ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

প্রতিবন্ধী হয়েও প্রতিবন্ধী কোটার মারপ্যাঁচে আটকে যাচ্ছে হৃদয়!

মায়ের কোলে চড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিতে আসা হৃদয়ের গল্পটা এখন অনেকেই জানেন। গণমাধ্যম আর ফেসবুকের সুবাদে নেত্রকোণার এই ছেলেটার কীর্তি ছড়িয়ে পড়েছে সবার নিউজফিডে। সেরিব্রালপালসি’তে আক্রান্ত হৃদয় সরকার নামের কিশোর ছেলেটা ছোটবেলা থেকেই হাঁটতে পারে না, ঢাবির ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করাতে ছেলেকে কোলে করে নিয়ে এসেছিলেন হৃদয়ের মা। ভর্তি পরীক্ষার দিন সকালে হাজার হাজার মানুষ আগ্রহভরে তাকিয়ে ছিল হৃদয় আর তার মায়ের দিকে, এমন দৃশ্য তো সচরাচর দেখা যায় না! মায়ের কষ্ট বৃথা যায়নি, বৃথা যায়নি হৃদয়ের হার না মানা মনের জেদ। নিজের মেধার পরিচয় দিয়ে হৃদয় কৃতকার্য হয়েছিল ভর্তি পরীক্ষায়, স্থান করে নিয়েছিল মেধা তালিকায়। কিন্ত তবুও হৃদয়ের স্বপ্নের আকাশে জমেছে কালো মেঘ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্নটা হয়তো পূরণ হবে না তার!

নেত্রকোণার ছেলে হৃদয় সরকার মাধ্যমিকে পড়ার সময় থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হবার স্বপ্ন দেখেছে। প্রাচ্যের অক্সফোর্ডের আলো-বাতাস নিজের শরীরে জড়াতে চেয়েছে। এইচএসসিতে ৪.৫০ জিপিএ পাবার পরেও সে হতাশ হয়নি, বরং দ্বিগুণ উদ্যমে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। নিজের সামর্থ্যের ওপর পুরোপুরি আস্থা ছিল তার, সেই আস্থার প্রতিদান হিসেবেই দুইশো নম্বরের ভর্তি পরীক্ষায় জিপিএ এবং এমসিকিউ মিলিয়ে ১২০.৯৬ নম্বর স্কোর করেছিল হৃদয়। কিন্ত এত কষ্টের পরেও দিনশেষে হৃদয়ের হাতটা এখনও খালি, কারণ তার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার সুযোগ নিয়ে তৈরি হয়েছে শঙ্কা। 

খ-ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করা পঁয়ত্রিশ হাজারেরও বেশি প্রতিযোগীর মধ্যে মেধা তালিকায় হৃদয়ের অবস্থান ছিল ৩৭৪০তম। খ-ইউনিটে মোট আসন সংখ্যা প্রায় ২৪০০টি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্যে প্রতিবন্ধী কোটায় আবেদন করেছিল হৃদয়। এই কোটায় আসনও ফাঁকা ছিল। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি মোতাবেক, প্রতিবন্ধী কোটায় শুধু দৃষ্টি, শ্রবণ ও বাকপ্রতিবন্ধী হলেই কোটা প্রযোজ্য হবে৷ অন্য কোন প্রতিবন্ধীরাই কোটায় ভর্তি হবার সুযোগ পাবেন না। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের এই নিয়মের বেড়াজালে আটকেই থমকে যাচ্ছে হৃদয়ের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্নটা।

