এরাউন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ডপিংক এন্ড ব্লু

ক্যান্সার নিয়ে যতো ভুল ধারণা!

রোগ-ব্যাধি নিয়ে কুসংস্কার আর ভ্রান্ত ধারণা সব দেশেই কম-বেশি আছে। অজ্ঞ মানুষের সংখ্যা কোন দেশেই কম নয়, বাংলাদেশের মত উন্নয়নশীল বা অনুন্নত দেশে সংখ্যাটা একটু বেশিই। সব রোগ নিয়েই আমাদের বিস্তর জ্ঞান। সেসব জ্ঞানের বেশিরভাগই যে ভ্রান্ত, তা বলাই বাহুল্য। রোগের চিকিৎসা নিয়ে যেমন আমাদের অনেক ভুল ধারণা আর অজ্ঞতা রয়েছে, অনেক রোগের কারণ নিয়েও তেমন অনেকের মাঝে রয়েছে অনেক ভুল ধারণা। যা অনেক সময় ক্ষতির কারণ হতে পারে।

দুরারোগ্য ব্যাধি ক্যান্সারের কারণ নিয়ে মানুষের কিছু ভ্রান্ত ধারণার কথা পড়ছিলাম এক স্বনামধন্য ইংরেজি পত্রিকায়। পড়তে গিয়ে দেখলাম, সেখানে উল্লেখিত ভুল ধারণাগুলো আমাদের দেশেও প্রচলিত। আমাদের দেশেও অনেকের মুখে শুনেছি, প্লাস্টিক বোতল একাধিকবার ব্যবহার এবং মাইক্রোওয়েভ ওভেনের ব্যবহার ক্যান্সারের কারণ হতে পারে। সত্যি বলতে কি, আমিও আর দশজন বিশেষজ্ঞ অজ্ঞ মানুষদের মত, কেন প্লাস্টিক বোতলে পানি খেলে ক্যান্সার হতে পারে এটা না জেনেই, শুনে শুনে খানিকটা বিশ্বাস করেই ফেলেছিলাম, কথাটা সত্যি। প্লাস্টিকের বোতলে পানি খেলে ক্যান্সার হলেও হয়ত হতে পারে! কেন যে হতে পারে সে সম্পর্কে জানা নেই, জানবার ইচ্ছাও নেই। অতো জেনে কি হবে বাপু! তবু এখন যখন জানলাম, আমার মত আর কিছু অজ্ঞ মানুষদেরকে জানানোর চেষ্টা করার ইচ্ছা হলো।

ক্যান্সার বিষয়ক এক ইউরোপিয়ান জার্নালে, ১৩৩০ জন মানুষকে নিয়ে করা এক জরিপের ফলাফলে বলা হয়েছে, বেশিরভাগ মানুষই ধুমপানকে ক্যান্সারের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। যা সঠিক। কিন্তু বেশিরভাগ মানুষই জানে না, কারণটা সঠিকভাবে জানে বলেই ধুমপান ত্যাগ করে খুব সহজেই ক্যান্সার প্রতিরোধ করা সম্ভব।

ক্যান্সার, ক্যান্সারের কারণ, জীবনব্যবস্থা, অভ্যাস

যুক্তরাজ্যের ক্যান্সার রিসার্চ ইন্সস্টিটিউটের তথ্যমতে, ক্যান্সারের প্রতি ১০টি কারণের মধ্যে ৪ টিই প্রতিরোধ করা সম্ভব শুধুমাত্র ‍প্রতিদিনের জীবনব্যবস্থা আর অভ্যাস পরিবর্তনের মাধ্যমে। শুধুমাত্র একারণেই, ক্যান্সারের কারণ সম্পর্কে সকলেরই সঠিক ধারণা থাকা প্রয়োজন।

ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন এবং দ্যা ইউনিভার্সিটি অব লিড’স এর কিছু গবেষক, সেখানকার কিছু মানুষের উপর করা এক সমীক্ষায় দেখেছেন যে ৪০% মানুষই ভুলবশত মানসিক চাপ এবং ফুড অ্যাডিটিভসকে (খাবারের স্বাদ, গন্ধ, বা সৌন্দর্য বাড়াতে এবং খাবার সংরক্ষণে যেসব জিনিস ব্যবহৃত হয়। যেমন- সস, সোডা, বেকিং পাউডার, টেস্টিং সল্ট ইত্যাদি) ক্যান্সারের কারণ হিসেবে মনে করে। আবার সেসব মানুষদের মধ্যে এক তৃতীয়াংশ মানুষই মনে করে, ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ফ্রিকোয়েন্সি এবং জেনেটিক্যালি মডিফাইড খাবার ক্যান্সারের কারণ হতে পারে। আবার ১৯% মানুষ মনে করে মাইক্রোওয়েভ ওভেন এবং ১৫% মানুষের ধারণা প্লাস্টিক বোতল কান্সারের কারণ হতে পারে। যদিও এসব ধারণার পেছনে কোন নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা বা প্রমাণ পাওয়া যায় না।

বেশিরভাগ মানুষই(৮৮%) মনে করে ধুমপান করলে, ধুমপায়ীদের সংস্পর্শে থাকলে এবং সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি দীর্ঘসময় শরীরে পড়লে তা ক্যান্সারের কারণ হতে পারে। এই কারণগুলো সঠিক, বৈজ্ঞানিকভাবে পরীক্ষিত। তাই যারা এই ব্যাপারটা জানে তাদের জন্য ধুমপান ত্যাগ করে ক্যান্সার প্রতিরোধ করা সম্ভব।

ক্যান্সারের ভ্রান্ত কারণগুলোকে বিশ্বাস করলে যে মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত হবে বা তাদের নিয়মমাফিক জীবনযাপন ব্যাহত হবে তা নয়। তবে যদি সঠিক কারণগুলো সবার জানা থাকে তবে মানুষ সেই ক্ষতিকর কারণগুলো এড়িয়ে চলতে এবং সুশৃঙ্খল জীবন-যাপনে মনোযোগী হতে পারবে বলে গবেষকরা মনে করেন।

লিড’স বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সামুয়েল স্মিথ বলেন, বিপুল সংখ্যক মানুষ ক্যান্সারের কারণ সম্পর্কে ভুল ধারণায় বিশ্বাসী যার কোন নির্ভরযোগ্য ভিত্তি নেই। অতীতে যেসব গবেষণা করা হয়েছে, তার তুলনায় বর্তমানের করা গবেষণায় বেশি সংখ্যক মানুষের মধ্যে ক্যান্সারের কারণ নিয়ে ভুল ধারণা দেখা যাচ্ছে যা উদ্বেগজনক। এটা হয়েছে সম্ভবত ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে ভ্রান্ত ধারণা বেশি পরিমাণে এবং সহজে ছড়িয়ে পরার মাধ্যমে। তিনি আরও বলেন, ক্যান্সার সম্পর্কে সার্বজনীন শিক্ষার প্রসার ঘটানোর মাধ্যমে এ সমস্যার প্রতিকার সম্ভব। মানুষের মধ্য থেকে ভুল ধারণা দূর করতে সার্বজনীন এবং সঠিক শিক্ষার প্রসারের বিকল্প নেই।

তথ্যসূত্র- বিবিসি

Comments

Tags

Related Articles