“হ্যালো! আমি কমিশনারের সঙ্গে কথা বলতে চাচ্ছি।… আমি উনার মিসেস বলতেছি… হ্যালো! হ্যালো!…”- উৎকণ্ঠায় উচ্চস্বরে এমনিভাবে কথা বলছেন মোবাইল ফোনের একপ্রান্ত থেকে। অপর প্রান্তের কথার স্বর অনুচ্চ। এর খানিক পর গুলির শব্দ… উহ্… গোঙানি… । এরপর আরেকটি গুলির শব্দ। এপাশে স্ত্রীর চিৎকার- “ও আল্লাহ…!”

কক্সবাজার প্রেসক্লাবে গতকাল বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে সম্প্রতি কথিত ক্রসফায়ারে নিহত পৌর কমিশনার একরামুল হকের ফোনে কল দেবার পর রেকর্ড করা অডিও ক্লিপে এভাবেই একরামকে হত্যার মুহুর্তটা উঠে আসে। সংবাদ সম্মেলনে একরামের দুই মেয়েকে নিয়ে সাংবাদিকদের সামনে হাজির হয়ে মোট চারটি অডিও ক্লিপে সবমিলিয়ে ১৪ মিনিট ২২ সেকেন্ডের একটি ক্লিপ শোনান একরামের স্ত্রী আয়েশা বেগম। অভিযোগ করেন, তার স্বামীকে ইয়াবা কারবারি কিংবা ভুল তথ্যে বা কারো সাথে গুলিয়ে ফেলে ভুল করে হত্যা করা হয়নি, বরং মেরিন ড্রাইভ সড়কে প্রভাবশালী এক চক্রের জায়গা-জমি দখলের ঘটনায় বাধা দেওয়া ও প্রতিবাদের কারণেই ঠান্ডা মাথায় খুন করা হয়েছে।

আয়েশা সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহিনীর এক কর্মকর্তার ক্রমাগত ফোনের কারণে গত ২৬ মে রাত ৯টার দিকে একরাম বাড়ি থেকে বের হন। রাত ১১টার সময়ও বাড়ি ফিরে না এলে, তার মেয়ে সোয়া ১১টার দিকে ফোন করে। সেসময় একরাম মেয়েকে জানান যে, তিনি একজন মেজর সাহেবের সঙ্গে যাচ্ছেন। যে কথা অডিও ক্লিপটিতেও শোনা যায়।

এরপর আরেকটি কলে শোনা যায়, মেয়ে জিজ্ঞেস করছে, আব্বু, তুমি কোথায়? কখন আসবে? একরাম জানান, তিনি টিএনও অফিসের যাচ্ছেন। “বেশিক্ষণ লাগবে না। আমি চলে আসবো ইনশাল্লাহ।”

রাত ১১টা ৩২ মিনিটে আবারও মেয়ে ফোন করলে তার বাবা বলেন, হ্নীলায় যাচ্ছেন।

কেন সেখানে যেতে হচ্ছে জানতে চাইলে উত্তর আসে, তিনি ‘জরুরি কাজে’ যাচ্ছেন।

মেয়ে তার কাছে আবারও জানতে চায়- কেন?

ধরা গলায় জবাব আসে, “যাচ্ছি আম্মু ঠিকাছে … যেতে হচ্ছে তা…।”

মেয়ে তখন জানতে চায়, তার বাবা কেন কাঁদছে।

এই অবস্থায় ফোন নেন আয়েশা। তিনি হ্যালো হ্যালো করতে করতেই ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

স্বামীর খোঁজ নেওয়ার জন্যে এরপর আয়েশা আবার ১১টা ৫৪ মিনিটে ফোন দিলে ফোনটি রিসিভ করা হয়। ফোন রিসিভ হলে আয়েশা বলেন, “হ্যালো, হ্যালো, হ্যালো, হ্যালো কে? হ্যালো, হ্যালো, হ্যালো, হ্যালো আমি কমিশনারের সাথে কথা বলতে চাচ্ছি। হ্যালো কে ওইটা, ফোন রিসিভ করছে ওইটা কে? আমি উনার মিসেস বলতেছি, হ্যালো, হ্যালো…।”

