ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

এটিই ছিল বাসে হয়রানি রোধে কার্যকরি প্রথম প্রতিবাদ!

[ঘটনাটি ২০১৫ সালের ডিসেম্বরের। ঘটনাটি সে সময় ভাইরাল হয়েছিল। চারিদিকে যে হারে বাসে নারী হয়রানির ঘটনা ঘটছে মনে হলো নিয়মতান্ত্রিক ও কার্যকরি প্রতিবাদের এই ঘটনাটি পুনরায় শেয়ার করি। এটিই ছিল বাসে হয়রানি রোধে কার্যকরি প্রথম প্রতিবাদ। কার্যকরি বলছি কেননা ফেসবুকে নয়, প্রতিবাদ হোক বাস্তবে। প্রতিবাদ হোক নিয়মতান্ত্রিক। শুভ হোক নারীর পথচলা] 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যেসব শিক্ষার্থীর বাড়ি ঢাকার আশেপাশে, একটু-আধটু ছুটি পেলেই তারা ছুটে যায় পরিবারের সান্নিধ্যে।

শামসুন নাহার হলের মেয়েটিও মাত্র একদিনের জন্যে মানিকগঞ্জ গিয়েছিল বেড়াতে আসা বড় বোন আর ভাগ্নিকে দেখতে। রবিবার পরীক্ষা থাকায় আজ দুপুরেই সে ফিরছিল ঢাকায়।

মানিকগঞ্জের বেতিলা থেকে গাবতলী যাবার জন্যে মেয়েটি দুপুর একটায় শুকতারা পরিবহনের একটি বাসে ওঠে। শুক্রবার ছুটির দিন, তাই বাসে যাত্রী কম। মেয়েটির পাশের সিটটাও ফাঁকা ছিল। আরো অসংখ্য সিট খালি থাকলেও বাসের হেলপার এসে বসে মেয়েটির পাশেই। উদ্দেশ্য বুঝতে বাকি থাকে না মেয়েটির।

কয়েক মুহুর্ত পরেই শুরু হয় হয়রানি। ক্রমাগত আপত্তিকর কথাবার্তা ছাড়াও ক্রমেই কনুই দিয়ে মেয়েটির শরীর ঠেলতে থাকে। শুরুতে দ্বিধায় ভুগলেও এক পর্যায়ে সাহস নিয়ে প্রতিবাদ করে মেয়েটি। এতে ক্ষেপে ওঠে মামুন নামের ওই হেলপার। তারপর মেয়েটিকে অকথ্য ভাষায় গালাগালি করতে থাকে। এক পর্যায়ে ড্রাইভারকে বাস থামাতে বলে। তারপর মেয়েটিকে ঘাড় থাক্কা দিয়ে বাস থেকে নামিয়ে দিতে উদ্যত হয়।

এবার এগিয়ে আসে বাসের অন্য যাত্রীরা। ঘটনা জানতে চাইলে মামুন বলে, ‘মাইয়াডার প্রবলেম অাছে’। মেয়েটি কাঁদতে থাকে। অন্য যাত্রীদের হস্তক্ষেপে মেয়েটিকে উপর্যপুরি অপমান করে বাস থেকে নামিয়ে দিতে পারেনি মামুন।

মেয়েটি এ ঘটনা আমায় দুপুরেই ফোন করে জানায়। তাঁর ধারণা আমি কিছু করতে পারবো। ওর অসহায় কন্ঠস্বর সত্যিই কিছু করতে ভেতর থেকে ধাক্কা দেয় আমাকে। আমি মেয়েটিকে অপেক্ষা করতে বলি।

এসব ঘটনায় একা আগানোর চেয়ে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আগানোর সুবিধা অনেক। তাই ফোন দিলাম ঢাবি প্রক্টরকে। তিনি ফোন ধরলেন না। বাধ্য হয়ে উপাচার্য স্যারকে জানালাম। মেয়েটির নাম ও ফোন নাম্বার তাকে দিলাম। তিনি প্রক্টরকে ব্যবস্থা নিতে বলবেন বলে জানালেন। এরপর মেয়েটিকে ডিএমপির একজন পদস্থ কর্মকর্তার নাম্বার দিয়ে বললাম, আমি পৌঁছাবার আগেই যেন নিজের পরিচয় দিয়ে পুরো ঘটনাটা খুলে বলে।

