মনের অন্দরমহলরিডিং রুম

এই দেশ হায়েনাদের, এহসানদের নয়!

এহসানের কথা মনে আছে? নাম মনে না থাকলেও, ছবিটা দেখে চিনতে পারছেন নিশ্চয়ই। সেই এহসান, দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে পড়ার স্বপ্ন পূরণ করে হাজার হাজার ছেলেমেয়েকে পেছনে ফেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় কৃতকার্য হয়েছিল যে ছেলেটা। সেই ছেলেটার স্বপ্নগুলোকে কাঁচের মতো ভেঙে দিয়েছিল ‘ছাত্র’ নামধারী কিছু কুলাঙ্গার।

পিটিয়ে এহসানকে নির্মমভাবে আহত করেছিল তারা, এহসানের ভাঙা স্বপ্নগুলো জোড়া লাগেনি আর কখনও। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফেরার ইচ্ছে বা সাহস, কোনটাই তার আর হয়নি, এহসান পাড়ি জমিয়েছে মালয়েশিয়ায়, সেখানে একটা বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে সে। আর যারা এহসানকে তুচ্ছ একটা কারণে পিটিয়ে আধমরা করে ফেলেছিল, যাদের জন্যে এহসানের প্রাণ সংশয়ে পড়েছিল, তারা এখনও দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়। কেন জানেন? কারণ ওদের গায়ে ছাত্রলীগের সীল বসানো আছে!

এদেশের প্রত্যেকটা স্কুল বা কলেজপড়ুয়া ছেলেমেয়ের স্বপ্ন থাকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার। এহসানেরও সেই স্বপ্ন ছিল। স্বপ্নকে সত্যি করতে তো সবাই পারে না, এহসান পেরেছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ বিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগে ভর্তি হয়েছিলেন তিনি। প্রথম বর্ষ শেষ করে দ্বিতীয় বর্ষের ক্লাসও শুরু করে দিয়েছিলেন এহসান। কিন্ত তার জীবনেই যে আচমকা এমন দুর্যোগ নেমে আসবে, সেটা হয়তো তার কল্পনাতেও ছিল না। 

এহসান রফিক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, সলিমুল্লাহ মুসলিম হল, ছাত্রলীগের হামলা

এহসান ছিলেন স্যার সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের আবাসিক ছাত্র। ছাত্রলীগের হল শাখার সহ-সম্পাদক ওমর ফারুককে ক্যালকুলেটর ধার দিয়েছিলেন এহসান। তিন মাসেও সেটি ফেরত না দেওয়ায় গত ৬ ফেব্রুয়ারি রাতে দুজনের কথা-কাটাকাটি ও হাতাহাতি হয়। পরে রাত দুইটার দিকে এহসান পড়ার কক্ষ থেকে বিছানায় যাওয়ার সময় ছাত্রলীগের হল শাখার সহসভাপতি আরিফুল ইসলাম তাকে টেলিভিশনের কক্ষে ডেকে নিয়ে যান। সেখানে কমিটির জ্যেষ্ঠ বেশ কয়েকজন নেতা মিলে তাঁকে প্রায় দেড় ঘণ্টা নির্যাতন শেষে হল থেকে বের করে দেন। এ সময় ফটকের কাছে ওমর ফারুকের নেতৃত্বে তাকে আবারও মারধর করা হয়। এতে এহসানের একটি চোখ মারাত্মক জখম হয়। তার কপাল ও নাক ফেটে রক্ত বের হয়। এ ঘটনায় হল কর্তৃপক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে।

গুরুতর আহত এহসানকে নিয়ে তার পরিবার উন্নত চিকিৎসার জন্যে দেশে-বিদেশে নানা জায়গায় নিয়ে গিয়েছে। একটা সময় তো শঙ্কা জেগেছিল, আহত চোখে এহসান আর কখনও দেখতে পাবেন কিনা সেটা নিয়ে। ভারতের শঙ্কর নেত্রালয়ে একদফা অস্ত্রোপচারের পরে খানিকটা সুস্থ হন এহসান। এরপরে আবারও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরতে চেয়েছিলেন তিনি। নিরাপত্তাজনিত কারণে হল পরিবর্তনের আবেদন করেছিলেন এহসান। কিন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাকে হল পরিবর্তন করতে দেয়নি। যে হলে এহসানকে নির্মমভাবে পেটানো হয়েছে, যারা পিটিয়েছে তাদের চোখের সামনেই এহসানকে থাকতে হবে, এটাই নাকি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম! 

