আমার বাবা মারা গিয়েছিলেন হঠাৎ করেই। সুস্থ মানুষ, দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছেন, হুট করে বুকে ব্যথা উঠলো, হাসপাতালে নিলাম, রাতের বেলাই মারা গেলেন। হঠাৎ করে মৃত্যু হলেও, তার মৃত্যুটি ছিল স্বাভাবিক মৃত্যু, কোন অপঘাতে তাকে মরতে হয়নি। তারপরও সেই শক থেকে, সেই ট্রমা থেকে ৪ বছর পরেও আমি বের হতে পারিনি। আমি শুধু কল্পনা করার চেষ্টা করছি সেই ছোট ছোট মেয়ে দুটির কথা যারা পিতার শেষ মুহুর্তের অসহায়ত্ব বুঝতে পেরেছে, নিজ কানে শুনেছে পিতার গোঙানি, যারা নিজের পিতার হত্যাকান্ডের মুহুর্তের সাক্ষী থেকেছে। তারা আর কোন দিন স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারবে না।

নিহত একরামের পরিবার তার জন্য চিন্তিত ছিল, তাই তারা বারবার ফোন করছিল তাকে। ‘সৌভাগ্যবশত’ একরাম শেষ মুহুর্তেও ফোনটা রিসিভ করতে পেরেছিল, যার কারণে আজ আমরা পুরো ঘটনাটা বুঝতে পারছি। কিভাবে হত্যা করা হল, হত্যার পর কিভাবে নাটক সাজানোর জন্য স্টেজ তৈরির কাজটি করলো হত্যাকারী রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সদস্যরা- সেটা আমাদের বোধগম্য হল। এতদিন ধরে মাদক নির্মূলের নামে ক্রসফায়ার নাটক চলে আসছে, আমরা অনেকে বুঝেও এটাকে সমর্থন জানিয়েছি। সমর্থন দেয়ার কারণ সম্ভবত এই যে, আমাদের কারোরই এখন আর দেশের আইন আদালতের উপরে কোন ভরসা নেই, তাই আমরা ভাবি এভাবে যদি দু একটা সন্ত্রাসী মরে তবে তো ভালোই হয়। কিন্তু নিজ কানে শুনে অনেকেরই টনক নড়েছে। অথচ প্রতিটা হত্যার ঘটনাই এমন ভয়াবহ, ‘দুর্ভাগ্যবশত’ সেগুলোর কোন অডিও/ভিডিও ক্লিপ নেই।

আমাদের বুঝতে হবে ‘ক্রসফায়ার’ বা ‘বন্দুকযুদ্ধের’ নামে এই যে বিনা বিচারে হত্যা করা হয়- এটা কোন ভাবেই, কোন মানদন্ডেই গ্রহণযোগ্য নয়। অপরাধীদের বিচার করার জন্য, শাস্তি দেয়ার জন্য দেশে আইন আদালত বিচার বিভাগ আছে। সেগুলোকে বাদ দিয়ে সন্দেহের বশে কাউকে হত্যা করা আরেকটি গুরুতর অপরাধ। একজন ব্যক্তি যদি নিঃসন্দেহে অপরাধী হিসেবে প্রমাণীতও হয়, তারও বিচার করার ক্ষমতা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দেয়া হয়নি। কিন্তু অতিরিক্ত অ্যাকশন থ্রিলার মুভি দেখার কারণেই হোক বা বিচার ব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতার কারণেই হোক, ক্রসফায়ারকে এদেশের অধিকাংশ মানুষ সমর্থন করে!

সাধারণত ক্রসফায়ারের শিকার হয় চুনোপুটিরা। এই চুনোপুটিরা মারা যাওয়ার ফলে যেটা হয়, এদের গডফাদারদের নাম আর কখনো সামনে আসেনা। ফলে এই গডফাদাররা আবার নতুন করে চুনোপুটির জন্ম দেয়, তাই অপরাধ আসলে কখনই নির্মূল হয়না, শুধু অপরাধীর পরিবর্তন হয়। কথিত মাদক বিরোধী অভিযানেও আমরা একই চিত্র দেখতে পাচ্ছি। দেখতে পাচ্ছি, গডফাদার এবং বড় বড় ব্যবসায়ীরা ঠিকই পালিয়ে যেতে পারছে, অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ তাদের আগে থেকেই জানিয়ে দিচ্ছে, ধরা পড়ছে ছিচকে ব্যবসায়ীরা। অনেক সময় নিরপরাধ মানুষকেও ব্যক্তিগত শত্রুতার জের ধরে ফাঁসিয়ে দেয়া হচ্ছে। এভাবে নির্বিচারে হত্যা করার লাইসেন্স পেয়ে যাওয়ার ফলে রাষ্ট্রীয় বাহিনী গুলোই পরিণত হয়েছে সন্ত্রাসী সংগঠনে, ভয়াবহ এক দানবে।

