আর কত নীচে নামবে ছাত্রলীগ? গভীর রাতে হুট করেই ফেসবুকের নিউজফিড সয়লাব হয়ে যায় একটা রক্তাক্ত পায়ের ছবিতে। সেই ছবিটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কবি সুফিয়া কামাল হলের ছাত্রী মোরশেদা আক্তারের। একই ছবির নীচে অনেক রকমের ক্যাপশন, তবে সবগুলোর ভাষা মোটামুটি একই- সুফিয়া কামাল হলের ছাত্রলীগের সভাপতি ইফফাত জাহান তার রুমে ডেকে নিয়ে নির্যাতন করেছেন ‘কোটা সংস্কার আন্দোলনে’ অংশগ্রহণ করা মেয়েদেরকে। এদের মধ্যে ছিলেন বোটানী বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্রী মোরশেদা আক্তারও, এক পর্যায়ে মোর্শেদার পা ধারালো বস্তুর আঘাতে কেটে যায়- এমনটাই দাবী করেছিলেন ছাত্রীরা। তবে আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে হলের প্রভোস্ট জানিয়েছেন, নির্যাতনের ফলে নয়, কাঁচের দরজার সঙ্গে লেগে পা কেটেছে মোরশেদার। তবে রুমে ডেকে নিয়ে নির্যাতনের ঘটনা সত্যি বলেই স্বীকার করেছেন তিনি। আর যথারীতি এর বিচার হিসেবে দলীয় প্যাডে এক লিখিত বিবৃতিতে এশাকে “দলীয় শৃঙ্খলা” ভঙ্গের দায়ে বহিষ্কার করেই দায়িত্ব শেষ করেছেন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। অপরাধ যত ভয়ংকরই হোক না কেন, তার শাস্তি স্রেফ একটাই- “শৃঙ্খলা ভঙ্গ”-এর অভিযোগে দলীয় পদ থেকে বহিষ্কার। ঠিক যেন প্যারাসিটামল দুই বেলা!

আচ্ছা, গত আট-নয় বছরে এমন কত অসংখ্যবার দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে ছাত্রলীগের প্যাডের একটা পেইজে এই গৎবাঁধা বস্তাপচা বহিষ্কার আদেশ শুনতে হয়েছে আমাদের, কোন হিসাব আছে? এই যে এতোবার শৃঙ্খলা ভঙ্গ হলো, একবারও কি তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়েছে? একবারও কি ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নিজে উদ্যোগী হয়ে মামলা করেছেন? এটলিস্ট স্পষ্ট করে এটা বলেছেন যে ছাত্রলীগের শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিতের জন্য যা করা দরকার, তারা করবেন? শুনতে হয়তো খুব অবাস্তব লাগছে, তাই না? হ্যাঁ, ঠিক এইভাবেই গত ৮-৯ বছর ধরে ক্ষমতাসীন দলের ক্ষমতার দাপট কাজে লাগিয়ে এতো এতো অপরাধ করেছে ছাত্রলীগ এবং এতো জঘন্যভাবে প্রতিবার স্রেফ লোক দেখানো “শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে বহিষ্কার” শব্দগুলোর ভেতর দিয়ে পার পেয়ে গেছে যে আজ ছাত্রলীগের বেপরোয়া কুলাঙ্গারদের বিচার চাওয়ার প্রসঙ্গটাও হাস্যকর হয়ে গেছে। ও হ্যাঁ, বিচার যে হয় নাই, তা কিন্তু না! বিশ্বজিৎকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করার বর্বরতার বিচার হয়েছিল, রায় এসেছিল অপরাধীদের ফাঁসীর। কিন্তু সেই অপরাধীরা আজ রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে খোলা বাতাসে মুক্তভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে, ছাত্রলীগের বিভিন্ন সমাবেশেও তাদের দেখা যায় প্রায়ই। হ্যাঁ, ঠিক এইভাবেই বিচারটা হয়েছে গত ৮-৯ বছরে, ন্যুনতম শাস্তি কাউকে দেওয়া হয় নাই, একের পর এক ভয়ংকর অপরাধের শাস্তি হিসেবে দলীয় পদ-পদবী দিয়ে পুরষ্কৃত করা হয়েছে। একজন ভয়ংকর অপরাধী যখন অপরাধের শাস্তি হিসেবে দলীয় পদ-পদবী দ্বারা পুরষ্কৃত হয়, তখন সে পরিণত হয় ফ্র্যাংকেস্টাইনে! আজ ছাত্রলীগকে মানুষ চেনে মানুষরুপী ফ্র্যাংকেস্টাইনদের সংগঠন হিসেবে!

