ফেসবুক আসার আগেও পৃথিবীর লোকে বই পড়তো, গান শুনতো, সিনেমা দেখতো, বেড়াতে যেতো, ছবি তুলতো, ভিডিও করতো। ফেসবুক আসার আগেও তারা প্রেম করতো, বিয়ে করতো, বর নিয়ে বৌ নিয়ে ঘুরতে যেতো দেশে বা বিদেশে। ফেসবুক আসার আগেও তাদের মন খারাপ হতো।

কিন্তু তখন তাদের একটা ব্যক্তিগত জীবন ছিলো, যা প্রকৃতপক্ষেই ব্যক্তিগত ছিলো, যার গণ্ডিটা আসলেই খুব ছোটো ছিলো। কিন্তু সেই ছোটো গণ্ডিটা ভীষণ সুখকর ছিলো। মানুষের অনেকটুকুই সামাজিক, কিন্তু সবকিছু নয়, সবকিছু সামাজিক করে তুলতে চাওয়ার পরিণাম ভয়াবহ।

ফেসবুক সেটাই করছে, সবকিছুকে সামাজিক করে তুলছে।

আজকে যখন আপনি একটা বই পড়ছেন, কোন লাইনটা কোট করে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেবেন, সে-চিন্তায় আপনি অস্থির হচ্ছেন। কোথাও একটা গান শুনে পছন্দ হলো, সোজা ইউটিউবে চলে যাচ্ছেন, ভিডিও থাকলে লিংক ফেসবুকে শেয়ার করবেন বলে। প্রেম করছেন, বিয়ে করছেন, কুয়াকাটা কক্সবাজার কলম্বো কুয়ালালামপুর ঘুরতে যাচ্ছেন যখন; মাথায় সবসময় এই চিন্তাটা থাকছে; ফেসবুকে দেয়ার জন্য কিছু ছবি তুলতে হবে ও/বা ভিডিও করতে হবে।

বিষয়টা নিছক লাইক বা শেয়ারের লোভ না। ধরা যাক অনেকের মধ্যেই সেই লোভ নেই। বিষয়টা হচ্ছে জীবনের সবকিছু সামাজিক করে তোলার, আপনার জীবনে প্রাইভেসি বলে আর কিছু নাই, এর পুরোটাই পাবলিক।

দ্য সার্কেল নামে একটা অস্বস্তিকর টেকনো-থ্রিলার আছে, এম্মা ওয়াটসন অভিনীত, সেখানে এই দর্শনের এক্সট্রিম রূপ দেখানো হয়েছে। তথাকথিত সোশ্যাল মিডিয়া ব্যক্তিকে কীভাবে গ্রাস করে, তা অনুভব করতে চাইলে দেখতে পারেন। এটি একটি উপন্যাস থেকে নির্মাণ করা চলচ্চিত্র, গুগল করে দেখলাম, মার্গারেট অ্যাটউড উপন্যাসটির একটি দুর্দান্ত রিভিউ লিখেছেন।

সে-রিভিউর শেষ লাইনটা কোট করছি, যা থেকে ফেসবুকের মৌলিক সমস্যাটা বোঝা যাবেঃ “To live entirely in public is a form of solitary confinement.”

ভেবে দেখেন কী ভয়ংকর একটা কথা এটা! ফেসবুক আপনাকে একটা নির্জন কারাবাসে প্রলুব্ধ করছে, আগুন দেখে ছুটে যাওয়া মাছির মতো, আপনি ফেসবুকে ঢুকে যাচ্ছেন। এই মুখর জনারণ্যে মানুষের কোনো অভাব নেই, সময়ও হয়তো কেটে যাবে, কিন্তু ঠিকই একা একা লাগবে আপনার।

