ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

এদেশে ধর্ম যার যার, উৎসব কি সত্যিই সবার?

আচ্ছা, ধরা যাক সামনের বুধবার পবিত্র ঈদুল ফিতর। আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো বন্ধ নেই। ক্লাস যথারীতি চলবে এবং এ নিয়ে তেমন কারও মাথাব্যাথাও নেই।

শুধু পড়বেন না, ভাবুন চোখ বন্ধ করে। কেমন অনুভূতি হচ্ছে? নিজেকে খুব ক্ষুদ্র মনে হচ্ছে না? মনে হচ্ছে না যে আপনার ধর্ম, আপনার বিশ্বাস, আপনার উৎসব কোনোকিছুর গুরুত্ব আপনার প্রিয় স্বদেশে কারো কাছেই নেই?

ঈদের দু’দিন আগে আপনি ভাবলেন বিশ্ববিদ্যালয় বরাবর আপনার ন্যায্য অধিকারবলে মুসলিম সম্প্রদায়ের সবাই মিলে একটা দিন ছুটির দরখাস্ত করবেন, যেন বৃহস্পতিবারের বন্ধটি পেলে সবাই অন্তত তিনটি দিনের বন্ধ পান এবং রবিবার থেকে ক্লাস আবার শুরু করতে পারেন।

উত্তরে পেলেন, আপনাদের বলা হচ্ছে ক্লাস ক্লাসের নিয়মেই চলবে। তবে মুসলীম ছাত্ররা চাইলে তারা যেতে পারবে, তারা এটেন্ডেন্স পাবে। বাকিদের ক্লাস নিয়ম মতোই চলবে।

এখন কেমন লাগছে?

আপনার সবচাইতে বড় ধর্মীয় উৎসবের আনন্দ নিজ দায়িত্বে কেবল আপনাকেই ভোগ করতে হবে? একবারও কি মনে আসবে না যে, আপনি হয়তোবা সমাজের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ? তা নাহলে আমার ন্যায্য একটা ছুটি কেন পাচ্ছিনা। কেন শিক্ষকেরা কঠিন মুখ করে বলবেন, “গেলে যাও। আমি কি করবো?”

বিশ্বাস করুন, যতটা শান্ত হয়ে এই মুহুর্তে আপনি এখন আছেন এবং আমার এই ষ্ট্যাটাস পড়ছেন, সত্যিই যদি এমন ঘটনা ঘটে, আপনি শান্ত থাকবেন না। তাহলে কিভাবে আশা করেন এইসব ছোট ছোট অগ্রাহ্য আচরনের পরে অমুসলীম সম্প্রদায়ের মানুষগুলো দিনশেষে মন থেকে এই ভূমিটাকে ভালোবাসতে পারে?

অথচ এই রাষ্ট্রের জন্মযুদ্ধে এ ভুমিতেই খুঁজে খুঁজে মারা হয়েছে নিরপরাধ হিন্দুদের। তাদের অপরাধ ছিল, তারা দেশভাগের সময়ে বাকিদের মতন চতুর হয়ে ভারতে চলে যাননি বরং ভালোবেসে পাকিস্তানের মতন ইসলামিক একটি দেশে থাকার স্পর্ধা দেখিয়েছিলেন।

প্রসঙ্গ আরো জটিল হওয়ার আগেই ছুটিতে ফিরে যাই।

বেশিরভাগ বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে দূর্গাপূজার বড় ছুটি নেই। কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয় দিলেও তারা এত প্রচন্ড অনিচ্ছা নিয়ে দেয়, যা তাদের আচরনেও টের পাওয়া যায়। এই দূর্গাপূজায় আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে বড় ভাই-বোনদের কাউকে দেখছি, অসহায়ের মতন স্যারদের কাছে আবেদন করে ছুটি চাচ্ছেন, কেউবা ছুটি দিচ্ছে না বলে রাগ করে ক্লাস বাদ দিয়েই বাড়ি যাবার পরিকল্পনা করছেন, কেউবা দূর্গাপূজায় তার বাড়ি যাওয়া হবেনা সে কষ্ট নিয়েও পরের উইকে কুইজ হবে তার জন্যে পড়াশুনা করছেন।

বাংলাদেশে মুসলিমরা সংখ্যাগরিষ্ঠদের দলে, তাই আমরা ঈদের দুটো বড় বড় ছুটি পাই। ঈদের এক সপ্তাহব্যাপী সেলফি উৎসব চালাই, রাতে মুরগীর রান চাবাতে চাবাতে মনযোগ দিয়ে ঈদের সিনেমা নাটক দেখি, এরপর এক সপ্তাহ ভরপেট খেয়ে-ঘুমিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসি। কিন্তু, পূজোয় কেন অন্তত একদিনের ছুটি দেবে না, তা নিয়ে আমরা কথা বলি না। হিন্দু ধর্মালম্বী ভাইবোন অথবা ক্লাসমেটদের পাশে কক্ষনো দাঁড়াই না। গম্ভীরমুখে বলি, কি আর করবি? বাদ দে। অথবা, ভাই এইটা বাংলাদেশ। বাদ দেন!

না ভাই, বাদ দেয়ার কিছু নাই। দিন যতোই যাচ্ছে এটা কালচারে পরিনত হচ্ছে। তারা কেন একা হয়ে যাবে? আমরাও কেন দল বেধে যাবো না? বাংলাদেশ তো কখনোই এমন হওয়ার ছিল না। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের এককোটি অমুসলিমদের প্রসঙ্গ ধরে সৌদি বাদশাকে বলেছিলেন, “এক্সলেন্সি পরম করুনাময় আল্লাহপাক তো শুধু আল মুসলেমিন নন, তিনি তো রাব্বুল আলামীন। আমাদের সবার সৃষ্টিকর্তাই তো তিনি।” জয় বাংলার পরে এই মানুশটা এক নিঃশ্বাসে বলতেন খোদা হাফেজ।

সমস্যা হচ্ছে, বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর মোটা একটি অংশ “জয় বাংলা” শ্লোগানটা হিন্দুয়ানী শব্দ বলে আপত্তি করেন। কিন্তু তারপর যে “খোদা হাফেজ” বলতেন তা তারা শুনেও না শোনার ভান করেন। এই এরাই পাশের দেশ ভারতে যখন কোনো বিজেপী নেতার মুসলমানদের দেশ থেকে বের করে দেয়ার হুমকি নিউজে দেখে মুহুর্তের মধ্যে তা শেয়ার দিয়ে বলে, মালোয়ানরা কত খারাপ দেখেন। আবার, এরাই ঈদের ছুটিতে খোজ করবে, এই ঈদে ইন্ডিয়াতে কি কি মুভি রিলিজ পাইছে? দেশ যদি কোনোদিন পেছন দিকে যাত্রা শুরু করে এরা দায়ী থাকবে। এদের উগ্রতা দায়ী থাকবে।

হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অগ্রিম পূজার শুভেচ্ছা। সবাই ভাল থাকবেন, সুস্থ থাকবেন। শুভকামনা!

বিঃদ্রঃ ‘ধর্ম যার যার উৎসব সবার’ বক্তব্যটি সম্ভবত এখনও স্রেফ রাজনৈতিক কারনেই বলা হয়। মানবিক আর হতে পারছি কই। দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে এবারও পূজা আসতে না আসতেই শুনতে হচ্ছে, প্রতিমা ভাঙার সংবাদ।

আরও পড়ুন-

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close