হুট করেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ(ডাকসু) আবারো আলোচনায় চলে এসেছে। এমনিতে ডাকসু বিভিন্ন সময় আলোচনার কেন্দ্রে ছিলো। ২৬/২৭ বছর বন্ধ থাকা মরা ডাকসু মাঝে মধ্যেই জিন্দা হয় বিভিন্ন সুর নিয়ে। এবারের চলতি সুর হচ্ছে, ডাকসুর নির্বাচন দিতে হবে। এই সুর মাঝে মধ্যেই উঠে। কিন্তু শ্রোতা না থাকায় প্রতিবারই মার খায়। এবার যখন ভিসি চত্বরে ভিসি মহোদয়ের বাসভবনের সামনে এক ভদ্রলোক যার বয়স ত্রিশ ছাড়িয়েছে, সে বিবিধ বস্তু সাথে করে নিয়ে এসে সেখানে একটু তাবু গেঁড়ে বসেছে, এবং ঘোষণা দিয়েছে এটা একপ্রকার অনশন, ডাকসুর দাবিতে অনশন তখন আবার মরা ডাকসুর টপিক জিন্দা হয়েছে।

সাধারণত, বিশ্ববিদ্যালয়ে এই ধরণে টপিকের আনাগোনা হলে বাম দলগুলো খুশি হয়। এবারো তা’ই হয়েছে। বামদলগুলো ডাকসুর দাবিতে মানুষটার সাথে একাত্মতা পোষণ করেছে। তবে, বামদলের প্রতিনিধিরা কতবেলা খাদ্যদ্রব্য বর্জন করেছে এটা অবশ্য মিডিয়াতে আসেনি। বামদলগুলোর ডাকসুর দাবির প্রতি একনিষ্ঠতা ক্যাম্পাসে কারো অজানা নয়। এমনো হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে বামদল ডাকসুর দাবিতে মিছিল করার জন্য স্কুল কলেজের ইউনিফর্ম পড়া বহিরাগত ছেলেপেলেদেরও নিয়ে এসেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এই মুহুর্তে কেউ আসলে এখনো কিছু ভবনের দেয়ালে বাম দলের স্লোগান লেখা দাবি চোখে পড়বে। তার মধ্যে খুব কমন একটা দাবি হচ্ছে, সান্ধ্যকালীন কোর্স সমূহ বন্ধ করতে হবে। অসাধারণ দাবি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সান্ধ্যকালীন কোর্সগুলোর কারণে শিক্ষকদের যে বাণিজ্য ও ধানাই পানাই করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে এবং এতে যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষতি হচ্ছে একথা বলাই বাহুল্য। কিন্তু দুঃখজনক হচ্ছে, উত্তম মধু মধু কথা আজকাল বিশ্বাস হয় না। কারণ, যাদের উত্তম কথা বলতে শুনেছি তারাই নীতিহীন কাজ কর্ম বেশি বেশি করে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক একবার ক্লাসে নীতির বয়ান দিচ্ছেন। তিনি বললেন, তোমরা ইয়াং পোলাপান। লিফট ব্যবহারের কি দরকার। লাইনে দাঁড়িয়ে সময় নষ্ট না করে হেটেই তো উঠতে পারো। আমি নিজেও তো পাঁচ তলা ছয় তলা হেঁটে উঠি। তার বয়ান চমৎকার শোনালো। তারপর একদিন, আমি নিচতলা থেকে দুই তলা যাবো ডিপার্টমেন্টে। ম্যাম দাঁড়িয়ে আছেন লিফটের সামনে। শিক্ষক বলে তার অগ্রাধিকার। লিফট আসলেই ঢুকে যাবেন। লিফট আসলো। এতো গ্যাদারিং এর মধ্যেও তিনি উঠলেন। দেখে শ্রদ্ধাবোধ হলো। হয়ত অনেক উপরে যাবেন। অনেক উপরে বলতে দশ তলার উপরে যেতে পারবেন না। বিল্ডিংটাই দশ তলা। এইদিকে আমি হেঁটে দুইতলা গেলাম। গিয়ে দেখি শ্রদ্ধেয় শিক্ষক দুইতলাতে লিফট থেকে নামছেন। কি অসাধারণ দৃশ্য! ক্লাসে বলা কথাগুলো মনে পড়ে গেলো।

