টেকি দুনিয়ার টুকিটাকি

ইমোটিকনে ‘ইমো’ খাওয়া এক প্রজন্ম…

বন্ধু-১: রাগ করেছ?

বন্ধু-২: না। 

বন্ধু-১: আমিও তো তাই বলি। রাগ করার মত কিছু তো আমি বলিনি।

বন্ধু-২: হ্যাঁ। 

ম্যাসেঞ্জারে দুই বন্ধুর মধ্যে চ্যাট কনভার্সেশনের অংশবিশেষ এটি। এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, দ্বিতীয় বন্ধুটি যেকোন কারণেই হোক, নিশ্চিতভাবেই প্রথম বন্ধুটির উপর মনোঃক্ষুণ্ন হয়েছে, যা সে সরাসরি স্বীকার না করলেও স্মাইলি ইমোর (অনেকের মতে সেন্টি ইমো) মাধ্যমে ঠিকই প্রকাশের চেষ্টা করেছে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, প্রথম বন্ধুটি দ্বিতীয় বন্ধুটির বলা না এবং হ্যাঁ-কেই ধ্রুব হিসেবে ধরে নিয়েছে। ইমোর মাধ্যমে যে দ্বিতীয় বন্ধুটি সম্পূর্ণ বিপরীত কিছু বুঝাতে চেয়েছে, তা সে ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি। তাই সে ভাবছে তার বন্ধুটি আদতে রাগ করেনি। অন্যদিকে দ্বিতীয় বন্ধুটি রাগ তো করেছেই, এবং এখন তার বন্ধু সেটি ধরতে না পারায় তার রাগের পরিমাণ প্রতিনিয়ত আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

আমরা জানি না এই দুই বন্ধুর মধ্যে সম্পর্কের প্রক্সিমিটি বা ঘনিষ্ঠতা কতটুকু। যদি তারা খুব কাছের বন্ধু হয়, তবে আমরা ধরে নিতেই পারি যে অল্প কিছু সময় পরই তাদের মধ্যে সবকিছু আবার আগের মত স্বাভাবিক হয়ে যাবে। কিন্তু যদি এমন হয় যে তাদের সম্পর্ক খুব গভীর না, তবে সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে যে তাদের সম্পর্কের এখানেই ইতি ঘটতে চলেছে। কিংবা পুরোপুরি ইতি না ঘটলেও, এরপর থেকে তাদের সম্পর্কে আগের মত উষ্ণতা থাকবে না অবশ্যই। একে অন্যের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করবে ঠিকই, তবে তা হবে খুবই শীতল।

এবার আসুন পাঠক, একটু সবিস্তারে গোটা বিষয়টি পর্যালোচনা করি। প্রথম বন্ধুটির কি আসলে কোন ভুল রয়েছে? সে তো দ্বিতীয় বন্ধুকে জিজ্ঞাসা করেছেই যে সে রাগ করেছে কি না। দ্বিতীয় বন্ধুটি যদি আসলেই রাগ করে থাকে, তবে সে তা স্বীকার না করে ‘হ্যাঁ’ বলল কেন? আর তারপর এমন একটি ইমোই বা কেন ব্যবহার করল যা দ্বারা আপাতদৃষ্টিতে এক অর্থ প্রকাশ পায়, কিন্তু বাস্তবে ভিন্ন কোন অর্থ বোঝানো হয়ে থাকে? তার মানে তো এখানে দ্বিতীয় বন্ধুটির ভুলই বেশি। সে সরাসরি রাগ করার কথা স্বীকার করে নিলেই পারত! তাহলেই আর এমন ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হতো না!

কিন্তু না পাঠক, এত সহজেই কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছে গেলে চলবে না। কারণ আমরা এখানে আলোচনা করছি মানুষের মন বা সাইকোলজি নিয়ে, যার মত জটিল জিনিস পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি নেই। একবার ভেবে দেখুন, কোন কারণে আপনার হয়ত আপনার মায়ের সাথে মন কষাকষি হয়েছে। আর তাই রাগ করে আপনি রাতে ভাত না খেয়েই ঘরের দরজা বন্ধ করে দিয়ে বসে আছেন। মা কিছুক্ষণ বাদে আপনার দরজায় ধাক্কা দিয়ে বললেন, “কি রে, খাবি না? খিদে পায়নি?” আপনি খুব রাগের সাথে বললেন, “না খাব না। খিদে পায়নি আমার। যাও তো এখান থেকে!” আসলে আপনার কিন্তু খুবই খিদে পেয়েছে। আর খানিকক্ষণ না খেয়ে থাকলে আপনি মারাই যাবেন। অথচ মাকে বললেন আপনার খিদে পায়নি। এই ডাহা মিথ্যেটা আপনি কেন বললেন? কারণ আপনার অভিমান হয়েছে। এবং আপনি চান সেটি আপনার মাকে ভালো করে বুঝিয়ে দিতে।

