অপরাধী সনাক্তকরণের জন্য যুগ যুগ ধরে বহু ধরণের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়ে এসেছে। সেই তালিকায় নতুন একটি সংযোজন ঘটাচ্ছে কানাডীয় পুলিশ। ডিএনএ ব্যবহার করে নিখোঁজ ব্যক্তির সম্ভাব্য ছবি তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে তারা। গেল বছর বড় দিনের আগের রাতে তারা একটি ময়লার ঝুড়িতে একটি মৃত শিশুকন্যার মরদেহ খুঁজে পায়। এখন পর্যন্ত বাচ্চাটির মা কে তা খুঁজে বের করতে পারেনি পুলিশ। আর তাই ঠিক কী কারণে তার মরদেহ ময়লার ঝুড়িতে ফেলে যাওয়া হয়েছিল সে হদিশও বের করতে ব্যর্থ হয়েছে তারা। এবং বাচ্চাটিকে যখন ময়লার ঝুড়িতে ফেলে যাওয়া হয়েছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে সে জীবিত ছিল নাকি ইতিমধ্যেই মারা গিয়েছিল, এমন প্রশ্নও জেগেছে তাদের মনে।

এ সকল প্রশ্নের উত্তর তখনই পাওয়া যাবে, যখন তারা খুঁজে বের করতে পারবে বাচ্চাটির মাকে। আর সেজন্য তারা সাহায্য নিচ্ছে ‘ফেনোটাইপিং’ নামক প্রযুক্তির। সেই লক্ষ্যে ভার্জিনিয়া-কেন্দ্রিক একটি কোম্পানিকে তলব করেছে তারা, যারা বাচ্চাটির ডিএনএ বিশ্লেষণের মাধ্যমে তার মায়ের সম্ভাব্য মুখচ্ছবি ফুটিয়ে তুলবে। বলাই বাহুল্য, ডিএনএ ব্যবহার করে এ ধরণের ফেনোটাইপিং যদি সত্যিই সম্ভব হয়, তাহলে অপরাধবিজ্ঞান এক লাফে অনেকদূর এগিয়ে যাবে। আর তার ফলে পৃথিবীতে ‘পারফেক্ট ক্রাইম’ এর পরিমাণও হ্রাস পাবে উল্লেখযোগ্য হারে।

সংশ্লিষ্ট এই কেসটির ব্যাপারে কানাডীয় পুলিশ এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে জানিয়েছে, ‘আমরা বাচ্চাটির মায়ের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে অবগত নই। কিন্তু আমাদের কাছে বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’

এদিকে যে কোম্পানিটি ফেনোটাইপিং এর কাজ করছে, তারা ইতিমধ্যেই ডিএনএ বিশ্লেষণের মাধ্যমে বাচ্চাটির মায়ের সম্ভাব্য কিছু বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে অনুমান করেছে। যেমনঃ মহিলা সম্ভবত নর্দার্ন ইউরোপিয়ান, তার চোখ বাদামী বা সবুজ, গায়ের রঙ ফর্সা, চোখ উজ্জ্বল বাদামী বা কালো।

উল্লেখ্য যে, এটিই কিন্তু ফেনোটাইপিং ব্যবহারের মাধ্যমে দোষী সনাক্তকরণের একেবারে প্রথম দৃষ্টান্ত নয়। এর আগেও অরলান্ডো, ফ্লোরিডার পুলিশ ২০১৬ সালে ২০০১ সালের একটি কোল্ড কেস রি-ওপেন করে, এবং ফেনোটাইপিং এর মাধ্যমে সম্ভাব্য অপরাধীর মুখচ্ছবি স্কেচ করতে সমর্থ হয়। তবে এই ফেনোটাইপিং আদৌ কার্যকরী ও বিশ্বাসযোগ্য কিনা তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে স্বয়ং বিজ্ঞানীদের মনেই। তারা বলছেন, ফেনোটাইপিং এর মাধ্যমে সঠিক লোকের বদলে ভুল কোন লোকের ছবিও তৈরি করে ফেলা অসম্ভব কিছু নয়।

ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালগারির বায়োলজি ও অ্যানাটমি বিভাগের প্রধান, বেনেডিক্ট হলগ্রিমসন কাজ করছেন মানুষের মুখের গঠন নিয়ে। তিনি বিশ্বাস করেন জেনেটিক্সের মাধ্যমে এ ধরণের অনুমানের একটি নির্দিষ্ট সীমা রয়েছে। ‘একজন ব্যক্তি আসলেই ঠিক কী রকম দেখতে, আমার মনে হয় না তা বের করার জন্য একদম শতভাগ কার্যকরী কোন প্রযুক্তি রয়েছে।’

কেননা একজন মানুষের ডিএনএ বিশ্লেষণ করে এটি বলা সম্ভব যে তার চুল ও চোখের রঙ কী, তার জাতীয়তা কী ইত্যাদি। কিন্তু একজন মানুষের মুখের আকার, নাক, ভুরু, চোয়াল ইত্যাদির আকার ও গঠন ঠিক কী রকম তা অনেক বেশি জটিল। কারণ একজন ব্যক্তি নির্দিষ্ট এক ধরণের মুখাবয়ব নিয়ে জন্মগ্রহণ করতে পারে, যা তার ডিএনএর সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। কিন্তু পরবর্তীতে বয়সের সাথে, এবং ব্যক্তিটি ধূমপান করে কিনা, তার বর্তমান স্বাস্থ্য কেমন ইত্যাদি তার বর্তমান মুখাবয়বের ক্ষেত্রে একটি বড় প্রভাব ফেলে।

আর তাই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি যতই এগিয়ে যাক না কেন, ফেনোটাইপিংকে এখন পর্যন্ত শতভাগ বিশ্বাসযোগ্য একটি প্রক্রিয়া হিসেবে মেনে নেয়া আসলে সম্ভব নয়। এ প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে এমন হতে পারে যে এমন কোন ব্যক্তির মুখের ছবি স্কেচ করাব হলো, যার আসলে সম্পর্কিত কেসের সাথে বিন্দুমাত্র যোগাযোগ নেই। তার ফলে পুলিশেরা যেমন ভুল পথে পরিচালিত হবে, তেমনি একজন নিরীহ, নিরপরাধ মানুষও হেনস্তার শিকার হতে পারে।

বিবিসি অবলম্বনে

Comments
Spread the love