শফিক তুহিন নামের এক গীতিকারের গাওয়া একটা গান একসময় খুব জনপ্রিয় হল। গানের নাম “এর বেশি ভালোবাসা যায় না।” নতুন আসা হিট গানের নিয়ম অনুযায়ী শহরের ছেলে- মেয়েদের মাঝে গানটা খুব সাড়া ফেলল। সবার ফোনের কলার টিউন হিশেবে সেট হল সেটা। উঠতি বয়সের, মানে তখন আমাদের বয়সের ম্যাক্সিমাম ছেলে মেয়েদের ফোন কল দিলেই বাজতো, “ভালোবাসি বড় ভালোবাসি, এর বেশি ভালোবাসা যায় না। ও আমার প্রাণপাখি ময়না।”

বেশ কিছুদিন পর সেই গান ছড়িয়ে পড়লো পুরো বাংলাদেশে। লোয়ার ক্লাসের কাছে পৌঁছে যাওয়ার পর থেকে আগের শ্রোতারা সেই গান ছুড়ে ফেলে দিল। তারা আর শুনলো না সেই গান।

মোটামুটি এটাই বাংলাদেশি ট্রেডিশন। যে কোন কিছু শহরের নাগরিকরা এখানে আগে পায়। তারপর সেটা পুরো দেশের অলিতে গলিতে ছড়িয়ে যায়। ততদিনে শহরে নতুন কিছু চলে আসে। আগের জিনিশটা তাদের কাছে ইউজলেস হয়ে যায়।

এটা মোটেও শহরকে আলাদা কিছু বোঝানোর জন্য বলা হচ্ছে না। মোটামুটি রিয়েলিটি এটা। ধানমন্ডিতে থাকা মানুষজন ঢাকা থেকে ৫০০ কিলোমিটার দূরে কোনো গ্রামে থাকা কারও চেয়ে বেশি আপডেটেড হবে এটা কি স্বাভাবিক নয়?

তবে এই দূরত্ব কমাচ্ছে প্রযুক্তি। তবুও কিছু ব্যাপার থেকেই যায়। শিক্ষিত জেনারেশনে কাছ থেকে ঘুরে ফিরে অশিক্ষিত জেনারেশনের কাছে গিয়ে সেসব ইউজলেস হয়ে যায়।

ফেসবুকটাও ঠিক সেই পথে হাঁটছে।

গুটিকয়েক মানুষের কীবোর্ড ধরে বাংলাদেশে ফেসবুকিং শুরু হয়। শুরুর দিকের দুই তিন বছর পর্যন্ত তারা অন্য কারো আইডি থেকে নিজের নাম লিখে সার্চ দিলে প্রথম সাজেশনেই সরাসরি নিজের আইডি পেয়ে যেত। ইউজার কম ছিল তাই এমনটা হত। এটা আহামরি কিছু না।

সেই সময়টার ফেসবুককে শুধুই ফেসবুক বলে ডাকা হত। এফবি, ফেবু এসব না। আর ফেসবুক চালানো, ইউজ করা, সার্ফিং এসবের বাইরে একটা ওয়ার্ড ছিলো। ফেসবুক চালানোকে তখন বলা হত ফেসবুকে বসা।

তারপর দিনদিন বাড়লো ইউজারের সংখ্যা। ডেক্সটপ ভার্সন থেকে এম ডট ভার্সনে আসলো ফেসবুক। সিম্বিয়ান আর জাভার অপেরা মিনির ফেসবুকে তখনও একটা ক্লাসিফাইড গোষ্ঠী ছিল ফেসবুকের গ্রাহক। কিংবা এন্ড্রয়েডের প্রথম দিকে।

তখনও ফেসবুকটা সামাজিক মাধ্যম হিসেবেই মনে হত। অতটা অসামাজিক কিছু ফেস করতে হত না। মেয়েদের আদার মেসেজ বক্স ওয়াজ মোর ক্লিন দ্যাট টাইমস।

তারপর ফ্রি ডট ফেসবুকের সময়ে এসে দুই টাকায় ইন্টারনেট কেনা জেনারেশনের হাতে ফেসবুক চলে যাওয়ায় পর ফেসবুকটা খুব পুওর হয়ে গেলো পুরোপুরি।

আজকাল এই নীল শাদার দুনিয়াটা খুব অসামাজিক লাগে। তৃতীয় শ্রেণিই এখন ফেসবুকের সবচেয়ে বড় গ্রাহক। যে কোন পাবলিক ফিগারের আইডি/ পেজের কমেন্ট বক্স খুললেই এদেরকে দেখা যায়। কমেন্টের অবস্থা দেখলে বমি বমি ভাব হয়। সুস্থ মাথায় সেখানে ঢোকা গেলেও, সুস্থ মাথা নিয়ে ফিরে আসা যায় না।

অপেরা মিনির একটা ট্যাব দিয়ে চটি পড়া আর অন্যটা দিয়ে ফেসবুক চালানো এই জেনারেশনের প্রধান কাজ মূলত ফেসবুকে ধর্ম প্রচার করা, ধর্ম এদের প্রধান হাতিয়ার। তাদের টাইমলাইন ঘুরলে দেখবেন, একটা ধর্মীয় পোস্ট শেয়ার করা, আরও স্ক্রল করলে দেখবেন, ফেইক প্রোফাইলের মেয়েদের ছবি শেয়ার করলে ইমো নাম্বার দেবে এমন পোস্ট শেয়ার করা।

