ঘাতক পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও এদেশীয় রাজাকার যারা নিজেদেরকে ইসলাম ধর্ম রক্ষার অভিভাবক বলে বেড়িয়েছিল তারাই এই পবিত্র রমজান মাসের পবিত্রতা উপেক্ষা করে নৃশংস গণহত্যা ও নির্যাতন চালিয়েছিলো। এই রাজাকার ও সাচ্চা পাকিস্তানি সেনারা মুখে ইসলামের কথা বলে ফেনা তুললেও তাদের জীবন ছিল অনৈসলামিক কর্মতৎপরতায়, মদ আর মেয়েমানুষে ছিল প্রচণ্ড রকমের আসক্তি, মানুষ হত্যায় উল্লাস করতো তারা। ধর্ম রক্ষা বা প্রতিষ্ঠা করার জন্য সৃষ্টিকর্তার দোহাই দিয়ে বাংলায় যে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে তা সভ্য সমাজের চোখে নিষ্ঠুর, হৃদয়বিদারক ও অমানবিক।

এই গণহত্যার বিরুদ্ধে বাঁধা দেওয়ার কেউ বা জবাবদিহিতার কেউ ছিল না, তাছাড়া পাকিস্তানি সেনা অফিসারদের আদেশই ছিল হত্যা করার, আত্মসমর্পণের পরে জেনারেল রাও ফরমান আলীর ড্রয়ার থেকে কিছু কাগজপত্র পাওয়া গিয়েছিল যাতে লেখা ছিল “পূর্ব পাকিস্তানের সবুজকে লাল রঙে রাঙিয়ে দিতে হবে”, একটি টেপ পাওয়া গিয়েছিলো যেখানে সে হত্যার আদেশ দিয়ে বলেছিল “কিছু জিজ্ঞাসা করা হবে না। মনে করবে কিছুই হয়নি। তোমাদেরকে কোন কিছুই ব্যাখ্যা করতে হবে না।“

এরকম আদেশ ও ইনফরমেশন পাওয়ার পর পাকিস্তানি সেনাদের কাছে গণহত্যার ব্যাপারটি ক্লিয়ার হয়ে যায়। জবাবদিহিতা বা বাঁধা দেওয়ার কেউ থাকলে তা একমাত্র স্বাধীনতাকামী মুক্তিযোদ্ধারা ছিলেন যাঁদেরকে তারা দুষ্কৃতিকারী বলে বেড়াতো, বাঙালিদের উপর গণহত্যা ও নির্যাতন বন্ধ করার বা তার জবাব দেওয়ার একমাত্র উপায় ছিল পাকিস্তানিদের বিপক্ষে যুদ্ধ করে তাদেরকে পরাজিত করে বিজয় অর্জন করা। কিন্তু স্বাধীনতা বিরোধী দেশীয় রাজাকারদের প্রতারণায় মুক্তিযোদ্ধাদেরও নির্মম গণহত্যা ও নির্যাতনের শামিল হতে হয়েছিলো।

২৪শে অক্টোবর, রবিবার ছিল একাত্তরের রমজান মাসের ৩য় দিন। যথারীতি পাকিস্তানি সাচ্চা মুসলমান সেনাবাহিনী আর তাদের দোসর দালাল রাজাকারদের কাছে রমজান মাসের কোন পবিত্রতা, গুরুত্ব বা তাৎপর্য ছিল না। ধর্মের অপব্যবহার করে হিন্দু-মুসলিম বাঙালি নিধন করে, তাদের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ, লুটপাট করে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারেই মগ্ন ছিল।

অক্টোবরের ৫ তারিখে বিরুনিয়া গ্রামে পাকিস্তানী সেনাদের ত্রাস আফসার বাহিনীর সাথে পাকিস্তানী বাহিনীর একদফা যুদ্ধ হয়েছিলো, তারই ফলশ্রুতিতে ২৪শে অক্টোবর রমজান মাসের ৩য় দিন আবারো ভালুকা থানার বিরুনীয়া গ্রামে পাকসেনারা ঢুকে পড়ে, শুরু করে লুটতরাজ ও বাড়ি বাড়ি অগ্নিসংযোগ। মুক্তিযোদ্ধারাও বসে থাকেননি, খবর পেয়ে দ্রুত মুভ করেন, আফসার সাহেব চাঁন মিয়া কোম্পানির মুক্তিসেনাদের নিয়ে পাক বাহিনীর উপর পাল্টা আক্রমণ করেন। ২ ঘন্টা গুলি বিনিময় চলে, ৫জন পাক সেনা নিহত হয়। কিন্তু ততক্ষণে প্রচুর বাড়িঘর ভস্মীভূত হয়ে গিয়েছিলো, নির্যাতিত হয়েছিলেন অনেক নারী পুরুষ।

