একাত্তরের ২৩শে অক্টোবর ছিল পবিত্র রমজান মাসের ২য় দিন, নিরীহ বাঙালিদের উপর ১লা রমজানের বর্বর গণহত্যা ও নির্যাতন ২য় দিনেও অব্যাহত থাকে। ঘাতক পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও এদেশীয় রাজাকার যারা নিজেদেরকে ইসলাম ধর্ম রক্ষার অভিভাবক বলে বেড়িয়েছিল তারাই এই পবিত্র রমজান মাসের পবিত্রতা উপেক্ষা করে নৃশংস গণহত্যা ও নির্যাতন চালিয়েছিলো। এই রাজাকার ও সাচ্চা পাকিস্তানি সেনারা মুখে ইসলামের কথা বলে ফেনা তুললেও তাদের জীবন ছিল অনৈসলামিক কর্মতৎপরতায়, মদ আর মেয়েমানুষে ছিল প্রচণ্ড রকমের আসক্তি, মানুষ হত্যায় উল্লাস করতো তারা। ধর্ম রক্ষা বা প্রতিষ্ঠা করার জন্য সৃষ্টিকর্তার দোহাই দিয়ে বাংলায় যে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে তা সভ্য সমাজের চোখে নিষ্ঠুর, হৃদয়বিদারক ও অমানবিক।

এই গণহত্যার বিরুদ্ধে বাঁধা দেওয়ার কেউ বা জবাবদিহিতার কেউ ছিল না, তাছাড়া পাকিস্তানি সেনা অফিসারদের আদেশই ছিল হত্যা করার, আত্মসমর্পণের পরে জেনারেল রাও ফরমান আলীর ড্রয়ার থেকে কিছু কাগজপত্র পাওয়া গিয়েছিল যাতে লেখা ছিল “পূর্ব পাকিস্তানের সবুজকে লাল রঙে রাঙিয়ে দিতে হবে”, একটি টেপ পাওয়া গিয়েছিলো যেখানে সে হত্যার আদেশ দিয়ে বলেছিল “কিছু জিজ্ঞাসা করা হবে না। মনে করবে কিছুই হয়নি। তোমাদেরকে কোন কিছুই ব্যাখ্যা করতে হবে না।“(১)

এরকম আদেশ ও ইনফরমেশন পাওয়ার পর পাকিস্তানি সেনাদের কাছে গণহত্যার ব্যাপারটি ক্লিয়ার হয়ে যায়। জবাবদিহিতা বা বাঁধা দেওয়ার কেউ থাকলে তা একমাত্র স্বাধীনতাকামী মুক্তিযোদ্ধারা ছিলেন যাঁদেরকে তারা দুষ্কৃতিকারী বলে বেড়াতো, বাঙালিদের উপর গণহত্যা ও নির্যাতন বন্ধ করার বা তার জবাব দেওয়ার একমাত্র উপায় ছিল পাকিস্তানিদের বিপক্ষে যুদ্ধ করে তাদেরকে পরাজিত করে বিজয় অর্জন করা। কিন্তু স্বাধীনতা বিরোধী দেশীয় রাজাকারদের প্রতারণায় মুক্তিযোদ্ধাদেরও নির্মম গণহত্যা ও নির্যাতনের শামিল হতে হয়েছিলো।

২৩ শে অক্টোবরের রমজান মাসের দ্বিতীয় দিনে রাজাকার কমান্ডার আব্দুল মালেক ডাক্তারের নেতৃত্বে মেহের জল্লাদ, ইসাহাক, আব্দুল মজিদসহ বেশ কয়েকজন রাজাকারেরা যশোরের মনিরামপুর উপজেলার রত্নেশ্বরপুর গ্রামের আব্দুর রহমানের বাড়িতে আশ্রয় নেয়া মুক্তিযোদ্ধা আসাদ, তোজো, শান্তি, মানিক, ফজলু ও সিরাজুল কে ধরেছিলো। পরে তাঁদের চোখ বেঁধে চিনাটোলা বাজারের পূর্বপাশে হরিহর নদীর তীরে নিয়ে বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে নির্যাতন করা হয়েছিলো।(২)

সিরাজুল ইসলাম দশম শ্রেণীতে পড়তেন আর বাকি ৫ জনের মধ্যে তোজো ১৯৬২ সালে এমএ পাশ করার পর লন্ডন থেকে একচুয়ারি ডিগ্রী(৩) নিয়ে কৃষকদের সাথে কাজ শুরু করেছিলেন, সাথে সাথে পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির একনিষ্ঠ কর্মী ছিলেন, আসাদ ও মানিক ছাত্র ইউনিয়নের মেনন গ্রুপে, শান্তি কৃষক সমিতির সেক্রেটারি ও ফজলু সেনাবাহিনী থেকে পালিয়ে এসে যুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন।