এহসান রফিক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, সলিমুল্লাহ মুসলিম হল, ছাত্রলীগের হামলা

এহসানের ওই ঘটনার পরে হল কর্তৃপক্ষের তদন্তের পরিপ্রেক্ষিতে গত ফেব্রুয়ারি মাসেই সলিমুল্লাহ মুসলিম হল শাখা ছাত্রলীগের সহসম্পাদক ওমর ফারুককে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এ ছাড়া উর্দু বিভাগের মেহেদী হাসান হিমেল, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের রুহুল আমিন ব্যাপারী, দর্শন বিভাগের আহসান উল্লাহ, সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সামিউল হক, লোকপ্রশাসন বিভাগের ফারদিন আহমেদকে দুই বছরের জন্য বহিষ্কার করা হয়েছিল। তারাও প্রত্যেকে হল শাখা ছাত্রলীগের পদধারী নেতা বলে জানা গেছে। শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী এবং হল শাখার সহসভাপতি আরিফুল ইসলামকে এক বছরের জন্য বহিষ্কার করা হয় তখন।

অনেকেই বলে থাকেন, ঢাকা বা অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের অপকর্মের জন্যে যেসব বহিস্কারাদেশ দেয়া হয়, সেগুলো সবই নাকি লোকদেখানো, অনেকটা আইওয়াশ টাইপের। যারা এই কথাটায় বিশ্বাস করতে চান না, তারা চাইলে সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে গিয়ে কথার সত্যতা খুঁজে বের করতে পারেন। ওমর ফারুক নামের ছাত্রলীগের যে নেতা এহসানকে পিটিয়েছিল, সে এখনও এই হলের বারো নম্বর কক্ষে থাকে, কেউ তার টিকিও ছুঁতে পারেনি। বহিস্কারাদেশ পাওয়া সামিউলও এই কক্ষেই থাকে। আরিফুল ইসলাম নামে এই ঘটনায় বহিস্কৃত আরেক ছাত্র থাকে এই হলেরই ১৫২ নম্বর কক্ষে। সাংবাদিকতা বিভাগের রুহুল আমিন থাকে রুম নম্বর ১৭৮-এ।

শুনতে অদ্ভুত লাগছে? অবাক হবেন না। সবকিছু এভাবেই চলছে। সবাই এখানে শক্তের ভক্ত, নরমের যম। এহসান হল পরিবর্তন করে হলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে থেকে যেতে চেয়েছিলেন, নিজের সারাজীবনের স্বপ্নের এই জায়গাটা ছেড়ে যেতে চাননি। সেজন্যেই এসএম হল ছেড়ে অন্য কোথাও উঠতে চেয়েছিলেন। অন্য হলে ওঠার সুযোগ চেয়েছিলেন কর্তৃপক্ষের কাছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার কথা শোনেনি, তারা এহসানকে আইন দেখিয়েছে, নিয়মের বেড়াজালে বেঁধে রেখেছে তাকে। সেই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষই আবার বহিস্কৃত ছাত্রদের ব্যাপারে অসম্ভব উদার! একজন বহিস্কৃত ছাত্র কি করে হলে থাকতে পারেন, তারা এই বিষয়ে কিছু জানেনও না! যারা জানেন, তারাও ‘এই বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোন নির্দেশনা নেই’ বা ‘কাগজপত্র দেখে বলতে হবে’ বলে পাশ কাটিয়ে যান! 

এহসান রফিক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, সলিমুল্লাহ মুসলিম হল, ছাত্রলীগের হামলা

এহসানের বাবা তার ছেলেকে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছেন। টাকা খরচ হলে হোক, ছেলেটা প্রাণে বেঁচে থাকুক। দূরে থাকলে হয়তো খারাপ লাগবে, কিন্ত সামান্য একটা ক্যালকুলেটরের জন্যে সেখানে কেউ এহসানের নাক-মুখ ফাটিয়ে দেবে না, মেরে তাকে প্রায় অন্ধ বানিয়ে দেবে না। স্বপ্নভঙ্গের বেদনা নিয়েই মালয়েশিয়ার বিমানে চড়ে বসেছেন এহসান। কিংবা কে জানে, স্বপ্নগুলো হয়তো অনেক আগেই মরে কঙ্কাল হয়ে গেছে তার!

এহসান দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। আর যারা এহসানকে নির্মমভাবে মেরেছিল, আহত করেছিল, তারা বুক ফুলিয়ে হেঁটে বেড়াচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তারা ছাত্রলীগ করে, এটাই তাদের শক্তির উৎস এখন! ছাত্রলীগের রাজনীতি করাটা তো দোষের কিছু নয়, কিন্ত ছাত্রলীগের নাম ভাঙিয়ে প্রভাব খাটিয়ে অপকর্ম করাটা অবশ্যই দোষের। আর সেই দোষগুলোকে প্রশ্রয় দেয়াটাও অন্যায়। তারা এখন নেতাদের সাথে সেলফি তোলে, নবনির্বাচিত নেতাদের ফুলেল শুভেচ্ছা জানায়, সেসব ছবি আবার গর্ব করে ফেসবুকে আপলোড দেয়। সেই ছবিগুলোতে তাদের তেলতেলে হাসির নীচে হায়েনার মতো হিংস্র মুখটা চাপা পড়ে থাকলেও আমাদের চোখে পড়ে সেটা। এহসানের জন্যে আমাদের কষ্ট হয়, তবুও ভালো লাগে এটা ভেবে, এই পশুদের সঙ্গে তাকে থাকতে হচ্ছে না এখন আর…

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close