ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

ডাক্তার হয়েছি বলে কি আমি মানুষ নই?

ঘটনাস্থলঃ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, শ্রীনগর, মুন্সীগঞ্জ। আমার কাছে থাকা সরকারী মোবাইলে রিংটোন বেজে উঠলো।

আমিঃ হ্যালো।

OC: (অত্যন্ত ক্রুদ্ধস্বরে) রোগীটাকে ঢাকায় রেফার করলেন কেনো?( OC সাহেব উনার পরিচয়টা পর্যন্ত দেননি।)

আমিঃ ওহ, আপনার কনস্টেবলকে প্রাইমারী ম্যানেজমেন্ট দেয়া হয়েছে। ECG করা হয়েছে, ধারণা করছি হার্টের সমস্যা আছে, তাই রেফার করতে হয়েছে।

(কনস্টেবল এর V2, V3 তে ST baseline থেকে ৩-৪ ঘরের মত Elevated ছিলো, Chest and upper abdomen এ discomfort ছিলো। পেশেন্টের ব্যাপারে আমি এতটুকু ডেডিকেটেড ছিলাম যে, সেই Chest discomfort টিপিক্যাল প্যাটার্ন না দেখানোর পরও আমি ECG করে নিয়েছিলাম।)

OC: (ক্রুদ্ধস্বরে): আপনি ২টা ঘন্টা হাসপাতালে রেখে রোগীটার চিকিৎসা করলেন না কেনো? মিটফোর্ডে পাঠাইছেন, অ্যাম্বুলেন্স কই, অ্যাম্বুলেন্স কই আপনাদের?

আমিঃ অ্যাম্বুলেন্সের ড্রাইভার অসুস্থ, ছুটিতে আছেন।

(অ্যাম্বুলেন্স ড্রাইভারের নিজে অসুস্থ, শুনলাম- ডেঙ্গু হয়েছে। সরকারী অ্যাম্বুলেন্সের ড্রাইভারের নাম্বার হাসপাতালে ডিসপ্লে করা থাকে। রোগীরা সে নাম্বারে কল করে ড্রাইভারের সাথে কথা বলে সরকারী রেটে তাদের যাত্রা নিশ্চিত করেন। এখানে আমার ভূমিকা তেমন নেই বললেই চলে। তবুও আমি খবর নিয়েছি।)

OC: কিহ? নাম কি আপনার? নাম কি?

আমিঃ আপনি মাথা গরম করছেন কেনো? রোগীর ভালোর জন্য যা করার দরকার আমি তাই করেছি। হার্টের সমস্যা যেখানে সন্দেহ করছি, সেখানে ২ ঘন্টা এই প্রাইমারী কেয়ার সেন্টারে রেখে চিকিৎসা দেয়া রিস্কি।

OC: নাম কি? নাম বলেন আপনার। দেখেন আমি কি অ্যাকশন নেই আপনার…

আমি: আপনার যা ইচ্ছা আপনি করেন। আপনি এক কাজ করেন, হাসপাতালে আসেন, আমি বিষয়টা আপনাকে বুঝায়ে বলি…

OC: নাহ, আমি আসবো না। আপনার নাম বলেন। দেখেন আমি আপনার কি করি….

আমিঃ আপনি তো এইভাবে আমার সাথে কথা বলতে পারেন না। আমার নাম ডা. মোঃ আসাদুজ্জামান, মেডিকেল অফিসার হিসেবে আছি…

OC: আমার নাম ওসি…..(নামটা মনে করতে পারছি না, তবে আমাদের সরকারী মোবাইলে OC হিসেবে নাম্বারটা ইনপুট করা ছিলো।)

আমিঃ আমি তো আপনার নাম জানতে চাইনি…

OC: আপনের নাম ডা. আসাদুজ্জামান? মেডিকেল অফিসার?দেখেন আমি আপনার কি করি….(উনি ফোন কেটে দিলেন)

মাথা গরম করা কোন কাজের কাজ না। আমি জানি সেই পুলিশ কনস্টেবলকে আমি কতটা মমতা নিয়ে দেখেছিলাম। আমি জানি সেই পুলিশের সাথে যারা এসেছিলো তাদের প্রতি আমি কতটা হৃদয় দিয়ে কথা বলেছিলাম। আমি জানি আমার প্রতিটা কাজই প্রোটকল ওয়াইজ হয়েছিলো। অবস্থা বিবেচনায় সম্পূর্ণ ঘটনা সাথে সাথে (আনুমানিক রাত ৯ টায়) আমি আমার RMO ভাইকে জানালাম, তিনি জানালেন একটু আগে OC ফোনে তার সাথেও যাচ্ছেতাই আচরণ করেছে। UHFPO( THO) স্যারকে ফোন দিলাম। উনি তারাবীহ এর নামাযে ছিলেন। আমি ছিলাম অনেকটাই অসহায়। শ্রীনগরের সার্কেল ASP কে ফোন দিলাম ঘটনার বিষয়ে ওয়াকিবহাল করার জন্য। সম্ভবত উনার মিসেস ফোন ধরলেন, বললেন, উনি দেশের বাইরে কোন এক ট্রেনিংয়ে আছেন..

