দশ বছর আগে ইজরাইলি সেনাদের রকেট হামলায় পা হারিয়ে পঙ্গু হয়ে পড়েছিলেন। কিন্ত সেই পঙ্গুত্ব তার মনের বিদ্রোহকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। হুইলচেয়ারে বসে তিনি প্রতিবাদ করে গিয়েছেন, সামর্থ্যের সবটুকু শক্তি দিয়ে ঢিল ছুঁড়ে মেরেছেন দখলদার সেনাদের দিকে। সেই ফাদি আবু সালেহ আর নেই। গতকাল ইজরাইলী সৈন্যদের বুলেট চিরতরে নিস্তব্ধ করে দিয়েছে মানুষটাকে। নিভিয়ে দিয়েছে তার জীবনপ্রদীপ।

পশ্চিম তীরের শহর জেনিনে জন্ম হয়েছিল তার। জন্মের পর থেকেই দেখেছেন, তাদের দেশটাকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দিচ্ছে দখলদার ইজরাইলী সেনারা। আর দশজন ফিলিস্তিনি শিশু যেভাবে মনের মধ্যে ইজরায়েলের প্রতি বিদ্বেষ নিয়ে বেড়ে ওঠে, ফাদি আবু সালাহও সেভাবেই বড় হয়েছেন। জীবনের নিশ্চয়তা নেই, মৃত্যুর কোন ঠিকঠিকানা নেই, এমন একটা পরিবেশে বছরের পর বছর ধরে লক্ষ লক্ষ ফিলিস্তিনীর মতো বেঁচে ছিলেন তিনি।

কিশোর বয়স থেকেই দুরন্ত স্বভাব তার। ইজরাইলের সৈন্যদের হাতে একবার গ্রেফতারও হয়েছিলেন। কয়েক বছর জেল খাটার পরে বিশেষ বিবেচনায় মুক্তি পান। মুক্তিকামী হাজারো তরুণের মতো একটাই স্বপ্ন ছিল ফাদি আবু সালেহ’র মনে, তার দেশ থেকে ইজরাইলী আগ্রাসন দূর হবে, স্বাধীন দেশে মুক্তির আনন্দে শ্বাস নেবেন তিনি।

ফাদি আবু সালাহ, হুইলচেয়ারে বসে যুদ্ধ, ইজরাইল, ফিলিস্তিন

আবু সালেহ’র সেই স্বপ্নে বড়সড় ধাক্কা লাগলো ২০০৮ সালে। গাজায় ইজরাইলী সৈন্যদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ মিছিলে অংশ নিতে রাস্তায় বেরিয়েছিলেন সালেহ। সেই মিছিলে রকেট লঞ্চার নিয়ে হামলা চালিয়েছিল ইজরাইলীরা। সালেহ’র ঠিক সামনে বিস্ফোরিত হয়েছিল একটা রকেট। সেখানেই জ্ঞান হারিয়েছিলেন তিনি। তিনদিন পর যখন জ্ঞান ফিরলো, নিজেকে আবিস্কার করলেন হাসপাতালে। জীবন বাঁচাতে ডাক্তার অপারেশন করে কেটে কেটে নিয়েছেন দুটো পা। হাঁটুর সামান্য ওপর থেকে কাটা পড়েছে সেগুলো।

কৈশরেই বিয়ে করেছিলেন তিনি। তার জীবনে যখন এই দুর্যোগটা নেমে এলো, তখন তিনি এক সন্তানের পিতা। সেখানেই থেমে যাওয়ার কথা ছিল আবু সালেহ’র। হয়তো আর পাঁচজন পঙ্গু মানুষের মতো করেই জীবনটা কাটিয়ে দিতেন তিনি, পরিবারের বোঝা হয়ে আছেন ভেবে আত্মগ্লানিতে ভুগতেন মাঝেমধ্যেই। কিন্ত ফাদি আবু সালেহ মানুষটা অন্য ধাতুতে গড়া। তার জীবনের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর অধ্যায়টা শুরু হলো হুইলচেয়ারে বসেই!

ফাদি আবু সালাহ, হুইলচেয়ারে বসে যুদ্ধ, ইজরাইল, ফিলিস্তিন

পঙ্গু একজন মানুষ সমান তালে ছুটছেন সুস্থ-স্বাভাবিকদের মিছিলে, গলা ফাটিয়ে শ্লোগান দিচ্ছেন দখলদার ইজরাইলের বিরুদ্ধে- এমন দৃশ্য বেশ অভাবনীয়। প্রতিবাদ মিছিলে বাড়তি একটা আকর্ষণ ছিল তার উপস্থিতি। তরুণেরা তাকে দেখে উদ্দীপ্ত হতো, এই মানুষটা যদি শরীরের এত প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে মিছিলে আসতে পারে, তাহলে সুস্থ শরীর নিয়ে আমরা কেন পারবো না- এমনটাই ভাবতো তারা। ফিলিস্তিনী তরুণদের কাছে আবু সালাহ ছিলেন আইডল, ছিলেন অনুপ্রেরণার আরেক নাম। আবু সালাহও তরুণদের সঙ্গে কথা বলতেন, তাদের উৎসাহ দিতেন এই বলে- “প্রতিমুহূর্তে আমাদের এই প্রতিরোধ জারি রাখতে হবে। এটা ছাড়া মুক্তির আর কোন উপায় নেই। আমরা থেমে গেলেই ওরা পেয়ে বসবে!”

