রিডিং রুমলেখালেখি

একটি প্রেমের আত্মকাহিনী

প্রেমে দুটো অধ্যায়, আলোকিত এবং অন্ধকার। কখনো কখনো অন্ধকার অধ্যায় এতোটা সাহসী হয়ে উঠে, প্রেমের অধ্যায়কে কোণঠাসা করে ফেলে। এই গল্পটিতে অন্ধকার কাটিয়ে আলোকিত প্রেমের আবিষ্কার হয়েছে।

নন্দিনীর মা প্রচণ্ড অসুস্থ। মায়ের এখন পৃথিবীর সাথে কোন লেনেদেনা নেই। তিনি সারাদিনে যে কটা বাক্য বলেন সব তার অসুস্থতা বিষয়ক। নন্দিনী আগ্রহ নিয়ে মাকে বলল-

-মা, আমি অফিসে ভালো পারফরমেন্সের জন্য বোনাস পেয়েছি। আজ আমার আনন্দের দিন। দেখো, আমি আজ শাড়ি পরে হালকা সাজগোজ করেছি।

মা নির্বিকার ভঙ্গীতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল-

-আজ কোমরের ব্যথাটা বেশীরে। কি করি বল তো?

নন্দিনী দীর্ঘশাস ছাড়ল। মায়ের জন্য হট ওয়াটার ব্যগ রেডি করে নিয়ে এলো। মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল-

-ঠিক হয়ে যাবে মা, চিন্তা করো না।

-আমার আর ভাললাগে না, সারা শরীর ব্যথায় নাড়াতে পারিনা।

-ডাক্তার বলেছেন তোমার হাড় ক্ষয় হয়ে গেছে, তাই স্বাভাবিক চলাফেরার সময় অস্বাভাবিক ব্যথা হয়। ওষুধে ঠিক হতে প্রচুর সময় লাগবে। তোমাকে ধর্য্য রাখতে হবে মা।

নন্দিনী নিজের ঘরে গিয়ে অফিসে যাবার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। দেখতে ও বেশ রূপবতী। চোখগুলো ওর চেহারায় একটা মায়াবতী ভাব নিয়ে এসেছে। ওর মোবাইল বেজে উঠে, প্রিয় নাম্বার থেকে কল। নন্দিনী রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে উত্তেজিত কণ্ঠে বলল-

-আমি পঙ্গু হয়ে যাবার পর থেকে তুমি আমাকে এড়িয়ে চলছ, ফোন নেই, দেখা নেই।

-বাজে কথা বলবা না, নিহান! আমি ব্যস্ততায় ছিলাম।

নন্দিনী অফিস বাদ দিয়ে নিহানের সাথে দেখা করতে এসেছে। এড়িয়ে চলার অভিযোগ সে মেনে নিতে পারছেনা। নিহানের সাথে তার গভীর প্রেমের সম্পর্ক। নিহান মারাত্মক এক সড়ক দুর্ঘটনায় পায়ে আঘাত পায় এবং ডান পা টি অচল হয়ে গেছে। সে এখন বলতে গেলে অন্যের উপর নির্ভরশীল একজন মানুষ। নন্দিনী বসার ঘরে বসেছে। নিহান ক্র্যাচে ভর দিয়ে এসে সোফায় বসলো। নন্দিনীর মুখ গম্ভীর। নিহান হাসি হাসি মুখে বলল-

-চা দিতে বলবো? চা খাবে?

-না।

-তোমাকে আজ বড্ড সুন্দর লাগছে।

নন্দিনী কিছু বলে না, হাসে না, গম্ভীর হয়ে মাথা নিচু করে বসে থাকে। নিহান বলল-

-বাসায় কি ক্লোজ আপ শেষ?

-মানে?

-হাসছ না তো, ভাবলাম, দাঁত হলুদ হয়ে আছে।

নিজের রসিকতায় নিহান হো হো করে হাসে। নন্দিনী এবার না হেসে পারেনা। অভিমানী সুরে বলে-

-তুমি ফোনে কি বলছিলে, আমি তোমাকে এড়িয়ে চলি?

