ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাচ্যের অক্সফোর্ড কথাটা বহুল ব্যবহৃত। এই ধারণা গড়ে উঠেছে কিভাবে? অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির কিছু বৈশিষ্ট্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিলো/আছে বলে এই ধারণা গড়ে উঠেছে মূলত।

১। হল এলোটমেন্ট, হলের সিট সমপরিমাণ ছাত্র ভর্তি করা হতো।
২। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে এফিলিয়েটেড কলেজ পরিচালনা।
৩। তিন বছরের অনার্স কোর্স সিস্টেম।
৪। অক্সফোর্ডের মতো সিলেবাস, গবেষণা, শিক্ষা পদ্ধতি।
৫। হাউজ টিউটর প্রথা, যেখানে শিক্ষকদের দায়িত্ব হলের ছাত্রদের পড়াশুনায় সাহায্য করা।

কিন্তু প্রাচ্যে কি একমাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ই অক্সফোর্ডের আদলে গড়া বিশ্ববিদ্যালয়? প্রাচ্যের অক্সফোর্ড মিথ আসলে অনেকেই গায়ে জড়াবার চেষ্টা করেছে, সচেতনভাবেই। কয়েকটা উদাহরণ দেই…

ভারতবর্ষের চতুর্থ প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম এলাহবাদ বিশ্ববিদ্যালয়। ভারতের উত্তরপ্রদেশে ১৮৮৭ সালের সেপ্টেম্বরে বিশ্ববিদ্যালয়টির যাত্রা শুরু হয়। ভারতে এই বিশ্ববিদ্যালয়টি সবচেয়ে বেশি পরিচিত ছিলো প্রাচ্যের অক্সফোর্ড হিসেবে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে কিছু এফিলিয়েট কলেজ আছে, আছে ছাত্রাবাসও।

আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়। উত্তরপ্রদেশের আলীগড় শহরে অবস্থিত বিখ্যাত এই আবাসিক ব্যবস্থাসংযুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়টি কলেজ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছে ১৯২০ সালে। স্যার সৈয়দ আহমদ খানের চেষ্টা, আলীগড় আন্দোলনের ফসল এই বিশ্ববিদ্যালয়। সচেতন ভাবেই আহমদ খান চেষ্টা করেছিলেন এটিকে অক্সফোর্ড-কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে গড়ে তোলার। তার চেষ্টা সফল হয়। সেই সময় ভারতে আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় প্রাচ্যের অক্সফোর্ড হিসেবে বিশেষিত হয়।

c বিহারের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়। একসময় এই বিশ্ববিদ্যালয়টিকেও প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বলা হতো। উপমহাদেশের সপ্তম প্রাচীন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয় ১৯১৭ সালে। বিশ্ববিদ্যালয়টির অধীনে ১০ টি এফিলিয়েটেড কলেজ আছে।

বিশ্ববিদ্যালয় এর উদাহরণ তো দিলাম কিন্তু ভারতবর্ষে অক্সফোর্ড প্রীতি এতোই বেশি যে গোটা একটি শহরকে এখানে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বলা হয়। শহরটির নাম পুনে।

পুনেকে শিক্ষানগরীও বলা যায়। যেহেতু শহরটাই প্রাচ্যের অক্সফোর্ড তাই এই শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উপরও ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ বিশেষণ আরোপ করা অস্বাভাবিক না। সেটি হয়েছে পুনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে। ৪৩৩ টি এফিলিয়েট কলেজ, ২৩২ টি গবেষণা ইন্সটিটিউট সহ বিভিন্ন ফিল্ডের পড়াশোনার কারণে এটিকে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বলা হতো।

এবার আমাদের দেশের একটি কলেজের কথা বলি। বরিশাল ব্রজমোহন কলেজ, বিখ্যাত এই কলেজটিকে সবাই সংক্ষেপে বিএম কলেজ বলে থাকে। প্রাচীন ও প্রথিতযশা এই কলেজটির শিক্ষার সার্বিক মান এতোই ভালো ছিলো যে একসময় এই কলেজটিকে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বা বাংলার অক্সফোর্ড বলা হতো। ১৮৮৯ সালে স্থাপিত এই কলেজটির ঐতিহ্য, ছাত্রাবাসের বৈশিষ্ট্য, শিক্ষার মান সব মিলিয়েই এটি ছিলো অনেকের ভালবাসার জায়গা।

এতো প্রাচ্যের অক্সফোর্ডের ছড়াছড়ি! এখন পরিনতি বলি। যারাই নিজেদের গায়ে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড ট্যাগ বসিয়েছে, তাতক্ষনিক সুনাম কুড়িয়েছে আজ সেই বিশ্ববিদ্যালয় ভালো নেই। সুনাম হারিয়েছে অনেকটা, হারিয়েছে শিক্ষার পরিবেশও।

এলাহবাদের মতো বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা রাজনৈতিক ভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। শিক্ষার পরিবেশ নেই আগের মতো। আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা পাটনা বিশ্ববিদ্যালয় কোনোটির ক্ষেত্রে কেউ এখন আর প্রাচ্যের অক্সফোর্ড শব্দটি ব্যবহার করে না। প্রত্যেকটি বিশ্ববিদ্যালয় যারা নিজেদের গায়ে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড মিথ গায়ে মাখিয়েছে বর্তমানে তারা তাদের গতিপথ হারিয়ে অনেক দূরে। হয়ত, ঐতিহ্য আছে, ইতিহাস আছে, নেই শিক্ষার মান। পিছিয়েছে আন্তজার্তিক র‍্যাংকিংয়ে, পিছিয়েছে গবেষণায়, পিছিয়েছে ছাত্রাবাসের মান।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে যারা অতি ঘন ঘন প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বলেন, তাদের বোঝা উচিত বস্তুত প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বলার মধ্যে বাড়তি কোনো গৌরব নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও আরো প্রাচ্যের অক্সফোর্ড ছিলো, আছে। তারা এখন না ধরে রাখতে পেরেছে তথাকথিত প্রাচ্যের অক্সফোর্ড ট্যাগ, না ধরে রাখতে পেরেছে স্বতন্ত্র।

