ‘ভালো হইছে’।

ধরেন একটা প্লেন ক্র্যাশ হলো, সে বলবে- ‘ভালো হইছে, খুশি হইছি, দেশের বাইরে গিয়া এতো ঘোরাঘুরির কি আছে?’ জাফর ইকবাল স্যারকে চাকু মারলে বলবে, ‘নাস্তিকরে চাকু মারছে, ভালো হইছে কিন্তু মরে নাই এখনো, এইটাই দুঃখ।’ স্টিফেন হকিং মরে গেলে বলবে, ‘নাস্তিকটা হুইল চেয়ারে বইসা এইসব বা*ছা* না কইরা সৃষ্টিকর্তা, পরজন্ম নিয়া গবেষণা করলেও কামে দিতো; মরছে ভালো হইছে’। শ্রীদেবী মারা গেলে বলবে, ‘সারাজীবন শরীর বেচা একজন মরলে কান্দার কি আছে? মরছে ভালো হইছে, দুনিয়াতে কিছু কম পাপ হইলো’। এই জিনিস আমাদের দেশের অনলাইনে নতুন না। যে কোনো ঘটনার পরই কমেন্ট সেকশনে এই গ্রুপ চলে আসবে এবং আপনার মনে হতে থাকবে সিরিয়াসলি! এত সিক মানুষজনের এত কাছাকাছি আমরা বাস করি?

আপনে একটু খোঁজ নিলেই দেখবেন যে প্লেন ক্র্যাশে মানুষ মরলে খুশি হয়, সে আসলে জীবনে প্লেনে চড়ে নাই, আসলে ওর প্লেনে চড়ার মতো অবস্থাই নাই। যে হকিং মরলে খুশি হয় সে আসলে ক্লাস এইটও পাশ করে নাই, তারে আপনি হকিং চেনাতে/বুঝাতে পারবেন না। এরা মুখে সবসময় ধর্মের কথা বলবে অথচ এক ওয়াক্ত নামায পড়বে না। পর্দার কথা বলবে কিন্তু সব ধরনের ১৮+ পেজে এদের লাইক থাকবে। নারীদের প্রতি ধর্ম সম্মান দেখানোর কথা বলছে বলে মেয়েদের ইনবক্সে নক দিয়া নোংরামি করবে। নায়িকার ছবি/ভিডিও নিয়া বাথরুমে থেকে আসার পরে ফেসবুকে লিখবে ‘সারা জীবন বুক/পা* দেখায়ে বেড়ানো একজন নায়িকার জন্য মায়াকান্না কান্দার মানে নাই’। এরাই নানান ইন্টারন্যাশনাল সেলিব্রেটির পোস্টে যেয়ে বাংলায় গালাগালি করে আসে।

এই গ্রুপটা আসলে রিয়াল লাইফে লুজার। নিজে জীবনে কিছু করতে পারছে না সেই হতাশা থেকেই অনলাইনে এইগুলা বলে শান্তি পায়। দুঃখজনকভাবে আমাদের দেশে কিছু করতে না পেরে হতাশ গ্রুপটা অনেক বড় আর এই গ্রুপের সবচেয়ে বড় বিচরণক্ষেত্র হলো ফেসবুক। এদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো ধর্মীয় বয়ান। যে মেয়েটা স্বামীর সাথে হানিমুনে গিয়ে প্লেন ক্র্যাশে মারা গেছে তাঁরে নিয়া এরা লিখবে যে নোংরামি করতে গিয়া মরছে। অন্যজনের স্বামীর সাথে তো হানিমুনে যায় নাই, নিজের স্বামীর সাথে গেছে; এতে ঠিক কই নোংরামি হইলো আল্লাহপাক জানে। এদের জিজ্ঞাস করলেও উত্তর পাবেন না কই নোংরামি হচ্ছে। কিন্তু সব কথার শেষ কথা হলো নোংরামি হচ্ছে, তালগাছ আমার। এরা নিজেদের ব্যর্থতা, ক্ষোভ, হতাশা সব গালি, ধর্ম, পরকাল ইত্যাদি দিয়ে ঢাকতে চায়।

নেপালের বিমান দূর্ঘটনার পর থেকে আমি নেপালিদের কমেন্টগুলা পড়তেছিলাম বিভিন্ন নিউজ এবং ইউটিউব ভিডিওতে। নেপালের ত্রিভুবন খুব ঝুকিপূর্ণ এয়ারপোর্ট, ঐখানে অনেক এয়ারলাইন্সই যায় না। নেপালিদের জন্য মিডলইস্টে যাওয়ার ট্রানজিট হলো বাংলাদেশ; তাঁরা বাংলাদেশ আসে, তারপরে এখান থেকে মিডল ইস্টে যায়। নেপালিরা আমাদের বন্ধু মানে, তারা এই ব্যাপারটাতে কষ্ট পাইছে। তাদের কমেন্টগুলা দেখে আমার মনে হয় এই শোকের মধ্যেও অন্তত ভালো কিছু মানুষ চেনা গেলো। আর তার ঠিক নিচেই থাকে গালি দেয়া বাংলাদেশী গ্রুপ। এরা নেপালকে গালি দেয়, এয়ারলাইন্সকে গালি দেয়, পাইলটকে গালি দেয়, যারা ঘুরতে গেছে সবাইকে গালি দেয়। এরা ভাবে এরা যা জানে/বলে তাই ঠিক, বাকি সব…।

আমি খালি চিন্তা করি এতো বড় একটা ‘অনলাইনে মুই কি হনু রে আর অফলাইনে লুজার’ প্রজন্ম আমরা ঠিক কিভাবে এতো কম সময়ে প্রোডিউস করতে পারলাম? প্রতিটা গুরুত্বপুর্ণ ঘটনার পর এই গ্রুপটার পোষ্ট/কমেন্ট দেখলে বাংলাদেশী হিসাবে নিজেকে খুব ছোট মনে হয়। আমরা এমন কেন?

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close