যাই হোক, বাম দলের অবস্থা সেই শিক্ষকের থেকে কোনো অংশে যে ভালো সেটা বলতে পারি না। বাম দল বিচ্ছিন্ন দাবি নিয়ে প্রায়ই ক্যাম্পাসে মাইক দিয়ে হাউ কাউ করে। ক্লাস চলাকালীন সময়ে আমরা পড়া বাদ দিয়ে তাদের দাবি শুনি। প্রগতির বাণী বড় মিঠা। কিন্তু, সাধারণ ছাত্রদের অংশগ্রহণ নেই বলে তাদের এই বিচ্ছিন্ন দাবিগুলো খুব একটা জনপ্রিয়তা পায় না। যাই হোক, সেই লোকটা যখন অনশনে নামলো তখন বাম দল সুযোগ কাজে লাগালো। তারা গান টান করলো। নাচানাচি করেছে কি না সেটা অবশ্য জানা যায়নি। কিন্তু, তাদের এইটুকু বোঝা উচিৎ ছিলো যে ডাকসুর দাবিতে অনশন যিনি করছেন তিনি তো এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের না। তিনি কে? ওয়ালিদ আশরাফ নামক মানুষটি হয়ত বিবেকবান। কিন্তু, তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত ছাত্র না। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সান্ধ্যকালীন কোর্সের ছাত্র। বয়স ও ম্যালা মানুষটার। অথচ, বাম দল সবসময় বলে এসেছে, তারা সান্ধ্যকালীন কোর্সের বিরুদ্ধে।

ডাকসু কাদের জন্য? ডাকসুর দাবি কারা তুলবে? কেনো তুলবে?

ডাকসু মূলত খিচুড়িপ্রেমীদের জন্য। এটি একটি ঝলসে যাওয়া হলুদ রং এর দুইতলা ভবন যেখানে দুপুর বেলা সুলভ মূল্যে (২০ টাকায়) খিচুড়ি খাওয়া যায়। খিচুড়ির বিশেষত্ব হচ্ছে, এতে এক টুকরা হাড্ডি দেয়া হয় যাকে অনেকে মাংস বলে। ফুড ব্যাংকে এই খাবারটির রিভিউ দিয়ে ইতিমধ্যে অনেকে জনপ্রিয় হয়েছেন। রিভিউ দেখে খেতে এসে অনেকে হয়েছেন বোকাচন্দ্র। এছাড়া, এক টাকার গরম পানি পাওয়া যায় যাকে কেউ কেউ বলে থাকে রঙ চা।

তবে রুপকথা প্রচলিত আছে যে, বহু বছর আগে এটি ছিলো ছাত্রদের সংসদ। মানে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ। ১৯২২-২৩ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এই ছাত্র সংসদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো। তখন সংগঠনটি ছিলো অরাজনৈতিক এবং প্রতিটি ছাত্র ১ টাকা ফি দিয়ে ডাকসুর সদস্য হতে পারতো। ডাকসুর প্রথম জিএস ছিলেন যোগেন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত।

এই ফাঁকে একটা তথ্য দিয়ে রাখি, কুখ্যাত রাজাকার গোলাম আযমও ডাকসুর প্রোডাক্ট ছিলেন। এই রাজাকার ১৯৪৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ(ডাকসু)র জিএস ছিলেন। তখনকার ডাকসু’র ভিপি ছিলেন অরবিন্দ বোস।

বেশিদিন আগের কথা না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মারামারি করে দুই তিনটা লাশ ফেলার ইচ্ছা কামনায় সাদেক হোসেন খোকার সাথে ভাইবারে কথা বলা মাহমুদুর রহমান মান্নাও ডাকসু নেতা ছিলেন।

