অদ্ভুত,বিস্ময়,অবিশ্বাস্যএরাউন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ড

ফাতিমা আল ফিহরি: বিশ্বের প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা!

আজ থেকে প্রায় এগারো শতক আগের কথা। ৮৫৯ সাল। সেই সময়ে পৃথিবীর প্রাচীন একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। এই বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেন ফাতিমা আল ফিহরি নামক এক নারী। তিনি জন্মেছিলেন এক মুসলিম পরিবারে।
 
খুব অবাক হওয়ার মতোই ব্যাপার। এখন আমরা বসবাস করছি একুশ শতকে, এই ২০১৮ সালে এসেও অনেক নারীকে ঘরবন্দী হয়ে থাকতে হয়। কোনো নারী ‘আউট অফ দ্যা ট্র্যাক’ কিছু ভাবতে গেলেই সেটাকে ততটা মর্যাদা দেওয়া হয় না। এটাও সত্যি যে, নারীরা আগের চেয়ে বেশি সামাজিক কাজে অংশ নিচ্ছেন, অর্থনৈতিক ভাবে তাদের স্বচ্ছলতা এসেছে। কিন্তু, তার জন্য প্রতিনিয়ত তাদের ত্যাগ তিতিক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। অনেক সামাজিক বাঁধা পেরিয়ে পাড়ি দিতে হচ্ছে সুদূর স্বপ্নের পথ।
এখনো সমাজ কি বলবে এই চিন্তা করতে হয়। এখনো বাইরে মুভ করার সময় অনেক কিছু মাথায় রাখতে হয়। তার উপর কখনো কখনো নিজ পরিবারের মধ্য থেকেই বাঁধা আসে। আমাদের চেনাজানা জগতের কথাই ভেবে দেখুন না, নারীরা কতটা স্বাধীন, কতটা মসৃণ জীবন কাটাচ্ছেন সেটা যে প্রতিনিয়ত প্রশ্নবিদ্ধ।
 
