ছোটবেলায় আমরা অধ্যবসায়ের উদাহরণ হিসেবে রবার্ট ব্রুসের গল্প শুনেছি, যে কিনা ৭ম বারের চেষ্টায় যুদ্ধ জয় করেছিল। আজ আর এক অধ্যবসায়ী চীনা এক ভদ্রলোকের যুদ্ধ জয়ের গল্প শুনব। তার যুদ্ধটা কোন দেশ বা জাতীর বিরুদ্ধে নয়, শারীরিক এবং প্রাকৃতিক প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে। তবু তার যুদ্ধটাও কিন্তু কম কঠিন এবং শিক্ষনীয় নয়।

অধ্যবসায়ী এই চাইনিজ ভদ্রলোকের নাম শিয়া বোউ। তেতাল্লিশ বছর আগে এভারেস্টের চূড়ায় উঠতে গিয়ে প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় আক্রান্ত হয়ে ফিরে আসতে হয়েছিল তাকে। তারপর ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে কেটে ফেলতে হয়েছিল তার দুটো পা-ই। কিন্তু তার পরও স্বপ্ন পূরণে পিছপা হননি তিনি। চেষ্টা করেছেন বার বার। অবশেষে গত ১৪ তারিখ সোমবার সকালে ৬৯ বছল বয়সী এই চীনা ভদ্রলোক ২৯,০২৯ ফুট উচ্চতা অতিক্রম করে পঞ্চমবারের চেষ্টায় এভারেস্টের চূড়ায় পৌঁছুতে সক্ষম হয়েছেন।

রেকর্ড গড়েছেন তিনি, কারণ এর আগে দুই পা নেই এমন কেউ নেপালের দিক থেকে এভারেস্টর চূড়ায় উঠতে পারেনি। ২০০৬ সালে দুই পা হারানো আরেক পর্বতারোহী – নিউজিল্যান্ডের মার্ক ইঙ্গলিস- এভারেস্টে উঠেছিলেন তিব্বতের দিক থেকে- যেটাকে অপেক্ষাকৃত সহজ হিসাবে বিবেচনা করা হয়।

এভারেস্টের চূড়ায় পৌঁছানোর সময় শিয়া বোউয়ের সঙ্গে ছিল তের জনের একটি দল। সেই দলে স্টিভ প্লেইন নামক একজন অস্ট্রেলিয়ান ভদ্রলোক ছিলেন, যিনি সবচেয়ে কম সময়ে এভারেস্টের চূড়ায় ওঠার রেকর্ড গড়েছেন।

এভারেস্ট জয়

১৯৭৫ সালে প্রথম শিয়া বোউ এভারেস্টে ওঠার চেষ্টা করেন। সেসময় তার সাথে ছিল বিশ জনের একটি চীনা দল যারা ৮,৮৪৮ মিটার উঁচু এভারেস্টের চূড়ায় উঠার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু চূড়ার উঠার যখন আর মাত্র ২০০মিটার বাকি তখন প্রচন্ড ঠান্ডায় আক্রান্ত হয়ে শিয়া বোউকে ফিরে আসতে হয়েছিল স্বপ্নপূরণের খুব কাছ থেকে। সেই অসুস্থতার জেরে পায়ে ক্যান্সার ধরা পড়ায় ১৯৯৬ সালে হাঁটুর নীচ থেকে তার দুই পা কেটে ফেলতে হয়েছিল।

এরপর ২০১৪ এবং ২০১৫ সালে তিনি আবার অভিযানের জন্য নেপালে আসেন, কিন্তু দুর্যোগপূর্ণ অবহাওয়া এবং দুর্ঘটনার জন্য নেপাল সরকার দুবারই পর্বতারোহণ বন্ধ রেখেছিলো। ২০১৬ সালেও মাত্র ২০০ মিটার ওঠার পর খারাপ আবহাওয়ার কারণে তাকে ফিরে আসতে হয়েছিল।

গত বছর নেপালের সরকার যখন দুই-পা কাটা এবং অন্ধদের জন্য এভারেস্টে ওঠা নিষিদ্ধ করে দেয়, চরম হতাশায় পড়ে গিয়েছিলেন তিনি। তবে এ বছর মার্চ মাসে নেপালের সুপ্রিম কোর্ট সরকারের ঐ নিষেধাজ্ঞা বেআইনি ঘোষণা করলে, এপ্রিল মাসে তিনি পঞ্চম বারের মত এভারেস্ট অভিযান শুরু করেন।

এভারেস্ট জয়

এবং এবার তিনি ৪৩ বছরের চেষ্টায় প্রথমবারের মত এভারেস্ট জয় করতে সক্ষম হন।

অভিযান শুরুর আগে তিনি বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেছিলেন, “এভারেস্টের চূড়ায় ওঠা আমার স্বপ্ন। আমাকে এই স্বপ্ন পূরণ করতেই হবে। ব্যক্তিগতভাবে এটা আমার জন্য এটা চ্যালেঞ্জ, আমার দুর্ভাগ্যের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ।”

স্বপ্নপূরণে এমন অধ্যবসায়ী আর দৃঢ় প্রতিজ্ঞ যে মানুষ, তার স্বপ্নের পথে বাধা হতে পারে এমন কি আছে পৃথিবীতে! কিছুই যে নেই তা শিয়া বোউ প্রমাণ করে দেখিয়েছেন গত সোমবার সকালে। তিনি এভারেস্ট জয় করে তার স্বপ্ন পূরণ করে দেখিয়েছেন। তার সাফল্য দুনিয়ার মানুষের কাছে অনুপ্রেরণার দৃষ্টান্ত হযে রয়ে যাবে।

শিয়া বোউয়ের এভারেস্ট সামিটের অংশবিশেষের ভিডিও দেখুন এখানে ক্লিক করে।

তথ্যসূত্র- বিবিসি, দ্য গার্ডিয়ান

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-