খোকার সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার এক পর্যায়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লাশ ফেলার পরামর্শ দিয়ে মান্না বলেছিলেন, “ধরেন, ইউনিভার্সিটিতে একটা মিছিল হলো। ধরেন যা মারামারি বাইরে হচ্ছে। ইউনিভার্সিটিতে মারামারিতে গেলো (প্রাণ) দুইতিনটা। কী করা যাবে? কিন্তু হল…আপনারা গভর্নমেন্টকে শেইক করে ফেললেন।”

ভাবতেই ঘৃণা লাগে এরা নাকি সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্ব করতেন ডাকসুর ব্যানারে!

ইঞ্জিনিয়ার শফিকুর রহমান অনু ইত্তেফাকের একটি প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে মন্তব্য করেন, “সুদূর অতীতের এবং নিকট অতীতের ডাকসুর নির্বাচিত বড়বড় নেতাদের রাজনৈতিক জীবন ও ইতিহাস মোটেই সুখকর নয়। যেমন, আশির দশকের ২বারের ডাকসুর ভিপি মান্নাভাই, ডাকসুর জিএস বাবলুভাই, ডাকসুর ভিপি সুলতান মোঃ মনসুর, ডাকসুর জিএস ডাঃ মোস্তাক ভাই, ডাকসুর ভিপি আমানুল্লাহ আমান প্রমুখদের বর্তমানকালের নীতিহীনতার, লোভী, সুবিধাবাদীতা, দুর্নীতির ইতিহাস আমরা সবাই জানি। এমনকি স্বাধীনতা উত্তর ডাকসুর ভিপি সেলিম ভাইয়ের হটকারী, নীতিহীনতার, লোভী, সুবিধাবাদী ইতিহাসও আমরা জানি।

আর আগের অনেক সাবেক ডাকসুর ভিপি-জিএস যেমন কুখ্যাত ও প্রমাণিত যুদ্ধাপরাধী গোলাম আজম, খুনী জিয়ার মন্ত্রী এস এ বারী এটি, আয়ুব–মোনায়েমের দালাল জুলমত আলী খান, বঙ্গবন্ধুর সাথে বেইমানীকরা কে এম ওবায়েদুর রহমান, বারবার দলবদল করা  সুবিধাবাদী রাশেদ খান মেনন, ফেরদৌস আহমেদ কোরেশী, নাজিম কামরান চৌধুরী, আসম রবদের নীতিহীনতার, লোভী, সুবিধাবাদীতার, দুর্নীতির ইতিহাসও সব বাঙ্গালী জানে।

তাই ডাকসু নির্বাচন হলেই যে আমরা সৎ, ভাল রাজনৈতিক নেতা পাব, তা একেবারে সত্য না।

ডাকসু হলেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্বর্গ হয়ে যাবে এমনটা কেউ বলতে পারে না। বরং, অতীতে ডাকসুর নেতাদের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ে তাণ্ডব হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছে নরক এমন উদাহরণ আছে।

নাম প্রকাশ অনিচ্ছুক একজন এই প্রসঙ্গে বলেন, “অতীতে ডাকসুর নির্বাচনের নামে ছাত্রহত্যা সহ, সকল প্রকার সহিংস হানাহানি দেখেছি। হলে বিজয়ী ছাত্রসংগঠনের একক আধিপত্য থাকে, তাদের ইচ্ছানুসারেই হলের সিট বরাদ্দ হয়। কোন কিছুরই পরির্তন হয় না ডাকসু নির্বাচনের মাধ্যমে। নব্বই দশকে ছাত্রদলের একক অধিপাত্যের কারণে অন্য সকল সংগঠনের ছাত্র-কর্মীদের হলের বাহিরেই থাকতে হয়েছিল, তাদের সন্ত্রাসী কর্মকান্ড কোন অংশেই কমছিল না এখনকার চেয়ে। বরং, ক্ষেত্র বিশেষে বেশিই ছিল। ডাকসু নির্বাচনে সাধারন ছাত্রদের কোন লাভ হয়না, শুধু লাভ হয় এক শ্রেনীর ছাত্রনেতাদের, তাদের ছাত্রনেতা থেকে ভবিষ্যতে জাতীয় নেতা হওয়ার পথ প্রশস্ত হয়, আরকিছুনা।”