ঘটনার আকস্মিকতায় আমি হতভম্ব বলা চলে। পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কি এভাবে তাদের অধঃস্তনকে আচার শিখান? যেহেতু পেশেন্টের শারীরিক বিষয় সবার আগে, তাই রোগীর বিষয়ে দাঁতে দাঁত চেপে নিজের মনে যন্ত্রণা পুষে আমি OC সাহেবের নাম্বারে ফোন ব্যাক করলাম…

আমিঃ আপনার রাগ কি কমেছে? (বিশ্বাস করেন, কলব্যাক করার পর এটাই ছিলো আমার প্রথম কথা)

OC: (রাগান্বিত স্বরে) না, না, আপনার সাথে কোন কথা নাই…

আমি: দেখুন, রাগ কোন সমাধান না, আমি যেটা করেছি…

OC: (আমাকে OC সাহেব কথা বলতে দিলেন না) আপনারা পাইছেনটা কি! রোগীটারে ঢাকায় রেফার করলেন!

আমি: আপনি মাথা ঠান্ডা করুন, আপনি এক কাজ করুন, হাসপাতালে আসুন, এক কাপ চা খান। আমি বিষয়টা আপনাকে বোঝাই, তারপর আপনি যা খুশি করবেন..

(জ্বি, আপনারা ঠিকই শুনেছেন, সমস্যা সমাধানে, রোগীর চিকিৎসার ভুল বোঝাবুঝির অবসানে তাকে রাত আনুমানিক ৯:৩০ টায় চায়ের নিমন্ত্রণও করেছিলাম। কি মনে হয়? আমি কতটুকু সহানুভূতিশীল ছিলাম?)

OC: আপনার সাথে কোন কথা নাই( মাঝখানে একবার আমার বিরুদ্ধে আবারও কঠিন অ্যাকশন নেবার কথাও বললেন এবং কোন রকম ভদ্রতার ধার না ধেরে উনি আবারও ফোন কেটে দিলেন)…

আমি যে লেখাগুলো লিখলাম সেগুলোর সম্পূর্ণ দায় দায়িত্ব আমার। যতদূর যেভাবে মনে আছে, সেটাই লিখে ফেললাম। যতদূর জানি, মোবাইলে যেকোন কনভারসেশন একমাস অবধি রেকর্ড থাকে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কি রেকর্ডটি কালেক্ট করবেন?

প্রিয় প্রধানমন্ত্রী, দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে সামনে নিয়ে যাবার জন্য আপনি আমাদের এদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে নিয়োগ দিয়েছিলেন। সম্পূর্ণ সুযোগসুবিধা ও একাডেমিক রেজাল্ট থাকার পরও দেশের বাইরে না গিয়ে আমি আপনার নির্দেশনায় দেশসেবায় ব্রতী হয়েছিলাম। দুবছর অতিক্রম করে আমার বিসিএস ব্যাচের অধিকাংশ চিকিৎসক যখন লজিক্যাল ওয়েতে ঢাকায় পোস্টিং নিয়ে চলে গিয়েছেন,প্রিয় প্রধানমন্ত্রী, আমি তখন ঢাকায় না গিয়ে গ্রামের মানুষগুলোর সেবায় নিজেকে আত্মনিয়োগ করেছিলাম, গ্রামে থেকে গ্রামের মানুষের সেবায় ব্রত ছিলাম। বেশীরভাগ সরকারী চাকুরীজীবীরা যখন এই রোজায় দেশকে ৩০-৩২ ঘন্টা সেবা দিয়েছেন, সেখানে আমি এই সপ্তাহে ৫২ ঘন্টা সেবা দিয়েছি। প্রিয় প্রধানমন্ত্রী, বিশ্বাস করেন-এই রোজায় আমি সেহেরী এবং ইফতারীটাও ঠিক সময় করতে পারি নাই, আমি নিশ্চিত করেছি যাতে রোগীরা সেহেরী বা ইফতার টাইমে হাসপাতালে এসে বলতে না পারে-‘ডাক্তার কই? ডাক্তারের আসতে দেরী হইতেছে কেন?’ আমার অ্যাসিট্যান্ট রোগীর কাছে যাবার আগে আমি রোগীর কাছে গিয়েছি, চিকিৎসা দিয়ে রোগী চলে যাবার পর আমার অ্যাসিট্যান্টদের আমি বলেছিলাম- ‘সবার আগে পেশেন্ট ম্যানেজমেন্ট, তারপর অন্য কাজ’। আমি বুক ভরা সাহস নিয়ে এ গাঁয়ে এসে ডায়াগনোস্টিক সেন্টারগুলোকে বলেছিলাম যাতে আমার নামে কমিশনের কোন অভিশপ্ত খাম না আসে, ঘৃণাভরে ওষুধ কোম্পানিগুলোর টাকার বিনিময়ে ওষুধ লেখার অফারগুলো ফিরিয়ে দিয়েছিলাম, সবাই সেদিনগুলোর সাক্ষী আছে। প্রিয় প্রধানমন্ত্রী, এই সৎ সাহস ও কাজগুলো কি আমার ভুল ছিলো? প্রিয় প্রধানমন্ত্রী, আমার কি এই প্রতিদান পাওয়া উচিত?

