শিশুতোষ চলচ্চিত্রের তালিকায় আমাদের অনেকেরই প্রথম পছন্দ “দীপু নাম্বার টু”। এ ছবিটির জনপ্রিয়তা এতটাই বেশী যে কাউকে যদি ন্যূনতম একটি শিশুতোষ চলচ্চিত্রের নাম বলতে দেয়া হয় তবে তার সর্বোচ্চ সংখ্যক প্রাপ্ত উত্তর হিসেবে নিঃসন্দেহতীতভাবে দীপু নাম্বার টু নামটিই পাওয়া যাবে। এর একটি কারন অবশ্য আমাদের দেশে শিশু কিশোরদের নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্র যে একেবারেই হাতেগোনা! ১৯৯৬ সালে দেশবরেণ্য চলচিত্রকার মোরশেদুল ইসলাম, জাফর ইকবালের রোমাঞ্চকর কিশোর উপন্যাস অবলম্বনে রাষ্ট্রীয় অনুদানে নির্মাণ করেন দীপু নাম্বার টু। সিনেমার দুই প্রটাগনিষ্ট দীপুও তারেক চরিত্রে অভিনয় করেন অরুন সাহা এবং শুভাশিস।

বড়বেলায় এসে কার না ফিরে যেতে ইচ্ছে হয় ছেলেবেলায়! আর দীপু নাম্বার টু সেরকমই একটি ছবি, যা টাইম ট্রাভেলে করে ঠিকই আপনার দুরন্ত শৈশবকে চোখের সামনে তুলে ধরবে। ডিটেকটিভ ধারার দীপু নাম্বার টু কিশোর বয়সের দুরন্তপনা, বন্ধুত্ব, শেয়ারিং, টিম ওয়ার্ক, প্রানবন্ত উচ্ছ্বাস, প্রত্যুৎপন্নমতিতা, বিচক্ষণতা, চিন্তার সৃজনশীলতা, বুদ্ধির ক্ষিপ্রতা, আবেগ, ভালবাসা, প্রখরতা, রাগ, ক্ষোভ, অভিমান, জেদ, প্রতিশোধস্পৃহা, এডভেঞ্চারস, ক্যারেক্টার’স ডুয়েলিটি, সিদ্ধান্তের পরিপক্বতা এবং জীবন বাস্তবতার প্রতিচ্ছবিদৃশ্যমানকরে।

সরকারি কর্মকর্তা বাবার ট্রান্সফার হবার সুবাদেদীপুর প্রতি বছর স্কুল পরিবর্তন করতে হয়। সিনেমার শুরুতেই নতুন স্কুলে অষ্টম শ্রেনিতে ভর্তি হওয়া দীপুকে স্কুলের নিয়ম অনুযায়ী আইস ব্রেকিংয়ের জন্য ৫মিনিট নতুন বন্ধুদের সামনে লেকচার দিতে বলা হয়। যেখানে দীপু তার বুদ্ধিমত্তা এবং প্রতিভার সাক্ষর রাখার পাশাপাশি একাকী বড় হওয়া অত্যন্ত কম সময়ের মধ্যে দীপুর ব্যাক্তিজীবন সম্পর্কে দর্শকদের এরকম কৌশলীভাবেই ধারনা দেন নির্মাতা। অন্যদিকে ক্লাসের সবচেয়ে দুষ্টু বখাটে তারেক অন্যান্য সহপাঠীদের মত দীপুকেও তার আনুগত্য স্বীকারে বাধ্য করতে চায়। লিডারশীপ ও একক আধিপত্য বিস্তার করতে চায় সে। কিন্তু একরোখা দীপু কোনভাবেই বখাটে তারেকের বশ্যতা স্বীকার করবে না। ফলশ্রুতিতে আগ্রাসী তারেকের হাতে একদিন প্রচণ্ড মার খায় দীপু। বাধ্যতা মেনে না নেয়ার দীপুর হাতের আঙ্গুলের মধ্যখানে পেন্সিল ঢুকিয়ে মারা ওকে শায়েস্তা করে তারেক। সে থেকেই দীপু হয়ে উঠে প্রতিশোধপরায়ন এক চরিত্র। যেনিজ হাতে তারেকের মারের বদলা নিতে চায় বলে   স্কুলে কোন বিচার দেয় না। বরং সেদিন ক্রোধ নিয়ে বাসায় ফিরে তারেকের স্কেচ করে সেখানেউদ্ধত মুষ্টিবদ্ধ ঘুষি (প্রতিশোধ) চিহ্ন একে দেয় সে।