এই ক্লাসিফাইড গোষ্ঠীই সবাইকে নাস্তিক ট্যাগ দিয়ে বেড়ায়। হেটস্পিচ ছড়ায়। উত্তেজনা ছড়ায়।
তাদের আরও একটা অন্যতম দায়িত্ব হল সাকিবের বউ কে পর্দা করানো আর ইন্টারন্যাশনাল পেজগুলোতে ইন্ডিয়ার সাথে কমেন্টের যুদ্ধ করা। কদিন আগে রুবেল হোসেন তার স্ত্রীকে নিয়ে ছবি আপলোড দিলে তারা সেখানে সবান্ধব ঝাঁপিয়ে পড়ে হ্যাপী হ্যাপী শুরু করেছিলো।

এরা নামাজ পড়বে না, মসজিদে যাবে না, মানুষের উপকার করবে না, মানুষকে ভালোবাসবে না, কারও প্রতি কোন মায়া দেখাবে না। কিন্তু কমেন্টে আমিন লিখে বেহেশতে যাওয়ার স্বপ্ন দেখবে।

ফেসবুক, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ফেসবুকে ধর্মপ্রচার

মূলত রেডিওমুন্নার মত কিছু পেজের মাধ্যমেই তাদের ফেসবুকের যাত্রা শুরু হয়। তারপর তারা ফেসবুকের অলিগলি ঘুরে সব জায়গায় চলে এসেছে।

এখন আবার ইন্টারনেট বেশি এভেইলেবল হওয়ায় তারা ভিডিও ফরম্যাটেও এসব শুরু করেছে। ইউটিউবে ইসলামিক নাম দিয়ে খোলা চ্যানেলে গিয়ে দেখুন, ভিডিওর ক্যাপশন হল, “পরীমণির নোংরামি দেখুন” কিংবা আরও চিপ কিছু।

তারা ইউটিউব থেকে বিভিন্ন ওয়াজের ভিডিও নিয়ে ফেসবুকে শেয়ার দিয়ে ভাইরাল করে। একদিন এক ওয়াজে জনৈক হুজুর বলতেছে, “জাহান্নাম মানে নারী নারী নারী। আর জান্নাত মানে অনেক পুরুষ আর অল্পকিছু নারী…”

এসব কি হেট স্পিচ না? মানুষের সম্মান নষ্ট করা না?

সেদিন একটা সিল বানাতে এক দোকানে গেছি। দোকানদার হুজুর মানুষ। ডেক্সটপে ওয়াজ ছেড়ে রাখছে। ওয়াজে হুজুর বলতেছে, “আজকাল আমাদের বাসাবাড়ি খুব ছোটখাটো। আবার সেখানে এমন সিস্টেম, মানুষজনের যাওয়া কষ্টের। কেউ আর আগেরমত আত্মীয় স্বজন পছন্দ করে না। অথচ আমাদের বাড়ি হওয়ার কথা ছিলো বড়সড়। অন্তত একটা ঘর সেখানে থাকতে হবে খুব বড়। বাইরে থেকে আত্মীয়রা আসবে, বন্ধুবান্ধব আসবে, হিন্দুরা আসবে। সেখানে বসে খানাদানা খাবে। এভাবেই সমাজের ভ্রাতৃত্যবোধ বজায় থাকবে।”

সেই লোকটাও তো হুজুর তাই না? আফসোস! এমন করে ওয়াজ করতেই বা পারে কয়জনে।

ফেসবুকে ফিরে আসি, ডেক্সটপের সময়টা বাদ দিলাম। এম ডটের সময়েও জাভা, সিম্বিয়ান দিয়ে ফেসবুকিং করার সময়ও গ্রামে গেলে যাদেরকে দেখতাম চায়না মোবাইল দিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে গান বাজাতে, ফ্রি ডটের সময়ের এসে ছয় মাস আগে ফেসবুক চেনা তাদের একজন সেদিন আমাকে মেসেজ পাঠিয়েছে, “ভাই ইসলামিক টপিক নিয়া লেখালেখি করলে ভালো হয়।”

এই ইউজাররা পঁচা শামুকের মত। কিছু শিক্ষিত শ্রেণির ফেসবুকাররা সেই পঁচা শামুকে পা কাটতেছে। তাদের মধ্যে ধর্মীয় বিষ ঢুকে যাচ্ছে। শিক্ষা- মাথা- বুদ্ধি দিয়ে চিন্তা করা তারা ভুলে যাচ্ছে।

যে পথে যাচ্ছে বাংলাদেশের ফেসবুক তাতে হয়ত আর কিছুদিন পরই এখানে আর আসতে ইচ্ছা করবে না।

অলটারনেটিভ নাই বলেই এখনো ফেসবুকে আসতে হয়। কিংবা কোনো কাজে, কোনো দরকারে। অন্য অপশন হয়ত আছে, সেখানে আরাম পাওয়া যায় না। ফেসবুকটা আমাদের জন্য ফ্লেক্সিবল। এক জায়গায় সবকিছু টাইপ।

যেসব বন্ধুদের সাথে ফেসবুকিং শুরু করেছিলাম তারা এখন ফেসবুক ছেড়ে ইনস্টাগ্রাম ধরেছে। তবুও কোন এক অজানা টানে তাদেরকে ফেসবুকে ফিরে আসতে হয়। অনেক বছরের অভ্যাস চাইলেই হয়ত ছাড়া যায় না।

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-