আপনি-ই সাংবাদিকইনসাইড বাংলাদেশ

আদতে কী হয়েছিল সেদিন?

“ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র এবং শিক্ষকদের মধ্যে হাতাহাতি হয়েছে”- এই সংবাদটি দেখার পর থেকে আমার প্রচন্ড লজ্জা হচ্ছে। রাস্তার পাশে কখনো লজ্জাবতী গাছ দেখেছেন? একটু ছোঁয়া লাগলেই কিভাবে চুপসে যায় লজ্জায়, দেখেছেন? এই খবরটি দেখার পর আমিও সেভাবে চুপসে যাচ্ছি ভিতরে ভিতরে। তবে আমি পরিষ্কার হতে পারছি না যে লজ্জাটা আসলে সুনির্দিষ্ট ঠিক কোন কারণে হচ্ছে বা হওয়া উচিত। শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ছাত্রদের দাঁড়াতে হয়েছে- এজন্য, নাকি শিক্ষকরা পুলিশের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে ছাত্রদের পোশাক টেনে হিঁচড়ে ছিঁড়ে ফেলেছে- এজন্য?

একটা বিষয় লক্ষণীয়। এক শ্রেণীর মানুষ এই ঘটনায় ছাত্রদের অপরাধী হিসেবে উপস্থাপন করছে এবং এই শ্রেণীর লোকেরা এখানে অপ্রাসঙ্গিক ভাবে ছাত্রলীগ টেনে নিয়ে এসে বলছেন, “এই জায়গায় ছাত্রলীগ থাকলে তো এতক্ষণে খবর হয়ে যাইতো”। আবার অনেকে এই সুযোগে বামপন্থীদের একচোট বকে দিচ্ছেন! সাস্টে শিক্ষকদের উপরে যে ‘হামলা’ হয়েছিল, আর ঢাবিতে ছাত্র-শিক্ষকদের মধ্যে যে ‘হাতাহাতি’ হয়েছে- এ দুটো ঘটনাকে এক করে দেখার কোন সুযোগ নেই। যাই হোক, ঐ আলোচনায় না গিয়ে বরং এই ব্যাপারে দু-একটি কথা বলে নেয়া যাক।

প্রাপ্ত ছবি, ভিডিও, উভয় পক্ষের বক্তব্য, প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ আর পত্রিকার রিপোর্ট বিশ্লেষণ করে মোটামুটি যে চিত্রটি পাওয়া যাচ্ছে, সেটা এরকম-

উপাচার্য নির্বাচন উপলক্ষে সিনেট ভবনে সিনেটের সভা হচ্ছিল। বামপন্থী ছাত্র সংগঠন এবং কিছু সংখ্যক সাধারণ ছাত্র (যারা কোন দলের সাথে যুক্ত নয়) উপাচার্য নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জ করে পূর্বঘোষিত কর্মসূচী অনুযায়ী সিনেট ভবনের সামনে মানব-বন্ধন করার উদ্দেশ্যে মিছিল নিয়ে সিনেট ভবনের সামনে আসে। কিন্তু সিনেট ভবনের মূল ফটক বন্ধ থাকায় তারা নির্ধারিত স্থানে যেতে পারেনা। এসময় তারা গেট খুলে ভিতরে প্রবেশের চেষ্টা করে। (যারা জানেনা, তাদের বলা যেতে পারে, সিনেট ভবনের এই গেট মূল সিনেট ভবন থেকে কিছুটা দূরে) গেটের অপর পাশে কিছু সংখ্যক শিক্ষক উপস্থিত ছিল। তারা ছাত্রদের এই দলটিকে ভিতরে প্রবেশ করতে বাধা দেয়, এবং গেট থেকে বের করে দিতে চায়। অর্থাৎ সম্মানিত শিক্ষকবৃন্দ এখানে পুলিশের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন! তাদের সাথে ছিল জবি’র একজন শিক্ষক। অর্থাৎ একজন ‘বহিরাগত শিক্ষক’! ছিল ছাত্রীকে যৌন হয়রানির অভিযোগে বরখাস্ত একজন ‘শিক্ষক’ও!

