মনের অন্দরমহলরিডিং রুম

আমাদের বাবারা…

তুমি কত রাত নির্ঘুম ছিলে,
কাঁদতে কাঁদতে ঘুম ভেঙ্গে যেতো তোমার,
বাবা তোমাকে কাঁধে নিয়ে উঠোনময় পায়চারি করতো…
তুমি কত বার তার সদ্য ধোয়া জামায় পিশাব করে দিয়েছিলে,
মানুষটা নিজের জামা বদলানোর আগে তোমার ভেজা জামা পালটে দিতো,
তুমি কত বার তার কাঁধে চড়ে চাঁদ ছুঁতে চেয়েছিলে,
মানুষটার কখনো ব্যথা লাগেনি,
বাবাদের কোনো ব্যথা নেই।
কত বার শেষ রাতে তোমার গায়ের চাদর সরে যেতো,
বাবা তোমার গায়ে চাদর টেনে দিতো সঙ্গোপনে,
কতবার তোমার ঘুমন্ত মুখের দিকে চেয়ে বিস্ময়ে হতবাক হতো মানুষটা,
বলতো, কি সুন্দর! কি সুন্দর।
কি আশ্চর্য একদিন তুমি বড় হবে, অনেক বড়।
মানুষটা হবে তোমার মতো শিশু।
আবার কোনো একদিন তুমি কাঁদবে ভীষণ,
বাবা থাকবেন তোমার কাঁধে..

একটা শিশু যখন জন্ম নেয় তখন বাবা তাকে পরম নির্ভরতায় কাঁধে তুলে রাখেন। একইভাবে একদিন বাবাকে কাঁধে নেয় সন্তান। কিন্তু সেদিন বাবা আর থাকেন না এই নশ্বর পৃথিবীতে। এই যে ছোট একটা পরিবর্তন! এর মধ্যেই কত ঘটনা, কত গল্প, কত জড়তা, কত না বলা অতৃপ্ততা। বাবারা অনেক কিছু বলতে চেয়েও সরাসরি কখনো বলে দেন না। প্রকৃতি বাবাদের প্রকাশভঙ্গিকে একদম আলাদা স্বাতন্ত্র্য দিয়েছে। সন্তানরাও বাবাকে বলতে পারে না, কত কথা মনে ঘুরে ফিরে, মুখে আর বলা হয় না। কী অদ্ভুত মধ্যবিত্তীয় জড়তায় আচ্ছন্ন জীবন।

আজকে বাবা দিবস। বাবাদের হয়তো এই সুযোগে না বলা কথাগুলো বলা যেতো। অথচ, একদম খাঁটি মধ্যবিত্ত বাবাদের কাছে এসব আদিখ্যেতা। এইতো সকালেও ঘুমটা ভাঙ্গবে বাবার বাজখাই গলার রাম ধমক শুনে। ‘জমিদার হয়েছে, নাকে তেল দিয়ে ঘুমানো আর খাওয়া ছাড়া আর কাজ নাই।’

কী অন্যজগতের এক মানুষ। একটা গাম্ভীর্য সবসময় ধরে রাখার কি চেষ্টা গড়পড়তা সব বাবার মাঝেই। ঘরের সব কিছুতেই তার একটা প্রভাব। কিন্তু সব কিছুর কেন্দ্র থেকে কিছুটাই দূরেই তার অবস্থান। সবচেয়ে বেশি জড়তা তো কাজ করে তার সামনে গেলেই।
বাবার সাথে আমাদের কোথায় যেন একটা টান পড়ে যায়। স্কুল, কলেজের বন্ধুবান্ধব নিয়ে নিজের মতো একটা পৃথিবী যখন তৈরি করে নেয়া শিখে যাই, তখন বাবার সাথে গ্যাপ আরো বেড়ে যায়। কিন্তু দরকারে তাকেই খুঁজতে হয় ভীষণ। পকেট খরচের একমাত্র শেষ ভরসা তিনি। বন্ধুবান্ধব এর সাথে ঘুরতে যাওয়ার চাঁদার টাকা চাওয়ার সাথে সাথে না পেলে হয়তো এক প্রকার তার উপর রাগ চলে আসে। কিন্তু বুঝতে চাই না, ঐ টাকাটা হয়তো তিনি ধার করে এনে দিবেন। হয়তো ওই বাড়তি টাকার হিসাব মেলাতে তাকে বাড়তি কয়েকটি দিন চলতে হিমশিম খেতে হবে।

ছেলেমেয়েরা ভালো রেজাল্ট করলেও খুব উচ্ছ্বাস দেখান না বাবারা। সামনে কলেজে ভর্তি করতে হবে কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে। অনেক টাকার ব্যাপার। বাবারা সেই বাড়তি টাকা রোজগারের কথা চিন্তা করতে শুরু করে দেন। আমাদের বাবারা সব বুঝেও মারাত্মক অভিনয় করে যেতে পারেন। প্রতিদিন তার পকেট থেকে টাকা সরে যায় জেনেও টাকা রাখার জায়গাটা বদলান না। কিংবা টাকা অন্য জায়গায় লুকিয়ে রাখেন না। অথচ, হিসাবে কাঁচা ভেবে আমরা বাবাদের দিয়ে ঠাট্টা করি!