খবরটা শোনার পরে খানিকটা থমকে গেছে হৃদয়। হাজার হাজার ছেলেমেয়েকে পেছনে ফেলে ভর্তি পরীক্ষায় যে ছেলেটা কৃতকার্য হয়েছিল, শত প্রতিকূলতাকে পরাজিত করে যে হৃদয় জায়গা করে নিয়েছিল মেধা তালিকায়, তাকেই এখন নিয়মের বেড়াজালে আটকে থেমে যেতে হচ্ছে। নিজের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জানাতে গিয়ে হৃদয় বলেছেন, “আমার বাবা-মা যখন ফর্ম আনতে গেলেন, তখন তাদের বলা হয়েছে, আমি নাকি কোটার মধ্যে পড়ি না। এরপরে আমরা ডীন স্যার আর ভিসি স্যারের কাছেও গেলাম। তারাও বললেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধির কারণে আমার কোটায় ভর্তির সুযোগ নেই।”

হৃদয়ের মা সীমা সরকারের কষ্টটা আরও তীব্র। ছেলেকে একদম ছোটবেলা থেকে কোলেপিঠে করে মানুষ করেছেন তিনি, সুস্থ-স্বাভাবিক একজন মানুষের সঙ্গে হৃদয়ের যে পার্থক্য আছে, সেটা ছেলেকে কখনও বুঝতে দেননি তিনি। হৃদয় স্বপ্ন দেখেছে, তিনি সেই স্বপ্ন পূরণ করার জন্যে ছেলেকে নিয়ে ছুটে বেড়িয়েছেন, ছেলেকে কোলে করে ভর্তি পরীক্ষা দিতে নুয়ে গিয়েছেন। ভেবেছিলেন, হৃদয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে গেলে নেত্রকোণা থেকে ঢাকায় চলে আসবেন পরিবারের সবাই মিলে। সীমা সরকার জানেন, তিনি চিরকাল বেঁচে থাকবেন না। তিনি না থাকলেও যাতে হৃদয়ের অসুবিধা না হয়, ভালো একটা জায়গায় পড়ে যাতে ছেলে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে, মা হিসেবে এটাই ছিল তার চাওয়া। সীমা সরকারের সেই চাওয়াটা এখন পূরণ হতে হতেও হচ্ছে না। 

বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধিতে প্রতিবন্ধী কোটায় শুধু দৃষ্টি, শ্রবণ ও বাকপ্রতিবন্ধী-এই তিন ধরণের প্রতিবন্ধীদের ক্ষেত্রে কোটা প্রযোজ্য হবে। এখানে শারীরিক বা মানসিক অথবা অন্য কোন ধরণের প্রতিবন্ধীরা কোটায় ভর্তি হতে পারবেন না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের ডীন ও ভর্তি পরীক্ষার প্রধান সমন্বয়কারী অধ্যাপক আবু মো দেলোয়ার হোসেন বলেছেন,

“ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেয়ার যোগ্যতা থাকলে যে কেউ অংশ নিতে পারবেন। কিন্তু কোটায় ভর্তি হবার সুযোগ পাবেন শুধুমাত্র বাক, শ্রবণ বা দৃষ্টি প্রতিবন্ধীরা। এর বাইরের প্রতিবন্ধীদের নেয়ার সুযোগ আমাদের নেই। আমরা তো অমানবিক নই৷ প্রতিবন্ধী পরিচয় ব্যবহার করে অনেকে অনৈতিক সুবিধা নেয়৷ আমাদের বিধিতে দৃষ্টি, শ্রবণ আর বাকপ্রতিবন্ধীদের কোটা সুবিধা দেওয়ার কথা বলা আছে৷ তার (হৃদয়) সঙ্গে আমাদের তো কোন বিরোধ নেই। কিন্তু বিধির কারণেই সে কোটার আওতায় পড়ছে না।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় কৃতকার্য হবার পরে এগিয়ে চলো’র সঙ্গে এক আলাপচারিতায় হৃদয় জানিয়েছিল তার জীবনের গল্পটা। যখন তার জন্ম হলো, তখন সব কিছু স্বাভাবিক হতে পারতো। অন্য সবার মতো স্বাভাবিকভাবেই হয়ত জন্মাতে পারতেন হৃদয়। কিন্তু, বিপত্তি ঘটলো তার জন্মের সময়। স্বাভাবিক অবস্থার থেকে ব্যাপারটা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় চলে যাওয়াতে হৃদয়ের মাকে বাঁচাতে অক্সিজেন সিলিন্ডার দিয়ে কৃত্তিম শ্বাস প্রশ্বাসের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কিন্তু সেই অক্সিজেন সিলিন্ডার কাজ করছিল না ঠিকমতো, কারণ সেটা বেশ পুরানো, অকার্যকর। এই রকম একটি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় হৃদয় এলেন এই ধরণীতে। কিন্তু, এখানেও হয়ে গেল আরেকটি ভুল। জন্মের পর শিশুদের যে টিকা দেয়া হয়, হৃদয়কেও সেগুলো দেয়া হয়েছিল কিন্তু টিকাগুলো ছিল ডেট এক্সপায়ার্ড!