বলে রাখি, আমি কোনো স্বর্ণযুগে বিশ্বাসী নই, আমি আধুনিকতা আর প্রগতিকে ইতিবাচকভাবেই দেখি। ইন্টারনেটকে ভালোবাসি আমি। গুগল আধুনিক বাটি, যা চালান দিয়ে যে-কোনো তথ্য নিয়ে আসতে পারছেন আপনার ডিভাইসটিতে, এককালে যা অকল্পনীয় ছিলো। উইকিপিডিয়া সারা দুনিয়ার জ্ঞান হাতের মুঠোয় এনেছে। গান শুনতে আর সিডি না কিনলেও হচ্ছে, পেয়ে যাচ্ছেন ইউটিউবেই, অনেক সিনেমাও তো এখন সেখানেই দেখা যাচ্ছে। আমি বাংলাদেশে বসে ফিউচারলার্নের মাধ্যমে নরওয়ের ইউনিভার্সিটি অফ অসলোর উন্নয়নসংক্রান্ত কোর্স করতে পারছি, যে-কোর্সের ফ্যাকাল্টিদের মধ্যে আছেন আবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা আর স্টিফেন কার্সনার। বহু মানুষ অনলাইনেই কেনাকাটা করছেন, ই-মেইল ছাড়া আধুনিক যোগাযোগ কল্পনা করাও কঠিন, আমার অফিসে অন্য রুমে বসা আমার সিনিয়রও প্রয়োজনে কল না করে ল্যানেই আমাকে ডেকে নেন।

কিন্তু ফেসবুকের চরিত্র অনেককিছুর চেয়েই বেশ আলাদা। শুরুর দিকে ফেসবুক অবশ্য বেশ নিরীহ ছিলো। গন্ডিটা ছিলো ছোট। কিন্তু সময়ের সাথে ফেসবুকের হাঁ বড়ো হয়েছে। সেই হাঁয়ের ভেতরে আপনার জীবন ঢুকে গেছে। এখন আপনি এখান থেকে বেরোতে পারেন না। ফেসবুকবিরোধী পোস্টও আপনাকে ফেসবুকে এসেই দিতে হয়, কারণ ফেসবুকবিরোধীরা ফেসবুকেই থাকে, অন্যত্র নয়।

কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা ফাইলস ফেসবুককে তোপের মুখে ফেলেছে। অনেকেই বলছেন ফেসবুক রাজনৈতিক ম্যানিপুলেশনের কাজে আসছে। আমি সম্পূর্ণরূপে একমত।

কিন্তু এটাকে ফেসবুকের মৌলিক সমস্যা ভাবছি না। আপনি যদি বলিউডের রাজনীতি সিনেমাটি দেখে থাকেন, তাহলে দেখবেন, পলিটিকাল ম্যানিপুলেশন আগেও ছিলো। ওটার জন্য মাধ্যমকে দায়ী করা যায় না।

আমি মনে করি, ফেসবুকের মৌলিক সমস্যা তা মানুষের প্রাইভেসির বিরোধী, মানুষের সবকিছুকে সে সামাজিক করে তোলায় সচেষ্ট। ফলে কেউ কেউ যে ভাবেন, ফেসবুক মানুষকে অসামাজিক করে তুলছে, এই ভাবনাটা ভুল। ফেসবুক মানুষকে সীমার বাইরে সামাজিক করে তুলছে, ব্যক্তিগত বলে আর কিছুই রাখছে না।

কমিউনিটারিয়ানরা অবশ্য এটাকে সমস্যা হিসেবে দেখবেন না। তারা খুশীই হবেন। তাঁদের কাছে যেহেতু ব্যক্তির কোনো মূল্য নাই, কমিউনিটিই মূল কথা, আর ফেসবুক তো দুনিয়ার সবচে বড়ো কমিউনিটি। কিন্তু আমি এই কমিউনিটারিয়ান জীবনদর্শনকে ভয় পাই। একজন জীবনানন্দকে আমরা এই দর্শনে পেতাম না। বা একজন সক্রেটিসকে।

অবশ্যই আমি সমাজবিরোধী কট্টর ব্যক্তিস্বাধীনতায় বিশ্বাসী না। মানুষ সামাজিক প্রাণী। সমাজ ছাড়া মানুষ বেঁচে থাকতে পারবে না। সমাজের প্রয়োজন আছে। কিন্তু মানুষের সবকিছু সামাজিক করে তোলা ভয়াবহ। জার্মানিতে নাজিরা এই মারাত্মক প্রকল্প হাতে নিয়েছিলো। মানুষকে এর জন্য অপরিমেয় মূল্য দিতে হয়েছে।

আমি অবশ্যই মার্ক জুকারবার্গকে এডলফ হিটলারের সাথে তুলনা করছি না, সে-তুলনা হাস্যকর হবে, জুকারবার্গ কোনো দানব নন। কিন্তু আমার মনে হয়, তিনি এমন এক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছেন, যা ব্যক্তির প্রাইভেসির পরিপন্থী ও দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর। আমরা এই কাল্পনিক কমিউনিটিতে আর কতোদিন থাকবো, সিরিয়াসলি সেই চিন্তা করার সময় এসেছে।

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-