রাফিয়া তামান্না

ঈশ্বর। তিন অক্ষরের এই শব্দটি উচ্চারণ করলেই আমাদের মানসপটে ভেসে ওঠে এক অসীম শক্তিময় সত্ত্বার ছবি, যিনি প্রত্যেক ধর্ম এবং মতবাদে বিশ্বাসী মানুষের আধ্যাত্নিক জীবনাচরণ এবং চিন্তাধারার সাথে জড়িয়ে রয়েছেন ওতপ্রোতভাবে।

ঈশ্বর কে? এই প্রশ্নের উত্তরে বলতে হয় ঈশ্বর হলেন এমন একটি সত্ত্বা, যিনি জাগতিক ক্ষমতার সর্বোচ্চ কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছেন। তিনিই মহাবিশ্বের জীব ও জড় সমস্ত কিছুর সৃষ্টিকর্তা ও নিয়ন্ত্রক। আদিম এবং মধ্যযুগীয় সমাজ কাঠামোয় ঈশ্বরের অস্তিত্বকে একপ্রকার নির্দ্বিধায় স্বীকার এবং মেনে নেয়া হলেও, রেনেসাঁর পরবর্তী সময়ে আবিষ্কৃত বিভিন্ন অধিবিদ্যাগত মতবাদ এবং অনুকল্পগুলো ইশ্বরেরর অস্তিত্ত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ এবং ক্ষেত্রবিশেষে অস্বীকারও করেছে। স্টিফেন ল’ এর ‘ইভিল গড চ্যালেঞ্জ‘ নামক থট এক্সপেরিমেন্ট তন্মধ্যে অন্যতম।

ইভিল গড চ্যালেঞ্জ”- স্টিফেন ল’ র ঈশ্বরবিশ্বাস প্রসঙ্গিত চিন্তার পরীক্ষা

চিন্তার পরীক্ষা বা ‘thought experiment’ এমন একটি বিষয়, যেটি বৈজ্ঞানিকভাবে পরীক্ষাগারে করা কোনো পরীক্ষা নয়, যে পরীক্ষা করা হয় চিন্তার মাধ্যমে, যুক্তির বিপরীতে যুক্তি দাঁড় করিয়ে, সেসব প্রশ্ন এবং যুক্তির উত্তর দেওয়ার মাধ্যমেই চলে এই পরীক্ষা। ঠিক তেমন-ই একটি পরীক্ষা হলো স্টিফেন ল’ এর “ইভিল গড চ্যালেঞ্জ”।

কে ছিলেন স্টিফেন ল’?

স্টিফেন ল মূলত একজন বৃটিশ দার্শনিক, তাত্ত্বিকের জন্ম এবং বেড়ে ওঠা ইংল্যান্ডের ক্যাম্ব্রিজ শহরে। এ লেভেলের জন্য ক্যম্ব্রিজের ‘লং রোড সিক্সথ ফর্ম কলেজ’-এ যোগ দিলেও তিনি ‘এ’ লেভেল সম্পন্ন করতে পারেননি। যদিও ‘এ’ লেভেল সম্পন্ন না করা সত্ত্বেও তিনি ২৪ বছর বয়সে লন্ডনের সিটি ইউনিভার্সিটিতে ‘দর্শনশাস্ত্রে’ ব্যাচেলর অফ সাইন্স ডিগ্রী লাভের সুযোগ পান। সিটি  ইউনিভার্সিটি থেকে তিনি প্রথম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হন এবং অক্সফোর্ডের ‘ট্রিনিটি কলেজ’ হতে ব্যাচেলর ইন ফিলোসফি ড্রিগ্রী অর্জন করেন। সবশেষে তিনি ‘দ্য কুইন’স কলেজ’ থেকে ‘দর্শনশাস্ত্রে’ ডক্টরেট ডিগ্রী লাভ করেন।

স্টিফেন ল’ ‘রয়্যাল ইন্সটিটিউট অফ ফিলসফি’ এর স্পন্সরকৃত ‘ক্যাম্ব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস’ এর প্রকাশিত ‘Think’ জার্নালের সম্পাদক হিসেবে কাজ করেছেন। তার রচনাসমূহের মধ্যে বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য বিখ্যাত কিছু কীর্তি  হলো, “The Philosophy Gym”, “The Complete Philosophy files” , “Humanism: A Very Short Introduction”, The War for children’s minds”, “Really, Really Big questions” ইত্যাদি।

