পাকিস্তান শাসনামলে বিশ্ববিদ্যালয় গুলো, আরো ভালো করে বলতে গেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল যাবতীয় আন্দোলন-সংগ্রামের কেন্দ্রস্থল। সে সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের এই আন্দোলন সংগ্রামকে প্রতিহত করতে পাকিস্তান সরকারের প্রত্যক্ষ মদদে বিশ্ববিদ্যালয়ে সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনী সৃষ্টি করা হয়েছিল। এরা বিশ্ববিদ্যালয়ে সঙ্ঘটিত ন্যায্য দাবী আদায়ের সংগ্রাম গুলোতে বাঁধা দিত। পাকিস্তানকে পিছনে ফেলে আমরা বাংলাদেশ হয়েছি, দেশ স্বাধীন হয়েছে। কিন্তু চরিত্র বদলায়নি এখনো।

যেকোন ক্ষমতাসীন সরকারের বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা নিয়ে একটা ভয় কাজ করে। সাধারণত দেশে যদি আইনের শাসন চলে, সব কিছু থাকে সুস্থিত- তাহলে ছাত্রদের রাজনীতির দিকে মন দেয়ার দরকার পড়েনা। কিন্তু বাংলাদেশে সেটি হবার জো নেই। তাই যেকোন অন্যায়ের বিরুদ্ধে স্বাভাবিক ভাবেই, প্রথম প্রতিবাদ শুরু হয় দেশের তরুণ অংশটির থেকেই, যারা এখনো বৈষয়িকতার ফাঁদে পড়ে তারুণ্য হারিয়ে ফেলেনি। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সব সময় এক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে এসেছে।

স্বাধীনতার পর ৯০ এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনেও ছাত্রদের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা লক্ষ করা যায়। সর্বশেষ ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও সেনাবাহিনী তাদের মূল ভূমিকা ভুলে গিয়ে যখন নিজেরাই নিজেদের দেশের শাসনকর্তা হিসেবে ভাবতে শুরু করলো তখনও প্রথম প্রতিবাদ-আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রকে, এক সেনা সদস্যের চড় মারার প্রতিবাদে যে আন্দোলন শুরু হয়, সেটা ধীরে ধীরে সমগ্র দেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং তৎকালীন সরকারও নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তরে বাধ্য হয়।

কিন্তু এরপর থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিরব হয়ে গেল। বিশ্ববিদ্যালয় তাদের সেই প্রতিবাদী চরিত্র হারিয়ে ফেললো। কোন ইস্যুই তাদের উজ্জীবিত করতে পারলো না। তারা অহেতুক মেতে রইলো তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে। কে তাদের বিরুদ্ধে ফেসবুকে কী লিখেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের উল্টো পথে বাসচলা নিয়ে কে কী মন্তব্য করেছে ইত্যাদি বিষয় গুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলো তখন। বিশ্ববিদ্যালয়জনিত ইগো এতটাই মারাত্মক হয়ে উঠলো তখন, এরা সংঘবদ্ধভাবে তুচ্ছ কারণে ঢাকা মেডিকেল কলেজ, সেন্ট্রাল মেডিকেল এবং বুয়েটে হামলা- ভাঙচুর চালালো!

বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন গণতান্ত্রিক চর্চা না থাকায় এবং সাধারণ ছাত্রদের নিষ্ক্রিয়তায় হল গুলোতে ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে ফেললো এর মধ্যে। আপনারা যদি লক্ষ করেন তবে দেখবেন, ২০০৮ এর আগে যারা ছাত্রলীগের নেতৃত্বে ছিল এবং এখন যারা নেতৃত্বে আছে এদের মধ্যে গুণগত পার্থক্য রয়েছে, যা খালি চোখেই দৃশ্যমান। সে সময় যারা ছাত্রলীগ করতো এরা প্রতিকূল অবস্থায় পথে আন্দোলন করা, মার খাওয়া নেতা-কর্মী। এদের মধ্যে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা ছিল, এদের অনেকেই যথেষ্ট মেধাবীও ছিল। এখন যারা ছাত্রলীগ করে তাদের প্রত্যক্ষ আন্দোলনের কোন অভিজ্ঞতা নেই। এরা ‘ভাই’দের তেলবাজী করে পদ পাওয়া নেতা। এদের মধ্যে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চাও প্রায় নেই বললেই চলে। মূলত ছাত্রলীগ এখন এসব ধান্ধাবাজদের আঁখরাতে পরিণত হয়েছে।