এই হত্যাকাণ্ডে ভাগ্যগুণে বেঁচে যাওয়া সিরাজুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, তাঁদেরকে ধরার পর বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে লবন দেওয়া হয় শরীরে। সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে এরকম অমানুষিক নির্যাতন। সেই লোমহর্ষক ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন “আসাদ ভাইসহ আমাদের ছয়জনকে এক দড়িতে বাঁধে রাজাকাররা। রাজাকাররা উল্লাস করছিল। তখন তোজোভাই বললেন- ওই ছেলেটা মাসুম বাচ্চা (আমাকে দেখিয়ে), ওকে ছেড়ে দেন। ও আমাদের সঙ্গের কেউ না; ও চাচাকে খুঁজতে এসেছে। তখন রাজাকাররা আমাকে তাদের কাছ থেকে আলাদা করে ধরে রাখে। তাঁদেরকে হত্যার পর এক রাজাকার বলেছিলো সাক্ষী রাখার দরকার নেই। রাজাকার গুলি চালায়। কিন্তু গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হলে আমি নদীতে লাফ দিয়ে সাঁতরে পালিয়ে যাই।“(৪)

এদিন আরো শহীদ হয়েছিলেন নলিতাবাড়ি থানার তন্তর এলাকায় যুদ্ধে নন্দীবাড়ির মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল খালেক ফকির(৫), রামভদ্রপুরের বন্দগোয়ালিয়া এলাকার নুরুল ইসলাম আকন্দ(৬), মুক্তাগাছা থানার কাঠবওলা গ্রামের মকবুল হোসেন মন্ডল(৭)। কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বে পাকিস্তানি বাহিনীর সাথে কিশোরগঞ্জের বিন্নাটি নামক এলাকায় যুদ্ধে ধরা পড়েন মুক্তিযোদ্ধা আলাউদ্দিন খান, তাঁর উপর অমানুষিক নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করেছিলো পাকিস্তানি সেনারা।(৮) তাঁর স্মৃতি ধারণ করে মির্জাপুর নিজ গ্রামে “শহীদ আলাউদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়” নামকরন করা হয়েছে।

ছবি- মনিরামপুরের পাঁচ শহীদের সমাধিস্থল (বাংলা ট্রিবিউন থেকে নেওয়া)

শুক্রবারে শুরু হওয়া রমজান মাসের ২য় দিন শনিবারে টাঙ্গাইলের গোপালপুর থানার হিন্দু অধ্যুষিত গ্রাম বাইশকাইলে চলে পাকিস্তানি বাহিনীর অগ্নিসংযোগ, নির্যাতন আর গণহত্যা। চতিলা গ্রামের কুখ্যাত রাজাকার সোমেশ মেম্বার ও আতরবাড়ির মফেজ মেম্বার পাকিস্তানি বাহিনীর সাথে বেলা ১১ ঘটিকায় টহল দিয়ে দুইঘন্টা পর আবার যখন বাইশকাইল গ্রামে আসে ততক্ষণে ত্রিশটি পরিবারের অনেক হিন্দু বাঙালি এ সুযোগে ভয়ে গ্রাম ছেড়ে পালিয়েছিলেন। তারপরও পাকিস্তানিরা ১১জন পুরুষকে ধরে ফেলেছিলো, তাঁদেরকে দড়ি দিয়ে বেঁধে পুরো গ্রাম ঘুরিয়ে পুকুরের পাশে এনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করেছিলো।(৯) বাঙালি হিন্দু নারীদের উপর চালিয়েছিলো পাশবিক নির্যাতন, আগুনে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছিলো ২০টি ঘর।

এই গণহত্যায় শহীদ হয়েছিলেন যারা তাঁদের নামঃ ১। গোবিন্দ কুমার চন্দ, ২। বানেশ্বর চরণ চন্দ, ৩। হরিকান্ত চন্দ, ৪। যোগেশ চন্দ্র ভৌমিক, ৫। মতিলাল ভৌমিক, ৬। প্রফুল্ল চন্দ্র ভৌমিক, ৭। বসন্ত কুমার চন্দ, ৮। গোবিন্দ চন্দ, ৯। ক্ষিতীশ কুমার চন্দ, ১০। উমাচরণ চন্দ ও ১১। যতীন্দ্র মোহন কর্মকার।(১০)