এদিন গাইবান্ধার সবচেয়ে বড় যুদ্ধ খ্যাত ত্রিমোহনীর যুদ্ধ হয়েছিলো, মুক্তিযোদ্ধারা বোনারপাড়া শত্রুমুক্ত করার উদ্দেশ্যে ত্রিমোহিনী ঘাট এলাকার কয়েকটি বাড়িতে আশ্রয় নিলে এ খবর শান্তি কমিঠির সদস্যরা পাক শিবিরে জানিয়ে দেয়। এ খবর পেয়ে ২৪শে অক্টোবর সূর্যোদয়ের আগে পাকস্তানি সেনারা বিশাল বাহিনী নিয়ে ত্রিমোহিনী ঘাট এলাকা ঘিরে ফেলে, তুমুল যুদ্ধে ১২ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা নিহত হন আর পাক সেনা নিহত হয় ২১ জন। এই যুদ্ধে শহীদ ১২ জন মুক্তিযোদ্ধারা হলেনঃ ১। মধু, ২। শহিদুল্লাহ, ৩। প্রভাত, ৪। ভরত, ৫। আব্দুল হাই, ৬। আহম্মদ আলী, ৭। আনসার আলী, ৮। হাবিবুর, ৯। আব্দুল হাই মিয়া, ১০। রঞ্জন ও নাম না জানা আরো ২জন।

এই যুদ্ধের স্মৃতি আঁকড়ে ধরে আজো বেঁচে আছেন মুক্তিযোদ্ধা সামছুল আলম, গৌতুম কুমার সহ আরো অনেকে। প্রতিবছর এদিন ফুলছড়ি,সাঘাটার মানুষেরা শহীদদের স্মরণ করেন। উল্লেখ্য যে গাইবান্ধার ৩০টি বধ্যভূমি ও গণকবরের মাঝে ফুলছড়ি একটি বড় বধ্যভূমি, এখানে বিভিন্ন সময়ে প্রায় ৪ হাজারেরও বেশি বাঙালি নরনারীকে ধরে এনে হত্যা করা হয়েছিলো। পাকবাহিনী ও তাদের দোসরদের মধ্যযুগীয় বর্বরতার নিদর্শন ছিল গাইবান্ধার ফুলছড়ি থানার বধ্যভূমি। এখানে নির্যাতনের পর সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিলো হাজার হাজার বাঙালিদেরকে।

প্রত্যক্ষদর্শী আবু বক্করের বয়স ছিল তখন ১৩ বছর, তাকে দিয়ে দোকান থেকে সিগারেট, পান, বিভিন্ন বাড়ি থেকে খাসি মুরগি ধরে আনাতো। উপজেলার পাকাবাড়ির যেখানে পাক বাহিনী রান্না করতো সেখানেই বাঙালি ধরে এনে নির্যাতন করতো। রাতের বেলা বধ্যভুমিতে ১৫/২০/২৫ জনকে নিয়ে গিয়ে গুলি করে হত্যা করতো, হত্যার পর তাদের নির্দেশে গর্ত করে পুতে রাখতেন আবু বক্করের বাবা বাহার আলী বাটু, শেখ পুশু, কসিম, রইচ চুলকি, ময়েজ, আবাদার, সোনা মিয়া ও আরো অনেকে। গর্ত খননকারীদের মতে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার বাঙালিকে হত্যা করে পুঁতে রাখা হয়েছিলো।