জানি এখন অনেকেই অনেক যুক্তির কাউন্টার নিয়ে আসবেন। হ্যাঁ, ছাত্রলীগে গত ৮-৯ বছরে ছাত্রদল-ছাত্রশিবিরের অসংখ্য দেশদ্রোহী, রাজাকারের সন্তান, বেঈমান ঢুকেছে, যারা ছাত্রলীগার পরিচয় দিয়ে কুকর্ম করে দলের ক্ষতি করছে। গত ৮-৯ বছরে অসংখ্য চাঁদাবাজ, ভূমিদস্যু, নেশাখোর, মাস্তান, দাগী আসামী, ধর্ষক, হিরোইঞ্চি ছাত্রলীগে ঢুকেছে যারা স্রেফ নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করছে, নিজেদের আখের গোছাচ্ছে, সরকারী দলের ক্ষমতা খাটিয়ে মানুষের উপর অত্যাচার করে, চাঁদাবাজি করে, জমি-জমা দখল করে সরকাররে উপর জনগণকে বিষিয়ে তুলছে! আপনাদের এই সব যুক্তিই মেনে নিলাম।

এখন আমাকে বলেন, ১৯৪৮ সালে বঙ্গবন্ধুর হাতে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ ছাত্রলীগের দলীয় নীতিমালার একজ্যাক্টলি কোন জায়গায় এই ধরণের ক্রিমিনালদের, দেশদ্রোহীদের ছাত্রলীগে রিক্রুট করার ধারা উল্লেখ আছে? পারবেন দেখাতে? যদি না দেখাতে পারেন, তাহলে কিভাবে এতো এতো অপরাধের দায় স্রেফ এদের উপর চাপিয়ে ছাত্রলীগের হাই কমান্ডকে ডিফেন্ড করার চেষ্টা করেন? এরা ছাত্রলীগে কেন ঢুকতে চাচ্ছে, এটা কি হাই কমান্ড জানতো না? তাহলে কিভাবে এই ক্রিমিনালেরা ছাত্রলীগে ঢুকতে পারলো? লাখ লাখ টাকার বিনিময়ে আওয়ামীলীগ ও ছাত্রলীগের যে নেতারা এই ক্রিমিনালগুলোকে দলে ঢুকিয়েছেন গত ৮-৯ বছরে, সেটা কি বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে উড়িয়ে দেবেন? কিভাবে একজন শিবিরকর্মী লাখ লাখ টাকা ঘুষ দিয়ে ছাত্রলীগে ঢুকে যেতে পারে? উপজেলা-জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক পদে বসতে পারে? এই সুযোগ তাকে কে দিয়েছে? আজকের এই সীমা অতিক্রম করে ছাত্রলীগের পেছনে কি এই দুর্নীতিবাজ নেতারা দায়ী না? এবং ছাত্রলীগের প্রত্যেকটা অপরাধের দায় কি এদের ছাপিয়ে আওয়ামীলীগ ও সরকারের উপর এসে পড়ে না?

কষ্টটা ঠিক এইখানেই। স্রেফ ছাত্রলীগকে দোষ দিয়ে লাভ নাই, কারণ মূল দলেই যেখানে হাজার হাজার জামায়াত ও শিবিরের নেতাকর্মী লাখ লাখ টাকার বিনিময়ে ঢুকে যাচ্ছে, সেখানে ছাত্রলীগ তো খুব মামুলি ব্যাপার! কিন্তু ছাত্রলীগ কিংবা আওয়ামীলীগের ট্যাগে এরা যত অপরাধ করছে, তার প্রত্যেকটা কিন্তু কাউন্ট হচ্ছে আওয়ামীলীগের নামে, মানুষের ক্ষোভটা জমা হচ্ছে এই সরকারের উপর। কারণ? কারণ এই সরকার, এই প্রশাসন এই অপরাধীদের বিচারের ব্যবস্থা করছে না। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিচ্ছে না। ছাত্রলীগ না হয় তাদের “নেতাকর্মী” বিবেচনায় এই ক্রিমিনালদের ইনডেমনিটি দিচ্ছে, কিন্তু সরকার? এক বিশ্বজিতের খুনীদের যদি ফাঁসী কার্যকর হত, আজ পর্যন্ত প্রত্যেকটা সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটে যাওয়া “ছাত্রলীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষের” যদি বিচার হত, তাহলে আজ এই অবস্থার সৃষ্টি হত না। প্রত্যেকটা বিচারহীনতা, শাস্তির বদলে দলের পদ-পদবী দিয়ে পুরষ্কৃত করার এই ধারা বাকি নেতাকর্মীদের জন্য উৎসাহ বিশেষ, যা ইচ্ছা করো, দুই-চারটা খুন করে আসো, কিচ্ছু হবে না—ঠিক এই রকম আশ্বাস দেওয়া। এর দায় সরকার কোন যুক্তিতে এড়াবে? দল হিসেবে আওয়ামীলীগ কিভাবে এড়াবে?