প্রায় প্রতিনিয়ত এদেশের চিকিৎসকরা এদেশের নানা স্তরের গ্রাম্য নেতাদের হুমকি-ধামকি মাথায় নিয়ে কাজ করে যান, এটা আমাদের সহ্য হয়ে গিয়েছে। আজ প্রজাতন্ত্রের এক কর্মচারীও ক্ষমতার দম্ভে আমাকে এমনভাবে অপমানিত করলেন। এটা কি আমার বা আমাদের প্রাপ্য ছিলো? এরপরও কি সেই গ্রামে গিয়ে আমি বা আমরা চিকিৎসা দিয়ে যাবো?

প্রিয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি কি মোবাইল কনভারসেশনটা একটু উদ্ধার করতে বলবেন? আমার সাথে দু’বার সেই OC এর কথাবার্তার রেকর্ডগুলো শুনবেন? ৫ মিনিট সময় লাগবে, একটু কি শুনবেন? আপনি কি একটু শুনবেন যথাযথ চিকিৎসা সেবা দেবার পরও কতটুকু ধৃষ্টতা ও অহমিকা নিয়ে তিনি আমার সাথে কথা বলেছেন? মাটির যে মানুষ মাটিতে নিঃশেষ হয়ে যাবে, প্রিয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি দেখবেন তিনি কতটুকু দাম্ভিক?

ঈদে সবাই আনন্দ করবে, প্রজাতন্ত্রের এক কর্মচারী কিভাবে আমার ঈদের আনন্দ অবৈধভাবে মাটি করে দিলো- সেটা কি কাউকে আপনি একটু অনুসন্ধান করতে বলবেন? আমার যদি দোষ থাকে আমি মাথা পেতে নিবো। যদি না থাকে তবে আপনি কি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিবেন? এদেশে শত শত চিকিৎসকের মনের দুঃখ আপনি কি ঘোচাবেন? একবার কি ব্যবস্থা নিয়ে আমাদের চিকিৎসক সমাজকে বলবেন–“আমি আছি তোমাদের সাথে, তোমরা কাজ করে যাও?”

স্বাস্থ্যমন্ত্রী আইনগতভাবে আমাদের অভিভাবক। তিনি বা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তর বা আমার মত ছোটমোটো কিন্তু সমব্যথী কোন মেডিকেল অফিসার কি আমার পাশে এসে একটু দাঁড়াবেন? এই ঘটনার যদি সুরাহা না হয় তবে আমি বা আমার মত যত চিকিৎসক আছেন তারা কি কোনদিন এই বাংলার মাটিতে আগ্রহ নিয়ে এদেশের মানুষের সেবা করতে পারবেন? আমার বড্ড কষ্ট হচ্ছে….

গভীর রাতের সময়টায় আমার চোখে টপটপ করে পানি ঝড়েছে। বিশ্বাস করেন, সৃষ্টিকর্তা সাক্ষী আছেন- এই পানি শুধু আমার নিজের কথা চিন্তা করে পড়ে নাই। যেকোন “সাডেন ব্লো” চুপচাপ সহ্য করার এক অসাধারণ ক্ষমতা আমার আছে, এদেশে চিকিৎসা দিতে গিয়ে অনেক অপমান মাথা পেতে নিয়েছি, আজ আর মানতে পারি নাই। এদেশের মাটির বুকে অনেক চিকিৎসক আজো মুক্তিসেনা হয়ে চিকিৎসা দিচ্ছেন। তাদের ক্রন্দন আমি টের পাই, তাদের চোখের পানির সাথে আমার চোখের এই পানির কি কোন পার্থক্য আছে?

নিজের ডিউটি শেষ করে বাসায় ঢুকেছি। অসুস্থ মা নিজের শরীরের কষ্ট অগ্রাহ্য করে জিজ্ঞেস করলেন–কিরে, হাসপাতালে নাইট ডিউটি কেমন গেলো?’ আমি হাসিহাসি মুখ করে বলেছি- ‘এইতো ভালো, তোমার শরীর এখন কেমন?’

মায়ের খুব ইচ্ছা ছিলো তার ছেলে-মেয়েকে তিনি ডাক্তার বানাবেন। মহান সৃষ্টিকর্তা তার ইচ্ছা পূরণ করেছেন। মৃত্যুপথযাত্রী মা নিজের কষ্ট ভুলে থাকেন তার ছেলেমেয়েকে এদেশের চিকিৎসক বানানোর আনন্দে। আমি কিভাবে তার এই আনন্দ নষ্ট করি? আমি কি করে এতটা পাষান হই?

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close