আমি মনে করি, ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ শব্দবন্ধনীটি বর্তমানে একটি বাহুল্যতা, একটি বিলাসিতাও বটে। বিশেষত, বর্তমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ বলার মতো বৈশিষ্ট্য নেই।

হল আছে, মানুষ থাকছে বটে, চারজনের রুম গনরুম হয়ে বিশ জন থাকার ব্যবস্থা আছে বটে, সেটা কোনোরকমে মাথা গুঁজে চোখ বুজে থাকার ব্যাপার। এর বেশি কিছুই না। এইটুকু থাকার জায়গাও আপনি পাবেন না, যদি প্রথম বর্ষে কোনো ‘বড় ভাই’ আপনার না থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধ্য নাই আপনাকে থাকার জায়গা দেয়ার। তাছাড়া, আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈশিষ্ট্য এমনিতেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হারিয়েছে হলের সিটের চেয়ে অনেক গুণ বেশি ছাত্র ভর্তি করিয়ে, নতুন নতুন বিভাগ হয়, প্রতিবছরই ছাত্র বাড়ে। থাকার জায়গা বাড়ে না। আরো কমে।

হাউজ টিউটর বলে পদবি আছে, সম্মানজনক পদবি বটে, কিন্তু, তাদেরকে টিউটর হিসেবে ভূমিকায় হয়ত দেখার সৌভাগ্য বর্তমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আপনি পাবেন না।

তিন বছরের অনার্স সিস্টেম তো পাল্টিয়েছে অবধারিত ভাবেই, পালটে গেছে তার সাথে শিক্ষা পদ্ধতি, শিক্ষার মান। ওসব নিয়ে এখন অনেকেই কথা বলে, গবেষণা কেনো হচ্ছে না সেই আলোচনায় না’ই গেলাম। নাহয় না’ই বললাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশিরভাগ শিক্ষকদের পিইচডি ডিগ্রি নেই, এই বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন আর বিদেশীরা পড়তে আসে না, বিশ্ব তো দূরে থাক বিশ্ববিদ্যালয়টি নেই উপমহাদেশের শীর্ষ কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড হিসেবে মিথ বানানোর কোনো যৌক্তিক জায়গা নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য আছে। তাছাড়া, প্রাচ্যের অক্সফোর্ড ট্যাগ এর মধ্যে আলাদা কোনো গৌরব নেই। ঘুরে ফিরে গর্ব করে হয়ত বলবেন, আমাদের একসময় এই ছিলো, সেই ছিলো, তাই আমাদের প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বলা হতো/হয়। এগুলা বলা ছেড়ে এমন কিছু করে যাওয়ার চেষ্টা করা উচিত যেনো, সামনের প্রজন্ম উদাহরণ দেয়ার মতো নতুন কিছু খুঁজে পায়। আহমেদ ছফার একজন রাজ্জাক স্যার ছিলো, যাকে নিয়ে ‘যদ্যপি আমার গুরু’ লেখা যায়। এমন কোনো শিক্ষক আসুক যাকে নিয়ে এই প্রজন্মের কেউ বই লিখে যাবে। অনেক রাজনৈতিক আন্দোলনের উদাহরণ দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে মহিমান্বিত করতে করতে এখন আর নতুন কিছু বলার মতো খুঁজে পাওয়া যায় না। এবার শিক্ষা বিপ্লব হোক, একটা কলম আন্দোলন হোক, যেখান থেকে ঘুরে দাঁড়াবে আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান। একজন গবেষক আসুক, একজন উদ্যোক্তা আসুক, একজন সাহিত্যিক আসুক, একজন নেতা আসুক যার উদাহরণ পরের প্রজন্ম মনে রাখবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সামান্য ছাত্র হিসেবে বলতে বাধ্য হচ্ছি, অতীতের উদাহরণ দিতে দিতে আমাদের স্বভাব খারাপ হয়ে গেছে। অতীতের কথা বলে বর্তমানের খারাপ সময়ের কথা ভেবে হতাশ হতে হতে আমাদের অভ্যাস খারাপ হয়ে গেছে। আমরা সবসময়ই আশা করি এমন কেউ আসুক যে পরিবর্তন নিয়ে আসবে, এমন কেউ আসবে যাকে নিয়ে আবার গর্ব করা যাবে। স্মৃতিচারন আর অপেক্ষার চক্রে আমরা আটক। হয় নতুন উদাহরণ হও, নাহয় নির্লজ্জের মতো স্মৃতি চাবানো পরিহার করো। আসল অক্সফোর্ড তো সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে, আর প্রাচ্যের অক্সফোর্ড এখনো ইতিহাসের পাতায় আটকে আছে। এখন হোক নতুন ইতিহাস রচনা, প্রাচ্যের অক্সফোর্ড না, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিচিত হোক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবেই।

সূত্র-

Comments
Spread the love