ছবি- ফুলছড়ি বধ্যভূমি (ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত)।

২৪ অক্টোবরের রাতের বেলায় মুক্তিবাহিনীর গেরিলারা নৌকাযোগে মজলিশপুর হয়ে নন্দনপুর আসলে আগে থেকে এমবুশ করা পাকিস্তানি বাহিনী ও রাজাকারেরা গুলি ছুড়েছিল, প্রথমদিকে পাল্টা গুলি ছুড়লেও টিকতে পারেনি, ছত্রভঙ্গ হয়ে ক্রলিং করে আশেপাশের গ্রামগুলিতে আশ্রয় নিয়ে পরে পালাতে সক্ষম হয়েছিলেন। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা আশুরঞ্জনের পায়ে গুলি লাগায় ক্রলিং করতে না পারায় আরো ৪ জনের সাথে ধরা পড়েছিলেন। আশুরঞ্জনকে হত্যা করার আগে কালীবাড়িতে তাঁকে আটকে রেখে অমানুষিক নির্যাতন চালিয়েছিলো, তাঁকে দেখতে কালীবাড়িতে অনেক লোকের ভিড় জমতো কিন্তু কারো কিছুই করার ছিলো না। তাঁর পায়ের ক্ষতস্থান থেকে প্রচুর রক্ত পড়তো, চিকিৎসার ব্যবস্থা তো করাই হয়নি বরং তাঁকে কোন খাবার দেওয়া হতো না, পানি খেতে চাইলে তাঁর মুখের দিকে প্রস্রাব করে পানি খেতে বলা হতো। সাধারণ বাঙালিদের কাছে এই নির্যাতন অমানবিক মনে হলেও সাচ্চা পাকিস্তানিরা পাশবিক উল্লাসে ফেটে পড়তো।

এদিন ব্রাহ্মণবাড়িয়া থানার শালদা নদীতে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখযুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন নবীনগর থানার মহেষপুর গ্রামের হাবিলদার আব্দুল লতিফ বীরপ্রতীক, কুমিল্লার গোয়ার নামক স্থানের যুদ্ধে শহীদ হন কুমিল্লার লাকসাম উপজেলার শাকেরা গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা মোখলেছুর রহমান, আরো শহীদ হন চট্টগ্রাম জেলার বাংলাদেশ রেলওয়ের সিরাজুল ইসলাম চৌধুরি।

এছাড়া এদিন রাজশাহীর বেড়পাড়ায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীরা হামলা চালিয়ে নিরীহ গ্রামবাসীদেরকে হত্যা করে। কতজন গ্রামবাসী এদিনের বর্বর হামলায় নিহত হয়েছিলেন তার সংখ্যা জানা যায়নি তবে রাজাকারদের সহযোগিতায় পাক বাহিনী যেখানেই তাদের মিশন চালিয়েছে সেখানেই তারা একেকটি গ্রাম ধ্বংস করে চলে গেছে, নিরীহ মানুষ হত্যা থেকে শুরু করে, বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ, লুটতরাজ, নারী ধর্ষণ, নির্যাতন কোন কিছু বাদ রাখেনি তা কোন সাধারন দিন হোক আর রমজান মাসের দিন হোক।

সাচ্চা মুসলমান ট্যাগ নিয়ে তারা একাত্তরে বাঙালি নারীদের বীভৎসভাবে নির্যাতন করেছিলো, মুসলমানদের পবিত্র রমজান মাসেও এই নির্যাতনের ভয়াবহ রুপ উঠে এসেছে এই গ্রন্থের ভেতরের পাতাগুলিতে।

প্রায় ৪০০-এরও উপর রেফারেন্স, ডকুমেন্টস ও ইন্টারভিউসহ একাত্তরের রমজানের এরকম অসংখ্য বেদনাবিধুর ঘটনাবলী জানতে এবং জানাতে সংগ্রহে রাখতে পারেন এই বইটি-

একাত্তরের রমজানঃ গণহত্যা ও নির্যাতন
লেখকঃ আরাফাত তানিম
একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৮

বইটি এই মুহুর্তে পাওয়া যাচ্ছে,
দেশ পাবলিকেশন্সে
স্টল নম্বরঃ ৪৫২ – ৪৫৩
যোগাযোগঃ ০১৮২৪ ৫৭৫৭৮৮ (প্রকাশনীর নাম্বার)

মুক্তিযুদ্ধ-ই হোক আমাদের পরিচয়।

Comments
Spread the love