পরে অবশ্য তারেকও সেদিনের কৃতকর্মের জন্য কিছুটা অনুশোচনা বোধ করে। মূলত এখান থেকে শুরু হয় তারেক চরিত্রের ডুয়েলিটি। দুর্জন তারেকের বিরুদ্ধচারন সরাসরি কেউ করাতে না পারলেও সবাই তাকে বয়কটই করে।

দীপু চরিত্রের বুদ্ধিমত্তার আবারও প্রমাণ মেলে স্কুলেরড্রিল টিচারের শাস্তির ভয়ে দীপুর কথামত সবাই যখন একইসাথে দৌড় শেষ করার সিদ্ধান্ত নেয়ার দৃশ্যতে। স্যার যখন ওদের পরিকল্পনা ধরে ফেলে তখন বন্ধুকে বাচাতে ওরা সবাইই নিজেকে পরিকল্পনাকারী হিসেবে দাবি করে তাদের বন্ধুত্বকেই সমহিমায় উদ্ভাসিত করে।

 ঘটনাপ্রবাহে একদিন তারেকের চ্যালেঞ্জে দীপু ও নাণ্টুমই বেয়ে পানির ট্যাংকিতে উঠায় কিশোর বয়সে জেদের বশবর্তী হয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে যে অপরিণামদর্শিতা কাজ করে সেটিও উঠে এসেছে। অন্যদিকে এই একই সিকুয়েন্সে তারেকের যে ভিন্ন আরেকটা সত্তার পরিচয় পাওয়া যায় তা হচ্ছে বন্ধুপ্রীতি ও দায়িত্বশীলতা। উপর থেকে নান্টুকে নিজ কাঁধে করে নামিয়ে আনে তারেক। আবার পরক্ষনেই নাণ্টুকে পেটে ঘুষি মেরে তার ক্ষোভও ঝাড়ে। অর্থাৎ কিশোর বয়সের এই চারিত্রিক ডুয়েলিটি বারংবার নির্মাতা অঙ্কন করে দেখিয়েছেন বেশ চমৎকার ভাবে। তারেকের এই ভিন্ন সত্তার উন্মোচন দীপুর ভাবনার জগতে এক নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়। আপাতদৃষ্টিতে আমরা যা দেখি তাই যে শেষ কথা নয় সেটিও নির্মাতা আমাদের ভাবান।

এক্ষেত্রে গুণীজন মোরশেদুল ইসলাম তার মুন্সিয়ানা দেখালেন আরও একবার। এই সিনেমার সবচেয়ে আলোচিত দৃশ্যও বলা হয় এটিকে। তারেকের সাথে দীপুর বন্ধুত্ব হয়ে যাওয়া তিনি দেখালেন মন্তাজ ব্যাবহার করে। বন্ধুত্ব হয়ের যাওয়া বুঝাতে তিনি আবার ফিরে গেলেন সেই মুষ্টিবদ্ধ ঘুষি চিহ্নিতস্কেচে। যেখানে দীপুকে দিয়েই মুষ্টিবদ্ধ হাতের উপর লাল কালিতে ক্রস চিহ্ন একে দিয়ে তাদের বন্ধুত্ব হয়ে যাওয়াকে প্রকাশ করলেন।

এরই মধ্যে দীপুর জীবনে ঘটে এক অফট্র্যাক বাস্তবতা। যার জন্য সে মোটেও প্রস্তুত ছিল না। এসময়ে তার সাথে তার মায়ের সম্পর্কের গভীরতার সাথে পরিমিতিবোধের সূক্ম এক সীমারেখা টেনে দেয়া হয়। দীপুর ব্যাপারে তার বাবার অবাধ স্বাধীনতা, তার দর্শন এবং আদর্শের যে মিশেল উপস্থাপন করা হয় তা সত্যিই প্রশংসাযোগ্য।