এরপর রওনা দিলাম মিরপুরের দারুস সালাম থানার উদ্দেশ্যে। থানায় ঢুকতেই ডিউটি অফিসার শায়লা জানতে চাইলেন, আমরা ঢাবি থেকে এসেছি কি না! বুঝলাম কাজ হয়ে গেছে। সোফায় বসতে বসতে বুঝলাম, প্রক্টর স্যার ছাড়াও ডিএমপির সেই পদস্থ কর্মকর্তা আমাদের আসার আগেই ওসিকে ফোন করে ফেলেছেন।

এরপর ওসি সেলিমুজ্জামান আমাদের তার নিজের রুমে ডেকে নিয়ে পুরো ঘটনা শুনলেন, নিজের ডয়রীতে সব তথ্য লিখে নিলেন। তারপর ডিউটি অফিসারকে নির্দেশ দিলেন মেয়েটির কাছ থেকে লিখিত অভিযোগ নিতে। আশ্বস্থ করলেন, রাতের মধ্যেই নিপীড়ক গ্রেপ্তার হবে। তারপর নিজের অনেকগুলো কার্ড এগিয়ে দিয়ে বললেন, সবাইকে বলবেন, অসুবিধায় পড়লে সবার আগে যেন আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে।

আমরা মুগ্ধতা নিয়ে ওসির দিকে তাকিয়ে রইলাম। একজন পুলিশ কর্মকর্তা যে এতোটা আন্তরিকতা নিয়ে সমস্যার সমাধানে এগিয়ে আসতে পারেন, আমাদের ধারণা ছিল না।

খুশিমনে থানা থেকে বেরুবার পথে আমি মেয়েটিকে বললাম, তুমি তো ভীষণ সাহসী মেয়ে, তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ করেছো আবার আইনগত ব্যবস্থা নিতেও এগিয়ে এসেছো।

মেয়েটি বললো, “ভাইয়া, এই পথে ঢাবির অনেক মেয়েই যাতায়াত করে। আজ আমি যদি প্রতিবাদ না করতাম, বিষয়টা গোপন করতাম, হয়তো অন্য কোন মেয়ে হয়রানির শিকার হতো। হয়তো ওইদিন বাসটা একেবারেই খালি থাকতো এবং আরো বড় কোন দূর্ঘটনা ঘটতো!”

আমি মেয়েটির দিকে তাকিয়েই রইলাম। তৃতীয় বর্ষে পড়া ছোট্ট একটা মেয়ে। অথচ কী অসাধারণ মনোবল আর বিশ্বাস! এমন বিশ্বাসই যে কোন অন্যায় গুড়িয়ে দিতে পারে। প্রয়োজন শুধু আওয়াজ তোলার। আফসোস, একটু প্রতিবাদ কিংবা প্রতিকারের সামান্য চেষ্টাটাই আমরা করি না!

আপডেট ১: ডিএমপি মিরপুর জোনের অতিরিক্ত কমিশনার মাসুদ আহমেদ জানিয়েছেন, অভিযান চালিয়ে রাতে হেলপার মামুনকে গ্রেফাতার করেছে পুলিশ।

আপডেট ২: মেয়েটির লিখিত অভিযোগ মামলা হিসেবে গ্রহণ করেছে পুলিশ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য রাতে প্রক্টর স্যারসহ শামসুন নাহার হলে গিয়ে আক্রান্ত মেয়েটির সঙ্গে দীর্ঘ সময় কথা বলেছেন এবং মেয়েটির সাহসীকতার প্রসংশা করেছেন।

আপডেট ৩: সকালেই ওই ছেলেকে কোর্টে চালান করেছে পুলিশ। রিমান্ড চাওয়া হয়েছে।

অনুভূতি: এই দেশে চাইলেই অনেক কিছু হয়, আমরা আসলে চাইতে জানিনা। ধন্যবাদ সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা ভাইদের বিদ্যুৎ গতিতে সব কিছু করায় এবং বিভিন্ন পত্রিকার ক্রাইম রিপের্টার বড় ভাইদের, যারা কয়েক ঘন্টার মধ্যেই ন্যাক্কারজনক এই ঘটনাকে টক অব দ্যা কান্ট্রি বানিয়ে দিয়েছেন।

~ আবদুল্লাহ আল ইমরান

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close