কিন্তু ডাকসুর দূর্ণামের চেয়ে সুনামের গল্প অনেক বেশি প্রচলিত। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের প্রধান নেতা ডাকসুর তৎকালীন ভিপি তোফায়েল আহমেদ এক আলোচনায় বলেছিলেন,“ষাটের দশকে ছাত্র নেতাদের ওপর সব শ্রেণি-পেশার মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল; মালিক-শ্রমিক দ্বন্দ্ব, গ্রামে গ্রামে বিরোধ এমনকি স্বামী-স্ত্রীর মনোমালিন্য মিটমাটের জন্যও ইকবাল হলে (সে সময়ে ছাত্র আন্দোলনের প্রধান কেন্দ্র, বর্তমান সার্জেন্ট জহুরুলহক হল) চলে আসত।”

ডাকসু নির্বাচন মোট ৩৬ বার হয়। স্বাধীনতার পর নির্বাচন হয়েছে ৬ বার। আইয়ুব খানের আমল, জিয়ার আমল, স্বৈরাচার এরশাদের আমলে নির্বাচন হয়েছে। গনতন্ত্র পুনরুদ্ধারের যে আন্দোলন তাতে ডাকসুর ভূমিকা ছিলো অতুলনীয়, অথচ এর পুরস্কার স্বরুপ গনতন্ত্রের আমলে ডাকসু হলো বাতিল।

ডাকসু বাংলাদেশের প্রতিটি ইতিহাসের বাঁকবদলে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে। তবে, খেয়াল রাখতে হবে সেই ভূমিকা কাদের বিরুদ্ধে পালন করেছিলো ডাকসু? প্রধানত বহিঃ অপশক্তি এবং পরে স্বৈরাচারী এরশাদের বিরুদ্ধে। এতোদিনে রাজনৈতিক ধারা গতিবিধি পালটে গেছে। এখন ছাত্রদের শিরদাঁড়ায় চেতনাহীনতা প্রবল। যারা চেতনাবাজি করে তারা মূলত চেতনার নামে কিছু গৎবাঁধা ফাঁকা বুলি আওরায়। সত্যি বলতে এখন ডাকসু হলেও ডাকসুর নেতারা কতটুকু ছাত্রদের কথা বলবেন, কতটুকু দলমতের উর্ধে উঠে প্রভাবমুক্ত হয়ে দেশের কথা ভাববেন সে নিয়ে আমি বড় সন্দিহান। ডাকসু মিথ হিসেবে যতটা সুন্দর দেখায়, হবার পর ডাকসুর নেতারা যদি অন্য সব সেক্টরের মাথামুন্ডুদের মতো পুতুল হয়ে থাকেন আর ভ্যা ভ্যা করে একই গল্প বেঁচেন সেই দৃশ্য খুব একটা সুখকর হবে না দেখার জন্যে।

ডাকসু হলে অনেক নেতা বের হবে, এই সেই যুক্তি দিয়ে আসলে ডাকসুর গুরুত্ব বোঝানো যাবে না। দেশে এমনিতেই অনেক নেতা। কাউয়ার চেয়ে নেতা বেশি। ডাকসুর কাজ কি আসলে সেটাই অনেকে ঠিকমতো জানে না।

অধ্যাদেশ অনুযায়ী ডাকসু ৪ টি লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য আছে।