স্বীকার্য, পটভূমি এবং ভিত্তি :

প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ ঈশ্বর আছেন কি নেই, এই প্রশ্নে দুই ভাগে বিভক্ত। ঈশ্বরে বিশ্বাসীরা আবার ঈশ্বরের আকার ,আদেশ-নির্দেশ ইত্যাদি নিয়ে নানা ভাগে ভাগে বিভক্ত, যার ফল স্বরূপ গড়ে উঠেছে নানা ধর্ম এবং মতবাদ।

কিন্তু আলোচ্য ‘ইভিল গড চ্যালেঞ্জ’ শুধুমাত্র ঈশ্বরে বিশ্বাসী এবং অবিশ্বাসী এই দুই ধরনের মানুষের যুক্তি ও চিন্তাগুলো মোটা দাগে পার্থক্য করে দেয় এবং একটি যৌক্তিক সমাধানের দিকে পৌছাবার চেষ্টা করে।

দ্য প্রবলেমস অব ইভল:

যারা ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন তাদের মতে, ঈশ্বর মানুষকে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন তার আনুগত্য করার জন্য, সৎ কর্ম করার জন্য, সৎ পথে থেকে পৃথিবীকে শান্তির স্থান হিসেবে গড়ে তোলার জন্য। তাই ঈশ্বর বিশ্বাসীদের কাছে ঈশ্বরের ধারণা ইতিবাচক এবং বিশুদ্ধ। এই চিন্তার পরীক্ষায় ঈশ্বরে অবিশ্বাসীদের প্রথম প্রশ্ন এখানেই। তাদের প্রশ্ন হলো, ঈশ্বর যদি এতোটা সর্বশক্তিমান এবং ইতিবাচক হয়ে থাকেন, তাহলে তার সৃষ্ট এই পৃথিবীতে বর্তমানে কেনো এতো অন্যায়, খুন , ধর্ষণ , যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ?

অবিশ্বাসীদের উথাপিত এই প্রশ্নটিকে “দ্যা প্রবলেমস অব ইভল” নামক অনুকল্পে আখ্যায়িত করা যায়। ঈশ্বরে অবিশ্বাসীদের এই প্রশ্নের সদুত্তর দিতেই বিশ্বাসীরা দাড় করান ফ্রি উইল বা “স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি” মতবাদ।

ফ্রি উইল মতবাদ:

ফ্রি উইল মতবাদ বলে ঈশ্বর যদি আমাদেরকে তার নিয়ন্ত্রণেই আবদ্ধ করে রাখতেন, তাহলে আমরা যে কাজগুলো করি বা করছি, তার জন্য আমাদেরকে কোনো ভাবে দায়ী করা যায় না। এটা অনেকটা পাপেট খেলার মতো, যেখানে পাপেট যা করে তার কোনোটিই স্বেচ্ছায় নয় বরং পাপেট মাস্টারের ইচ্ছাধীন। ফ্রি উইল মতবাদ আরো বলে, যদি এমন হয়, তাহলে আমরা যে কার্যকলাপগুলো করছি, তার জন্য আমরা নয়, প্রকারান্তরে ঈশ্বরই দায়ী সাব্যস্ত হন। এতে করে পাপ-পূণ্যের ভিত্তিতে আমাদের পুরস্কৃত বা তিরস্কৃত করবার ঈশ্বরে যে উদ্দেশ্য, সেটি একপ্রকার ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে।

তাই ঈশ্বর প্রত্যেকটি মানুষকে স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি এবং বিবেক প্রদান করেছেন, যার মাধ্যমে সে নিজেই কোনটি ঠিক, আর কোনটি ভুল তা বুঝে কাজ করতে সক্ষম হয়। মানুষকে কোনো ধরণের “পাপেট” বানিয়ে নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী তিনি পরিচালিত করতে চাননি। কেননা তাহলে সেই কাজ ঈশ্বরের কাজ হয়ে যাবে। তাই মানুষ-কে স্বাধীন চিন্তাশক্তি দেওয়া হয়েছে।