সেই জায়গা থেকে আজ থেকে এগারো শতক আগে একজন মুসলিম নারী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করছেন, ব্যাপারটি অভিনবই বটে। পৃথিবীর বিভিন্ন ধর্মের মানুষজন বিভিন্ন সেক্টরে অবদান রেখেছেন বলেই আমরা ২০১৮ সালের আজকের আধুনিক পৃথিবী পেয়েছি। ফাতিমা আল ফিহরি একজন মুসলিম নারী, এই কারণে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করার ব্যাপারটি উল্লেখযোগ্য সেটা দাবি করছি না, কিন্তু একজন মুসলিম নারী আজ থেকে এগারো শতক আগে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছেন, এই ব্যাপারটি একটু সিগনিফিকেন্ট। তৎকালীন মুসলিম সমাজের উদারতা, নারীদের ভাবনার জগত কতটা এগিয়ে ছিল, নারীরা কিভাবে এমন একটি বৃহৎ উদ্যোগ নিয়েছেন – পুরো ব্যাপারটি বেশ সুন্দর। সেই জায়গা থেকে আজকের সমাজের অবস্থান বিবেচনা করে দেখুন, আমরা আসলে কতটুকু এগিয়েছি? মধ্যযুগে যদি একজন মুসলিম নারী বিশ্বের প্রথম ডিগ্রি প্রধানকারী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে পারেন, তাহলে এই আধুনিক যুগে নারীদের অবস্থান কতটা ভাল? নিজেদের কাছে প্রশ্ন, আমি জানি আমরা প্রতিনিয়ত আগাচ্ছি, কিন্তু কখনো কখনো মনে হয় এখনো আমাদের মানসিকতা পুরোপুরি বিকশিত হয়নি। আমাদের অনেক নারীবাদীর দরকার নেই, অনেক উগ্রবাদীর দরকার নেই। আমাদের মধ্যে উদারতা, সহনশীলতা আরেকটু বেশি থাকা প্রয়োজন হয়ত।
যাইহোক, ফাতিমা আল ফিহরি ৮০০ খৃষ্টাব্দে তিউনিশিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। পরবর্তীতে তার পরিবার চলে আসে মরক্কোর ফেজ নগরীতে। ৮৫৯ সালে এই ফেজ নগরীতেই ফাতিমা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। বিশ্ববিদ্যালয়টির নাম আল-কারউইন বিশ্ববিদ্যালয়। এখানে সব ধর্মের মানুষদের পড়ালেখা করবার সুযোগ রাখা হয়েছিল, যেটি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম স্বতন্ত্র দিক। খ্রিষ্টানদের পোপ দ্বিতীয় সিলভেস্টার এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেছিলেন। ইহুদি চিকিৎসাবিদ ও দার্শনিক মায়মোনাইডস এই বিশ্ববিদ্যালয় অন্যতম বিখ্যাত একজন ছাত্র ছিলেন।
আরেকটি ব্যাপার হলো, বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ধর্মীয় শিক্ষা, রাজনৈতিক শিক্ষা, সাধারণ বিজ্ঞান তো পড়ানো হতোই এর পাশাপাশি জ্যোতিবিদ্যা, ভূতত্ত্ববিদ্যা, ব্যাকরণ, রসায়ন, চিকিৎসাশাস্র ও গনিত শিক্ষা দেওয়া হত। এখনো এই বিশ্ববিদ্যালয়টি টিকে আছে, একারণেই এটিকে বলা হয় টিকে থাকা বিশ্বের প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয়। ইউনেস্কো ও গিনেজ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসও এই বিশ্ববিদ্যালয়টিকে স্বীকৃতি দিয়েছে। গিনেজ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস বিশ্ববিদ্যালয়টি সম্পর্কে বলছে, “The oldest existing, and continually operating educational institution in the world is the University of Karueein, founded in 859 AD in Fez, Morocco.”
ফাতিমা আল ফিহরি ছিলেন মোহাম্মদ বিন আব্দুল্লাহ আল ফিহরির মেয়ে। আব্দুল্লাহ ছিলেন সম্ভ্রান্ত ব্যবসায়ী। তিনি পরিশ্রম করে প্রচুর অর্থ উপার্জন করেন এবং উত্তরাধিকার সূত্রে সেসব রেখে যান নিজের দুই কন্যার জন্য। তার দুই কন্যাই বেশ সুশিক্ষিত, চিন্তাভাবনায় প্রগতিশীল এবং যথেষ্ট ধর্মপ্রাণও বটে। ফাতিমা যখন বাবার রেখে যাওয়া অর্থ পেলেন, তিনি ভাবলেন অর্থগুলো অর্থপূর্ণ কোনো কাজে লাগুক। যেহেতু তিনি একই সাথে ধার্মিক এবং শিক্ষানুরাগী তাই তিনি একটি মসজিদ নির্মানের কথা ভাবলেন, যা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবেও কার্যকর হবে। একই সাথে দুটি কাজ হবে। মানুষেরও উপকার হবে, মানুষ নতুন কিছু জানবে, নতুন কিছু শিখবে এই ভাবনায় তিনি বেশ শিহরিতই হলেন।
দুই বছর নিজের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে তিনি এই নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করালেন। তিনি শপথ করেছিলেন যতদিন নির্মাণকাজ শেষ হবে না ততদিন তিনি নফল রোজা রাখবেন। তিনি তার শপথ রক্ষা করলেন। টানা দুইবছর তিনি রোজা রেখেছিলেন এবং স্বপ্ন বুনছিলেন। মসজিদের পাশে তিনি জমি কিনে জায়গাটুকু আরো বিস্তৃত করতে থাকেন যেনো শিক্ষার কাজটুকু ভালোভাবে করা যায়। সেই মসজিদ আল-কারউইন উত্তর আফ্রিকার অন্যতম বৃহৎ মসজিদ ছিল। এখানে একসাথে ২২ হাজার মানুষ নামাজ পড়তে পারত যেটি সেইসময়ের জন্য বিরাট ব্যাপারই বটে। আর এতে যে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছিল সেটি মধ্যযুগে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে উচ্চশিক্ষার একটি প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হল।
ফাতিমা আল ফিহরি, আল কারউইন আল কারাউইয়িন, প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়, ফেজ, মরক্কো, নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়,
এই বিশ্ববিদ্যালয় ঘিরে মানুষের সমাগম বাড়তে থাকে। বাজার বসে। শিক্ষানুরাগী মানুষের যাতায়াত বাড়তে থাকে। ফলে অল্পকিছুদিনের মধ্যে ফেজ একটি গুরুত্বপূর্ণ নগরীতে পরিণত হয়। ফাতিমা মারা গিয়েছেন ৮৮০ খ্রিষ্টাব্দে। তিনি হয়ত জানেনও না, তার তৈরি করে যাওয়া বিশ্ববিদ্যালয় এখনো টিকে আছে, পৃথিবীর প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে। অথচ, অনেক প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়ই এখন আর নেই, যেমন নেই নালন্দা ইউনিভার্সিটি সহ ইউরোপে শুরু হওয়া বেশকিছু বিশ্ববিদ্যালয়। কালের স্বাক্ষী, ইসলামের সোনালী অতীতের স্বাক্ষী হয়ে এই বিশ্ববিদ্যালয় এবং ফাতিমা আল ফিহরির প্রচেষ্টা এটাই মনে করিয়ে দেয়, নারীরা সুযোগ পেলে কত অসাধারণ কাজ করে যেতে পারেন!
আরও পড়ুন-
Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close