১। শিক্ষার্থীদের মধ্যে সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা ত্বরান্বিত করা।
২। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে একাডেমিক ও একাডেমির বাইরের বিষয়ে সর্বোচ্চ সুবিধা অজর্ন করা।
৩। নেতৃত্ব বিকাশে এবং সত্যিকারের নাগরিক হিসেবে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করা।
৪। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং দেশ বিদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়েরশিক্ষার্থীদের সধ্যে সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের সুযোগ ত্বরান্বিতকরা।

এই চারটি উদ্দেশ্য ছাড়াও ডাকসুর কার্যাবলিতে আছে, বছরে কমপক্ষে একটিজার্নাল বের করা। বুলেটিন, পত্রিকা, ম্যাগাজিন প্রকাশ করা। নিয়মিত বির্তকের আয়োজন করা, সাধারণ এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে বক্তৃতার আয়োজন করে ছাত্র জমায়েত করা। সদস্যদের মধ্যে বিতর্ক, বক্তৃতা, আবৃত্তি, রচনা লিখন, খেলাধুলার প্রতিযোগিতার আয়োজন করা ছাড়াও অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এসব প্রতিযোগিতার আহ্বান করা, শিক্ষা বিষয়ক কনফারেন্সের আয়োজন করা, সমাজ সেবামূলক কাজের সৃপহা বজায় রাখাসহ নানাবিধ সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের আয়োজন করা।

এইসব কাজগুলো করতেন ডাকসুর বিভিন্ন সম্পাদকরা। এটা ডাকসুর একটা সৌন্দর্য ছিলো। এখনকার রাজনৈতিক দলগুলোতে তথাকথিত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ছাড়া আর কেউ কোনো দায়িত্ব পালন করার সুযোগ পান না। বাকিদের কাজ হয়ে যায় মোসাহেবি করা, সেলফি তুলা এবং প্রটোকল দেয়া।

ডাকসু হলে অন্তত ঐ কর্মকান্ডগুলো হয়ত ফিরে আসতো।

কিন্তু, ডাকসুর গলায় ঘন্টা কে বাঁধবে?

ডাকসু এমন একটি বিড়াল, যার গুরুত্ব সবাই জানে। বিভিন্ন সময় এই বিষয়ক বিভিন্ন তরজমা বয়ান করেছেন বিভিন্ন আধুনিক ওলামারা। যাই হোক, যেহেতু প্রশাসনের দায়িত্ব এই ডাকসু নির্বাচন দেয়া, আমরা একটু প্রশাসনের অবস্থান দেখে আসি। সাবেক ভিসি অধ্যাপক আ.আ.ম.স আরেফিন সিদ্দিক সাড়ে আটবছর এই বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্বে ছিলেন। তার প্রশাসন মনস্তাত্ত্বিক সমস্যায় ভুগছিলো। সেটা তার নিজেরই মন্তব্য। তিনি সাড়ে আটবছর ধরে চেয়েছেন ডাকসু নির্বাচন দিবেন, ডাকসু হবে। কিন্তু ডাকসু কবে? আদৌ হবে? আবারো স্যার একই কথা শুনাতেন। হবে হবে। উদ্যোগ নিচ্ছি। সব পক্ষ, আলোচনা। চেষ্টা চলছে। ইত্যাদি শব্দ শুনে সবাই ঠান্ডা হয়েছে। তার আগে যারা ভিসির দায়িত্বে ছিলেন তারা কেউ কেউ চেষ্টা করেছিলেন, কেউ তফসিল দিয়েছিলেন, কেউ নির্বাচনের তারিখ দিয়েছিলেন কিন্তু আরেফিন স্যার তার মেয়াদে শুধু আশ্বাস দিয়েছেন। তিনি, অন্যতম সফল একজন ভিসি অনেকের মতে, কিন্তু ডাকসুর প্রশ্নে তিনি ব্যর্থ। অথচ, তিনি ঠিকই প্রায় তৃতীয় বারের মতো ভিসি হতে যাচ্ছিলেন, সব ব্যবস্থা সেরকমই করা হয়েছিলো। অপূর্ণাংগ সিনেট যে উপাচার্য প্যানেল দিয়েছিলো সেখানে তার নাম ছিলো। উল্লেখ্য, বিশ্ববিদ্যালয় আদেশ ১৯৭৩ অনুযায়ী সিনেটের ১০৪ সদস্যের মধ্যে ৫ জন থাকার কথা ছাত্র প্রতিনিধি। পরে একটি রিটের কারণে স্থগিত হয়ে যায়।