মূল হোতারা যদি ধরা না পড়ে, সাপ্লাই যদি বন্ধ না হয় তাহলে এসব অভিযান স্রেফ লোক দেখানো রাষ্ট্রীয় ধান্ধাবাজী। মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রণয়ন, দ্রুত বিচার ট্রাইবুনালের মাধ্যমে মামলা নিষ্পত্তি করা, আইন বাস্তবায়ন করা, মূল হোতাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা, দেশে মাদকের প্রবেশ বন্ধ করা ছাড়া মাদক নির্মূল করা সম্ভব না। সত্যি কথা বলতে, মাদক পুরোপুরি নির্মূল কখনোই সম্ভব না। বিশেষ করে আমাদের মত দেশে, যেখানে অর্থনৈতিক-সামাজিক নানা রকম হতাশা বিদ্যমান। এই কলাপ্স সিস্টেম হতাশ মানুষের জন্ম দেবে, এদের একটা অংশের মধ্যে মাদকের চাহিদা তৈরি হবে, আর চাহিদা থাকলে কোন না কোন ভাবে যোগান থাকবেই। মাদক নির্মূলের সদিচ্ছা থাকলে এই যোগানের রাস্তাটা বন্ধ করতে হবে। তা না করে বিনা বিচারে মানুষ মেরে সমস্যার এক ভাগও সমাধান করা সম্ভব নয়।

একরামুল হক ক্রসফায়ার, একরামুল হক ইয়াবা, ক্রসফায়ার

বিনাবিচারে হত্যাকান্ডের বিরুদ্ধে দেশ জুড়ে যে প্রতিবাদ উঠেছে একরাম হত্যাকান্ডের অডিও প্রকাশ হবার পরে, সেটা কিছুটা হলেও আশা জাগায়। যদিও সরকার ডেইলি স্টারের সাইট বন্ধ করে দিয়েছে বাংলাদেশ থেকে, কিন্তু ইতিমধ্যেই এই অডিওটি ছড়িয়ে গেছে। যত কঠিন হৃদয়ের মানুষই হোক, এটা শোনার পর কারো পক্ষেই নিজেকে সামলে রাখা কঠিন। কথা পরিষ্কার, একরাম অপরাধী না নিরপরাধ, সে মাদক ব্যবসায়ী না নিষ্পাপ- এই প্রশ্ন এখানে পুরোপুরি অবান্তর। সে অপরাধী হোক বা না হোক, সে নিষ্পাপ হোক বা মাদক-ব্যবসায়ী হোক, তাকে বা এরকম যেকোন কাউকে এভাবে হত্যা করা অন্যায়, আরো বড় অপরাধ। সে অপরাধী হলে আইন অনুযায়ীই তার বিচার হবে। সেই বিচার ব্যবস্থা যেন ঠিক ভাবে কাজ করে এটা নিশ্চিত করাই সরকারের দায়িত্ব।

আমরা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবী করেছি, বলিনি তাদের গুলি করে মেরে ফেলো। আমরা বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিচারের আওতায় এনেছি, বলিনি তাদেরও একই ভাবে গুলি করে হত্যা কর। কেন? কারণ এটাই সভ্য সমাজের বৈশিষ্ট্য। ক্রসফায়ারের মাধ্যমে হত্যা পুরোপুরি অসভ্য একটা কর্মকাণ্ড। রাষ্ট্র নিজেই যখন এই অসভ্য আচরণ করে, তার মানে হল তার নিজেরই নিজেদের আইন ও বিচার ব্যবস্থার প্রতি কোন শ্রদ্ধা নেই। তার মানে হল, সেই রাষ্ট্র নিজেই নিজেকে দুর্বল মনে করে।

আমাদের স্পষ্ট করে বলতে হবে, আমরা অপরাধ নির্মুল চাই কিন্তু ক্রসফায়ার চাইনা। আমরা এই রাষ্ট্রীয় হত্যাকান্ডের প্রতিবাদ করি। আমরা এই রাষ্ট্রীয় হত্যাকান্ডকে ঘৃণা করি। আমরা চাই এই হত্যাকান্ড বন্ধ হোক, অপরাধীদের বিচারের আওতায় নিয়ে আসা হোক। নিরপরাধ মানুষদেরকেও যেভাবে মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে ফাঁসিয়ে দেয়া হচ্ছে, তাতে এই অসভ্য দেশে নিজেকে নিরাপদ বোধ করার কোন কারণ নেই।

Comments
Spread the love