অন্যধর্মের মানুষকে হত্যা করে নিজ ধর্ম রক্ষা বা প্রতিষ্ঠা করার ধর্মীয় গোঁড়ামিতেই নিমগ্ন ছিলো, যেখানেই হিন্দু ধর্মের লোক পাওয়া গিয়েছিলো সেখানে শুরু হয়েছিলো গণহত্যা আর নির্যাতনের বর্বরতা। পাকিস্তানিদের মধ্যে প্রচণ্ড রকমের ভারত ও হিন্দু বিদ্বেষ ছিল যা বাঙালিদের মধ্যে ছিল না, পূর্ব ও পশ্চিম বাংলার লোকেদের মধ্যে অনেক মিল ছিল, এজন্য পাকিস্তানিরা বিশ্বাস করতো যে হিন্দুরাই বাঙালি মুসলমানদের মনমানসিকতায় প্রভাব ফেলেছিল।

পাকিস্তানি সামরিক অফিসারেরা সাধারণ সৈন্যদের বলতো “বাঙালিরা মুলত হিন্দু ছিল। ধর্ম পরিবর্তন করে তারা মুসলমান হয়েছে, তাই মুসলমান হিসেবে তাঁদের কোন গুরুত্ব নেই। আসলে এরা ধর্মবিরোধী, এদেরকে মেরে ফেলাই শ্রেয়।“(১১) রাও ফরমান আলী অবশ্য তার মত করে উদাহরণ দিয়ে বলতো “বাঙালিরা ধুতি পরে (হিন্দুদের অনুসরন করে)।”(১২) ফজল মুকিম খান বলেছিলো “বাঙালিরা মুসলমানদের পছন্দ করতো না, করতো হিন্দুদের।“(১৩) ধর্মের ভিত্তির উপর রাষ্ট্র গঠন করা পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতারা ও সেনা অফিসাররা সেই ধর্মীয় খোলস থেকে কখনো বের হতে পারেনি, অন্য ধর্মের প্রতি প্রচণ্ড রকমের বিদ্বেষ মারাত্মকভাবে রুপ নিয়েছিল গণহত্যার মাধ্যমে তা নিঃশেষ করে দেয়া।।

তথ্যসূত্রঃ
১। গণহত্যা’৭১, তপন কুমার দে, নওরোজ সাহিত্য সংসদ, পৃঃ ৪৯।
২। দৈনিক যায় যায় দিন, “মনিরামপুরের ৫ সূর্যসন্তানের শাহাদাতবার্ষিকী আজ”, ২৩শে অক্টোবর ২০১৬।
৩। দৈনিক জনকণ্ঠ, “মনিরামপুরের ৫ মুক্তিযোদ্ধার শাহাদাত বার্ষিকী আজ”, ২৩শে অক্টোবর ২০১৬।
৪। বাংলা ট্রিবিউনে সিরাজুল ইসলামের সাক্ষাৎকার, “পাঁচ শহীদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা চান সিরাজুল”, ২৭শে মার্চ ২০১৬।
৫। মুক্তিযুদ্ধ কোষ নবম খন্ড, মুনতাসির মামুন সম্পাদিত, সময় প্রকাশন পৃঃ ৩২৬।
৬। মুক্তিযুদ্ধ কোষ দশম খন্ড, মুনতাসির মামুন সম্পাদিত, সময় প্রকাশন পৃঃ ৪৪০।
৭। মুক্তিযুদ্ধ কোষ একাদশ খন্ড, মুনতাসির মামুন সম্পাদিত, সময় প্রকাশন পৃঃ ২০।
৮। প্রাগুক্ত ঐ পৃঃ ২৪৯।
৯। একাত্তরের গনহত্যাঃ যমুনার পূর্ব পশ্চিম, শফিউদ্দিন তালুকদার, কথাপ্রকাশ, পৃঃ ৬৮।
১০। প্রাগুক্ত ঐ।
১১। গণহত্যা’৭১, তপন কুমার দে, নওরোজ সাহিত্য সংসদ, পৃঃ ৬০।
১২। পাকিস্তানি জেনারেলদের মনঃ বাঙালি বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ, মুনতাসির মামুন, সময় প্রকাশন, পৃঃ ২৭।

গ্রন্থ কৃতজ্ঞতা- একাত্তরের রমজান- গণহত্যা ও নির্যাতন 

বইটি পাওয়া যাচ্ছে ইত্যাদি শপ,বাংলা বই ,রকমারি ও বইপোকায়

Comments
Spread the love