ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

ঢাবির ‘মিনি কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প’সমূহ এবং এশার গ্রাফের ওঠানামা

পর্ব ১: বিক্ষুব্ধ ছাত্রীরা এশার গলায় জুতার মালা দিয়েছে। হল-দল-বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি বহিষ্কৃত।

পর্ব ২: তিনি রগ কাটেন নি, জানা গেছে। ভাইরাল ভিডিও দেখে সবার খারাপ লেগেছে। হল-দল-বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার। এশার জন্য জাতি সহানুভূতিশীল। তিনিই হবেন প্রথম নারী ছাত্রলীগ সভাপতি, অনেকের প্রেডিকশন।

পর্ব ৩: কোটা সংস্কার আন্দোলনে যাবার কারণে কীভাবে তিনি হলের মেয়েদের শাসিয়েছেন, গালিগালাজ করেছেন, তার অডিও ভাইরাল হয়েছে। গ্রাফ আবার একটু নেমেছে।

আমার বেশি আগ্রহ পর্ব ১-এ এবং পর্ব-১-পূর্ব অধ্যায়ে। এশা রগ কেটেছেন, কেবল এই ভুল তথ্যের কারণেই কি তাকে হেনস্থা করা হলো? নাকি আরও ব্যাপার ছিল? ভাইরাল অডিওতে তিনি নিজ সংগঠনের জুনিয়রদের যেভাবে শাসিয়েছেন শোনা গেল, সাধারণ ছাত্রীদের সঙ্গে তার ব্যবহার কেমন ছিল, অনুমেয়। সাত কলেজ ইস্যু উদ্ভূত আন্দোলনে তিনি কীভাবে আরেক ছাত্রীকে শারীরিকভাবে আক্রমণ করেছেন, তার ছবিও আমাদের দেখা হয়ে গেছে। একটা প্রশ্ন উঠতে পারে, এত দ্রুত তাকে বহিষ্কার করা হলো কেন? আবার এত দ্রুত বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারই বা করা হলো কেন? কাউকে বহিষ্কার করার আগে যাচাই করবে না, দল এবং বিশ্ববিদ্যালয়? ঘটনা ঘটেছে রাতে এবং রাত পেরুনোর আগেই বহিষ্কার করার প্রয়োজন পড়লো কেন?

কারণ সেদিন ছাত্রীরা খুবই ক্ষুব্ধ ছিল। বিশ্বস্ত সূত্রে জানতে পেরেছি, সেদিন পরিস্থিতি খুবই মারাত্মক ছিল। এক পুলিশ অফিসার যেমন আন্দোলনকারীদের ‘খেয়ে ফেলতে’ চেয়েছিলেন, তেমনি সেদিন ছাত্রীরাও তাকে ‘খেয়ে ফেলতে’ই চেয়েছিল। হল-প্রশাসন ও প্রক্টরিয়াল টিম মিলে ছাত্রীদের এই বলে নেগোশিয়েট করতে হয়েছে যে, তোমার কী চাও? যা চাও তাই করা হবে। ছাত্রীদের দাবি অনুযায়ীই তাকে হল-দল-বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়, এবং তাড়াহুড়া করেই। নইলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছিল না। কারণ সাধারণ ছাত্রীদের বহু দিনের ক্ষোভ ছিল এই সভানেত্রীর ওপর। রগকাটা গুজবের বাইরে তিনি একজন সাধারণ মানুষ বা সভানেত্রীমাত্র নন, তিনি নির্যাতক, সাধারণ্যের জন্য আতঙ্কস্বরূপ ছিলেন। প্রশ্ন উঠতে পারে, ছাত্রীরা এরকম ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করলো কেন? এশার মাফ চাওয়া, ক্রন্দন, কিছুই তাদের স্পর্শ করলো না কেন? আমাদের এক্ষেত্রে বুঝতে হবে, সাধারণ ছাত্রীদের ক্ষোভের কারণ। বহুদিন ধরে নির্য়াতিত হতে হতে তাদের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ প্রকাশিত হয়েছে। এদিকে কোটাসংস্কার আন্দোলন করে তাদের মধ্যে ঐক্যের শক্তি সঞ্চারিত হয়েছে, পড়ে পড়ে মার খাওয়া নিঃসাড় দেহে প্রাণের সঞ্চার হয়েছে।

আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াই, ছাত্রসংগঠন বা ছাত্র-ছাত্রীদের গণ্ডগোলে নাক গলানোতে বা মন্তব্য করতে আমার অস্বস্তি হয়। কিন্তু সাধারণ ছাত্র শিক্ষকের স্বার্থ নিয়ে আমার ভাবনা আছে, সর্বোপরি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মানরক্ষা ও অ্যাকাডেমিক পরিবেশ অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য কাজ করে যাবার একটা প্রবণতা আছে। তাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও এসব লিখতে হচ্ছে। এর আগের এক স্ট্যাটাসে আমি বলেছিলাম, বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো হলো মিনি কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প। স্পষ্ট করে বলি, এশারা হলেন সেই ক্যাম্পের নিপীড়কদের ক্যাপ্টেন। সব হলেই এশারা আছেন। আর গ্রাম থেকে আসা গরিব-নিরীহ ছাত্র-ছাত্রীরা হলগুলোতে প্রথমে গণরুমে ওঠে। বিনিময়ে তাদের ছাত্রলীগের মিছিলে যেতে হয়। বড় ‘ভাই’দের উঠতে বসতে সালাম দিতে হয়। ‘গেস্টরুম কালচার’-এর বলি হয়ে তাদের যাপন করতে হয় এক প্রায় রেজিমেন্টেড জীবন। এক তরুণ বা তরুণীকে মহা-অনিচ্ছুকের এক জীবন যাপন করতে হয় – এর চেয়ে বেদনার আর কী আছে! তারুণ্য হয় বাঁধনহারা, কথা না-শোনার বয়স এটা – কিন্তু তাকে অনিচ্ছাসহ চলতে হয় অন্যের কথায়। আমি নিশ্চিত হয়ে বলতে পারি, হলের যে জীবন তাতে কোনো ছাত্র বা ছাত্রীর সেল্ফ ডিগনিটি অবশিষ্ট থাকে না। একেকজন হলবাসী হলো পরাস্ত, পরজীবী একেকটি প্রাণী। তারই ক্যালকুলেটর কোনো এক ভাই নিয়ে যাবার পর, সেটা চাইতে গেলে তার চোখে মুখে আঘাত করে রক্তাক্ত করা হয়। মাঘের শীতে হলের লনে শাস্তিভোগ করতে করতে মারা যায় কিছুদিন আগে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া তরুণ। আর তাদের দেখভাল করার দায়িত্বে যে শিক্ষককূল, যে হল বা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, তারাও এই পরিস্থিতির জন্য অনেকখানি দায়ী। আমি প্রথম আলোয় এক লেখায় বলেছিলাম, আগে রাজনীতিবিদরা আসতেন শিক্ষকদের কাছে পরামর্শ নিতে, আর এখন শিক্ষকরা রাজনীতিবিদদের দুয়ারে ধর্না দেন নানান পদপদবীর জন্য। এই শিক্ষকরাই তাদের পদ পেতে ও রক্ষা করতে এমনকি ছাত্রলীগকেও সমঝে চলেন। আরেক লেখায় বলেছিলাম, হলগুলো মূলত চালায় ছাত্রলীগ, প্রভোস্ট আর হাউস টিউটররা আছেন ছাত্রলীগের ছদ্মপ্রশাসনের বৈধতা দেবার জন্য।

এখন এরকম হবার একটা সম্ভাবনা যে, এশার পুনরাভিষেকে সুফিয়া কামাল হলে সেই রাতের উত্তেজিত ছাত্রীদের ধরে ধরে শাস্তি দেয়া হবে। কিংবা কোটাসংস্কারের আন্দোলনে যারা অংশ নিয়েছে হলে হলে তাদের ওপর নির্য়াতন করা হবে। তবে প্রধানমন্ত্রী যে সমাধান দিয়েছেন, তাতে ছাত্রলীগও আনন্দ মিছিল করেছে, আন্দোলনকারীরাও খুশি হয়ে তাকে ‘মাদার অফ এডুকেশন’ উপাধি দিয়েছে। তাই আশা করতে চাই সাধারণ ছাত্র ও ছাত্রলীগ মিলেমিশে সামনের দিনগুলো পার করবে। আর এশার ওপরে কেন সাধারণ ছাত্রীরা ক্ষেপে গিয়েছিল, সেই ক্ষোভের কারণ যে শুধু রগকাটার বিষয় ছিল না, সেটাও ছাত্রলীগকে বুঝতে হবে, হলপ্রশাসনকে বুঝতে হবে। এবং বুঝে তাদের তৎপরতার ধরন বদলাতে হবে। হলগুলোয় রেজিমেন্টেশন বন্ধ করতে হবে। শিক্ষার্থীদের প্রাপ্য ডিগনিটি ফিরিয়ে দিতে হবে। নইলে অন্য যেকোনো ইস্যুতে, সবাইকে বিস্মিত করে, সাধারণ শিক্ষার্থীরা আবার ঐক্যবদ্ধ হয়ে, অন্য কোনো দুঃখজনক ঘটনার জন্ম দেবে। ততক্ষণ পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা দেবার দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বা শিক্ষকদের, এমনকি ছাত্রলীগেরও। বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিনির্ধারকদেরও হলব্যবস্থাপনা নিয়ে একেবারে নতুন করে ভাবতে হবে।

সবাইকে নববর্ষের শুভেচ্ছা। জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক।

ফাহমিদুল হক
অধ্যাপক, 
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
Comments

Tags

Related Articles