খেলা ও ধুলা

খেলার সাথে রাজনীতি কিংবা একটি ‘হোয়াট্টে সেলিব্রেশন’

পাকিস্থানের সাথে ম্যাচ। সাফ ফুটবলের এই ম্যাচটি বাংলাদেশের জন্য ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ এমনিতেই। জিতলেই সেমিফাইনালের পথে এক পা বাড়ানো। তবে পাকিস্থানের সাথে খেলা মানে শুধু খেলাই নয়, এই খেলার দিনে অনেক আবেগ ভর করে দর্শকদের মধ্যে, খেলোয়াড়দের মধ্যে। ব্যাক অফ দ্য মাইন্ডে একটু হলেও একাত্তর ফিরে ফিরে আসে। 

খেলা শুরু হলো, সেই পুরোনো ধারাভাষ্য। ভুলের পর ভুল। খেলাটাও ঠিক জমছিল না। পাকিস্থান ডিফেন্সিভ খেলছে। সুযোগ পেলে দুই একটা কাউন্টার এট্যাক দিয়ে সুযোগ তৈরি করতে চাচ্ছে। সেটাকে ট্যাকেল করলেও বাংলাদেশও যে খুব উজ্জ্বল সুযোগ তৈরি করতে পারছে তাও নয়৷

পুরো মাঠ জুড়ে সাদ, তপু বর্মন, জামাল ভুঁইয়াকেও একটু আলাদা করে নজরে পড়ছিল। আজকে সুফিল ছিলেন কড়া মার্কিংয়ে, তার কাছে তেমন ভাল পাসও যায়নি যে তিনি কাজে লাগাবেন। সাদ একাই লেফট উইং দিয়ে কয়েকবার ঝড় তোলার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু লাভ হয়নি তাতে। পরিকল্পিত আক্রমণের অভাব লক্ষণীয়, ফলে খেলোয়াড়রা কয়েকটা দূর পাল্লার শট নিয়ে গোলের খাতা খোলার চেষ্টা করেছিলেন। তাতেও কাজ হলো না। প্রথমার্ধ এভাবেই কেটে গেল।

সেকেন্ড হাফে হঠাৎ টেলিভিশন ক্যামেরা গেল গ্যালারিতে। চোখ আটকে গেল টিভি পর্দায়। প্লেকার্ডের মাঝখানে লেখা একাত্তর। কি অদ্ভুত! পাকিস্থানের সাথে খেলায় একাত্তর শব্দটি দেখেই বোঝা যাচ্ছে খেলাটা শুধু নিছকই খেলা নয়, প্রতিপক্ষ যখন পাকিস্থান তখন আমাদের উপর বিবিধ স্মৃতি ভর করে। সেটাই দেখা গেলো দর্শকদের প্লেকার্ডেও।

একটি প্লেকার্ডে লেখা- ‘রেফারি দুই নাম্বারি করলে একদম ঝুলাইয়া দিমু!’ অদ্ভুত না? এই যে অবহেলিত মরা ফুটবলের দর্শকভরা গ্যালারি, তাতে দর্শকরা খেলাটাকে আত্মা দিয়ে উপভোগ করছেন সেটারই যেন বহিঃপ্রকাশ সাথে একটু প্রচ্ছন্ন দাবি, পাকিস্থানকে ফেভার দেয়া যাবে না। কোনো দুই নাম্বারি চলবে না।

কিন্তু, মন ভরছিল না খেলা দেখে। প্রবল তৃষ্ণা নিয়ে আমরা অপেক্ষা করছি একটা গোলের৷ পাকিস্থানের বিপক্ষে একটা কাঙ্খিত গোলের দেখা পাওয়ার জন্য রীতিমতো হাপিত্যেস শুরু হয়ে গিয়েছিল তখন। কিন্তু গোল যে আসছিল না। এদিকে সময় ছুটে যাচ্ছে, আর বেশি সময়ও নেই। আশি মিনিট পরেও গোলের দেখা নেই।

ম্যাচের চুরাশি মিনিট। চারদিকে প্রবল চিৎকার! গোওওওল! গোলটা এসেছে তপু বর্মনের পা থেকে। উল্লাস হলো বাঁধভাঙ্গা। পাকিস্থানের বিপক্ষে এখন আমরা এক শূন্যতে এগিয়ে। আর কিছু সময় পার হলেই ম্যাচ জিতে যাব, গোল দেখার পর এই অনুভূতি মনের মধ্যে অদ্ভুত সুখের হাওয়া বয়ে দিচ্ছিলো।

কিন্তু, ম্যাচের সবচেয়ে বড় চমকটাই অপেক্ষা করছিল তারপর।

গোল হয়েছে সেলিব্রেশন হবে না? হলো সেলিব্রেশন। সেই সেলিব্রেশন কতটা সুন্দর তা কি না দেখলে কাউকে বোঝানো যাবে! গোলের উৎসবের মধ্যে ওয়ালি ফয়সাল কিছু একটা বোধহয় বললেন তপুকে।