যাই হোক, অবশেষে যিনি ভিসি হলেন তার নাম উপাচার্য প্যানেলেই ছিলো না। অধ্যাপক আক্তারুজ্জামান স্যারকে ১৯৭৩ সালের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আদেশের ১১(২) ধারা অনুযায়ী মহামান্য রাষ্ট্রপতি উপাচার্যের দায়িত্ব দেন। আক্তারুজ্জামান স্যারও ইতিমধ্যে আশ্বাসের বাণী শোনানো শুরু করেছেন। আপাতদৃষ্টিতে তাকে আন্তরিক মনে হচ্ছে। তিনি বলেন, “গত ২৭ বছর ডাকসু নির্বাচন হচ্ছেনা। নির্বাচন না হওয়ার যে অসংস্কৃতি চালু আছে, আমরা সেখান থেকে বের হয়ে আসতে চাই।” এই বাণীগুলো কতটুকু বাস্তবায়িত হবে টাইমমেশিন থাকলে সেটা দেখে আসা যেতো।    

এদিকে ডাকসু নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বশেষ সমাবর্তনে মহামান্য রাষ্ট্রপতির বক্তব্যের পর বিষয়টি টক অব দ্যা টাউনে পরিণত হয়েছিলো। রাষ্ট্রপতি বলেছিলেন, “ডাকসু ইজ মাস্ট।”    

গতবছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের দুইদিনব্যাপী “বর্ধিত সভা ও কর্মশালা ২০১৬”-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে। আওয়ামি লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন,“গণতন্ত্রের জন্য, নেতৃত্ব বিকাশের জন্য ডাকসুর নির্বাচন দেওয়া উচিত। কিন্ত আজ সেটা বন্ধ হয়ে আছে। আমার আক্ষেপ আছে, আমি ডাকসুর ভিপি হতে পারিনি। কিন্তু এখান থেকে নেতা বানিয়েছি। তাই ডাকসুর নেতা তৈরির এই প্রোডাকশনটা আমাদের খুলে দেওয়া উচিত। ছাত্রনেতা থেকে জাতীয় নেতা সৃষ্টি হওয়ার জন্য এটি চালু হওয়া উচিত।”

শিক্ষামন্ত্রীও ডাকসু চান। জাতীয় সংসদে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ ডাকসু সহ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদগুলোর নির্বাচন না হওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সাহসের অভাবকে দায়ী করেছেন।

রাষ্ট্রপতি, শিক্ষামন্ত্রী, আওয়ামি লীগের সাধারণ সম্পাদকের এসব মন্তব্য তাহলে কি গুরুত্বহীন!

এতো গুরুত্বপূর্ণ মানুষেরা বলার পরেও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের কিসের এতো ভয়?      

প্রশ্ন ফাঁস নিয়ে আন্দোলন হবে এই ভয়?

শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন তুলবে ছাত্ররা এই ভয়?

সান্ধ্যকালীন ধান্ধা বন্ধ হয়ে যেতে পারে এই ভয়?

শিক্ষকদের প্রাইভেটে খেপ মারা বন্ধ হয়ে যাবে এই ভয়?

নম্বরপত্র ম্যানিপুলেশন করা বন্ধ হয়ে যাবে?

সিনেটে ডাকসুর প্রতিনিধিরা উচিৎ কথা বলে ফেলতে পারে এই ভয়?

পছন্দের লোকজনকে শিক্ষক নিয়োগ দেয়ায় বাঁধা আসবে?