এরমধ্যে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও উঠে এসেছিলেন সালাহ। হুইলচেয়ারে বসে ইজরাইলি সৈন্যদের লক্ষ্য করে পাথর ছুঁড়ে মারছেন একজন পঙ্গু ফিলিস্তিনি- এমন ছবি দারুণ সাড়া ফেলেছিল মানুষের মধ্যে। যেখানেই ইজরাইলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের আয়োজন হয়েছে, স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে সেখানে ছুটে গেছেন আবু সালাহ। কাঁধে অয়াঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়েছেন। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা কখনও বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি তার পথচলায়। তবে ইজরাইলী সেনাদের ঘাতক বুলেট তার সেই পথচলাটা চিরতরে থামিয়ে দিল গতকাল।

জেরুজালেমকে ইজরাইলের রাজধানী স্বীকৃতি দিয়ে সেখানে মার্কিন দূতাবাস সরিয়ে নেয়ার প্রতিবাদে গত ডিসেম্বর থেকেই আন্দোলন করছিল ফিলিস্তিনীরা। ডিসেম্বরেই পরিবার নিয়ে পশ্চিম তীর থেকে গাজায় চলে এসেছিলেন ফাদি আবু সালাহ। তাঁবু খাটিয়ে বসবাস করছিলেন এখানে। এরমধ্যে গতকাল ছিল নাকবা দিবস। ১৯৪৮ সালের ১৫ই মে প্রায় সাড়ে সাত লক্ষ ফিলিস্তিনীকে উচ্ছেদ করে তাদের ঘরবাড়ী দখল করেছিল ইজরাইল। গত সত্তর বছর ধরেই এই দিনটাতে বিক্ষোভ পালন করছে ফিলিস্তিনীরা। গতকালও প্রায় পঞ্চাশ হাজার ফিলিস্তিনী জড়ো হয়েছিলেন একসঙ্গে, শ্লোগান দিচ্ছিলেন ইজরাইলী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে।

ফাদি আবু সালাহ, হুইলচেয়ারে বসে যুদ্ধ, ইজরাইল, ফিলিস্তিন

সকাল থেকেই বিক্ষোভের একদম সামনের দিকে ছিলেন আবু সালাহ। দুপুর নাগাদ শান্তিপূর্ণ এই প্রতিবাদ লক্ষ্য করে হঠাৎই গুলি চালানো শুরু করে ইজরাইলী সৈন্যরা। প্রাণ বাঁচাতে দিগ্বিদিক ছুটতে শুরু করেন সবাই। কেউ কেউ প্রতিরোধও করার চেষ্টা করেছিলেন। সালাহও সএইএই অকুতোভয় মানুষগুলোর একজন। হাতের গুলতি নিয়ে বুলেটের জবাবে ঢিল ছুঁড়ে প্রতিহত করার ব্যর্থ চেষ্টা করেছিলেন। দুপুরের খানিক পরেই তার নিহত হবার সংবাদ আসে। ইজরাইলী সৈন্যদের এই বর্বর হামলায় গতকাল প্রায় ষাট ফিলিস্তিনী নিহত হয়েছেন, তাদের একজন ফাদি আবু সালাহ। আটজন শিশু মারা গেছে গতকাল, যাদের বয়স পনেরোর কম। এদের মধ্যে একটা মেয়ে শুধু কাঁদানে গ্যাসের তীব্রতায় শ্বাস নিতে না পেরেই প্রাণ হারিয়েছে!

ফাদি আবু সালাহ, হুইলচেয়ারে বসে যুদ্ধ, ইজরাইল, ফিলিস্তিন

গত দশ বছর ধরে যে হুইলচেয়ারটা তার নিত্যসঙ্গী ছিল, সেটা ভেঙে পড়েছিল সালাহ’র নিথর দেহের পাশেই। সেই চেয়ারে আবু সালাহ আর কোনদিন বসবেন না। প্রতিবাদ মিছিলে ছুটে যেতে দেখা যাবে না তাকে। তার মৃতদেহকে ঘিরে কান্নায় ভেঙে পড়া শত শত মানুষের ভালোবাসাই বুঝিয়ে দেয়, আবু সালাহ তাদের কাছে কি ছিলেন। বুলেট হয়তো মৃত্যু ডেকে আনতে পারে, থামিয়ে দিতে পারে কণ্ঠস্বর, কিন্ত চেতনার অগ্নিস্ফুলিঙ্গকে কি দাবিয়ে রাখা সম্ভব? সালাহ’র ছোঁড়া গুলতির ইট-পাকেলগুলোই একদিন হয়তো বুলেট হয়ে ছুটে যাবে ইজরাইলী সৈন্যদের দিকে। কোথাও না থেকেও ফাদি আবু সালাহ বেঁচে থাকবেন লাখো মুক্তিকামী ফিলিস্তিনীর অন্তরে, সাহসী প্রতিবাদের এক উজ্জ্বল নিদর্শন হয়ে।

Comments
Spread the love