সিনেমা হলের গলি

কলকাতার এসকে মুভিজ আমাদের সিনেমার জন্য কতটা ক্ষতিকর?

এস রাব্বি

সময়ের সবচেয়ে আলোচিত খবরটি হলো বাংলাদেশি সিনেমা ডিরেক্ট প্রযোজনায় নামলো Eskay Movies। Eskay Movies- সম্পর্কে টুকটাক সবাই জানেন; কোন কোন সিনেমা বানিয়ে তারা বিখ্যাত(?!) এখন পর্যন্ত না জানা থাকলেও একবার গুগল করতে পারেন। আমি সেদিকে যাবো না; খবর হলো Eskay Movies বাংলাদেশী সিনেমায় লগ্নি করতে তৈরি প্রায়; অবকাঠামোগত সকল প্রস্তুতিও শেষ। খবরটা যেমন বেশ রোমাঞ্চকর, সেই সাথে বিব্রতকরও বটে। Eskay Movies এর ইতিহাস ভালো না; গড়ে তামিল-তেলেগু মুভির রিমেকে রিমেকে এ পর্যন্ত ক্যারিয়ারগ্রাফ তাদের। আর্টের জায়গা নিয়ে তাদের এত সস্তা স্ট্রাটেজি পুরো এশিয়াতে দেখাতে পারবেন না। মাসালা সিনেমার ভিড়ে হাতে গোণা যা কয়টা হিট ছবি। এটাও আলোচ্য বিষয় না। Eskay Movies-এর আগমনে আসলে কতটা প্রভাব পড়বে আমাদের নিজস্ব সিনেমার উপর।

একটা বিষয় ক্লিয়ার করে নেই এইখানে; ইতোমধ্যে অনেকেই জানেন Eskay Movies আপাতত শাপলা মিডিয়ার অফিসটা ব্যবহার করছে(?!)। এইটা হলো স্থাবর পরিচয়; স্থাবর পরিচয় নিতে দেশের সরকারকে অবগত করতে হয়; ভ্যাট/ট্যাক্স ঠিক থাকতে হয়; অফিসিয়াল কাঠামো ঠিক থাকতে হয়। এরপর অনুমতি মিলে আপনি কি বিষয়ে কাজ করতে চান এই দেশে; এতগুলো জটিলতা পার করা গেলে তবে অাপনি আপনার কনটেন্ট নিয়ে মাঠে নামতে পারবেন; আয়োজন-ঘোষণা দিতে পারবেন। এবং যখন প্রোডাক্ট রেডি হবে; তখন কোন বিঘ্নতা রইবে না; সহজেই প্রোডাক্ট বাজারজাত করতে পারবেন। একটু খোঁজ নিলেই দেখবেন অফিসিয়ালি ২০১৫ থেকেই মোটা অংকের টাকা ঢালছে Eskay Movies যৌথ সিনেমার নামে আমাদের হিরো/হিরোইন ব্যবহার করে বাংলা সিনেমায়।

ভালোই চলছিলো এভাবে; জাজ স্মার্টলি অনেক সাহায্যে করেছে তাদের বলতেই হবে। সুতারং দেশে যেহেতু জাজ বেশ কিছুটা বিতর্কিত বা বিতর্কিত ভঙ্গিতে দেখা হয় সে কারনে Eskay Movies-কেও সহজে গ্রহণ করা আমাদের ক্ষেত্রে সম্ভব নয়। তার ওপর ঝামেলা শুরু হয়ে গেল দুটি ছবিতে; যৌথ বলেন সাফটা বলেন, এই সিনেমাগুলো আটকাতে বা হেনস্থা করতে কি যে বিশ্রী রকম নিয়ম পাশ করা হচ্ছে দেশি নীতিনির্ধারকদের তরফ থেকে তা বেশ লজ্জাজনকও। এতগুলো প্রতিকূলতা কাটিয়ে, টাকা খাটিয়ে, এদেশের টপ সুপার হিরো ইউজ করেও যদি নিশ্চয়তা না পাওয়া যায়, তাহলে তো বিশাল সমস্যা। তারচেয়ে বাংলাদেশে একটা অফিস নিলেই ৯৫% সমস্যা সমাধান। সুতরাং Eskay Movies আগমন যে মাত্রই হলো, বিষয়টা তা না আসলে।

আমি ১০০টা লজিক দেখাতে পারি তারা ডকুমেন্টসগত জটিলতা এড়াতে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং অবশ্যই বাংলাদেশে মেইনস্ট্রিমে কোয়ালিটি ছবি না থাকাও বেশি করে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে। অন্তত এ কথা আমিও স্বীকার করি তামিল/তেলেগু রিমেক হলেও ওপারে মেকিং বেশ খানিকটা ভালো আমাদের মেইনস্ট্রিম মেকিং থেকে। সো ইজিলি টার্গেট অডিয়েন্স রিচ করা যাবে। প্রশ্ন হলো তাদের টার্গেট অডিয়েন্স কারা?