তপু বর্মন জার্সি খুলে ফেলছেন। সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছেন কয়েকজন খেলোয়াড়। তপু বর্মন হাটু গেঁড়ে হাত দিয়ে গুলি করার ভঙ্গি করলেন। অদৃশ্য গুলি খেয়ে সামনে দাঁড়ানো সবাই যেনো মারা যাচ্ছে এই ভঙ্গিতে পড়ে যাচ্ছে। এই সেলিব্রেশন দেখে গায়ের লোম দাঁড়িয়ে গেছে! একাত্তরকেই মাঠের পর্দায় নামিয়ে এনেছেন তপু বর্মন, ওয়ালি ফয়সাল, সাদ, সুফিল, জামাল, মামুনুলরা।

যদিও জার্সি খুলে সেলিব্রেশন করার জন্য হলুদ কার্ড খেয়েছেন তপু, কিন্তু তপু তার জন্য একটুও অনুতাপে ভুগছেন না। বরং দর্শকদের দিকে দুই হাত ছড়িয়ে ‘জাগো সবাই জাগো’ ভঙ্গিতে উজ্জীবিত করার চেষ্টা করছিলেন। দর্শকরাও প্রবল চিৎকারে স্বাগত জানিয়েছে এই উদযাপনকে। এই উজ্জীবন যেন বাংলাদেশ ফুটবলের‍, বাংলাদেশের দৃষ্টিভঙ্গির গভীরতার!

*

একটু পেছনে রিওয়াইন্ড করা যাক। বেশি পেছনে না, মাসদুয়েক আগের ২০১৮ বিশ্বকাপ।

সুইজারল্যান্ড বনাম সার্বদের ম্যাচ। শাকিরি সেদিন নিছক ফুটবল খেলেননি, শাকিরির রক্তে জ্বলছিল রক্তপাতের আগুন। ইতিহাস নিয়ে যারা একটু নাড়াচাড়া করেন তারা সার্ব গণহত্যার ইতিহাস জানেন। ইউরোপের ইতিহাসে হিটলারের পরেই সবচেয়ে নির্মম যে গণহত্যা সেটা সার্বরা করেছিল বসনিয়া, কসোভা আর আলবেনিয়ানদের উপর। শাকিরি সেদিন এক পায়ে কসোভার পতাকার ট্যাটু লাগিয়েছেন। মাঠজুড়ে দাপিয়ে বেড়িয়েছেন। ধারাভাষ্যকারও বেশ কয়েকবার শাকিরির রিফিউজি ইতিহাস বলেছেন সংক্ষেপে। সব মিলিয়ে ম্যাচটা আর সুইস-সার্ব ছিল না। খেলাটা হয়ে গেছে সার্বিয়া বনাম গণহত্যার শিকার সেই হাজার হাজার বসনিয়ান, কসোভানদের। বাস্তুহারা এসব মানুষদের একজন এই জাদরান শাকিরি।

 

শাকিরি একা মাঠে খেলেননি। তার সাথে খেলেছিল সমস্ত কসোভা, আলবেনিয়া আর বসনিয়ার মানুষ। তার পায়ে বল পড়লে আনন্দে চিৎকার করেছে সবাই। বিপরীতে তার প্রতিটা দৌঁড় সেল হয়ে বিঁধেছে সার্বিয়ানদের বুকে। তিনি সেটা বুঝেছেন, অনুভব করেছেন। এজন্যই গুরুত্বহীন ম্যাচে শাকিরি গোল করার পর জার্সি খুলে করেছিলেন উগ্র সেলিব্রেশন। সার্বিয়ান দর্শকদের সামনে গিয়ে করেছেন কোনো একটা ইংগিত। জার্সি খুলে হলুদ কার্ড দেখেছেন। গোল করার পর সুইস দর্শকদের দিকে না গিয়ে দৌঁড় দিয়েছেন সার্বদের দিকে। তার বাবা সার্ব জেল খাটা মানুষ। তিনি যতটা না আনন্দ দিতে চেয়েছেন সুইসদের, তারচেয়ে বেশি বিষ দিতে চেয়েছিলেন সার্বদের বুকে।

*

বাংলাদেশ দলের এই সেলিব্রেশন করার পেছনের ভাবনা কি সেটা হয়তো পরে জানা যাবে। কিন্তু অন্ধকারের অমানিশা কাটিয়ে বাংলাদেশ ফুটবল যে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে, সেই পথে আজ যখন পাকিস্থানকে হারিয়ে এই সেলিব্রেশন করলো বাংলাদেশ- তাতে বোঝা যায় এখনো আমাদের রক্তে একাত্তর। যারা পাকিস্থানের পক্ষে সাফাই গায়, তাদের মুখে থুথু হয়ে এসেছে এই অসাধারণ গোল উদযাপন। খেলার সাথে যারা রাজনীতি মেশাবেন না বলেন, তাদের জন্য জবাব হয়ে এসেছে এই উদযাপনটি।

ফুটবলে এমন উপলক্ষ্য আবার কবে আসবে আমরা জানি না। সেই পর্যন্ত এই ‘হোয়াট্টে সেলিব্রেশন’ অনুভূতিটি জারি থাকুক। জারি থাকুক হৃদয়ে একাত্তর ও বাংলাদেশ ফুটবলের প্রতি ভালবাসা।

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close