কমলাপুর রেল স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম নম্বর ৫। অাজ সকা‌লের কথা। নারী শিশুসহ নানা বয়সের মানুষ হাঁটছে ট্রেনে উঠতে বা নামতে। দারুন চেহারার দুই ভদ্রলোক সিগারেট ফুঁকছে। আমি পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় দেখে বললাম ভাই আপনাদের মতো শিক্ষিত ভদ্র মানুষ যদি এইভাবে স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে সিগারেট খায় তাহলে অন্যরা কী করবে?

হঠাৎ এমন প্র‌শ্নে একজন কিছুটা বিব্রত। আরেকজন উল্টো বললেন, আমরা সিগারেট খাচ্ছি। কিন্তু স্টেশনের কেউ এসে তো মানা করছে না। আমি বললাম মানা করতে হবে কেন? আপনার নিজের এই বোধটুকু নেই? এবার চুপ থাকা ভদ্রলোক বললেন আচ্ছা ফেলে দিচ্ছি। আমি দাঁড়িয়ে থাকলাম। তারা সিগারেট ফেললো। আমি ধন্যবাদ দিয়ে হাঁটা শুরু করলাম।

আপনাদের কাছে মনে হতে পারে এটা ছোট্ট একটা ঘটনা। কিন্তু এই এক ঘটনা দিয়ে আমি পুরো বাংলাদেশ বিশ্লেষণ করতে পারবো।

শুরু করি ব্যক্তি থেকে। যে দুই ভদ্রলোক সিগারেট খাচ্ছিলেন তাদের মতোই আমাদের দেশের বেশিরভাগ মানুষ। সুযোগ পেলেই আমরা আইন ভাঙি কিংবা আইন মানি না। আর শিক্ষিত প্রভাবশালী হলে তো কথাই নেই। আমরা কথায় কথায় বলবো এই দেশ রাষ্ট্র সমাজ সব ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। কোথাও আইনের শাসন নেই। যে কোন আড্ডায় গেলে এটাই সাধারণ আলাপ।

সেদিন এক আড্ডায় এক ভদ্রলোককে কোনভাবেই বোঝাতে পারলাম না আমরা নিজেরা ভালো হলে দেশটা ভালো হয়ে যেতো। কিন্তু সমস্যা হলো আমি নিজে ভালো হবো না। কিন্তু আশা করবো দেশের সবাই ভালো হবে। এটা কী ক‌রে সম্ভব?

যার সা‌থে অাড্ডা হ‌চ্ছিল কম্পিউটার প্রকৌশলী সেই ভদ্রলোক এই দেশের পুলিশ বিচারক সাংবাদিক রাজনীতিবিদ সবাইকে গালি দিলেন। সবাই নাকি অসৎ। আমি বললাম ভাই এই দেশের রাজনীতিবিদ, বিচারক কেউ বিদেশ থেকে আসে না। আমার আপনার আত্মীয় সবাই। একটা দেশের মানুষ যেমন সেই দেশের নেতা, বিচারক, সংবাদিক পুলিশ এমনকি মসজিদের ইমামও তেমনই হবে।

ভদ্রলোককে পাল্টা প্রশ্ন করলাম সবাই খারাপ তা আপনি কেন ভালো না। কেন নিজে সৎ থাকেন না। তাঁর জবাব সৎ থাকতে গেলে, নিয়ম মানতে গেলে এই রাষ্ট্রে চলতে পারবো না। কারণ কেউ আইন মানে না। অার আমি একা মানলে কী হবে? জবা‌বে আমি বললাম এটাই আমাদের সমস্যা। আমরা সবাই ভাবি বাকিরা কেউ মানছে না। আমি কেন মানবো? আর রাষ্ট্র সমাজ ভালো নয়, এই যুক্তিতে আমি তো খারাপ হতে পারি না। ভদ্র‌লোক কোনভাবেই যুক্তি মানবেন না। তাঁর কথা এই দেশে কোন সিস্টেম নেই। আমি বললাম আচ্ছা তর্কের খাতিরে আপনার কথা মানলাম। কিন্তু আমাকে বলেন তো এই যে ভাই হয়ে আপন ভাইয়ের বিরুদ্ধে জমিজমার ভাগ নিয়ে মামলা হয় কেন?এখানে তা রাষ্ট্র সমাজের কোন দায় নেই? তিনি তখনো যুক্তি মানতে নারাজ।

এটাই আমাদের মূল সমস্যা। আমরা সবকিছুর জন্য আরেকজনের উপর দোষ চাপাবো। রাষ্ট্র সমাজকে দায়ী করবো। কিন্তু নিজেরা ভালো হবো না।