এমন সময় ফোনের অপর পাশে কাউকে বলতে শোনা যায় “… তুমি যেটা বলছ,… জড়িত না? কেউ একজন বলেন, নাহ। এরপর অাগ্নেয়াস্ত্রের শব্দ এবং দুটি গুলির শব্দ শোনা যায়। সেই সঙ্গে মরণাপন্ন কারও চিৎকার।

ওই আওয়াজে চিৎকার করে কেঁদে ওঠেন একরামের স্ত্রী ও মেয়েরা।

আয়েশা বলেন, “ও আল্লা আমার জামাই কিছু করে নাই। আমার জামাই কিছু করে নাই। আমরা বিনা দোষী। আমার জামাই, আমার হাজব্যান্ড কিছু করে নাই, আমার হাজব্যান্ড কিছু করে নাই।”

এ সময় ফোনের অপর প্রান্ত থেকে কয়েকজনের কথা শোনা গেলেও স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল না। বার বার বাঁশির শব্দ শোনা যাচ্ছিল। পরে গালিগালাজের আওয়াজও শোনা যায়।

এক পর্যায়ে একরামের স্ত্রী চিৎকার করে জানতে চান- “আপনারা কোথায়, আপনারা কোথায়…।”

অপরপ্রান্তে বাশির শব্দ বাড়তে থাকে। গালিও শোনা যায়।

কাঁদতে কাঁদতে আয়েশা বলতে থাকেন, “আমার জামাই কিছু করে নাই। কমিশনার কিছু করে নাই। আপনারা শুয়ারের বাচ্চা কেন বলতেছেন? উনি কিছু করে নাই। আমার হাজব্যান্ড কিছু করে নাই, কমিশনার কিছু করে নাই, উনাকে কেন মারতাছেন? আপনারা উনাকে কেন মারতাছেন?”

একপাশে “ও আল্লা” বলে নারী ও শিশুকণ্ঠে আর্ত-চিৎকার শোনা যায়। “আমার জামাই কিচ্ছু করে নাই।… আমরা বিনা দোষী।… ” বলে একজন নারীর কান্না। ফোনের অপর পাশে বাঁশির ফুঁ… আতঙ্কিত কণ্ঠে গালিগালাজের আওয়াজ।

অডিও ক্লিপটা শুনলাম। মাঝপথে এসেই মনে হলো না শুনলেই ভালো করতাম। সহ্য করা কঠিন হয়ে যাচ্ছিল। বিশেষ করে ট্রিগার টানার শব্দের পর আয়েশার আহাজারি যেন বুকটা ঝাঁঝরা করে দিয়ে গেল। তবুও দাঁতে দাঁত চেপে পুরো অডিওটাই শুনলাম, কি সূক্ষ্মভাবে অসাধারণ কারুকার্যে র‍্যাব তাদের ক্রসফায়ার নাটক সাজায়, টের পেতেই হাত পা ঠান্ডা হয়ে গেল। অবর্ণনীয় যন্ত্রণায় ভেতরটা খাঁ খাঁ করছে, তবুও টের পেলাম সেদিন ফোনের এপারে একরামের দুই মেয়ের জায়গায় আমি ছিলাম না। মোবাইলে লাইনে থেকে নিজের বাবাকে, পরিবারের আপনজনকে কুকুরের মত গুলি করে মারার বীভৎস ঘটিনাপ্রবাহ শোনার মত দুর্ভাগ্য আমার হয়নি। মুশকিল হচ্ছে হয়নি বলে যে হবে না, সেটা বলা যাচ্ছে না। কাল আমিও কোন প্রভাবশালীর স্বার্থে আঘাত দিলে, কোন অন্যায়ের প্রতিবাদ জানালে, জনগণের প্রিয় জনপ্রতিনিধি হলে, মানুষের কল্যাণ চাইলে আমাকেও ঠিক একই পরিণতি বরণ করতে হতে পারে। একটা দেশের এলিট নিরাপত্তা বাহিনীকে এমনভাবেই ব্যবহার করা যায়, পথের বাধা উপড়ে ফেলতে কাজে লাগানো যায়, একুশ শতকের আধুনিক এই যুগে এটা সম্ভবত অবিশ্বাস্য কল্পনার চেয়েও বড় কিছু!

সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং লাগলো র্যাবের কার্যপদ্ধতি। ১০/১৫ সেকেন্ড বিরতি দিয়ে দুইটা ফায়ারে কাজ শেষ করার পরপরই, ননস্টপ হুইসেল বাজানো আর বাতাসে কাল্পনিক ব্যক্তিকে তুমুল গালিগালাজ, পাশাপাশি “ধর ধর” বলে ব্যাপক হাঁকডাক। ভাবটা এমন – যেনো সত্যিই ওঁত পেতে থাকা “একরামের সন্ত্রাসী বন্ধুরা” একরামকে গুলি করে পালিয়ে যাচ্ছে। এমনকি হত্যাকাণ্ডের পরের কাজকর্মও পিউর প্রফেশনাল। অডিওতে শোনা গেল, ১০ মিনিট ৩০ সেকেন্ডের মাথায় একরামের বাঁধা হাত পা খুলে দেয়ার নির্দেশ দেয়া হচ্ছে। ১১ মিনিট ৫০ সেকেন্ডের মাথায় নিহত একরামের চারপাশে লোড করা বন্দুক, এলজি ও সেই সাথে খালি খোসা রেখে দিতে বলা হচ্ছে। এমন আরো অনেকগুলো ব্যাপার মিলিয়ে মনে হলো বছরের পর বছর একই নাটক মঞ্চায়ন করতে করতে র‍্যাব কিংবা অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এই কাজে হয়ে উঠেছে বিশ্বমানের প্রফেশনাল। ক্রসফায়ার/বন্দুকযুদ্ধের ‘প্রেস ব্রিফিং’ যতোই একঘেয়ে আর গৎবাঁধা লাগুক, অন স্পট ওরা সত্যিই বিশ্বাসযোগ্য একটা আবহ তৈরী করে। ইম্প্রেসিভ মঞ্চায়ন।

যে মঞ্চায়ন আমরা এর আগেও দেখেছি অনেকবার। সেই যে ২০০২ সালে অপারেশন ক্লিনহার্টের নামে ৫৮ জন মানুষকে বিনাবিচারে মেরে ফেলে এই দেশে যে বিচারবহির্ভুত হত্যাকান্ডের ধারার সূচনা হয়েছিল, এর দু’বছর পর র‍্যাব গঠন করে তাকে দেওয়া হয়েছিল বৈধতা। এরপর থেকে গত ১৪ বছরে ক্রসফায়ার কিংবা বন্দুকযুদ্ধ ইত্যাদি নামের আড়ালে অসংখ্য হত্যাকান্ড ঘটেছে বিনা বিচারে, বেশ কিছু সত্যিকারের অপরাধীরা তাতে মারা পড়লেও অনেক সময়েই দেখা গেছে নিরীহ নিরপরাধ মানুষকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে কিংবা স্রেফ পথের কাঁটা সরিয়ে দিতেও র‍্যাব কিংবা পুলিশ ব্যবহার করে সরিয়ে দিয়েছে প্রভাবশালীরা। কলেজছাত্র লিমনকে গুলি করে পঙ্গু করে দেওয়ার পর সেই লিমনের বিরুদ্ধেই আবার মামলা করেছিল র‍্যাব, সেই মামলা এখনো চলছে। আর নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনা ছিল এতোটাই ভয়ংকর যে সেটা আর কার্পেটের তলায় ঢেকে রাখা যায়নি। সামনে নূর হোসেনকে দাঁড় করিয়ে দিলেও সেই নির্বিচার নির্মম হত্যাগুলোর পেছনে কে মূল কলকাঠি নেড়েছিল, সেটা আমরা সবাই জানি। র‍্যাবক সেখানেও কম দক্ষতার পরিচয় দেয়নি। দুজন র‍্যাব কর্মকর্তাসহ ২৬ জন আসামীর বিরুদ্ধে রায় হয়েছে এই সেদিন। কিন্তু এতো বড় লজ্জাজনক ঘটনার পরেও র‍্যাবসহ আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে পেশাদার খুনী হিসেবে ব্যবহার করার ট্রেন্ডে কোন পরিবর্তন আসেনি, কোন অনুতাপ, ক্ষমাপ্রার্থনা, বাহিনীর পচে যাওয়া অংশগুলোর বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলম শাস্তির ব্যবস্থা, কিছুই হয়নি। আজ হয়তো একরামের খুনের মুহুর্তটার অডিও রেকর্ড হয়ে যাওয়ায় আমরা জানতে পারলাম, কিন্তু এমন আরো কত অসংখ্য মানুষকে যে ঠিক এইভাবে ব্যক্তিস্বার্থে কিংবা বিনা অপরাধে মেরে ফেলা হয়নি, কিভাবে নিশ্চিত হওয়া যাবে?