আপাতদৃষ্টিতে মেইনস্ট্রিমে যে সব ছবি এখন হচ্ছে তা অনুমেয় যে এসব ছবির টার্গেট ওডিয়েন্স নিন্ম মধ্যবিত্ত শ্রেনী। খারাপ শোনালেও বলি, রিক্সাওয়ালা, গার্মন্টেস ওয়ার্কার ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি ছোট করছি না, শ্রেণী বিভাজন করলাম বোঝাতে। আমাদের মেইনস্ট্রিম সিনেমার বর্তমান মান ঠিক এই শ্রেণীর জন্যে এইটা স্বীকার করে নিতে হবেই। এভাবে কি সত্যিকার অর্থে সিনেমা হিট হচ্ছে? দেশের একটা বড় জনগোষ্ঠী ছাত্ররা, এদের ৫%ও আমি নেতা হবো টাইপ বা চালবাজ সিনেমা দেখতে যায় বা গিয়েছে? একজন কলেজ/ভার্সিটি পড়ুয়া ছাত্র ফিলই করে না ‘আমি নেতা হবো/চালবাজ/ভালো থেকো‘ বা এইরুপ ছবি দেখা প্রয়োজন; উল্টা হাজারটা বিতৃষ্ণা জন্ম দিয়েছে আমাদের মনে বছরের পর বছর এসব দেখতে দেখতে। সুতরাং নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেনী টার্গেট করে সিনেমা বানানোর উদ্দেশ্য কি আসলে? যারা ভালো মুভি দেখতে চায়; স্মার্ট মুভি দেখতে চায়, তারা বিনোদনের জন্যে ঐ টাইপ সিনেমা দেখতে যাবে হলে? ঠিক এইখানে হচ্ছে সবচেয়ে বড় ভুল।

সিনেমা বানান আয়ানাবাজি/ঢাকা অ্যাটাক… সব ধরনের পাবলিক লুফে নিবে। সব ধরনের দর্শকই যাবে সিনেমা হলো; তবেই কিনা হিট। এখন প্রশ্ন হলো সামর্থ্যের! আমরা প্রতি বছর সব মিলিয়ে মাস্ হিট মুভি দিতে পারছি মাত্র একটা/দুইটা; প্রতি মাসে যদি একটা আয়ানাবাজি/ঢ্যাকা অ্যাটাক তৈরি হয় তবেই সংকট কাটবে অন্যথায় যতই যাকে/তাকে ভালো/খারাপ বলেন, উত্তরণ হবে না লিখে রাখেন। Eskay Movies এতদিন যা বানিয়েছে দু/তিনটি মুভি বাদে মান একেবারেই ভালো না। এপার/ওপার বাংলায় তথ্য প্রযুক্তির বিপ্লব ঘটেছে; সামনের শুক্রবারে কি বাংলা মুভি হলে চলে এইটা একটা ছেলের না জানা থাকলেও ‘ওয়েস্টওয়ার্ল্ডের ফোর্থ পার্ট‘ কবে আসবে সে দিন গুনি আমরা। স্টার সিনেপ্লেক্সে ইনফিনিটি ওয়্যার এর জন্যে মাইল মাইল লম্বা লাইন কি এতটুকু চিন্তা খুলে না আপনাদের ? আমাদের দর্শক রুচি কবে বুঝবেন।

এই জায়গাটি থেকে Eskay Movies যদি ভাবে তারা শুধু শাকিব খান এবং এবং সো কলড ইন্ডিয়ান ডিরেক্টর দিয়ে এদেশে মাসালা খাওয়াবে ভেবে থাকে… শিওর থাকেন এই স্ট্রাটেজি কাজে দিবে না। বিশ্বের এমন কোথাও দেখাতে পারবেন না যারা নিজের দেশের কালচার-কৃস্টি রেখে অন্যের কালচারে বিনোদিত হতে চাই । এইটা সাময়িক চলতে পারে এক/দু বছর কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদী খুবই বাজে প্রভাব ফেলবে এবং ফলস্বরূপ এই প্রজেক্ট সবমিলিয়ে ৫ বছর অতিক্রম করবে না; আমি চ্যালেঞ্জ করতে পারি।