এখানে অভিমান হওয়া আর মাকে সেটি বুঝিয়ে দেয়া, দুইটির মধ্যে খুবই গভীর যোগাযোগ রয়েছে। এমন যদি হতো যে আপনি রাগ করেছেন কিন্তু মাকে সেটি বুঝতে দিতে চান না, তাহলে আপনি রাতে ঠিকই ভাত খেতেন। মনে মনে রাগ করলেও সেটি বাইরে প্রকাশ করতেন না। কিন্তু বিষয়টি তো সেরকম না। আপনি চান আপনার মা যেন আপনার রাগ বা অভিমানটা ধরতে পারেন।

এখন আপনার মায়ের হাতে দুইটি অপশন আছে। এক. তিনি আপনার রাগ বা অভিমানের কারণটি বুঝতে পারলেন। যতক্ষণ না আপনি দরজা খোলেন, ততক্ষণ দরজা ধাক্কাতেই থাকলেন, তারপর নিজে হাতে আপনাকে খাইয়ে দিয়ে তবেই শুতে গেলেন। কিংবা দুই. তিনি বললেন, আচ্ছা খিদে না থাকলে খাওয়ার দরকার নাই। অনেক রাত হয়েছে, আমি ঘুমাতে গেলাম।

আপনি কিন্তু মনে মনে চাইছেন আপনার মা প্রথম কাজটিই করুক। তিনি আপনার রাগ, অভিমান বা জেদের কাছে হার মেনে নিক, আর আপনিও ভরপেট খেয়ে তবেই শান্তিতে ঘুমান। কিন্তু যদি আপনার মা দ্বিতীয় কাজটি করেন, তার মানে দাঁড়াবে যে আপনার অভিমানকে তিনি গুরুত্ব তো দিলেনই না, বরং রাতটা আপনার না খেয়েই কাটাতে হলো। অর্থাত আপনার এ-কূল ও-কূল দু-কূলই গেল!

তারমানে বুঝতেই পারছেন, মানবমন কতটা বিচিত্র। আপনি চান সবাই আপনাকে বুঝুক। কিন্তু সবাই সবসময় আপনাকে বোঝে না। কারণ সবার মধ্যে একটি জিনিস থাকে না। সেটি হলো ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স। এই জিনিসটির অভাবেই আশেপাশের অনেকেই আপনার মুখের কথাকেই কেবল প্রাধান্য দেয়, কথার পিছনে লুকিয়ে থাকা আবেগটাকে বিন্দুমাত্র আমলে নেয় না।

ভাবছেন, হঠাৎ কেন ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্সের অবতারণা করলাম, এবং শুরুর আলোচনা থেকে এতটা দূরে সরে এলাম? তার পেছনে সঙ্গত কারণ রয়েছে। বাস্তব জীবনে যেমন একে অন্যের আবেগ ধরতে না পারার ফলে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হওয়ার পেছনে ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্সের ভূমিকা রয়েছে, তেমনি ভার্চুয়াল জগতের আলাপচারিতায় একে অন্যের ইমোর সঠিক অর্থ বা বোঝার ফলে সৃষ্ট ভুল বোঝাবুঝির মূলে রয়েছে ইমোজিনাল ইন্টেলিজেন্স।

হ্যাঁ, ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্সেরই একটি একদম নতুন শাখা হলো ইমোজিনাল ইন্টেলিজেন্স। এটি দ্বারা বোঝায়, কোন ব্যক্তির ব্যবহৃত ইমোটিকনের মাধ্যমে তার প্রকৃত মনের ভাব বুঝতে পারার ক্ষমতা। যেমন সেন্টি ইমোর উদাহরণ তো আগেই দিয়েছি। এরকম আরও কিছু উদাহরণ দেয়া যাক।

বন্ধু-১: শোন, গ্রুপ প্রেজেন্টেশনে আমরা কিন্তু এই টপিকটাই নিচ্ছি।

বন্ধু-২: আচ্ছা। 

বন্ধু-১: ওকে, তবে সেই কথাই রইল। 

এখানে দ্বিতীয় বন্ধুটি তার ইমোর মাধ্যমে বোঝাতে চেয়েছিল যে প্রেজেন্টেশনের টপিকটি তার মনঃপুত হচ্ছে না। কিন্তু প্রথম বন্ধুটি তার ইমোর অর্থ ধরতে পারেনি। তাই দুইজনের মধ্যকার ভুল বোঝাবুঝির দরুণ এমন একটি টপিক নেয়ার সিদ্ধান্ত ফাইনাল হয়ে গেল, যেটি নেয়ার ব্যাপারে দ্বিতীয় বন্ধুর মন থেকে সায় ছিল না।