 বাংলা সিনেমার জন্য আবশ্যকীয় উপাদান বলে স্বীকৃত “গান” জিনিসটি এই সিনেমার কোথাও ব্যাবহার করা হয়নি। তবে সিনেমার শব্দ এবং আবহ সঙ্গীতের কাজটি করা হয়েছে বেশ নিপুণতার সাথে। প্রতিটি সিকুয়েন্স এবং শটের মেজাজকে মাথায় নিয়ে সত্য সাহা এ জায়গায় তার কাজের যথার্থতার প্রমাণ দিয়েছেন।

 মা’র কাছ থেকে জীবন বাস্তবতাকে প্রত্যক্ষ করে ফিরে আসা দীপু এইবার দেখা করতে চায় দ্বিচরিত্রের অধিকারী তারেকের সাথে। কিন্তু তারেকের বাসা অব্দি পৌঁছে দীপু যেন হাজির হয় আরেক সত্যের কাছাকাছি। তারেককে যেন এবার পুরোপুরিভাবে আবিষ্কার করা হল! বখাটে স্বভাবের উগ্র তারেকের পরিস্থিতি বাস্তবতা একেবারে স্বল্প পরিসরে হলেও দর্শকমনে ভাবনার উদ্রেক ঘটায়। এ অবস্থায় শুরু হয় এদের দুজনের প্রকৃত বন্ধুত্ব ও এডভেঞ্চার পর্বের। তাদের এই এডভেঞ্চারকে কালোচিতা রহস্য বলে সম্বোধন করাই যায়।

দীপু নাম্বার টু সিনেমায় দেখানো হয়েছে কিশোর বয়স দূর্বার, এ বয়স কোন শৃঙ্খলকেই তোয়াক্কা করে না। এ বয়স রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার স্বাদ পেতে মরিয়া। তাই ক্লাসের বিশ্বস্ত সব বন্ধুদের সাথে নিয়ে এবার শুরু হয় দীপু তারেকের কালোচিতা অভিযান। শিশুতোষ সিনেমা বলেই বোধহয় নির্মাতা এই অভিযানকে টান টান উত্তেজনায় রেখে খুব বেশী শ্বাসরুদ্ধকর করে উপস্থাপনের সিদ্ধান্ত নেননি। বরং তিনি সেটিকে অনেকটাই শিশুবান্ধব করে ভিজুয়ালাইজ করেছেন। যেখানে দীপু তারেক এবং তার সঙ্গীসাথীরা তাদের বুদ্ধিমত্তায় মূর্তিচোরদেরকুপকাত করে দেশের প্রত্নতত্বের মহামূল্যবান ঐতিহাসিক প্রাচীন পোড়ামূর্তি চুরি হয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করে। তাদের গৌরবোজ্জ্বল এই কাজের কৃতিত্বস্বরূপ সরকার তাদের পুরস্কৃত করে, যার সবটাই প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় তারেককে দিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সবাই। এইখানে খুব চমৎকারভাবে বন্ধুত্বের এক উজ্জল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন গল্পকার। এছাড়ামুভির একেবারে শেষ দৃশ্যের সাথে শুরুর দৃশ্যের স্থানিক যোগসূত্র স্থাপনের বিষয়টিও বেশ ভালো মেকিং ট্রিটমেন্ট হিসেবেই বিবেচনায় নেয়া যায়।

 শেষকথায় বলতে চাই নতুন প্রজন্মের এই চলচ্চিত্রের সাথে পরিচয় হওয়াটা এসকল কারনেই বেশ জরুরী বলে মনে করি। কেননা চিত্তবিনোদনের পাশাপাশি বাস্তবিক জীবনের নানা উদ্ভুত পরিস্থিতি মোকাবেলার অনুপ্রেরণা এবং ইতিবাচক পরিবর্তনের নানা উপাদান পরোক্ষভাবে এই সিনেমায় বিধৃত। তাছাড়া সাময়িকভাবে কিছু সময়ের জন্য নস্টালজিক হতে চাইলে বড়দের দেখার জন্যও এটিএকটি আবশ্যিক সিনেমা।

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-