এসময় ছাত্ররা ওখানেই বসে পড়ে। কিছুক্ষণ পর তারা উঠে আবার সিনেট ভবনের দিকে যেতে চাইলে শিক্ষকদের সাথে ধাক্কাধাক্কি হয়। শিক্ষকরা তাদের আক্ষরিক অর্থেই ঘাড় ধরে বের করে দিচ্ছিলো! এই অর্ধচন্দ্র দেয়ার ছবি, একজন ছাত্রের জামা টেনে ছিঁড়ে ফেলার ছবি, এক ছাত্রীকে এক শিক্ষকের টেনে হিঁচড়ে সরিয়ে দেয়ার ছবি আমরা বিভিন্ন পত্র পত্রিকার মারফত দেখেছি। এই ধাক্কাধাক্কির সময় এক শিক্ষকের আঙ্গুল ভেঙে যায় বলে খবরে প্রকাশিত হয়েছে। সেই সাথে ছাত্রদের মধ্যে ৬ জন আহত হয়েছে। পরবর্তীতে প্রক্টর এসে IER এর সামনে মানব-বন্ধনের অনুমতি দিলে ছাত্ররা সেখানেই মানব-বন্ধন করে।

মোটামুটি এই হল ঘটনা। এই ঘটনাকে যারা ‘ছাত্ররা শিক্ষকদের পিটিয়েছে’ শিরোনামে প্রচার করছে তাদের নিয়ে আমার ঘোর সন্দেহ আছে। স্বয়ং প্রক্টর বলেছেন, “ছাত্ররা যে শিক্ষকদের লাথি-ঘুষি মারছে, সেটি আমরা বলতে চাই না। তাদের আচরণ অসৌজন্যমূলক ছিল।” অবশ্য তিনি আবার বলেছেন, ছাত্ররা শিক্ষকদের উপর ‘হামলা’ করেছে! উনি হয়তো ভেবেছিলেন শিক্ষকরা যখন ছাত্রদের ঘাড় ধরে বের করে দেবে বা জামা কাপড় ছিঁড়ে ফেলবে তখন ছাত্ররা একান্ত অনুগতের মত ‘জি স্যার, জি স্যার’ করতে করতে বাইরে গিয়ে মলচত্বরে ফুটবল খেলবে!

মজার ব্যাপার হলো, এই সম্পূর্ণ ঘটনায়, মূল যে বিষয়- সিনেটে ছাত্র প্রতিনিধি অথবা ডাকসু নির্বাচন। এটা কিন্তু চাপা পড়ে গেছে। অবশ্য বরাবরই তাই হয়, মূল বিষয় চাপা পড়ে গিয়ে গৌণ বিষয় মুখ্য হয়ে ওঠে অথবা ভালো করে বললে, মুখ্য করে তোলা হয়।

পুরো ব্যাপারটি থেকে মোটা দাগে দুটো বিষয় চোখে পড়ে-

১। বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় যে ছাত্রদের কোন ভূমিকাই নেই এবং এই অধিকার থেকে বঞ্চিত করে তাদের সাথে যে অন্যায় করা হচ্ছে, এই বোধটি অধিকাংশ ছাত্রছাত্রীদের নেই। গুটি কয়েক ছাত্রছাত্রী সেখানে প্রতিবাদ করতে গিয়েছিল। শুধু প্রতিবাদে উপস্থিত নেই তাই নয়, তাদের এ নিয়ে কোন বক্তব্যও নেই।

২। শিক্ষকদের ছাত্ররা এখন আর বিশ্বাস করে না। ছাত্র-শিক্ষক প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে অনেক ক্ষেত্রে। আমি বিশ্বাস করি, সম্মান কেউ কাউকে দিতে পারেনা, অর্জন করে নিতে হয়। অধিকাংশ শিক্ষক সেই সম্মান অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছেন। (ব্যতিক্রম যে নেই তা নয়। মাত্র কিছুদিন আগেও ফাহমিদুল হক স্যারের পক্ষে অনেকজন ছাত্রছাত্রী দাঁড়িয়ে গিয়েছিল।)