-আরে ওটা তোমাকে এখানে আনার জন্য বলেছি। একটু আহ্লাদী করেছি।  

-এভাবে কেউ বলে নিহান? তুমি জানো আমি কতো ধরণের সমস্যার মধ্যে থাকি? বাসায় অসুস্থ মা, তাকে দেখাশুনা করার আমি ছাড়া কেউ নেই।

-আমিও তো বলতে গেলে অসুস্থ।

-তোমাকে তো দেখাশুনা করার জন্য ঘর ভর্তি লোক আছে।

নন্দিনী ওঠে যেতে চায়। নিহান তাকে বসতে অনুরোধ করে। নন্দিনী বিরক্ত মুখে বলে-

-আমার অফিসের দেরি হয়ে যাচ্ছে।

-অফিসে তো প্রতিদিনই যাও। আজ না গেলে হয় না?

-প্রাইভেট কোম্পানিতে জব করি, মামার বাড়ি না, যে ইচ্ছে হলেই গেলাম না!

নিহান মুখ কালো করে ফেলে। শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। নন্দিনীর প্রচণ্ড মায়া হয়। সে নিহানের কাছে গিয়ে ওর হাত ধরে। নিহান চারুকলার ছাত্র, এই হাতেই সে আঁকে নিদারুণ সব ছবি। সেসব ছবি দেখেই নন্দিনী তার প্রেমে পরেছিল। যখন প্রেমে পরেছিল তখন মা সুস্থ ছিল, পৃথিবী সুন্দর ছিল। তাই ছবিগুলোর দিকে তাকালে সুন্দর অনুভূতি জাগত। সময়ের সাথে সাথে নন্দিনীর পৃথিবী অসুন্দর হয়েছে। নন্দিনী বিশাল এই পৃথিবীর যান্ত্রিক ত্রুটি বুঝে উঠতে পারছেনা। কারণ আজকাল তার নিহানের আঁকা ছবির প্রতি কোন টান আসে না।

নন্দিনী অফিসে ঢুকল। নন্দিনীর অফিসের বস নন্দিনীকে ইনিয়ে বিনিয়ে বুঝিয়েছে তিনি নন্দিনীকে বিয়ে করতে চান। নন্দিনীকে তিনি জিজ্ঞেস করেছন মতামত, নন্দিনী চাকরী হারাবার ভয়ে সেও ইনিয়ে বিনিয়ে বুঝিয়েছে, বিয়েতে অমত নেই। নন্দিনীর সামনে দুটা পথ, বিধবা মা এবং ধনী বসের সাথে একটি নিরাপদ জীবন শুরু করা। অথবা তার প্রিয় পঙ্গু মানুষটি এবং মায়ের হাত শক্ত করে ধরে জীবন যুদ্ধে নেমে পরা। নন্দিনী বুঝতে পারেনা কি করবে। নন্দিনী ফাইল সাজিয়ে বাদল রহমানের ঘরে ঢুকল। বাদল রহমান আন্তরিক ভঙ্গীতে তাকে বসতে বলল। নন্দিনী ফাইল এগিয়ে দিলে তিনি সাইন করলেন। হাসি হাসি মুখে বললেন-

-কফি খাবে?

-না স্যার, খেতে ইচ্ছে করছে না।

-তোমার কি মন খারাপ? এতো বিষণ্ণ দেখাচ্ছে কেন?