কিন্তু মানুষ যে সবসময় এই স্বাধীনতার ইতিবাচকতা কাজে লাগিয়েছেন ব্যাপারটি তা নয়। বরং আত্মবিস্মৃত হয়ে পাপ-পংকিলতার সাগরে ডুব দিয়ে বারংবার। যার ফলে আজ এই পৃথিবীতে এতো অনাচার। মূলত এই অপব্যবহারগুলো মানুষকে চিন্তার স্বাধীনতা দেয়ার ক্ষতিপূরণ ছাড়া আর কিছুই নয়। কিন্তু ঈশ্বর এই অনাচার গুলোকে একপ্রকার বৈধতা দিচ্ছেন, যাতে করে বৃহত্তর ভিত্তিতে ইতিবাচকতার উন্মেষ ঘটতে পারে।

ইভিল গড চ্যালেঞ্জ পরীক্ষার বিশ্লেষণ:

ঈশ্বরে বিশ্বাসীদের দেওয়া এই যুক্তি অনুসারেই, স্টিফেন ল’ বিপরীত চিত্র অঙ্কন করে, তাদের দেওয়া যুক্তি দিয়েই প্রশ্ন করে তার পরীক্ষা এগিয়ে নিয়েছেন।

তার বর্ণিত বিপরীত চিত্র এরকম- তিনি প্রশ্ন করে বলেছেন, বর্তমান পৃথিবী এতোটা অন্যায়ে জর্জরিত কেন, এমন ও তো হতে পারে তাহলে, পৃথিবী সৃষ্টিকারী ঈশ্বরের সত্ত্বা নেতিবাচক। এই নেতিবাচক ঈশ্বর চান পৃথিবীতে খারাপ কাজ হোক, অন্যায়ের রাজত্ব চালু থাকুক। এক্ষেত্রে ও ঈশ্বর হয়তো চাননি মানুষকে ‘পাপেট’ বানিয়ে নিজের ইচ্ছায় কাজ করাতে। তাই তিনি মানুষকে স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি দিয়েছেন, যার ফলে অনেকেই খারাপ কাজ করলেও কেউ ভালো কাজ ও করে, এটিই ইচ্ছাশক্তি দেওয়ার ক্ষতিপূরণ।

এই ‘নেতিবাচক ইশ্বর’ এর বিপরীত চিত্রকে ঈশ্বর বিশ্বাসীরা নাকচ করে দেয়, তখনই স্টিফেন ল’ বলেন, ঠিক একইভাবেই ‘ইতিবাচক ঈশ্বর’ এর ধারনাকেও নাকচ করে দেয়া যায়। এভাবে দুইটি ধারণাই পরস্পরকে প্রশমিত করে দেয়। যার ফলে স্টিফেন ল এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে এই মহাবিশ্বে ঈশ্বরের কোনো অস্তিত্ব নেই। এটি স্টিফেন ল’ দ্বারা প্রদত্ত চিন্তার পরীক্ষা। এটি কোনো সংজ্ঞায়ন নয়, ইশ্বরের অস্তিত্ব-অনস্তিত্বের ব্যাপারে অভিমত প্রদান নয়। এমনকি এটি কোনো বৈজ্ঞানিক যুক্তিলব্ধ কোনো সমাধানও নয়। নিছক-ই পাল্টাপাল্টি যুক্তির মাধ্যমে একটা সিদ্ধান্তের দিকে এগিয়ে যাওয়ার চিন্তাভিত্তিক পরীক্ষা।

তথ্যসূত্র :

  • Stephen Cahn, Cacodaemony, Analysis 37 (1976).
  • New, Christopher (June 1993). “Antitheism – A Reflection”. Ratio. 6 (1): 36–43.
  • Edward Stein, American Philosophical Quarterly, Vol. 27, No. 2 (Apr., 1990), pp. 163-167,
  • Daniels, Charles B. (1997). “God, demon, good, evil”, The Journal of Value Inquiry, Vol. 31 (2), June, pp.177–181.
  • Smith, Kelly (2014). “Manifest complexity: A foundational ethic for astrobiology?”. Space Policy. 30 (4): 209–214.

 

 

 

Comments
Spread the love