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ ১৯৭৩- এর ২০(১) ধারায় বলা আছে কাদের নিয়ে গঠিত হবে সিনেট। সেখানে ২৫ জন registered graduates এবং ৫ জন ছাত্র প্রতিনিধি থাকার কথা বলা আছে। সেই ৫ জন কিভাবে আসবে? অধ্যাদেশ থেকে কোট করি- “five representatives of the students to be nominated by the University Central Students Union.” অর্থাৎ ডাকসু থেকে নির্বাচিত ৫ জন ছাত্র প্রতিনিধির এই সিনেটে থাকার কথা যারা সিনেটে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের প্রতিনিধিত্ব করবে।

বিশ্ববিদ্যালয় একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, যার সংসদ হচ্ছে সিনেট। এই সিনেট উপাচার্য হিসেবে ৩ জনকে নির্বাচিত করে যাদের মধ্যে থেকে ১ জনকে রাষ্ট্রপতি উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেন। শুধু উপাচার্য নির্বাচনই নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সিদ্ধান্ত গুলো সিনেটে নেয়া হয় এবং সেখানে ছাত্রদের অংশ গ্রহণের অধিকার প্রদান করা হয়েছে। কিন্তু যেহেতু ডাকসু নির্বাচন হয়না, সেহেতু এখানে কোন ছাত্র প্রতিনিধি নেই। অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় ছাত্রদের ভূমিকা ‘শূন্য’।

দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ডাকসু নির্বাচন হচ্ছে না। ডাকসু নির্বাচন হলে কী উপকার হত? ডাকসু নির্বাচন হলে উপকার হত সাধারণ ছাত্রদের। তেলবাজীর রাজনীতি বন্ধ হয়ে, আদর্শিক রাজনীতির চর্চার সুযোগ সৃষ্টি হত। ক্যাম্পাসে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের একচ্ছত্র আধিপত্য তৈরি হতনা। ফলে হল গুলোতে তারা যে মাস্তানি করে বেড়ায় সেটা বন্ধ হত। ছাত্রদের সমস্যা গুলো সমাধানে ডাকসু ভূমিকা রাখতে পারতো। ছাত্রদের কথা গুলো সরাসরি উত্থাপিত হত সিনেটে।

কিন্তু কোন দলই ডাকসু নির্বাচন (অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতেও একই ঘটনা) দিতে আগ্রহী না, কারণ এতে করে বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের যে বিশাল সংখ্যক ক্যাডার বাহিনী মজুদ থাকে, সেটা ক্ষতিগ্রস্থ হবে। বর্তমান ভিসি আরেফিন স্যার এই নির্বাচন দিতে আগ্রহী নন। কেন, সেটা বোধবুদ্ধি সম্পন্ন সকলেরই বুঝতে পারার কথা।

আরেফিন স্যার ভিসি হিসেবে আসার পর থেকে ক্যাম্পাসে কোন বড় ধরণের গন্ডগোল হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয় ‘অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ’ হয়নি একবারো। ফলে সেশন জট কমে এসেছে অনেকখানি, প্রায় নেই বললেই চলে। যেহেতু দীর্ঘদিনের অব্যবহৃত ডাকসু মরচে পড়ে ভোঁতা হয়ে গেছে, তাই এটা নিয়ে নাড়াচাড়াতে কিছুটা বিপদের সম্ভাবনা আছে। ক্যাম্পাসে প্রত্যেক হলে হলে দলীয় মদদপুষ্ট অনির্বাচিত ‘সিলেক্টেড’ নেতারা তাদের সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে আসীন হয়ে আছে। এখন তো প্রত্যেক ডিপার্টমেন্টেও সিলেক্টেড ‘তথাকথিত’ নেতা বসিয়ে দেয়া হয়েছে। ফলে এই মুহুর্তে ডাকসু নির্বাচন দিলে ক্যাম্পাসে ‘অস্থিতিশীল’ অবস্থা তৈরি হবার যে সম্ভাবনা আছে, সেই দায় আরেফিন স্যার নিজের ঘাড়ে নিতে চাচ্ছেন না বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে।