-না তো আমার কিছু হয়নি।  

বাদল ড্রয়ার থেকে একটি বক্স বেড় করে নন্দিনীর দিকে এগিয়ে দিলো। আইফোনের ল্যাটেস্ট ভার্শন। নন্দিনী ভ্রূ কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো-

-মোবাইল তো আমার আছে।

-ওইদিন বললে তোমার ফোনে চার্জ থাকেনা, তাই নতুন ফোন।

-ফোনে চার্জ না থাকলে পোর্টেবল পাওয়ার ব্যাংক ব্যবস্থা করতে হয়, নতুন ফোন কিনে ফেলার মতো বিলাসিতা আমার পছন্দ নয় একদম।

-সামান্য ফোন। এমন বিলাসিতায় সামনে অভ্যস্ত হয়ে যাবে।

নন্দিনী ফোন হাতে নিজের ডেস্কে গিয়ে বসে। চারপাশের কোলাহলের সাথে নিজের কোন যোগ পায়না সে। তার ইচ্ছে করে ছুটে কোন নির্জন পাহাড়ে গিয়ে একা একা বাস করতে। সে একই সাথে তিনজন মানুষকে ধোঁকা দিচ্ছে, নিজেকে, নিহান কে, বাদলকে। নিজেকে কারণ সে নিহানকে ভালোবাসে। নিহানকে কারণ, নিহান তাকে ভালোবাসে। বাদলকে কারণ বাদলকে সে ভালোবাসে না! নিজের হিপোক্রেসি সে নিজেই সহ্য করতে পারছে না। সৎ এবং স্বচ্ছ মেয়েটি কিভাবে পারছে এতগুলো অপরাধ একসাথে করতে। অপরাধ করতে সাহস লাগেনা কিন্তু প্রেমের জন্য সৎ হতে সাহস লাগে। বাংলাদেশের ৯৯% মেয়ের সেই সাহস নেই। যুদ্ধ করার সাহস মেয়েদের থাকেনা। অপশন হিসেবে তাদের দামি গাড়ি, বিশাল বাড়ি ওয়ালা সঙ্গীর সাথে সহজ জীবন পছন্দ। নন্দিনী দাঁত দিয়ে নখ কাটে আর নিহান আর তার সৎ সময়ের প্রেমের দিনগুলির কথা মনে করে। একটা অচেনা সুর তার মস্তিষ্কের ভীতর বাজতে থাকে। নন্দিনী ঝাঁপ দিয়ে উঠে বাদলের ঘরে প্রবেশ করে। দামি মোবাইলটি সাহস করে ফিরিয়ে দেয়। বাদল হতভম্ব হয়ে বলে-

-তুমি তো আমাকে অপমান করছ!

-আপনি অনেক বড় মনের মানুষ, বড় মনের মানুষকে অপমান করা যায়না স্যার। আমি সাহস করে একটি ভুলকে ঠিক পথে আনার চেষ্টা করছি।

-কি বলতে চাইছ?

-আমি আপনাকে বিয়ে করতে পারবো না।

নন্দিনী অফিসের সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামে। উজ্জ্বল চোখে নিজের জন্য তালি বাজায়। তার মনের গ্লানি দূর হতে আর অল্প সময় বাকি। সে ছুটতে থাকে নিহানের বাসার দিকে। নিহান নন্দিনীকে অসময়ে দেখে অবাক হওয়া কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে-

-অফিস থেকে আজ তারাতারি বেরিয়েছ নন্দিনী?

-হুম।

-কেন, তোমার শরীর খারাপ নাতো?

-আমি ঠিক আছি। তোমাকে কবিতা শোনাব তাই তারাতারি চলে এসেছি।

নিহান সন্ধেহের দৃষ্টিতে তাকায়। ক্র্যাচে ভর দিয়ে নন্দিনীর কাছে এসে বসে বলে-

-সত্যি করে বল তো কি হয়েছে তোমার?

নন্দিনী হু হু করে কেঁদে ওঠে। নিহানের বুকে মুখ গুঁজে দিয়ে বলে-

-তুমি আর আমি মিলে আম্মুর যত্ন নিতে পারবো না নিহান?

-অবশ্যই পারবো, খুব পারবো!

-ঠিক, আমরা খুব পারবো।

ওরা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে থাকে, ওদের দেখলে মনে হয় ওরা অনন্তকাল এভাবে একজন অন্যজনকে আঁকড়ে ধরে আছে।

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close