Duel- ট্রাক যখন খুনি!

১৯৭১ সাল।

পরিচালক স্টিভেন স্পিলবার্গের এক সহকারী অলস সময় কাটানোর জন্য প্লেবয় ম্যাগাজিন পড়ছিলেন। সেখানে Richard Matheson এর লেখা একটি ছোট গল্প পড়ে তাঁর আক্কেলগুড়ুম হওয়ার জোগাড়! গল্প যে খুবই নতুন কিছু, সেরকম না, কিন্তু এমনভাবে গল্পটি লেখা হয়েছে, সেটাকে ঠিকমতো চিত্রনাট্যে রূপ দিতে পারলে ফাটাফাটি একটা জিনিস হতে বাধ্য! জলদি তিনি এই গল্পটা স্পিলবার্গকে দেখান। পরিচালক নিজেও অনেক পছন্দ করলেন গল্পটি।

শুভ কাজে দেরি করতে নেই দেখে সেই গল্পের লেখকের সাথে যত দ্রুত সম্ভব দেখা করলেন স্পিলবার্গ এবং তাকে এই গল্প নিয়ে নিজের সিনেমা বানানোর ইচ্ছার ব্যাপারে বললেন। তখন পর্যন্ত স্পিলবার্গের তেমন কোন নামডাক না শোনা গেলেও, ইতিপূর্বে স্পিলবার্গ কোন সিনেমা না বানালেও লেখক রাজি হয়ে গেলেন। স্পিলবার্গ তাকে জিজ্ঞাসা করলেন- এই গল্পের আইডিয়া আপনার মাথায় আসলো কীভাবে? জবাবে লেখক যা বললেন- সেটা চমকে যাওয়ার মত ব্যাপার! এই ধরনের একটি ঘটনা নাকি তার জীবনেই সত্যিকারে ঘটেছিল, সেটাকেই তিনি গল্প হিসেবে লিখেছেন।

গল্পের দিকে যাই একটু?

একজন অতি সাধারণ বিজনেসম্যান নিজের লাল রঙের গাড়িটি নিয়ে এক সকালে বের হলেন ব্যবসার কাজে। ক্যালিফোর্নিয়ার বিস্তীর্ণ মরুভূমির মাঝ দিয়ে চলা হাইওয়ে দিয়ে তিনি চলতে থাকলেন। হঠাৎ পেছন থেকে হর্নের শব্দ। রিভারভিউ মিররে তিনি দেখলেন- বিরাট সাইজের এক ট্রাক! তিনি ট্রাকটিকে সাইড দিলেন। তখনও তিনি জানতেন না যে তিনি কত বড় একটি ভুল করলেন সেদিন! পেছন থেকে সামনে চলে আসা ট্রাক তাকে আর সাইড দেয়না! তিনি যতই হর্ন বাজান না ক্যান, কোন ভ্রূক্ষেপ নেই সামনের ট্রাক ড্রাইভারের! অবশেষে স্পীড বাড়িয়ে তিনি ট্রাকের সামনে চলে আসলেন। নিজের ভেতরে একটা “বিশ্বজয়ীর” ভাবও চলে আসলো তার, নিজেকে সত্যিকারের পুরুষ মনে হতে থাকল নিজের গাড়ির চেয়ে বড় সাইজের একটি ট্রাককে হারিয়ে দেয়ার কারণে! কিন্তু এবার ফলাফল হল আরও ভয়াবহ!পেছনে থাকা সেই ট্রাক তাকে তার গাড়িসহ মেরে ফেলতে চাইল, বারবার পেছন থেকে এসে ধাক্কা দেয়া শুরু করল। অনেক চেষ্টা করেও এই ট্রাকের চোখে তিনি ধুলো দিতে পারলেন না। এখন কি হবে? আজকের দিনই কি তার শেষ দিন? নাকি তিনি বাঁচতে পারবেন এই দৈত্যাকৃতির ট্রাকের হাত থেকে?

