বাংলাদেশের সংবিধান

অনুচ্ছেদ ৩১:

আইনের আশ্রয়লাভ এবং আইনানুযায়ী ও কেবল আইনানুযায়ী ব্যবহারলাভ যে কোন স্থানে অবস্থানরত প্রত্যেক নাগরিকের এবং সাময়িকভাবে বাংলাদেশে অবস্থানরত অপরাপর ব্যক্তির অবিচ্ছেদ্য অধিকার এবং বিশেষতঃ আইনানুযায়ী ব্যতীত এমন কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাইবে না, যাহাতে কোন ব্যক্তির জীবন, স্বাধীনতা, দেহ, সুনাম বা সম্পত্তির হানি ঘটে।          

অনুচ্ছেদ ৩২:

আইনানুযায়ী ব্যতীত জীবন ও ব্যক্তি-স্বাধীনতা হইতে কোন ব্যক্তিকে বঞ্চিত করা যাইবে না।

বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আইন সংবিধানের এইসব অনুচ্ছেদ, আইন-আদালত-রায়, স্বীকৃত ও গৃহীত আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দলিলসমূহ রেটোরিক স্থিরচিত্র হয়ে ঝুলে থাকে রাতের অন্ধকার আকাশে, সব ছাপিয়ে আমাদের কানে বাজে ট্রিগার টানার শব্দ, বুলেটের সশব্দে ছুটে যাওয়া, অভিযুক্তের মৃত্যুচিৎকার এবং অপরপ্রান্তে স্বজনদের মর্মন্তুদ আহাজারি আর মৃত্যুমুখে পতিত ব্যক্তির পক্ষে স্ত্রীর ডিফেন্স পৌনঃপুনিক ধ্বনিত হতে থাকে- ‘আমার হাজব্যান্ড কিছু করে নাই যে, আমার হাজব্যান্ড কিছু করে নাই যে..’

একরামুল হক ক্রসফায়ার, একরামুল হক ইয়াবা, ক্রসফায়ার

এমন তো নয়- এই দৃশ্য পূর্বের ‘ক্রসফায়ার’, ‘এনকাউন্টার’ কিংবা অধুনা ‘বন্দুকযুদ্ধ’তে জীবন কেড়ে নেওয়া আর আর বহু নাগরিকের মৃত্যু ঘটনাক্রম থেকে ভিন্নতর কিছু কিংবা তুমুল ব্যতিক্রম। অডিও- ভিডিও রেকর্ড থাকলেই তবে আমাদের বিবেক এইভাবে নাড়া দেয়, আমরা আইন-বেআইন, ঠিক-ভুলের ঠিকুজি খুঁজি, আচমকা একদিন এভাবে সংবিৎ ফিরে পেয়ে ফেসবুকে হাহাকার করে বলি- ‘আহা! কী মর্মান্তিক! পুরোটা শুনতে পারিনি, কী ভীষণ অন্যায়, বিচার চাই!’

নক্ষত্রদের কেউ কেউ বলেন- “বড় ও মহৎকর্ম সম্পাদনে এমন দুয়েক ‘ভুল’ তো হতেই পারে, কোল্যাটেরাল ড্যামেজ”। আর আমরা প্রত্যক্ষ বা প্রচ্ছন্ন সমর্থনের বালিতে মুখ বুজে জীবন্মৃত পড়ে থেকে এইসব হত্যাকে অনুমোদন দিয়েছি, দেই, দিচ্ছি ততক্ষণ পর্যন্ত যতক্ষণ কোন ‘ভুল’ এই অডিও রেকর্ডের মতো সর্বব্যাপী সমালোচিত হয়ে না উঠছে!

এই অন্তর্জালে দেখি- আইনের শিক্ষক, আইনের শিক্ষার্থী, এমনকি সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবী পর্যন্ত ‘Doctrine of Necessity’ দেখিয়ে সারাজীবন পড়ে আসা, চর্চা করা সংবিধান, জুরিসপ্রুডেন্স, ফৌজদারি আইন-আদালত-বিচার, আইনের শাসনকে অকার্যকর গণ্য করে জীবন কেড়ে নেওয়ার এই গণ-প্রিয় পদ্ধতিতে উপশম খুঁজছে! হায়, এতবড় আত্মগ্লানি, নিজেদের এত বড় অপমান আর কীসে হতে পারে! এই আইন, আদালত, বিচার, আইনের পাঠ ও আইন চর্চার তবে দরকার কী? বন্ধ হোক সব দরোজা, খোলা থাক শুধু বন্ধুকের নল।

অথচ বর্বরতার বিরুদ্ধে সভ্যতার এই আইন তো আমরাই তৈরি করেছি, সম্মিলিত সম্মতিতে। আমরাই তো সংবিধানের প্রস্তাবনায় লিখে দিয়েছি এটি- ‘বাংলাদেশের জনগণের অভিপ্রায়ের অভিব্যক্তিস্বরূপ’

আইনের প্রাথমিক পাঠেই আমরা জেনেছি- “Every person is presumed to be innocent until proven guilty”। আইনগত সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আদালতের রায়ের মাধ্যমে দোষী প্রমাণিত না হওয়া অব্দি প্রত্যেকেই নিরপরাধ গণ্য হবে, আমরা জেনেছি ‘Lawless Trial’ ক্ষতে আপাত গণ-প্রিয় টোটকা উপশম দিলেও আখেরে বুমেরাং হতে পারে, স্বেচ্ছাচারী হতে পারে, অপপ্রয়োগ হতে পারে- ১০০ জন অপরাধীকে ক্রসফায়ার দণ্ডে শায়েস্তা করতে করতে এবং সমর্থনের তালি বাজাতে বাজাতে ১০১ তম সংখ্যায় ‘ভুল’ এর তালিকায় উঠে যেতে পারে আপনার নামটিও, তখনও ট্রিগারে শব্দ হবে, মরণ চিৎকার ধ্বনিত হবে, তখনও ‘কোল্যাটেরাল ড্যামেজ’ শব্দটি ডিকশনারিতে থাকবে, তখনো আপনার প্রিয়তমা স্ত্রী আকাশ বিদীর্ণ করে বলবে…

‘আমার হাজব্যান্ড কিছু করে নাই যে..!’

কিন্তু সেই ডিফেন্স প্রমাণ করার কোন ক্ষেত্র, কোন পদ্ধতি আর যে তখন অবশিষ্ট নেই। আইনহীন পৃথিবীর সে এক গভীর আঁধার সময়, সে সময় আর দূরে নেই। অপেক্ষায় থাকুন।

#STOP_Extra_Judicial_Killing

সাঈদ আহসান খালিদ,
আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

Comments
Spread the love