Eskay Movies বাংলাদেশে প্রবেশে আমাদের লাভ/ক্ষতি; বাংলাদেশের মাটিতে অফিসিয়াল সেট আপ মানে শুরুতেই সরকার লাভ হচ্ছে এখান থেকে। তাকে প্রডাক্ট তৈরি করার ব্যাপারে সকল সুবিধা প্রদান করা হবে; গুনগত মান বজায় রেখে সে লাভ করতেই পারে এই নিয়ম সারাবিশ্বেই আছে। স্বয়ং বলিউডেও বড় বড় হলিউডি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান কাজ করছে এইটা দোষের না। সিনেমার লগ্নিকৃত টাকা যেকোন সোর্স থেকেই আসুক না কেন; আপত্তি নেই; ঐ সিনেমায় কোটি কোটি টাকা লাভ হলেও আপত্তি নেই । যা হবে নিয়ম মেনেই হবে; অন্যান্য সকল ক্ষেত্র মিলিয়ে বছরে হাজার কোটি ডলার ইন্ডিয়াতে চলে যায়। এইটা পাচার না; তারা টেকনিক্যালি স্ট্রং জোন থেকে শ্রম দিয়ে পারিশ্রমিক নিয়ে যায়। কেউ ব্যাবসা ভালো বুঝলে এইটা দোষের না আবার কেউ টেকনিক্যালি স্ট্রং হলেও এইটা দোষের না। আমাদের মার্কেট যেহেতু সম্ভাবনাময় হয়ে দাঁড়িয়েছে সো যে কেউ এন্ট্রি নিতে পারে নিয়ম মেনে খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার।

প্রশ্ন যদি থাকে সেটা Eskay Movies এর মার্কেটিং স্ট্রাটেজির উপর ; তারা কীভাবে আগাবে; শাকিব, বাবা যাদব নিয়ে ই থাকবে কিনা? আামাদের দেশের অন্য শিল্পী/পরিচালক নিয়েও তারা কাজ করবে কিনা? যদি শাকিব ছাড়াও অন্য হিরো/হিরোইন নিয়ে; দেশের ভালো ডিরেক্টর নিয়ে সিনেমা তারা তৈরি করে তবে তো পুরো স্বার্থটাই রক্ষা হলো অামাদের।

দেশের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান নিয়ে আমার বেশ আক্ষেপ আছে। বহুল বিতর্কিত হলেও একমাত্র ধারা অব্যাহত রেখেছে জাজ। তারা যে কোনও একজনকে নিয়ে পড়ে নেই । এমনকি দর্শক চাহিদার ভিত্তি হালের ক্রেজ হিরো/হিরোইন দিয়েও বিগ বাজেট ছবি বানিয়েছে বা বানাচ্ছে। বিষয়টা ইতিবাচক; পোড়ামন ২ রিলিজ রিপোর্ট হতে পেলে এই বিষয়ে অনেক কথা বলব অন্য আরেকদিন। আমার প্রশ্ন হলো দেশে কয়টা প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান আছে যারা নিয়মিত মুভ দিতে পারে?? হাতে গুনলে ২ টা বা তিনটা সব মিলিয়ে। বাকি কোন প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের প্রফেশনালিজম নেই। যার যখন ইচ্ছে সিনেমার ঘোষণা দিচ্ছে; বাজেট পাশ করছে। আর যত দোষ ঘাড়ে ডিরেক্টর আর লিডরোলের উপর। সবিশেষ কথা; আমাদের ভালো সিনেমা বানাতে হবে; টার্গেট অডিয়েন্স পারফেক্ট হতে হবে। কনটেন্ট যদি স্ট্রং হয় ঐ সিনেমা ঠেকাতে পারে সাধ্য কার! অন্যথায় লাখ লাখ টাকার মার্কেটিং; কোটি টাকার হিরো নিলেও সর্বোচ্চ ঐ শুক্রবার/শনিবার পাবলিক হলে যাবো, কিন্ত সপ্তাহের বাকি ৫ দিন সিনেমা হলে চালাতে কনটেন্ট ম্যাটার করে ব্রোহ… কনটেন্ট ম্যাটার করে।

সুতরাং ফোকাস পয়েন্ট আসা উচিত নিখুঁত এবং মানসম্পন্ন কনটেন্টে; তাহলে এইসব ভারতীয় ইয়ে.. এসকে/ফেসকে হালেও টিকবে না। কেউ ব্যবসা করতে চাইলে করুক আপত্তি নেই; কিন্তু মনে রাখবেন দাদা; ‘প্রত্যেক জাতি তার নিজের ভাষায় বিনোদিত হতে চায়…!’

Comments

Tags

Related Articles