না, নিশ্চিত হবার কোন উপায় নেই। বরং উল্টোটাই ঘটেছে বারবার। বিনা বিচারে নিহত হয়েছে অসংখ্য মানুষ। হয়তো তাদের অনেকেই অপরাধী ছিল, হয়তো তাদের অনেকেই আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যেত। কিন্তু সেটা আইন ও বিচার বিভাগের ব্যর্থতা, রাষ্ট্রের ব্যর্থতা, তার জন্য কোনভাবেই সেই অপরাধীকে আইনের কাঠগড়ায় না তুলে বিচারের মুখোমুখি না করে মেরে ফেলার ক্ষমতা কাউকে দেওয়া হয় না। আইন এভাবে নিজের হাতে তুলে নিলে আদালত, বিচার ব্যবস্থার কি প্রয়োজন? আর এই ভয়ংকর প্রসেসে যে নিরীহ নিরপরাধ মানুষগুলো মারা যাচ্ছে প্রতিদিন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হচ্ছে অসংখ্য নিরপরাধ মানুষ, সেগুলোর বিচার কে করবে? কারা করবে? আছে এই প্রশ্নের উত্তর?

পৌর কমিশনার একরামের হত্যাকান্ড নিয়ে ক’দিন আগে একটা লেখা লিখেছিলাম। অনেকেই সেই লেখার প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছিলেন, একরাম আসলেই ইয়াবা কারবারি, ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনের অপরাধ বিষয়ক অনুষ্ঠান “তালাশ”-এও নাকি তার নাম এসেছে, সে কারণেই তাকে ক্রসফায়ারে দেওয়া জায়েজ। মজার ব্যাপারটা হচ্ছে সম্ভবত এই প্রোগ্রাম এবং গণমাধ্যমের বেশ কিছু খবরের কথা উল্লেখ করে র‍্যাব জানিয়েছিল, তাদের হাতে নাকি একরামের ইয়াবা কারবারের সাথে জড়িত থাকার অনেক প্রমাণ আছে। গণমাধ্যমগুলো থেকেই নাকি তারা এই প্রমাণ পেয়েছে। এমনকি তার নাম মাদক ব্যবসায়ীদের লিস্টেও আছে।

অথচ আসল ঘটনা আরো ভয়ংকর রকমের বিচিত্র। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে কক্সবাজারে পোস্টিং হওয়া একজন ঊর্ধ্বতন গোয়েন্দা কর্মকর্তার সাথে ব্যক্তিগত বিরোধের জেরে একরামুল হকের নাম ২০১০ সালে তৈরী করা ইয়াবা ব্যবসায়ীদের লিস্টে ঢুকিয়ে দেয়া হয়। তার দুবছর পর ঐ গোয়েন্দা কর্মকর্তা টেকনাফ/কক্সবাজার থেকে বদলি হলে একরামুল হকের নাম ঐ লিস্ট থেকেও কাটাও পড়ে। কিন্তু ইন্ডিপেনডেন্ট টিভির তালাশ আর যমুনা টিভির ৩৬০ ডিগ্রি অনুষ্ঠানে একরামুল হকের নাম ও ছবি দেখতে পাওয়ার কারণ হলো ঐ দুইটি চ্যানেল ‘হালনাগাদ’ তালিকা ধরে প্রোগ্রামটা বানায়নি, বরং সেই ২০১০ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক তৈরীকৃত একদম প্রথম যে ৩১ জনের তালিকা করা হয়েছিল, সেই তালিকা ধরে বানানো হয়েছিল প্রোগ্রাম দুইটি। প্রোগ্রাম বানানোর সময়ে হালনাগাদ তালিকায় চোখ বুলিয়ে নিলেই একরামুল হকের নাম কোনোভাবেই পাওয়া যেতো না। আর সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য হচ্ছে – টেকনাফ থানার ওসি গতকাল বর্তমান ও অতীত রেকর্ড চেক করে জানিয়েছেন – “একরামুল হকের নামে মাদক বা অন্য কোনো ইস্যুতে থানায় কোনো মামলার রেকর্ড নেই”।