মধ্যবিত্ত বাবাদের সব কিছুতে কি ভীষণ দরকষাকষি। মাঝে মধ্যে ফিক্সড প্রাইসের দোকানে গিয়েও তারা বলেন, আরেকটু কম রাখা যায় না? তখন সন্তানেরা হয়তো লজ্জা পায়। বাবাটা এত বোকা। দোকানদারগুলো কী না কী ভাবছে। আহারে!

নিউমার্কেট, মতিঝিল, গুলিস্থানের ফুটপাতে আমাদের বাবাদের দেখা যায়। কম দামে শার্টের পিস কেনেন ওখান থেকে তারা। জিজ্ঞেস করলে হয়তো বলবেন অনেক বড় দোকান থেকে কিনে এনেছি। দামে কিছু সস্তায় পাওয়া গেছে। অথচ, সন্তানের জন্যে কেনেন ব্র্যান্ড থেকে। যুগের সাথে তো তাল মেলাতে হবে যে সন্তানের।

মুচির দোকানগুলোতে সবচেয়ে বেশি ভিড় দেখা যায় মধ্যবয়স্ক বাবাদের। এই তো কদিন আগেও এই একই জুতা সেলাই করা হয়েছে। এখন আবার রঙ করতে নিয়ে এসেছেন জুতা জোড়া। রঙ করলেই চকচকে হয়ে যাবে। পড়া যাবে আরো কটা দিন। মুচিরাও মাঝে মধ্যে বিরক্ত হয়ে যায়। ‘ভাই এই জুতারে আর কি করমু! নতুন একটা কিনেন। কিপটামি আর কত করবেন।’ হুম, বাবারা কিপটা হয়। বাবারা কিপটা হয় বলেই, সন্তানের জন্য নতুন মডেলের একজোড়া জুতা কিনতে পারে মানুষটা।

“আমি ইতানের ফাংশন মাংশন বুঝি না”- অজুহাত দিয়ে আদিকালের পুরানো মোবাইল সেটটা আর পাল্টান না বাবারা। কখনো শখ করে যদি স্মার্ট ফোন কেনেনও, হয়তো দেখা যাবে ছোট ছেলেটা সেটটা দেখে মুখ ফসকে বলবে ‘বাহ কি সুন্দর মোবাইলটা’, ব্যাস! বাবাদের ইতং বিতং শুরু হয়ে যায়। সেটের ফাংশন তারা ভুলে যান। তারা শুধু খসখসে রঙ ওঠা পুরান মোবাইলগুলোর ফাংশন ভালো বোঝেন।

চোখে কম দেখার অজুহাতে কিংবা মুখে আগের মতো রুচি নেই বলার ছলে মাছের বড় পিসটা সন্তানের প্লেটে দিয়ে দেন। খাবার নষ্ট করতে হয় না -এই ঝাড়ি দিয়ে জোর করে মুরগীর মাংসের বাটির শেষ পিসটা প্লেটের মধ্যে ঢেলে দিবেন। নিজে খাবেন সবজি দিয়ে। এই ছোটখাটো নাটুকেপনা করবেন বড় নির্লিপ্ততায়। যেন জগতের কোনো খাবারে তার আগ্রহ নাই। যেন সবজির চেয়ে মুখরোচক কোনো খাবার এই দুনিয়ায় আর নেই।

হাঁটলে স্বাস্থ্য ভালো থাকে- এই অজুহাতে তিন চার কি.মি হেটে অফিসে যায় কত বাবারা। সকাল বেলা অফিস টাইমে একদিন বের হয়ে দেখি, খাবার বাটি একটা কাঁধে ধরে কিছু মানুষ হনহন করে হেঁটেই চলেছে। অথচ, রাস্তায় কত খালি রিকশা। তারা রিকশায় যাবেন না। হাঁটলে স্বাস্থ্য ভালো থাকে। অথচ, সন্তানকে নিয়ে বের হলে তাকে হাঁটতে দিবেন না একটুও। কাঁধে চড়ে নিয়ে বয়ে বেড়াবেন ছোট বাচ্চাকে। দূরে কোথাও গেলে রিকশা নেবেন। সন্তানকে বসাবেন রিকশার বাম পাশটায়। 

চরিত্রের বাইরে বাবারা বের হয়ে যান না কখনো। বড় ভালো অভিনয় জানেন তারা। বড় ভালো এ অভিনয়…

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close