duel

গল্প শুনে খুবই সাধারণ মনে হলেও, স্ক্রিন থেকে চোখ ফেরানোর সময় হয় না দুর্দান্ত স্ক্রিনপ্লে আর স্পিলবার্গের অসাধারণ পরিচালনার কারণে। মূল চরিত্রে ডাস্টিন হফম্যান ও গ্রেগরি পেকের কথা চিন্তা করা হলেও, শেষমেশ লাল গাড়ির চালক চরিত্রে অভিনয় করেন Dennis Weaver । মজার ব্যাপার হল, ট্রাক ড্রাইভারের চরিত্রে অভিনয়কারী একটি বারের জন্যও দেখানো হয়নি ৯০ মিনিটের পুরো এই সিনেমাতে! ওহ, আসল কথা তো বলাই হয়নি! এটা প্রথমে সিনেমা হিসেবে রিলিজ পায়নি, টিভিতে রিলিজ পেয়েছিল টিভি মুভি হিসেবে। সিনেমা বানানোর মত সময় আর বাজেট তখন স্পিলবার্গের ছিল না। কিন্তু টিভিতে দেখার পরে ইউনিভার্সাল এর মত বড় কোম্পানি এগিয়ে আসে এটিকে সিনেমা হিসেবে রিলিজ দেয়ার জন্য। টিভি মুভিটি ছিল ৭৫ মিনিটের, সেটার সাথে আরও কিছু দৃশ্য যোগ করে ৯০ মিনিট বানিয়ে অবশেষে এটিকে থিয়েট্রিকাল রিলিজ দেয়া হয়।

সিনেমার পুরোটাই শুট করা হয়েছে রিয়েল লোকেশনে। ১২ দিনে সম্পূর্ণ শুট শেষ করে বাকি চারদিনে পোস্ট প্রোডাকশনের সব কাজ করে -মোট ১৬ দিনে সিনেমাটি শেষ করে কম সময়ে দারুণ সিনেমা বানানোর ক্ষেত্রে পরিচালক স্পিলবার্গ দারুণ এক দারুণ উদাহরণ স্থাপন করেন।

আপাত দৃষ্টিতে সাধারণ সিনেমা মনে হলেও, অনেক সমালোচক এর ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। অনেকে এই সিনেমাতে অনেক লুকানো মেসেজ খুঁজে পেয়েছেন। অনেকের মতে, যান্ত্রিকতার ক্রমশ আগ্রাসন এই সিনেমাতে খুনি ট্রাকের মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে। অনেকের মতে, সবলের উপরে দুর্বলের অত্যাচার এই সিনেমাতে স্পষ্ট। অনেকে আরও গভীরে গিয়েছেন- লাল গাড়ি চালকের ভূমিকায় অভিনয় করা ডেনিস বারবার দৈত্যাকৃতি ট্রাকের ড্রাইভারকে হারানোর চেষ্টা করে বা তার সাথে ইঁদুর বিড়াল খেলা খেলে নিজের পুরুষত্ব প্রমাণের চেষ্টা করছিলেন। অর্থাৎ অনেক সমালোচকই এই সিনেমাতে gender performativity কে খুঁজে পেয়েছেন।

সমালোচকেরা হয়ত আরও কিছু খুঁজে পাবেন বা না পেলেও হয়ত আরও কিছু খুঁজতে থাকবেন। আমরা আমজনতা না হয় অন্য একটি মজার জিনিস জেনে আসি সিনেমাটি সম্পর্কে।

স্পিলবার্গ এই সিনেমার গল্পের লেখককে জিজ্ঞাসা করেছিলেন- আপনি তো বললেন, এই ঘটনাটি আপনার সাথে ঘটেছিল, মানে সত্যিকারের একটি ঘটনা। আপনি কি বলতে পারবেন ঘটনাটি কবে ঘটেছিল?

লেখক বললেন- ২২ নভেম্বর, ১৯৬৩

২২ নভেম্বর যাদের জন্মদিন নেই বা এই তারিখে কোন স্পেশাল স্মৃতি যাদের জীবনে নেই, তাদের কাছে আপাতদৃষ্টিতে এই তারিখকে নিরীহ মনে হলেও, এই তারিখটি আমেরিকার মানুষদের জন্য বেশ স্পেশাল! কেন?

কারণ এই দিনে প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডিকে গুলি করে হত্যা করা হয়!

জি হ্যাঁ, পৃথিবী অনেক রহস্যময়!

আপনার কাছে কেমন লেগেছে এই ফিচারটি?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-