কেন যেন মনে হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী খুব শিগগিরই টেকনাফের নিহত কমিশনার একরামুল হকের পরিবারকে গণভবনে ডাকবেন। একরামের স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরে এবং দুই কন্যা ও এক পুত্রের অশ্রু মুছে দিতে-দিতে, কপালে যথাসম্ভব ভাজ ফেলে, চোখ ও ঠোঁট যথাসম্ভব কাঁদো-কাঁদো করে, মুখমণ্ডলজুড়ে সর্বোচ্চ পরিমাণ শোকাচ্ছন্ন আবহ এনে কয়েকদফা ছবি তুলবেন। একরামের তিন সন্তানের পড়ালেখার গুরুদায়িত্ব নেওয়ার ঘোষণা দেবেন এবং তার স্ত্রীকে টেকনাফ পৌরসভায় একটি চাকরি দিয়ে দেবেন। মেয়ে দুটো আরেকটু বড়সড় হলে প্রধানমন্ত্রীর জন্য বেশ সুবিধে হতো। নিজেকে তাদের মা ঘোষণা করে গণভবনে প্রধানমন্ত্রী দুইকন্যার জোড়া-বিয়ের আয়োজন করতে পারতেন। কিন্তু ওরা বিবাহযোগ্য না হওয়ায় প্রধানমন্ত্রী এ যাত্রায় তাদের বিয়ের বন্দোবস্ত করার সুবর্ণ সুযোগ হারালেন, প্রধানমন্ত্রীর স্তাবকরা হারাল তাকে ‘মাদার অব টেকনাফ’ খেতাবে ভূষিত করার সুযোগ।

গণভবনে তোলা ছবিগুলো এর পর গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়বে। বেশ কিছুদিন ধরে অস্বস্তির মধ্যে থাকার পর এবং একরামের হত্যাকাণ্ডকে হালাল করতে না পারার কোষ্ঠকঠিন যন্ত্রণা পোহানোর পর সরকারি চাটার দল এই ছবিগুলো পেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবে, পেয়ে যাবে লাইফলাইন। দীর্ঘদিন ধরে খেতে-না-পাওয়া হাঁসের বাচ্চা যেমন কুড়া পেলে এলোপাথাড়িভাবে কুড়ার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, চাটার দল ছবিগুলোর ওপরও একইভাবে ঝাঁপিয়ে পড়বে।

চাটার দলের কেউ-কেউ ছবিগুলোকে বানাবে প্রোফাইল পিকচার, কেউ-কেউ বানাবে কাভার ফটো। উল্লাসে উদ্বাহু চাটারুরা ক্যাপশনে লিখবে— যতদিন আপার হাতে দেশ, পথ হারাবে না বাংলাদেশ। যে-প্রথম আলো পড়েন না বলে তাদের আপা সদম্ভে প্রচার করেন, সেই প্রথম আলোরই উদ্ভাবিত স্লোগান (যতদিন তোমার হাতে দেশ, পথ হারাবে না বাংলাদেশ) দিয়ে আপা-বন্দনা করবে মেধাবী চাটার দল। কেউ-কেউ ক্যাপশনে লিখবে— কী রে, সুশীলের দল! বলেছিলাম না আপা কিছু-একটা করবে? হলো তো এবার? এবার তোরা কই লুকাবি? দেশটাকে আপা কি তোদের চেয়ে কম ভালোবাসে? কখন কী করতে হবে; সেটা মাদার অব হিউম্যানিটি, বিদ্যানন্দিনী, দেশরত্ন শেখ হাসিনা তোদের চেয়ে ভালো বোঝে।

যারা চাটার ওপর তস্য চাটা, অর্থাৎ যারা চাটুকারেরও চাটুকার; মন্তব্যের ঘরে সেসব সেকেন্ডারি চাটার দল লিখবে— ভাই/ ভাই, আমার ভাই/ জি, ভাই/ ঠিক বলেছেন, ভাই/ একদম মনের কথাটা বললেন, ভাই/ সহমত, ভাই/ আতাহার ভাই— মাদার অব হিউম্যানিটির বিশ্বস্ত ভ্যানগার্ড/ আতাহার ভাইকে পরবর্তী সভাপতি হিশেবে দেখতে চাই/ যতদিন ভাইয়ের হাতে দেশ, পথ হারাবে না বাংলাদেশ/ পাশে আছি, ভাই/ এত সত্য কথা কীভাবে বলেন, ভাই। আর মুক্তিযুদ্ধের সঞ্জীবনীশক্তি ‘জয় বাংলা’ স্লোগানের ওপর লেবুর বুলডোজার চালিয়ে অন্তত নব্বই শতাংশ চাটুকার মন্তব্য করবে— জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।

একরামুল হক ক্রসফায়ার, একরামুল হক ইয়াবা, ক্রসফায়ার

এর পর একরাম নাম লেখাবেন সাগর-রুনি-তনু-বিশ্বজিতের দলে, হারিয়ে যাবেন পাদপ্রদীপের আলো থেকে; বের হবে নতুন কোনো অডিও বা ভিডিও, নতুন কোনো একরাম এসে দখল করবেন আমাদের আলোচনার টেবিল। অবশ্য এমনও হতে পারে প্রধানমন্ত্রী একরাম ইশুতে প্রকাশ্যে একটি শব্দও উচ্চারণ করবেন না, আগামীকালই গণভবনে সহাস্যে ইফতার করবেন তার একান্ত বাধ্যগত কবিদেরকে নিয়ে অথবা পরবর্তী সাংবাদিক-সম্মেলনে একরাম ইশুতে সেরেফ একবাক্যে তিনি বলে দেবেন— ‘সরকারকে বিব্রত করতে বিএনপি-জামায়াত এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে’ অথবা ‘সরকার নিশ্চয়ই মেরিন ড্রাইভের নিরাপত্তা দেবে না’। 

সব ঠান্ডা। এর পর প্রধানমন্ত্রী নতুন কিছু রাঁধবেন, নাতিদের সাথে ব্যাডমিন্টন খেলবেন, বঙ্গোপসাগরে পা ভেজাবেন, বোনের সাথে বরফ-বরফ খেলবেন, রংপুরে রিকশায় চড়বেন, গোপালগঞ্জে ভ্যানে চড়বেন এবং সেসবের ছবি কাভার ফটো বানিয়ে সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে থাকবে এই বদিমাতৃক বাংলাদেশ। বাংলাদেশ কাল বাদে পরশু একরামকে ভুলে যাবে, ভুলবে না কেবল তার তিনটে সন্তান।

Comments
Spread the love