হলগুলোতে এদের দাপটে শিক্ষকরাও অসহায়। হলে কে উঠবে, না উঠবে- জামাত শিবির দমনের নাম করে সেটা ছাত্রলীগই নিয়ন্ত্রণ করে। সেখানে হলের প্রভোস্টের বিন্দুমাত্র ক্ষমতাও নেই। আমি নিজে হলে উঠেছিলাম প্রভোস্টের অনুমতি নিয়ে, যাবতীয় প্রসিডিউর সম্পন্ন করেই। অন্যদের পরামর্শ শুনেও কোন ‘বড় ভাই’কে ধরার প্রয়োজন বোধ করিনি। এর মূল্যও আমাকে দিতে হয়েছিল। আমাকে বের করে দিতে আসা ছাত্রলীগের পান্ডাদের থেকেই প্রথম শুনেছিলাম- “হলে উঠানোর এখতিয়ায় তো প্রভোস্টের নেই!”

যেহেতু রাজনৈতিক দল গুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের এই সুপ্ত শক্তি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল, তাই তারাও সেটাকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য দু ভাবে কাজ করে থাকে- ১. বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে নিজেদের অনুগত লোক বসিয়ে (যোগ্যতার থেকে আনুগত্য এখানে প্রধান) এবং ২. নিজেদের ছাত্রসংগঠনগুলোর মাধ্যমে। এটা করতে গিয়ে একদিকে প্রশাসনে অনেক সময় অযোগ্য লোকজন যেমন বসানো হয়, তেমনি ছাত্র-সংগঠন গুলোও ভোগ করে অসীম ক্ষমতা, তাদের অপরাধ গুলোও উপেক্ষা করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা নির্ঝঞ্ঝাট জীবনের প্রত্যাশি বিধায় নিজেদের স্বার্থে আঘাত না লাগা পর্যন্ত চুপচাপ এসব মেনে নেয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন ভর্তি হওয়া ছাত্রটি একটা সিটের আশায়, কিংবা সিট হারানোর ভয়ে এক সময় নিজেই পরিণত হয় এই গুন্ডাবাহিনীর ক্যাডারে।

সাম্প্রতিক সময়ে জাতিয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ৭ টি কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করার যে হঠকারী সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় ছাত্রছাত্রী আন্দোলন শুরু করে। যদিও এই আন্দোলন ছিল উপরে উল্লেখিত ইগো জনিত আন্দোলন। ৭ কলেজের ছাত্রছাত্রীরা নিজেদের ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র’ হিসেবে পরিচয় দেবে এটা ‘মহান বিশ্ববিদ্যালয়ের’ ছাত্রদের জন্য অপমানকর ব্যাপার বৈকি! তবে দাবী যৌক্তিক হোক বা অযৌক্তিক- আন্দোলন করা, দাবী উত্থাপন করা ছাত্রছাত্রীদের গণতান্ত্রিক অধিকার। ‘আমি এই দাবীর সাথে একমত নই, অতএব এই আন্দোলনকারীদের পিটিয়ে মাঠছাড়া করতে হবে’- এমন চিন্তা বর্বর এবং অসভ্যদের দ্বারাই সম্ভব। ঠিক এই কাজটিই করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ।

তারা করেছে আরো জঘন্য কাজ। আন্দোলনরত ছাত্রীদের চারিদিক থেকে ঘীরে ফেলে যৌন হয়রানি করে তারা। নিজেদেরই সহপাঠিনীদের উপর, নিজেদের বান্ধবি-বোনদের উপরে নিজেরাই নোংরা আক্রমণ চালায় এসব অমানুষ গুলো। মূলত এরপরেই বহুদিনের সেই সুপ্ত প্রতিবাদী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ফুঁসে ওঠে। সাত কলেজ অধিভুক্তি বিরোধী আন্দোলনে যাদের প্রত্যক্ষ সমর্থন ছিল না, তারাও এই আন্দোলনে শামিল হয়, কারণ এই আন্দোলন এখন- যৌন নিপীড়ন বিরোধী আন্দোলন, চিহ্নিত ছাত্রলীগ নেতাদের শাস্তির দাবীতে আন্দোলন। কিন্তু প্রশাসন উল্টো ‘অজ্ঞাতনামা’ আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে দেয়!

আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় আজ (২৩ জানুয়ারি, ২০১৮) প্রশাসনিক ভবন ঘেরাও করে আন্দোলনকারীরা। তারা উপাচার্যের কাছে সুনির্দিষ্ট দাবী উত্থাপন করে। কিন্তু এ সময় ছাত্রলীগের নেতাদের নেতৃত্বে ছাত্রলীগের একদল সন্ত্রাসী লাঠি-রড নিয়ে আন্দোলনকারীদের উপরে হামলা করে। এতে গুরুতর আহত হয়ে অনেকেই হাসপাতালে ভর্তি আছেন। মেয়েদের বাঁচাতে গিয়ে মারাত্মক ভাবে আহত হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্নালিজম বিভাগের এক শিক্ষার্থী। পহেলা বৈশাখে যে মানুষটি যৌন নিপীড়কদের থেকে রক্ষা করেছিলেন কয়েকজন নারীকে, সেই লিটন নন্দীও আহত হয়েছেন গুরুতরভাবে।

ছাত্রলীগ এখন একটি সন্ত্রাসী সংগঠনে পরিণত হয়েছে। যে ছাত্রলীগ এক সময় ন্যায়ের পক্ষে আন্দোলন করেছে, ছাত্রছাত্রীদের অধিকার আদায়ে নেতৃত্ব দিয়েছে- সেই ছাত্রলীগ মুক্তিযুদ্ধে শ্লোগান ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ ব্যবহার করে, ন্যায্য দাবী আদায়ে জড়ো হওয়া ছাত্রদের উপর রড হাতে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। এর থেকে লজ্জার আর কী হতে পারে!

বিশ্ববিদ্যালয়ে সংগঠিত এই ঘটনাকে কেবল রাজনৈতিক ঘটনা হিসেবে দেখার অবকাশ নেই। ছাত্রলীগ এবং প্রশাসনের এই হঠকারী আচরণ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক পরিবেশ এবং সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের অধিকারের পরিপন্থী। কিছুদিন আগে একদল আওয়ামীপন্থী শিক্ষক নামধারী কিছু লোকও ছাত্রছাত্রীদের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল! বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অবস্থা কি স্বাভাবিক বলে মনে হয়?

বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে এবং সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মহাকাশ থেকে কোন দেবদূত এসে হাজির হবে না। প্রশাসন কখনো ছাত্র-বান্ধব হবেনা। ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনের সন্ত্রাসও আপনা-আপনি থেমে যাবেনা। এর জন্য আমাদের, আমরা যারা পড়াশুনা করতে এসেছি এই বিশ্ববিদ্যালয়ে, আমরা যারা চায়ের কাপে আড্ডা জমাই টি.এস.সিতে, আমরা যারা নাটক করি- সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করি, আমরা যারা সোডিয়াম বাতির গান শুনি, আমরা যারা নতুন নতুন আইডিয়া নিয়ে তর্ক জমাই- এই আমাদের মাঠে নামতে হবে। আমরা সংখ্যায় অনেক কিন্তু সংঘবদ্ধ নই। দুষ্কৃতিকারীর সংখ্যায় কম- কিন্তু সংঘবদ্ধ। তাই আমাদের পক্ষ থেকে যে অল্প কিছু মানুষ অধিকার আদায়ে মাঠে থাকে, তাদের নির্মম ভাবে পিটিয়ে হাসপাতালে পাঠায় সন্ত্রাসীরা। আমরা যদি সবাই মিলে রুখে দাঁড়াই, এসব মূর্খ- বর্বর সন্ত্রাসীরা পালানোর পথও খুঁজে পাবেনা।

সিদ্ধান্ত তোমাকেই নিতে হবে বন্ধু। তুমি কি প্রতিবাদী হবে, নিজের অধিকার আদায়ের জন্য? অতীতের বীর অগ্রজদের মত? নাকি মাথা নিচু করে, মেরুদন্ড বিকিয়ে দিয়ে নিজের বন্ধুর উপরে হামলা মেনে নেবে? আর নিজেও অপেক্ষা করবে এভাবেই একদিন মার খাওয়ার জন্য? সিদ্ধান্ত তোমার। সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করো না বন্ধু… এবার যদি সিদ্ধান্ত নিতে ভুল হয় তবে আবারো অনেক দিনের জন্য দাসত্বের শৃঙ্খলে বাধা পড়তে হবে। এই আন্দোলন সরকার বিরোধী বা প্রশাসন বিরোধী নয়- নিজেদের অধিকার আদায়ের আন্দোলন। এই প্রতিবাদে শামিল হতে তুমি প্রস্তুত তো?

ছবি- ফোকাস বাংলা

Comments
Spread the love