কত ধরণের ভয়’ই থাকতে পারে একটা প্রশাসনের। নির্বাচন যেহেতু তারা দিতে পারে না তাহলে ডাকসুর নামে অর্থ আদায় কেনো? বাজেটে এই বাবদ আসা অর্থ কোথায় যায়? প্রতি বছর ভর্তির সময় প্রত্যেক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ডাকসু ও হল ছাত্রসংসদের নামে ৬০টাকা করে মোট ১২০ টাকা নেওয়া হয়। এছাড়া দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ, মাস্টার্স ও এমফিল সহ অন্যান্য কোর্সে ভর্তি হওয়ার সময়ও আদায় করা হয় একই পরিমাণ অর্থ।

বাজেট বইয়ের তথ্যানুযায়ী, সবশেষ ২০১৭-২০১৮ অর্থ বছরে ডাকসুর জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১৩ লাখ ৮৬ হাজার টাকা। একই অর্থ বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট ১৮টি আবাসিক হলে ছাত্রসংসদের জন্য ২৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত বরাদ্দ রাখা হয়েছে। জিজ্ঞেস করলে নিশ্চয়ই উত্তর আসবে সব ছাত্রদের কল্যাণে খরচ করে ফেলেন তারা।

তারপরেও ধরে নিলাম, প্রশাসন উদ্যোগ নিয়েই ফেললো ডাকসু দেওয়ার। কিন্তু, এক পক্ষ না এক পক্ষ বাঁধা দেবেই। ড. মনিরুজ্জামান মিয়া যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ছিলেন তখন একবার তিনি ডাকসুর উদ্যোগ নিলেন। কিছু ছাত্র হাকিমে মিছিল বের করলো। মিছিল থেকে গুলি ফুটছে। তারা স্লোগান দিচ্ছে, পরীক্ষা না পরিষদ? পরীক্ষা, পরীক্ষা। মনিরুজ্জামান স্যার অবাক হয়ে গেলেন। তিনি নাকি সেদিন বলেছিলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা পরীক্ষার জন্য হটাত এতোটা আগ্রহী হয়ে যাবে তিনি কখনো কল্পনাও করতে পারেননি। পরে নির্বাচন স্থগিত করতে হয়েছিলো তাকে। এরপর যতবারই নির্বাচনের উদ্যোগ ততবারই বাঁধা। সর্বশেষ ১৯৯৭ সালে বঙ্গবন্ধু হলে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে এক ছাত্রদল নেতা আরিফ হোসেন তাজ খুন হন। ঐ ঘটনা তদন্তে গঠিত তদন্ত কমিটির রিপোর্টে ডাকসু ভেঙ্গে দেয়ার সুপারিশ হয়। পরে সিন্ডিকেট সভায় ডাকসু যে ভেঙ্গে দেয়া হলো আর সচল হলো না এটি।

কিন্তু, বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্য সব রাজনীতি বহাল তবিয়তে চলছে। শিক্ষকরা রাজনীতি করছেন, তাদের নির্বাচন নিয়মিতই হচ্ছে। অতি সুখে মাঝে মধ্যে দুইটা মুক্তিযুদ্ধের শক্তিও হয়ে যান তারা। পরে তাদের ঘটনা সামাল দিতে হয় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে। তারপর ক্যাম্পাসকে ব্যাক্তিগত ব্যানার পোস্টার দিয়ে নষ্ট করে রেখেছেন চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারিরা। তাদের নির্বাচন নিয়মিত হচ্ছে। চায়ের দোকানে গেলেই তাদের আলাপ শোনা যায়। রেজিস্টার ভবনের অভ্যন্তরীণ পলিটিকসও থেমে নেই। সবই চলছে। ডাকসুও থেমে নেই। ডাকসুতে চলছে, খিচুড়ির উৎসব।   

তথ্যসূত্র- ইত্তেফাক, প্রথম আলো, বাংলা ট্রিবিউন, সামহোয়্যার ইন ব্লগ, ডিইউটাইমজ

Comments
Spread the love