কি ইন্টারেস্টিং না! কতটা সুক্ষভাবে একজন মানুষকে মেরে ফেলা হলো, ডেডবডির রক্ত ঠান্ডা হবার আগেই মৃত্যুকে জায়েজ করার জন্য তাকে বানানো হলো ইয়াবা ব্যবসায়ী। একরামুল ইয়াবা ব্যবসা করে নাকি টেকনাফে ২টি বাড়ি, চট্টগ্রামে একটি বাড়ি, ঢাকায় একটি ফ্ল্যাট আর ২টি গাড়ি কিনেছেন বলে তালাশ অনুষ্ঠানটিতে দেখানো হয়েছিল, যে একই ভাঙা রেকর্ড র‍্যাবের পক্ষ থেকেও তার ক্রসফায়ারে হত্যাকে জায়েজ করতে বাজানো হয়েছে। অথচ এই মানুষটা তার দুই মেয়ে-স্ত্রীকে নিয়ে যে বাড়িটায় বাস করতেন, সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেল বাড়িটা ভাঙা, জরাজীর্ণ, এলাকাবাসী, প্রতিবেশীদের সাথে কথা বলে জানা গেল, একরামুলের সংসার চলে না, আর্থিক অবস্থা খুবই খারাপ, মেয়ে দুটোকে স্থানীয় বিজিবি স্কুলে পড়াচ্ছেন বিনা বেতনে। এলাকাবাসী, প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন এবং যারা তাকে পর পর তিনবার জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত করেছেন, তারা সবাই একরামুলের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ এবং ব্যক্তিগত সম্পদের বিবরণকে মিথ্যা ও অসত্য দাবী করে প্রত্যাখান করেছেন এবং চ্যালেঞ্জ করেছেন। র‍্যাব, তালাশ টিম এবং প্রশাসন কি তাদের এই চ্যালেঞ্জ নেবার সাহস করবে কখনো?

যারা এরপরেও একরামকে ইয়াবা ব্যবসায়ী হিসেবে প্রমাণ করার চেষ্টা করবেন, তারা ঠাণ্ডা মাথায় একবার ভেবে বলেন তো, মাদক ব্যবসাতে জড়িত কোন ব্যক্তি কেন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ডাকে গভীর রাতে নিজের ঘর থেকে বের হয়ে তাদের সাথে যাবে যেখানে মাদক ব্যবসায়ীদের ধরে ধরে ক্রসফায়ারে দেওয়া হচ্ছে? আর সেই মানুষটা যদি সত্যিই ইয়াবা গডফাদার হতো, তাহলে পুরো টেকনাফের একজনও আই রিপিট একজনও কেন সরকারবিরোধি কিংবা ছাগু নিউজ চ্যানেল কিংবা সংবাদমাধ্যম কিংবা অনলাইন পোর্টাল্গুলোতে এসে একরামুলকে ইয়াবা ব্যবসায়ী হিসেবে দাবী করলো না? কেন আমরা এমন কোন নিউজ শুনলাম না? কেন প্রতিটা মানুষ তাকে ভালোবাসা আর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছেন? এই হত্যাকাণ্ডের বিচার চাইছেন?

ক্রসফায়ারের মত অপরাধ দমনের অজুহাতে ভয়ংকর জবাবদিহিতাহীন অপরাধকে যারা শর্টকাট সমাধান মানছেন, এর পক্ষে দাঁড়িয়ে সমর্থন দিয়ে যাবেন বলে ঠিক করেছেন, একবার নিজেকে একরামের স্ত্রী-সন্তানের জায়গায় কল্পনা করে দেখুন তো! আপনার আপনজনকে ঠান্ডা মাথাও কেউ মেরে ফেলছে আর আপনি সেটা শুনছেন, এর চেয়ে যন্ত্রণার আর কি হতে পারে! অথবা একবার ভাবুন তো, ফোনের ওপাশে আপনি জানেন যে আপনাকে মেরে ফেলা হবে, কিন্তু তবুও আপনার মেয়েকে বলছেন, “চিন্তা করো না, মা, বেশিক্ষণ লাগবে না, আমি চলে আসবো”!

কি, ভাবতে পারছেন?

Comments
Spread the love