এই মুহুর্তে ডাকসু নির্বাচন দিলে ছাত্রলীগ (যেহেতু এখন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামিলীগ) ‘যে কোন মূল্যে’ নির্বাচনে জিততে চাইবে এটা তো জানা কথা। আবার সমগ্র দেশে বাম দল গুলোর অবস্থা যাই হোক না কেন, ক্যাম্পাসে তাদের ভালো সংখ্যক কর্মী সমর্থক আছে। ইতিহাস অনুযায়ী ডাকসু নির্বাচনে বরাবরই বাম দলগুলো জয়ী হয়ে এসেছে। তাই শুরুটা যে মসৃণ হবে না, সেটা মোটামুটি পরিষ্কার। তবে হ্যাঁ, একটা কথা মনে রাখতে হবে। ইতিহাস বলে, ক্ষমতাসীন দল যতই চেষ্টা-অপচেষ্টা করুক না কেন, জনগণ না চাইলে, দু’নম্বরী করে কখনোই ক্ষমতায় আসা যায়না বা বেশিদিন টিকে থাকা যায়না।

আগেই বলেছি, ডাকসু মরচে পড়ে ভোঁতা হয়ে গেছে। প্রথম প্রথম নাড়াচাড়া করলে কিছু ময়লা বেরোবে বৈকি, তবে ক্রমাগত ব্যবহার হতে থাকলে সে আবার তার পুরনো ধার ফিরে পাবে! এই ধার উদ্ধারের জন্য ঝুঁকি তো নিতেই হবে।

কিন্তু এই ঝুঁকি তো কোন সরকার সমর্থিত উপাচার্য কখনোই নেবেনা। তাহলে করণীয় কী? করণীয় হচ্ছে ধাক্কা দেয়া, চীৎকার করা, চাপ প্রয়োগ করা, আন্দোলিত করা। আর সেটাই করতে গিয়েছিল ঐ গুটি কয়েক ছাত্র। ওখানে যারা গিয়েছিল তাদের বেশিরভাগের পড়াশুনা শেষের দিকে। ডাকসু নির্বাচন যদি হয়ও এনারা কেউ সেই নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেনা। নিছক নেতা হবার শখে এরা কেউ মার খেতে যায়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ে হাজারো ছাত্রের ন্যায় সঙ্গত অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে এরা প্রতিবাদী হয়েছিল।

‘বড় ভাই’দের লেজ ধরে থাকা ‘রাজনৈতিক ছাত্ররা’, লাল বাস ধরে ঝুলে থাকা ‘অরাজনৈতিক ছাত্ররা’ আর শিক্ষকতার মহান পেশাকে নীল-সাদা রঙে রঙিন করা তেলবাজ শিক্ষকরা এদের এই প্রতিবাদের ভাষা বুঝবে না। যেহেতু আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, সিনেট আমার সংসদ। কিন্তু সিনেটে আমার বক্তব্য পৌছে দেয়ার মত কোন প্রতিনিধি নেই। তাই ইন্টারনেটই ভরসা। অন্তর্জাল মারফত আমি মহামান্য সিনেটের প্রতি আবেদন জানাই-

এরপর থেকে যে সকল শিক্ষকদের ‘বিশ্ববিদ্যালয় পুলিশ’ হিসেবে মিছিল ঠেকাতে নিয়োগ দেয়া হবে, তাদের হাতে যেন একটা করে জালি বেত দিয়ে দেয়া হয়। এতে করে তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মনে হোক বা না হোক, অন্তত প্রাইমারী স্কুলের ‘শিক্ষক’ বলে তো মনে হবে!

(একটা কথা এ বেলা বলে যাই গোপনে। প্রাইমারী স্কুলের ঐ শিক্ষকদের আমরা এখনো অন্তরের অন্তস্থল থেকে শ্রদ্ধা করি)

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close