সবচেয়ে পরিহাসের ব্যাপার হচ্ছে, আজ যারা ছাত্রলীগের পাণ্ডা হিসেবে মাঠ-ঘাট দাপিয়ে বেড়াচ্ছে, এরা কেউই বিএনপি-জামায়াতের সময়ের সেই মাৎস্যন্যায়ে ছিল না। আজ যারা লাখ লাখ টাকা দিয়ে মাছের বাজারে দাম-দর করে মাছ কেনার মত করে ছাত্রলীগে পদ কিনছে, ওকা আংকেলের সাথে সেলফি তুলে, মেকাপ সুন্দরী হবার খাতিরে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ কিংবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা হলের প্রেসিডেন্ট পদ পাচ্ছে, তারা কেউই জীবনে কখনো ছাত্র রাজনীতি করেনি, তারা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তো দূরে থাকুক, ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত এই তিল তিল আন্দোলন সংগ্রামে, মুক্তিযুদ্ধে হাজার হাজার নেতাকর্মীর শহীদ হওয়ার বিনিময়ে স্বাধীন বাংলাদেশ গঠনে ছাত্রলীগের গৌরবোজ্জ্বল অংশগ্রহণের ইতিহাসটা পর্যন্ত জানে না। অথচ বিএনপি-জামায়াতের সময়ের মাঠপর্যায়ের সেই ত্যাগী নেতাকর্মীরা, যারা নির্যাতন-মামলা-হামলার শিকার হয়েও গঠনতান্ত্রিক রাজনীতি চালিয়ে গেছে, তারা আজ এই হাইব্রিডদের মাঝে অচ্ছুৎ।

এ কারণেই এরা এতোটা বেপরোয়া হবার সাহস পায়, কোটা সংস্কারের মত এতো জরুরী আর জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের পাশে দাঁড়াবার বদলে তাদের উপর আক্রমণের স্পর্ধা দেখায়, হলের ভেতর আবার সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের নির্যাতনের দুঃসাহস দেখায়। কারণ এরা জানে তাদের ইনডেমনিটি দেয়া আছে, তাদের বিচার বলতে ছাত্রলীগের প্যাডে দল থেকে বহিষ্কারের আইওয়াশ। অথচ চাইলে খুব সহজেই ছাত্রলীগ এই আন্দোলনের নেতৃত্ব নিতে পারতো, ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করে দাবী-দাওয়া উত্থাপন করতে পারতো, এরপর সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের প্রতিনিধি হিসেবেই সরকারের সাথে বসে একটা গ্রহণযোগ্য সমাধানে আসতো পারতো। এতে ছাত্রলীগের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হত, সরকারও পেতো বাহবা। অথচ তার বদলে তাদের সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের উপর লেলিয়ে দেয়া হল, আন্দোলনে ছাত্রলীগের অনুপস্থিতিতে শিবির নিজেদের প্রভাব বিস্তার করলো, এমনকি মাইক নিয়ে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগও পেয়ে গেল শিবির নেতা। আর ছাত্রলীগ ড্যামেজ কন্ট্রোলের বিন্দুমাত্র চেষ্টা না করে আরো উন্মত্তের মত আচরণ করতে শুরু করলো সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের সাথে! গত এক বছরে এতো বড় ক্ষতি এমনকি বিএনপি-জামায়াতও করতে পারেনি। সরকার কি বুঝতে পারছে এটা?

কোটা সংস্কার আন্দোলন, পুলিশ ছাত্র লড়াই, মুক্তিযোদ্ধা কোটা

আর এই বেপরোয়া ক্রিমিনালগুলোর ন্যুনতম বিচার না করে এদের ফ্র্যাংকেস্টাইনে বানিয়ে ফেলছে সরকার, ছাত্রলীগ মানুষের কাছে পরিচিত হচ্ছে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে। যার মাশুল দেবে সরকার, আর ফল ভোগ করতে হবে বাংলাদেশকে। আক্রমণের পরে সেই নারী কর্মীকে বহিষ্কার করা গেলে – এমন কাজ যেন কোন কর্মী না করে সেটা কেন শুরুতেই নিশ্চিত করেনি ছাত্রলীগ ? ছাত্রলীগের কর্মীর কর্মকাণ্ডের দায় তো এখন শুধু পুরো ছাত্রলীগের উপরেই নয় , আওয়ামীলীগ সর্বোপরি সরকারের উপরে পড়ছে , সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হচ্ছে যেখানে সামনে নির্বাচন। সরকার কি ভেবে দেখছে? মানুষ কিন্তু কিছুই ভুলে যায় না!

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে এই অধমের বিনীত জিজ্ঞাসা, আজ যদি ছাত্রলীগের এই চরম সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের জেরে ধর্মান্ধ মৌলবাদী গোষ্ঠী ক্ষমতায় আসে, এই হাজার হাজার দুধের মাছি ছাত্রলীগারদের কয়জন আপনার পাশে পাবেন? আপনার সরকার আর কত দেরি করবে এদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নিতে?

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-