আবার,

বন্ধু-১: আমার প্রক্সি দিস কিন্তু।

বন্ধু-২: দিব না। 

বন্ধু-১: 

এখানে দ্বিতীয় বন্ধুটি লিখেছে ঠিকই যে সে প্রক্সি দেবে না, কিন্তু পাশে জিভ বের করা ইমোর মাধ্যমে এটিও বোঝানোর চেষ্টা করেছে যে সে আসলে মজা করছে। কিন্তু প্রথম বন্ধুটি তা বুঝতে পারেনি, তাই সে নিজে এখন সেন্টি খেয়ে গেছে।

এভাবেই ম্যাসেঞ্জার কিংবা ভার্চুয়াল বার্তা আদান প্রদানের অন্য যেকোন প্ল্যাটফর্মে ইমোর যথাযথ প্রয়োগ না করায়, কিংবা অন্যের ইমোর সঠিক অর্থ বুঝতে না পারায় প্রতিনিয়তই ভুল বোঝাবুঝি হচ্ছে একজনের সাথে আরেকজনের।

আবার এমন অনেক দৃষ্টান্তও পাওয়া যাবে ভূরি ভূরি যেখানে দুইজন ব্যক্তিই ইমোর ব্যবহারে খুবই দক্ষ, এবং একে অপরের ইমোর অর্থ সম্পর্কে অবগত। তাই কোন অবস্থাতেই তাদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হচ্ছে না। দিব্যি তারা দিনের পর দিন নির্বিঘ্নে, নির্ঝঞ্ঝাটে চ্যাটিং চালিয়ে যেতে পারছে।

এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যেটি তা হলো, ভার্চুয়াল জগতে দুইজন ব্যক্তির চ্যাটিং এর প্রকৃত কারণ বা উদ্দেশ্য কী, তা অনুধাবন করতে পারা। অতি অবশ্যই উদ্দেশ্যটি হলো মনের ভাবের আদান প্রদান করা। এবং মনের ভাব আদান প্রদানেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হলো ইমো। বিশেষত হাসি, কান্না, রাগ, ক্ষোভ, লজ্জা, উত্তেজনার মত মানবীয় আবেগগুলো, যেগুলোকে লিখে প্রকাশ করা এ যায় না, সেগুলোর ক্ষেত্রে বিশেষ সহায়ক হতে পারে ইমো। কিন্তু এতক্ষণ যেমনটি বলছিলাম, ইমোর যথেচ্ছ প্রয়োগের ফলে প্রতিনিয়ত ভুল বোঝাবুঝিও নেহাত কম হয় না। গবেষকদের মতে, আজকাল অধিকাংশ সম্পর্কেই ভাঙনের সূচনা হয় ভার্চুয়াল ম্যাসেজিং বা চ্যাটিং এর মাধ্যমে। আর সেখানে নিঃসন্দেহে একটি বড় ভূমিকা পালন করে ইমোর যথেচ্ছ কিংবা ভুল প্রয়োগ।

আমাদের মনে রাখা দরকার, সমাজে সবাই যেমন সমান ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্ট না, তেমনি ইন্টারনেট ব্যবহারকারী প্রতিটি ব্যক্তিও সমান ইমোজিনাল ইন্টেলিজেন্ট না। তাই আপনি কোন বিশেষ একটি ইমো তার প্রচলিত অর্থের বাইরে বিশেষ কোন অর্থে ব্যবহার করতে চাইলেন, আর সবাই সেটিই বুঝে ফেলল, এমনটি আশা করা অমূলক। তাই অনর্থক ভুলভাল ইমো ব্যবহার করে সম্পর্কে জটিলতা টেনে আনবেন না। যথাসম্ভব চেষ্টা করবেন কোন ইমো সেটির প্রচলিত অর্থ প্রকাশের উদ্দেশ্যেই ব্যবহার করতে। কিংবা যদি ভিন্ন কোন অর্থে ব্যবহার করতে চান, তবে নিশ্চিত হয়ে নেবেন যে যাকে সেটি পাঠাচ্ছেন তিনিও সেই ভিন্ন অর্থটি সম্পর্কে আগে থেকেই অবগত। নইলে কিন্তু ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টির সম্ভাবনা থেকেই যায়।

একটি কথা মনে রাখবেন, বাস্তব জীবনে সব মানুষই যেমন আপনার আবেগ ও তার বহিঃপ্রকাশকে ঠিকভাবে ধরতে সক্ষম নয়, তেমনি ভার্চুয়াল জগতেও অনেকেই আপনার ব্যবহৃত ইমোর প্রকৃত অর্থ উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হতে পারে। তাই আপনি নিজে চেষ্টা করুন যথাসম্ভব ইমোজিনাল ইন্টেলিজেন্ট হয়ে ওঠার; কিন্তু আর সবাইও যে সেটি হয়ে উঠবে, এমনটি আশা করবেন না।

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close