ফলে হৃদয়ের ব্রেইন হ্যামারেজ হয়। শুধু তাই নয়, তার শরীরের নার্ভ সিস্টেমের উপর খুব বেশি প্রভাব ফেলে সেটি। কোমর থেকে পা পর্যন্ত তার শরীর অকেজো হয়ে যায়। সে হাঁটতে পারে না সেই প্রভাবে। আর তারপর থেকেই হৃদয়ের এই জীবনটাকেই মেনে নিতে হয়৷ শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে হৃদয় ভালোবেসে বরণ করে নেননি, এটা তাকে মেনে নিতে হয়েছে, নিয়তি তার ওপর চাপিয়ে দিয়েছিল এই অমানবিক ব্যাপারটা। ভাগ্যের কাছে হৃদয় আর তার পরিবার সেদিন অসহায় ছিলেন, অসহায় তারা আজও, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে, নিয়ম নামের অনিয়মের কাছে। 

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে আমাদের প্রশ্ন, কেবল দৃষ্টি/শ্রবণ কিংবা বাকপ্রতিবন্ধীরাই কি শারিরীকভাবে অক্ষম? তাহলে অন্য প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা কেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে সমান সুযোগ পাবেন না? এটা কি একচোখা দৃষ্টিভঙ্গি নয়? বাড়তি সুবিধাটুকু তো সব প্রতিবন্ধী ব্যাক্তিরই পাবার কথা, সেটা কেউকে দেয়া হবে, কাউকে দেয়া হবে না, এরকম কেন করা হবে? এটা কি অমানবিক আচরণ নয়? বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে একটু মানবিকতা কি আমরা প্রত্যাশা করতে পারি? হৃদয়ের জন্যে তারা কি খানিকটা নমনীয় হতে পারেন না?

হৃদয় সরকার একজন যোদ্ধার নাম। হাজারো প্রতিকূলতাকে পায়ে মাড়িয়ে যে কিশোর লক্ষ্যের দিকে ছুটে চলে একমনে, তাকে তো যোদ্ধাই বলা যায়, তাই না? কিন্ত হৃদয়ের যুদ্ধটা শেষ হচ্ছে না, যুদ্ধে জয়ী হয়েও তিনি বিজয়ীর মুকুট পাচ্ছেন না, নিয়ম নামের এক অনিয়মের কারণে। ভাগ্য যে ছেলেটাকে নিয়ে তার জন্মের পর থেকেই ছিনিমিনি খেলেছে, সেই হৃদয়ের জন্যে কি নিয়মে খানিকটা শৈথিল্য আনা যায় না? বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম-কানুন তো কোরআন বা বাইবেল নয়, সেখানে পরিবর্তনের সুযোগ তো রয়েছেই। প্রতিবন্ধী হবার জন্যে বাড়তি সুবিধাটুকু যদি একজন শ্রবণ বা দৃষ্টি প্রতিবন্ধী পেতে পারেন, হৃদয় কেন পাবেন না?

আরও পড়ুন-

Comments

Tags

Related Articles