আবার কমলাপুর রেলস্টেশনে ফিরি। ওই যে দুই ভদ্রলোক প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে বাহাদুরের মতো সিগারেট খাচ্ছিলেন পাশ দিয়ে শত শত মানুষ হেঁটে গেলেও কেউ প্রতিবাদ করেননি। কেউ তাদের বলেলনি আপনারা কেন এখানে সিগারেট খাচ্ছেন? লোকজন কেউ প্রতিবাদ করেননি কারণ সবাই দায় এড়াতে চেয়েছেন। এভাবে সমাজে আমরা প্রতিমুহুর্তে দায় এড়াই। আমরা মনে করি আমার তো কোন ক্ষতি হচ্ছে না। আমরা বুঝতে চাই না এভাবে দায় এড়ানোর ফলে সমাজটা ধ্বংস হচ্ছে। আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য আমরা দূষিত অনিরাপদ এক পরিবেশ রেখে যাচ্ছি। তবুও আমাদের হুশ ফিরছে না।

আমি সবসময় বলি রাস্তায় খেলনা পিস্তল নিয়ে দাঁড়িয়ে একদিন কাউকে হুমকি দেন। পাশ দিয়ে শত শত লোক হেঁটে যাবে। কেউ ঠেকাবে না। সবাই ভাববে আমার তো কিছু হয়নি। আর আমি কেন নিজের ঝুঁকি নেবে? এই যে সবাই আমরা নিজের স্বার্থের কথা ভাবছি সে কারণে নিজেরা যে শুধু অনিরাপদ হচ্ছি না তাই না এই দেশটাকেও অনিরাপদ করছি।

এবার আসি আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ জায়গায়। আবারও সেই কমলাপুরে ফিরি। আমাদের আইন আছে স্টেশনে সিগারেট খাওয়া যাবে না। আইন বাস্তবায়নের জন্য রেল কর্তৃপক্ষ আছে। স্টেশনে সেখানে পুলিশ আছে। আছে সিসি ক্যামেরা। কিন্তু কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় কারও কোন সাজা হচ্ছে না। অথচ সিসি ক্যামেরা দেখে কিংবা প্রকাশ্যে অভিযান চালিয়ে দুজন ধুমপায়ীকে জরিমানা করলে তারা তো এ ঘটনা ঘটাতোই না অন্যরাও বার্তা পেয়ে যেতো। কিন্তু সেটি হচ্ছে না। আর এভাবেই আমাদের কর্তৃপক্ষ, রাষ্ট্র তার দায় এড়াচ্ছে। ফলে অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে না। আর পুরো ঘটনার যদি বিশ্লেষণ করি যে কোন আড্ডা বা বাস্তবতা থেকে দেখবেন সবাই বলবে তারা অপেক্ষায় আছেন এমন একজন নেতা আসবেন যিনি সব ঠিক করে ফেলবে। কিন্তু আমরা নিজেরা কেউ সেই নেতা হতে চাই না। অামরা নিজেরা রাজনী‌তি‌বিদ হ‌তে চাই না।

এই হলো গোটা বাংলাদেশের চিত্র। আমি কিন্তু এই দেশটা ঠিক করার মন্ত্র জানি। সবার আগে নিজে ভালো হতে হবে। নিজে সৎ থাকতে হবে। আমরা যদি নিজেরা ভালো থাকি নিজেরা সৎ থাকি নিজেরা আইন মানি তাহলে আশি শতাংশ সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। আর রাষ্ট্রের ওপর সমাজের উপর দায় চাপিয়ে কোনভাবেই আমি নিজে অসৎ হতে পারি না। আর আমি আপনি যখন নিজে সৎ থাকবো আমরা আরেকজনকে চ্যালেঞ্জ করতে পারবো। চ্যালেঞ্জ করতে পারবো রাষ্ট্রকে।

দ্বিতীয় বিষয় হলো আমাদের চোখের সামনে যে কোন অন্যায় হলে অনিয়ম হলো অসঙ্গতি হলে আমরা যেন প্রতিবাদ করি। আর সবার শেষে দায়িত্ব রাষ্ট্রের। রাষ্ট্র যদি ঠিক না হয়, শুধু আইন করে রাখে কিন্তু আইনের বাস্তবায়ন না করে, সুশাসন প্রতিষ্ঠা না করে তাহলে কখনোই দেশ আগাবে না।

আমি এখনো বিশ্বাস করি আমরা সবাই আমাদের যার যার কাজটা ঠিকমতো করলে, নিজে সৎ থাক‌লে দেশটা আগাবেই। কাজেই চলুন আরেকজনের উপর দায় না চাপিয়ে নিজেরা ভালো হই। ভালো থাকুক বাংলাদেশ।

Comments
Spread the love