রিডিং রুমলেখালেখি

হাঁসের বউ তো পর্দা করে না…

সে বহু কাল আগের কথা। সাত সমুদ্র তেরো নদীর পাড়ে ছোট্ট এক গ্রাম ছিল। গ্রামের মানুষগুলো ছিল খুবই অভাবী। দিনে আনে, দিনে খায়। আশেপাশের গ্রাম থেকে ধার করে চলে। যেদিন কারো বাড়িতে একটু ভালো রান্না হয়, সবাই মিলে উৎসব করে খায়। প্রতিবেশী গ্রামগুলো তাদের একটু অবজ্ঞার চোখে দেখে, গরিব বলে তাচ্ছিল্য করে… এমনকি তাদের কোনো অনুষ্ঠানে দাওয়াতও দেয় না।

গ্রামের এই প্রচন্ড দুর্দশায় সবাই হা-পিত্যেশ করে মরছিল, আর ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করছিল। ‘ঈশ্বর…ওদেরকে এতো দিয়েছো, আমাদেরও কিছু দাও। আমাদের কথাও শোনো’

তাদের এই কান্নার আওয়াজে ঈশ্বর আর স্থির থাকতে পারলেন না। ‘আহারে…বেচারাগুলো এতো কষ্টে আছে।’ 

উনি আশীর্বাদ করলেন। নিদর্শনস্বরূপ পাঠালেন একখানা হাঁস। হাঁসটা সত্যিই গ্রামের মানুষের পরিবর্তনের অগ্রদূত হল। প্রতিদিন সকালে ওই হাঁস গিয়ে গ্রামের সবচেয়ে বড় বটগাছের নিচে একটা করে সোনার ডিম পেড়ে রাখতো। গ্রামের মানুষ সেই ডিম বিক্রি করে টাকা ভাগাভাগি করে নেয়া শুরু করল। অবস্থা ফেরা শুরু করল তাদের। 

এখন সেই গ্রামে প্রতিদিন উৎসব হয়। ঘরে ঘরে খুশির আমেজ। গ্রামের মাতবর সাহেব বিশাল ছাতা মাথায় দিয়ে দামী পাঞ্জাবী পরে আশেপাশের গ্রামে ঘুরে বেড়ান। সবাই তাকে ইজ্জত দেয়, সালাম করে। কিন্তু অর্থের সাথে সাথে মানুষের লোভও সমানুপাতিক হারে বাড়ে। গ্রামের সবচেয়ে কুটিল বুদ্ধির অধিকারী মাতবরের চাটুকার বলল, 

‘হুজুর যদি অভয় দেন একটা কথা বলি।’

-বল।

– দেখেন হাঁস তো প্রতিদিন একটা করে ডিম দিচ্ছে। এতে আসলে এতোজন গ্রামবাসীর পোষাচ্ছে না। ও যদি দুটো করে ডিম দিতো, তাহলে বেশ ভালো হতো।

মাতবর সাহেব হা হা করে হাসলেন। বললেন, ‘ওরে আমি যদি বলি, ও দুটো কেন…পাঁচটা ডিম দিবে। বৈদ্যকে ডাক দেও।’

বৈদ্য আসল। হাঁসের শরীরে ইঞ্জেকশন দেয়া হল। হাঁস এখন দুটো করে ডিম দেয়। কিছুদিন গেল। চাটুকার আবার আসল মাতবরের কাছে। ‘হুজুর…ডিম দুটো হওয়ার পর থেকে হাঁসের ডিমে স্বর্ণের পরিমাণ কেমন যেন আগের মতো নেই।’ 

– সেটা কিভাবে হয়?

– হতে পারে হুজুর। একশোবার হতে পারে। দেখেন…হাঁস এখন বাইরের গ্রামের পুকুরে সাঁতার কাটতে যায়। ওরা খাবারের লোভ দেখিয়ে হাঁসের পেটের সোনা চুরি করা শুরু করেছে না তো? 

আমি বলি কি…হাঁসের বাইরে যাওয়া বন্ধ করে দেন!

-ঠিক বলেছো তো, বড়ই লোভী হাঁস। এখনই ওর পাশের গ্রামে যাওয়া বন্ধ করছি।

হাঁসের পায়ে শেকল পরানো হল। হাঁস শুধু এখন চিৎকার করে আর ডিম দেয়, ডিম দেয় আর চিৎকার করে। গ্রামবাসীর মন তবু ভরল না। তারা দাবী জানালো, আমরা প্রতিবেশী গ্রামগুলোর মতো রাতারাতি ধনী হতে চাই । এখনই হাঁসের পেট কেটে সবগুলো সোনার ডিম বের করা হোক। 

মাতবর সাহেবও এই প্রস্তাবে নেচে উঠলেন। হুকুম দিলেন, হাঁসকে ধরে আনো। তারপর সবাই মিলে হাঁসের পেট কেটে ফেলল। হাঁস মরল। একটাও সোনার ডিম পেল না তারা। আঁতকে উঠলো গ্রামবাসী, কপালে হাত দিলেন মাতবর সাহেব। চাটুকারকে বললেন, সব তোমার দোষ। চাটুকারও সমান তেজে উত্তর দিল, ‘আমার দোষ কই, হাঁস মরেছে নিজের পাপে। ওই দেখেন, হাঁসের বউ তো পর্দা করে না…’ 

আরও পড়ুন- 

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close